এ বিবর্তনবাদে তুমি ভিন্ন বাকিটা অলীক

তমাল রায়



তার চুল থেকে ভেসে আসছিলো জবাকুসুম তেলের গন্ধ। আমি নাক ডুবিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিলাম কোনো এক সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে। সেখানে রোদ ছিলো অনেক। ছিলো গেঁড়ি-গুগলি আর শ্যাওলা মাখা জলজ অভিযোজন। টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যেতাম কানা নদীর চরে। হ্যাঁগো, আমাদের নদীর নাম ছিলো কানা। কানা ছেলের নাম যেমন হয় পদ্মলোচন ঠিক তেমন নয় একটু উল্টো। নামে কানা হলে কী হবে সে নদীর রূপ ছিলো অসামান্য। কেন যে তবু তার নাম কানা হয়েছিলো জানা নেই। ওখানে পৌঁছলে পরে দেখা হয়ে যেতো টেঁপি, মুন্নি, বাবু, কেষ্টদের সাথে দেখা হবেই। ওরাই তো সে জলবিষুব রেখায় আমাকে ধরে রেখেছিলো ধূলোবালি শৈশব ছড়িয়ে। চরে লেখা ছিলো না কোনো নাম। কেবল বালির বুকে যেটুকু দুপুর ফুটে থাকতো তার নাম কখনো ছিলো রাগ, ঝগড়া, অভিমান আর ভালোবাসাও। হ্যাঁগো ভালবাসাও। ওখানেই তো প্রথম লুকিয়ে হাতের মধ্যে কাগজ গুঁজে দিয়েছিলো সে। যাকে আমি ভালবাসিনি আলাদা করে অথচ সে আমাকে ভালোবেসেই গেছে গহীন অরণ্যের মত। অতুল সামুদ্রিক ঝড়ের মত, সুনামির মত। ওখানেই তো জেনেছিলাম বিরহ। সে যাকে স্পর্শ করে থাকলে নীল হয়ে যেতে যেতেও বেঁচে উঠতাম আবার। কারণ ওই অভিঘাতই তো আমাকে, আমাদের গড়ে তুলেছিলো। পিঁপড়ের মত মুখে মুখে ছড়িয়ে দিয়েছিলো সঙ্কেতমালা যৌথতায়। শিখে নিয়েছিলাম ডান, বা বাম উত্তর বা দক্ষিণ মুখী গন্তব্য অভিমুখে যাত্রার সিদ্ধান্ত কিভাবে নিতে হয়। লাল না কালো ছিলো সে পিঁপড়ে জীবন তা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু বেঁচে ছিলাম প্রবল, আর তাই সন্ধে নামলে তার কাছে যখন ফিরে এসে রাখতাম মাথা তারই কোলে, ঘুম আসতো না, আসতো হাজার তারার পথে নক্ষত্রমুখী গমন। সে আকাশে তারা ছিলো অনেক। আর সে চিনিয়ে দিতো কালপুরুষ, সপ্তর্ষি আর অযুত বেঁচে থাকার যাপন সত্য। এও তো ছিলো এক পর্যটন। যা অনেকটা অ, য়া, অ্যা থেকে ম, মা-হ্যাঁ মা হয়ে ফুটেছিলো আমার বাগানে, আমারই দিকে চেয়ে। আমার ভাব অনুভবের প্রথম পার্থিব অনুবাদ। শুনতে পাচ্ছো সে এক কি দুই সদ্য ফোটা দাঁতের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে আসছে আমার ভাষা?

