আ মরি বাংলা ভাষা

রীনা ভৌমিক


হাত বাড়ালে ও কারো হাত ধরিনা । ভীড়ের মধ্যে একা একা ঘুরি , গটগট । তোমার জলে প্রতিদিন দেখি সূর্যের আলমোড়া ভাঙার গল্প ।ধূসর দুপুরে খা-খা আকাশে গাঙচিলের ডানা খসা বিষাদ পতন ।তবুও বিকেলে পাখির মা-গন্ধে ম-ম বাসায় ফেরা !

ঘুমপাড়ানি গান থেকে উঠে কখন না বলেই চাঁদের দেশে ছাউনি ফেললো মা । আমি পথে প্রান্তরে , কাদা-মাটিতে , বাদী- বিসম্বাদী রঙে নাকানি চোবানি । মা খুঁজে ঘেমে নেয়ে একাক্কার ! অভিমান টালমাটাল ঘায়ে ঘায়ে ।আর হায়রে কপাল ! চোখ তুলে ওপরপানে তাকাতেই , " মধুর আমার মায়ের হাসি / চাঁদের মুখে ঝরে ....."

ওমনি চোখ ভরে সমুদ্র জলতরঙ্গ বাজাতে লাগলো । গলা দিয়ে দলা পাকানো লাভা জেহাদী হয়ে উঠলো ।ঠোঁট ফোলালাম । " জানো, ক-ত্তোদিন তোমার আঁচলের গন্ধ পাইনি ! তোমার দুই স্তনের বকুল শয্যা আর অমৃত ঝরনার অভাবে মরে গেল কিশলয় ? ওই টানা দুচোখের শীতল, আহা ! মন আনন্দ আনন্দ ছায়ো ! " আকুল হই অশ্রুর অঝোরে , " মাগো, আমি বড় ছায়াহীন । "

মা শীতের ওম হয়ে ঘন হলো পাশটিতে ।মিটিমিটি হাসতে লাগলো ।চমকে দেখি চাঁদ গলছে । গলে গলে ঝ'রে নদী হয়ে ভাসছে । সাথে মা-ও ! তখন-ই ম্যাজিকের মত বদলাতে লাগলো পারিপার্শ্বিক ।চারিদিকে সামগান আর পারিজাতের মৃদুল সৌরভ ! " বাংলার মাটি বাংলার জল / বাংলার বায়ু বাংলার ফল.....", পৃথিবী জুড়ে একুশে বসন্তের মাতাল আলোড়ন ......

শায়র , তুমি আমার ছেলেবেলার আত্মিক বন্ধন ।তোমাতেই আমার তাবৎ সমর্পন । আমার গোপন গাছ-গাছালি , পাখ- পাখালি, 'স্বপ্নোঁ কী গলি'-র বে-জুবান সাক্ষী তুমি ! অঘটন কথা বলি , একদিন কিছু স্বতঃস্ফূর্ত রঙিন পাখি আকাশে উড়ালে মশগুল । ঠোঁটে তাদের রঙমশাল । আমার চোখেও দৃষ্টিসুখ !

হঠাৎ পাখির ঠোঁট খসে একটা মশাল আমায় দাহ্য দিল ।ভয় পেয়ে কঁকিয়ে উঠলাম । হাপুস কাঁদতে লাগলাম ' মা-মা ' বলে । পুড়তে লাগলাম বুকপোড়া প্রদীপের সলতের মতোই দাউদাউ । যতো অস্থির হই , পুড়ি , মা ততোই স্মিত হাসিতে ভরিয়ে তোলে দশদিক । ফিসফিসিয়ে বলে , " কাঁদ সোনা , এভাবেই কাঁদ ! উজাড় কান্না না কাঁদলে , উপুড় ভালবাসা না ঢাললে আমি তো ধরা দেব না...."

মা ছাড়া আমি ভীষণ অসহায় ! মা কে আমার চাই- ই....তাই দহন দিয়ে আকাশ আঁকলাম...." নীলাকাশ ".....প্রদীপ গড়ি আর সলতে পাকাই ....মাকে খুঁজে পেলে দীপান্বিতার উৎসব দেব....প্রতি মুহূর্তে একমুখী আয়োজন......মায়ের উদ্দেশ্যে রঙ্গোলী সাজাই.....

জানি , খোঁজা এক আজন্ম ক্রন্দন ! সমব্যথী , তোমার জলে ঢালি দু ফোঁটা মা-খোঁজা নিবিড় অশ্রু । হাত ধরো বন্ধু । শ্রাবণে প্লাবিত হ'য়ো , পুকুরের বন্ধন ছিঁড়ে সুদূর নদীমুখী । আমরা অনন্ত দুঃখ বুকে এসো , মা খুঁজি । কেঁদে কেঁদে । ভালবেসে । পাগলের মতো আত্মভোলা ভাবাবেগে.....

পবিত্র মন্ত্রের মতো উদ্ভাসিত উচ্চারণ করি , " আ মরি বাংলা ভাষা..."