শ্যামল সিংহঃ একটি বীক্ষণ

স্বপন রায়

বাঙালির কবিতাবোধ নিয়ে আমার সন্দেহ আর গেলোনা! রবীন্দ্রনাথ’কে নোবেল পাওয়ার পরেও সের দরে বই বিক্রি করার কথা ভাবতে হয়েছিলো,জীবনানন্দ’কে নিতেই পারেনি তখনকার বাঙালি বোদ্ধারা,স্বদেশ সেন সম্প্রতি চলে গেলেন,টুঁ শব্দও কেউ করেনি আর একইরকম উদাসীনতায় শ্যামল সিংহ ২০০৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি চলে গিয়েছিলেন,বাংলার কবিতাজীবিরা বুঝতেই পারেনি যে এক অনন্য স্রষ্টাকে বাঙালি হারালো যিনি মিডিয়াকেপ্ট বা বাজারু হতে চাননি,যিনি বাংলা কবিতাকে উপহার দিয়েছিলেন এক অসমান্তরাল লিখনশৈলী!

“চারদিকে মাংস
আমি কিছুতেই পার হতে পারছি না
                   মাংস
চাপে আছি
বলের চাপে আছি

সারাক্ষণ
আমাকে ঘিরে আছে
                   বল
আমি হরিণের ঘুমে টোকা দিয়ে যাই

আমি হরিণের ঘুমে টোকা দিয়ে যাই

যদি ফল পাকে
যদি ফল পাকে (ফসলবন্দী/সূর্যাস্ত আঁকা নিষেধ/২০০১)

শ্যামলের তারুণ্যে ছিলো সত্তর দশক,সত্তরের আবহাওয়ায় প্রগলভ,তখনকার রাজনৈতিক মুখরতায় কবিতা হয়ে উঠেছিলো কথাবাহী এবং ঘোষনাময়!সন্ত্রাস, নিপীড়ন ইত্যাদির প্রতিরোধে কবিতার একটা বড় অংশে ছিলো এলিয়টসুলভ নান্দনিক ভাষন বা চমকের ছড়াছড়ি!তখনকার কবিদের এই চার্জড আবহাওয়া এক সহজলভ্য ‘টুল’ হাতে তুলে দিয়েছিলো,প্রচলিত ছন্দের ‘টুল’!কারণ একটা সময়ে বিপ্লব যখন সমাগত আর একটা পরবর্তী সময়ে বিপ্লব যখন পরাজিত কবিদের একটা বড় অংশই তখন বিবৃতির ছন্দোময় দোলায় চল্লিশ বা পঞ্চাশ দশকে ফিরে গেছেন!আর বাংলা বাজার এমন আবেগঘন অনুপ্রাসিত উচ্চারণকেই কবিতা হিসেবে বেচতে শুরু করে দিয়েছে!কবি শ্যামল এমনই একটা বিরুদ্ধ সময়ে বাংলা কবিতাকে পদ্য বা গানের বালকোচিত প্রভাবের বাইরে নিয়ে আসার কাজ শুরু করেছিলেন!আমাদের সৌভাগ্য যে তিনি “পাগলা ঘোড়া” এবং”ক্রুসেডে”র মত দুরদৃষ্টিসম্পন্ন পত্রিকার সঙ্গ পেয়েছিলেন এবং সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন সম মানসিকতার কবি বিজয় দে আর কবি সমর রায়চৌধুরিকে!

কি করলেন শ্যামল? কবিতাকে তিনি নিয়ে এলেন বিষয়বাক্যের বিরক্তিকর পারফরমিং চাপল্য থেকে অনুভবের প্রাক-সংযমে!আর কি অনবদ্য খ্যাপামি কবির তখন,কত অনায়াস কিন্তু জটিল ছেদবিন্দুতে তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন আমাদের যা না পড়লে লেখা যাবেনা!:
১.”সেতুর কাছে আমি রেখেছি পাটিগণিতের প্রস্তাব..”
২.”চিরুনির শেষে ভেঙে যাচ্ছে গ্রাম”
৩.”লোমের ফাঁকে ফাঁকে জিরাফ”
৪.”প্রদীপের কূটচালে নিহত খড়মের শ্লোক”(সব কটি উদাহরণ”চাঁদ ও খোঁড়া বেলুনওয়ালা”থেকে নেয়া)
এরকম অজস্র চিত্রবিরোধ এবং প্রতিসরিত অনুভবের ক্ষরণ উঠে আসছে শ্যামলের কবিতায়!তিনি প্রায় একা হাতেই ভেঙে দিচ্ছেন ‘কাব্যপ্রতিমা’র যাবতীয় মিথ!অনুভবের উৎসে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি আর ব্যঞ্জনার অবাক দুনিয়ায় ছেড়ে দিচ্ছেন আমাদের!কবিতা’কে অন্য মাত্রায় স্থাপিত করার এই প্রচেষ্টায় শ্যামল উৎসাহিত হয়েছিলেন হাইকুর গঠনশুন্যতায়,হয়তোঃ
“ব্যাঙ ডাকছে। বৃষ্টি পড়ছে