নুন এসে ভীড় করলে মাটি পুষ্ট হয় না যদিও সর্বত। তবু নুন যা কিনা ঋণও তো বটেই। নুনের কথা মনে পড়লে ভীড় করে আসে অযথা দুপুর। যা কাটতেই চাইতো না কিছুতে। বাইরে মৃদূ বাতাস বইতো ভেতরে গম রঙ গাঢ়। নদীর পাশে এই সব মায়া জাল বিছানো থাকে চিরকাল। সে নদীতে নৌকাও চলে। খুব ধীর, যেন গতি আছে, কিন্তু তাড়া নেই। আর একটু কমলা রোদ্দুর উঠুক, শীত ফিরে আসুক, লেপ-তোষক, আদিখ্যেতা সবই বাড়তে থাকুক ধোঁয়া ওঠা চায়ের পেয়ালার মত। নইলে বাষ্প জমে কী করে। নইলে ছায়ারা নড়ে নড়ে উঠবে কী করে, নইলে কী করে ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া বালি পায়ের নীচে আবার! এ তো সেই সময় যখন দুপুর মিশে যাচ্ছে বিকেলের নুড়ি পথে। নৌকা দুলছে, যেমন দোলে কী যেন এক অনিবার্যতায় সব। ডোরা কাটা কে যেন সরে গেলো আবার? ফেলা জাল কি গুটোনোর সময় হয়ে এলো? পাখী ডাকছে আচম্বিতে, মাটি কি কাঁপছে? গাছেরাও দুরু দুরু বুকে অপেক্ষায়...হরিণরা দৌড়তে শুরু করলো। কিজানি বিপদ নাকি সুখের আশঙ্কায়? ঘর পোড়া বেচারা হরিণ, সে তাহলে আসছে? সাথে উন্মাদ আশ্রমের কান কাটা ভ্যান গখ? সে তাহলে আসছে? যেমন আসতো টেলিগ্রাফ টরেটক্কা কোনো উত্তেজনা না ছড়িয়ে? মাটি কাঁপছে। হাওয়া বইতে শুরু করেছে জোরে, নৌকো দুলছে আরো জোর, সে আসছে। মেঘ আসছে ভীড় করে। কত বার, কত কত বারণ করা সত্ত্বেও ভিজে চুলটা ওভাবে ছড়িয়ে রাখতে হল ওভাবেই, যেন নিয়তি এভাবেই...আজ ও.. সে আসছে, কাদা মাটিতে পায়ের দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে আজ, চকিত, তীব্র, শাণিত...সে আসছে, দৃকপাতের সময় না দিয়ে, ছড়ানো চুলে টান পড়লে অস্ফুট চীৎকার – আর ‘মাগো...’। দাঁত বসে যাচ্ছে। রক্ত এবার মিশে যাবে নদীর শরীরে। আর নদী হয়ে যাচ্ছে সমুদ্র, ফুঁসছে, ঢেউ ভাঙ্গছে, পাড় ভাঙ্গছে... ‘মা’ ছড়িয়ে পড়ছে নদী, সমুদ্র পেরিয়ে আরো আরো দূরে... মিশে যাচ্ছে বাতাসে। ভাষা ছড়িয়ে পড়ছে বিকেলের প্রান্তসীমা থেকে যৌবন রহস্য মায়ায়। আমার যুবতী ভাষা...বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ছে অঝোর ধারায়।

সে পথে সুড়ঙ্গ ছিলো, যেমন থাকে। রাত এসেছিলো সন্ধ্যের হাত ধরে। গোপন অন্তর্ঘাত, ম্যাপ, কাঁটা –কম্পাস। কুয়াশা ছিলো, কুয়াশার ভেতর ছিলো প্ররোচনা, রাত নামছিলো টেবিলে, ঘড়ির কাঁটার ঠিক পাশেই। আর সে এগিয়ে চলছিলো, স্তিমিত আলোয় উল্টনো পড়েছিলো জুতো, ভিজে রুকস্যাক। কেউ কেউ ভেবেছিলো বোকা উড়োজাহাজ। পাখী সব করে রব, ফিরে গেছে ঘর। এইখানে প্রকৃত ঘর বাসা হয়ে উঠেছিলো। সামনে বোকা বাক্স জুড়ে- ইমন...