ছ’ ইয়ারি গল্প – প্রথম পর্ব

শুভ্র চট্টোপাধ্যায়

বাড়ির পেছনে কাঠা চারেক জমিতে অনেক রকম গাছ। তার মধ্যে চারটে কাঁঠাল গাছ চার কোণে। ইস্কুল থেকে ফিরে রবিকান্ত রায় বাগানে একটা টুল নিয়ে বসেন আর ভাবেন। গেল বার এঁচোড়ের ভালো দাম পেয়েছেন। এখন এই শেষ ফাল্গুনে দুটো গাছেই যে পরিমাণে কাঁঠালের বাচ্চা জমে আছে তাতে এবারও ফলবে প্রচুর। তিনি জানেন গঙ্গার ওপাড়ে কাঁঠাল তেমন জন্মায় না। এত বড়ো ফল। রসে টম্বুর। যথেষ্ট জল না পেলে ফলবে কেন। রবিকান্তের গ্রামে আগে বছরে বৃষ্টি পড়ত গড়ে চারশো সেন্টিমিটার। এখন সেটা কমে গেলেও কাঁঠালের পক্ষে যথেষ্ট। মনে হয় এবার তিনি কাঁঠালের ছানা বেচে বারান্দার টিনটা বদলে ফেলতে পারবেন।
রবিকান্ত ভূগোলের শিক্ষক। নবমোহন হাইস্কুল তার বাড়ি থেকে মোটর সাইকেলে আধা ঘন্টার রাস্তা। এঁচোড় বিক্রি করে বারান্দার টিন বদলানোর কথা ভাবলেও রবিকান্ত বিষয়ী মানুষের আওতায় আসেন না ঠিক। তিনি রাতে খাওয়ার পর ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল দেখে আনন্দ পান। কিন্তু যা দেখেন তা নিয়ে আলোচনার করার মত লোক আর আসে পাশে কোথায়! অবশ্য ইস্কুলেও যে আছে, এমন নয়। মাঝে মাঝে টিচার্স রুমে বসে কেনিয়ার ভূ প্রকৃতি কিংবা ডুয়ার্সে বৃষ্টি কমে যাওয়ার মত বিষয় নিয়ে কিছু কথা তোলার চেষ্টা করেন। দু-এক জন দু'চারটে বাক্য শোনে। তারপর কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় নিজেদের মহার্ঘ ভাতা সংক্রান্ত বঞ্চনার হিসেব টেনে এনে আলোচনা থেকে রবিকান্তকে সরিয়ে দেয়। এই কারণেই বিকেলে খানিকটা সময় বাগানে না বসলে স্বস্তি পান না রবিকান্ত। সেখানে দু-চারজন আসে। তাদের সাথে কথা কয়ে সুখ।
দু-চার জন বলতে আসলে চার জন। দাড়ি আর গোঁফ ঠিক চার রকম ভাবে চার জনের মুখে না থাকলে চার জনকে আলাদা করে মনেই রাখতে পারত না রবিকান্ত। চার জনকে এক রকম দেখতে আর চার জনের একটাই নাম। সে নামটা হলো 'বিশ্ব'। মনে রাখার জন্য রবিকান্ত তাঁদের আলাদা আলাদা নাম দিয়েছেন। দাড়ি-গোঁফ যুক্ত লোকটার নাম রেখেছে মধুসূদন। কেবল গোঁফ ওয়ালাটার নাম আশুতোষ। গোঁফ ছাড়া কেবল দাড়ি নিয়ে আসে আবদুল আর দাড়ি-গোঁফ হীন ব্যক্তিটির নাম বিবেকানন্দ। বাগানের উত্তর আর দক্ষিণে প্রতিবেশীর জমি আর খড়-টিনের বাড়ি। এ পাড়ায় দুটো বাড়ির মেঝে সিমেন্টের। তাঁর আর শ্যামকান্ত বর্মনের