অন্তিম দহন পেরিয়ে গার্সিয়া মার্কেস

অদ্বয় চৌধুরী



পুড়ছে। পুড়েই চলেছে সবকিছু। তবে, এই দহনের নানান আকার ও প্রকার আছে। কখনো কলকাতার গনগনে দুপুরে গাঢ় কালো, চকচকে ও পিছল, রাস্তার উপরে মরীচিকা; কখনো আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ বনভূমিতে দাবানল। কখনো সিরিয়া, মিশর বা কাশ্মীরের নিষ্প্রদীপ রাতের আকাশে দীপাবলির ধুম লাগিয়ে নেমে আসা একঝাঁক রকেট। কখনো আবার কলোম্বিয়ার আরাকাটাকায় শ্রমিক ধর্মঘটে আগুনের ফুলকি ছোটানো দমাদ্দম ফায়ারিং। ভিন্ন নাম, ভিন্ন রূপ, ভিন্ন পরিচয়। কিন্তু অভিন্ন অনুভূতি। দহন।

আগুন মানে ‘ফায়ার’, ‘ফায়ার’ মানে ‘গুলিবর্ষণ’। ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মনে পড়ে গিয়েছিল সেই বিকেলের কথা যেদিন তার বাবা তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বরফ চেনাতে। সম্ভাব্য অন্তিম দহনের ঠিক আগের মুহূর্তে হিমশীতলতা হাতড়ে বেড়ানর উদ্দেশ্য কি? দহনকে নাকচ করে দেওয়া? অগ্রাহ্য করা? তবে আগুন ও বরফ কি প্রতিস্পর্ধী? আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মতোই তার সৃষ্টিকর্তা, গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, ছোটবেলায় তার দাদুর হাত ধরে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির গুদামঘরে গিয়েছিল বরফের অলৌকিক ক্ষমতা দেখতে। কিন্তু রেফ্রিজারেটরের ধোঁয়া ওঠা বরফ আর চুল্লির ধোঁয়া নির্গত করা আগুনের মধ্যে সেই বাচ্চা ছেলেটা কোন পার্থক্য খুঁজে পায়নি সেই মুহূর্তে। কিন্তু, হিংসা ও মৃত্যুতে ক্রমাগত পুড়তে থাকা সময়কাল নিশ্চিতভাবেই তাকে সেই পাঠ দিয়েছে পরবর্তীকালে। তাই, কোন এক ভয়ঙ্কর শীতকালে, হয়তো শীতলতার অলৌকিক ক্ষমতাবলে, বুড়ো, অক্ষম, মৃতপ্রায় দেবদূতের ডানায় নতুন পালক জন্মায় এবং সে উড়ে যায় আকাশে।

গার্সিয়া মার্কেসের বুড়িয়ে যাওয়া, দুর্বল, রোগাক্রান্ত, নশ্বর দেহকে মৃত্যু অন্তিম দহনের পথে নিয়ে গিয়েছে। ‘আগুনপথ’ ধরে। যে পথের ধারে ছিল তাঁর শেষ ঠিকানা। কিন্তু নিদাঘপীড়িত বৈশাখী কলকাতার প্রথম মার্কেসহীন রাতে, আশ্চর্যজনক ভাবে, তাপমাত্রা ছিল মাত্র ২৯ ডিগ্রী। আর্দ্রতা ছিল ৭৯ শতাংশ। হাওয়াও বইছিল। ৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে। সব থেকে বড় ব্যাপার, নিরন্তর মেঘের আনাগোনা ছিল বিষাদে ভারাক্রান্ত আকাশে। এসব তো মৃত্যুর ঝলসানো দাবদাহের ইঙ্গিতবাহী নয়! তবে এ কিসের ইঙ্গিত বহন করে? কোন জাদুবাস্তবতার? আগুনের অদৃশ্য ফাঁদে আটকে পড়া এই সময়কে, মৃত্যুর অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন, বিপদরেখা ছুঁয়ে ফেলা প্রসারতাকে থমকে দিয়ে, কোন অলৌকিক জাদুর মাধ্যমে, হয়তো বা, তিনি রূপান্তরিত হবেন সেই বুড়ো দেবদূতে। তারপর, শীতলতার কোমল স্পর্শে, নতুন পালকের সাহায্যে আবার আকাশে ডানা মেলবেন। অন্তিম দহন পেরিয়ে, মৃত্যুঞ্জয়ী স্পর্ধায় ভর করে, উড়ে যাবেন, বহু দূরে, একা, নিঃসঙ্গ।

তখনই, ঠিক সেই মুহূর্তেই, হয়তো, বৃষ্টি নামবে অঝোর ধারায়।