কল্যাণে কল্যানীয় স্লো মোসান জনিত যাপন। সুড়ঙ্গ ছিলো যেমন লুকোনো প্রাণ রবি ঠাকুর। ব্যাংকের পাস বই, কুয়োতলা, খাদ..। অ্যাসট্রেতে ছাই। এ সময়ে রজনীগন্ধা ফোটে। সুরভিত এ দৃশ্যে খাটের পায়ের কাছে মাথা হেঁট করে শুয়ে ছিলো কুকুর। দড়িতে তখনো ঝুলছে হাতাওলা জামা, গামছা টুকিটাকি, যেমন হয় আর কি গার্হস্থ্য জীবন। মাথার ওপর পাখা ঘুরছে ধীরে, মঞ্চের বাম দিক জুড়ে তখন পাতা ঝরবার গান... ডান দিকে লোভী ও বিষয়মুখী সন্তানের মুখ থেকে ঝরে পড়ছে লালা। আর সেন্টার স্টেজ আলো করে নয়, কুন্ঠায়, অস্বস্তিতে অন্ধ তরঙ্গ ও ব্যক্তিগত খাদ থেকে সরিয়ে রাখতে স্মৃতি কণ্ডুয়নে...হাতে বিড থেকে বিডে আঙ্গুল সরে সরে যাচ্ছিলো যেভাবে দিন ও... এ দৃশ্যে কেন যে লঙ শট, মায়াবী আলো ফেলেন পরিচালক, ঈশ্বর, এক সর্বগ্রাসী ‘না’ তা বুঝে ওঠার আগেই ছায়া ভাঙ্গছিলো, যেভাবেই ভেঙ্গেছিলো ভারতবর্ষ কোনো এক সাতচল্লিশে।
পথে তখনো কানা উঁচু অপ্রাপ্তি, মোক্ষহীনতা। রাত বাড়ছিলো। সবুজ এক অনন্তের গ্রীন সিগনালে যাবার আগে এটাই লাস্ট স্টেশন। হুইশল বাজিয়ে ট্রেন ছাড়বার আগে এ পাখী জীবনকেও তো ধন্যবাদ দেওয়ার ছিলোই। তাই চোখ বেয়ে নেমে আসছিলো জল। ফোটো ফ্রেম, মাছ ও জলের গভীর সম্পর্কের ওপর দিয়ে তখন ছিপ ফেলা দূরে, হুইলে টান ধরেছে, উঠে আসছে রাত ধীর পায়ে একটু একটু করে, উঠে আসছে জলও নয় জীবনও নয় এক অমোঘ অভিজ্ঞান। এইবার ক্লোজ শটে পাশাপাশি দুইজন কেবল। কোলে মাথা তার, কন্যারূপী, জায়ারূপী, বন্ধুরূপী কোনো এক ‘মা’ হয়ে ওঠা আধেক আকাশের স্নিগ্ধ কোমল স্পর্শ কতদিন পর শুক ও সারিকে এক ফ্রেমে পাওয়া। আর তিনি ভিক্ষে করছেন মার্জনা, রাতের কাছে, কোনো এক হয়ে ওঠা মায়ের কাছে, চোখে জল... বিষাদেও সুর ছুঁয়ে সে প্রার্থনা করছিলো কোনো এক পতঙ্গ জীবনের। অগ্নিতে পুড়তে চেয়ে ফিনিক্স পাখী হবার শেষতম বাসনায় সে বলছিলো-উফফ থেকে আহ হয়ে ‘মা’ – এক ভাষাগত জার্নির বেদনার্ত অন্বেষণ, খোঁজ।
তারপর ভোর হল যেভাবে সকাল হয় রোজ। কারা যেন পায়ে হেঁটে, অথবা সে নৌকোর দোলনায় নিয়ে চললো চার পায়ে...ধূপ, অগুরু সহযোগে, সে চললো কোনো এক প্রজ্ঞার দিকে, শৈশবের চর ছুঁয়ে, দুপুরের নদী গন্ধ নুন ছুঁয়ে, রাতের মায়াবী আলোকে স্পর্শ হীন করে সে চললো, পাশ দিয়ে দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে ঘর বাড়ি, আলো। অথবা অন্ধকার নামক বেলজিয়াম আয়না। সে চললো উত্তপ্ত বালির ওপর দিয়ে, কাঁটার ওপর দিয়ে, সামুদ্রিক লবণ মাড়িয়ে কোনো এক অজানা স্টেশনে। কুকুর ডাকছে, দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে গান। পাখী ডাকছে, আর কারা যেন হাত ছানি দিয়ে ডাকছে তাকে, প্রাণের সবুজ যা কিছু ছিলো তাকে।
আপাতত এ অক্ষরেখায় কিছু অস্পষ্ট ছায়া। কাজ কম্মো সব হয়ে গেছে পুরোহিত দর্পন। আপাতত সে ভেসে যাচ্ছে কোনো এক মাটির খুড়ি চেপে কোনো নদির মোহনার উদ্দেশ্যে... এ সব জলজ অভিযোজনে এক মাত্র ব্যতিক্রম স্থল ভাগে রয়ে গেলো কিছু কুশ ও জীবন, যাকে ভাষা বলে জানি আমরাও।
‘মা’- এক ব্রহ্মনাদ হয়ে উঠে আসছে প্রবল শক্তি নিয়ে। ভাষা ইস্টিশনে তখন ভোরের লোকাল ছাড়লো আবার।