যুবতীর পেটের ভেতরে বসে
আমি শুষে নিচ্ছি ব্লটিং-পেপারের দুঃস্বপ্নগুলি”
এবার বাশো রচিত সেই বিখ্যাত হাইকুটি পড়া যাকঃ”old pond/a frog leaps in/water’s sound” শ্যামল হাইকু’র ভেতরে থাকা ইমেজের বিরোধ-সমন্বয় (জাক্সটাপজিশন) এবং সেই বিরোধ-সমন্বয়ী ইমেজগুলিকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যে সব ছিন্নশব্দ বা কাটিং ওয়ার্ডস থাকে সেই সব টেকনিক কিছুটা প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর কবিতায়!কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর কবিতার স্বল্প শরীরগুলিতে এক মেধাবী পরিস্রুত আবেগ হাইকুর পরিসরে বিস্তার পেতে থাকে এবং তিনি এক পরম ও চরম সংহত সৃজনায় পৌঁছে যান তাঁর নিজের সিগনেচারে,যাকে আমি বলি বাংলা কবিতা’র “শ্যামল ধারা”!

বড় কবি তাঁর পরের প্রজন্মকে প্রভাবিত করেন!একেবারে শুরুতে আমি লিখেছিলাম আমাদের কবিতাবোধ এবং তার গুণগত মান নিয়ে!এর একটা কারণ এই যে বাঙালি যতই রাজনৈতিক বিপ্লবের বুলি কপচাক,তার ভেতরে কোথাও এক অনুন্নত মনের চাপ আজো রয়ে গেছে,বিশেষত সাহিত্যের বিচারে!আর শ্যামল সিংহ ওই সময়ে দাঁড়িয়ে লিখে চলেছিলেন তাঁর সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা কবিতা,যা এখনো কত কবিকে প্রভাবিত করে চলেছে,সেইসব প্রভাবিত কবিরা কি জানেন যে ধারায় তাঁরা কবিতাকে সংহত করেন সেই ধারার স্রষ্টার নাম?

আমি শুধু অবাক বিস্ময়ে “এখন বাংলা কবিতা’র কাগজ” প্রকাশিত এই “নির্বাচিত শ্যামল সিংহ” পড়তে ভাবি কোন অতান্ত্রিক বিস্ময়পাথরের স্পর্শে এমন সব বিচ্ছুরণ ঘটে যায়?কি ভাবে কোন মানুষ এ রকম মাপহীন ঔদাসীন্যে থেকেও আসক্ত থেকে যায় এই পৃথিবী’র সামান্য মায়া,সামান্যতর ভালোবাসায়,কি ভাবে প্রকৃতি এত বাকহীন কিন্তু সংবেদনী হতে পারে?আমি জানিনা,পাঠক আপনি কি জানেন?
১.টেবিলের কাছে জ্বলজ্বল করছে টমেটো
তুমি কি বিবাহিত? (টমেটো/পৃঃ৫৮)

২.সারাদিন লোকটি খোঁজে কলম
অন্ধ হয়ে যাচ্ছে পায়রা

ছুটি থেকে
আর ফেরেনি ঝর্ণা(কলম/পৃঃ৮৮)

৩.ফুলের আলোয়
ঈশ্বর রচনা করছেন গান

নদীতে এল বান

কেউ গেলো নদীর পক্ষে
কেউ বিপক্ষে (পক্ষে বিপক্ষে / পৃঃ৪২)

উদাহরণ থাক,কবি শ্যামল সিংহ’কে পড়ে ফেলতে হবে পাঠক,না পড়লে অধরা থেকে যাবে কবির এই অসম্ভব অভিযানঃ”কালিমাখা লন্ঠনের মত আমি যাচ্ছি এক ঘর থেকে আর এক ঘরে”
আমি শ্যামলধারায় স্নাত এখন,অযথা স্নাতক হতে যাবো কেনো? পাঠক আপনি কি করবেন?আপনি কি সত্যিই দেখতে চাননা কি ভাবে ”শিশুদের পা থেকে উঠে আসছে রামধনু..”

আমি তো দেখছি!