বাড়ি। রবিকান্তর বাগানের পেছন দিকটা ঢালু হয়ে একটা বাঁশ ঝাড়ের সাথে মিশে গেছে। তারপরে নদী। সেটা ছোট নদী। নদীর ওপাড়ে প্রধানমন্ত্রী যোজনার পাকা রাস্তা। রাস্তার ওপাড়ে জমি আবার ধীর গতিতে খানিকটা উঁচু হয়ে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেছে। সে জঙ্গল সেখানে হালকা হলেও ভেতরের দিকে গভীর হতে হতে উঠে গেছে ভূটান পাহাড়ের গা বেয়ে। চারটে লোক ওই পাহাড়েই থাকে কোথাও। অন্তত: রবিকান্তের তাই ধারনা। নদী পেরিয়ে ওরা তাঁর বাগানে ঢোকে। এটাই শর্টকাট। ওরা বেরোয় জঙ্গল থেকে। সেটাও আরেকটা শর্টকাট। পাহাড়ের গায়ে গায়ে লেগে থাকা গ্রামগুলোতে যারা থাকে তার ছাড়া জঙ্গলের মধ্য দিয়ে শর্টকাট করার অনুমতি এখন আর কেউ পায় না।
রোদ্দুর এখন প্রায় নিভে যাওয়ার মুখে। বাগানের গাছগুলো কালো কালো দেখাচ্ছে। বাতাবী লেবু গাছের তলা থেকে টুলটা সরিয়ে রবিকান্ত একটু ফাঁকা জায়গায় বসল। পাখিদের ফেরার সময় এখন। গাছে বসে তারা প্রচুর আলোচনার সাথে সাথে যখন তখন পটি করে দিতে পারে। রবিকান্ত সেই আশংকায় টুল সরিয়ে বসে বিড়ি ধরিয়ে নদীর দিকটা দেখার চেষ্টা করলেন। বাঁশ ঝাড়ের অন্ধকার থেকে একজন বেরিয়ে এদিকে আসছে। চারজন একসাথে খুব কমই আসে। বেশির ভাগ দিন আসে দু-জন। কখনো আবার একজন। তবে একাধিক বিশ্ব এলে এক সাথে আসে না।
বিড়ির ধোঁয়া নাক দিয়ে আলতো করে বের করে দিয়ে রবিকান্ত উৎকৃষ্ট নেপালি তামাকের গন্ধ মাখলেন। একটা বিশ্ব তাঁর বাগানে ঢুকে পড়েছে। সে হলো আশুতোষ। আসলে বাংলার বাঘের কথা ভেবেই নামটা রেখেছিলেন রবিকান্ত। শুকনো পাতা মাড়িয়ে আশুতোষ এসে দাঁড়াল সামনে। অন্য কেউ হলে পাতা গুঁড়িয়ে যাওয়ার শব্দ হত। ওরা এলে হয় না।
"আর কেউ আসবে?" রবিকান্ত জানতে চাইল। আশুতোষ মাটির ওপর বাবু হয়ে বসতে বসতে বলল,"আজ তো আমার বিশেষ দিন। ছাব্বিশে ফাল্গুন।"
"সরি। মনে ছিল না।" রবিকান্তর মনে পড়ল দিনটার কথা। চৈতন্যদেবের কীর্তন থেকে ফেরার পথে আশুতোষের হৃদরোগ হয় আর সে মরে যায়। দিনটা ছাব্বিশে ফাল্গুন ছিল।
"শান্তিপুরের জন্মভিটে থেকে এই ঘুরে এলাম।" আশুতোষ জানায়। "বছরে একটা দিনই যাই। এখন তো সেখানে সরকারের অফিস হয়েছে। অবশ্যি পাঁচশো নয় বছর তো কম কথা নয়।"
আশুতোষ হাসি হাসি মুখে কথাগুলো বলে মাথার ওপরে তাকাল। বোধহয় তাঁর শান্তিপুরে যাতায়াতের পথটা আরেকবার স্মরণ করল সে।