স্বপ্ন দেখার বাংলাভাষা

যশোধরা রায় চৌধুরী



তেরো চোদ্দ বছরের একটি মেয়ে। গায়ে রংচটা ফ্রক। বেঢপ, ধুলো জমা। মেয়েটি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ঢল গ্রাম থেকে এসেছিল। চুপ করে বসেছিল বসবার ঘরের সোফাটাতে। সোফা বারবার ওকে বলছিল, আমার উপরে বসবার সময়ে ভেবে দেখো তুমি এর যোগ্য কিনা। তোমার সঠিক স্থান বোধহয় মেঝেতেই। পর্দাগুলো যখন হাওয়ায় দুলে উঠছিল, তারাও ফিসফিস করে ওকে বলছিল, ফ্যানটা চলছে বটে, তবে এ বাড়িতে তোমার মত মেয়েদের জন্য কেউ ফ্যান চালিয়ে দেয়না। ভুল করেছে ওরা। মেয়েটার হাতে ময়লা একটা রুমাল। কপালের ঘাম মুছছিল ও। ও তো ইশকুলে যায়। এই ঘরেই, ছোট একটা টেবিলের উপরে কয়েকটা বাংলা গল্পের বই পড়ে আছে। অপেক্ষা করতে করতে ও বইগুলো ভীতু আর আলত হাতে নেড়েচেড়ে দেখছিল।
বইগুলোর পাতাও যেন বিড়বিড় করে ওঠে : এই মেয়ে, সামলে ধরিস আমাদের। ইঃ ভারি পড়তে শিখেছিস, বই দেখেই অমনি ধরা চাই!
এমন সময় ঘরে এলেন বাড়ির গিন্নি। এই সময়ের সালোয়ার কামিজ পরা বৌদি। এন জি ও-তে কাজ করেন। সেই সূত্রেই তো তাঁর বাড়িতে আসা ওর।
সোফা থেকে নেমে বসতে বললেন না ওকে। ফ্যান বন্ধ করে দিলেন না। ওর হাতে বই দেখে ভুরু কুঁচকে উঠল না তাঁর। ওর সাথে গল্প করতেই যেন তাঁর আসা, এমনি ভাবে জিগ্যেস করলেন, তোমার কথা বল। ইস্কুলে যাও?
রোজ আধ ঘন্টা হেঁটে ইস্কুল যেত ও। পরাশুনো করত। অঙ্কে ভীষণ ভয় পেত। ক্লাস সেভেনে বীজগণিত কী কঠিন। পড়ার বই ছাড়াও গল্পের বই পড়ত ও । ইস্কুলের লাইব্রেরি থেকে নিয়ে । টিউশন ও পড়ত ও। বোনের সাথে ইস্কুলে যেত। মা আঙ্গনওয়ারি ইস্কুলে খিচুড়ি রাঁধে। বাবার নিজের সেলুন আছে। চুল কাটে। বাবার সাইকেলও আছে। তবু কী যে হল, পাশের গ্রামের এক চাচা এসে ওর বাবাকে বোঝাল। মেয়ের বয়েস হয়েছে। এবার পার করে দাও। অনেক টাকা পাবে। মেয়ে দুবাই গিয়ে সেটেল হয়ে যাবে। আর দুঃখ থাকবে না।
পড়া ছাড়া কী করো তুমি? বন্ধুদের সাথে খেল না?
হ্যাঁ, বউবাসন্তী খেলে ওরা।
মেয়েটিকে বৌদি বললেন, এই বইগুলো তুমি পড়বে নাকি? তাহলে নিয়ে যাও না হয়। পড়ে ফেরৎ দিয়ে দিয়ো। ব্যাগ নেই, না তোমার ? আচ্ছা, এই প্লাস্টিকটা নাও।
বৌদির সাথে ও আবার সেন্টারে ফিরে গেল। সেন্টারে কাজ শিখছে একটু বড় দিদি, বৌদিরা। আক্রান্ত, চালান হয়ে যাওয়া, উদ্ধার করা, ইজ্জত লোটা মেয়েদের হম এতা। জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলেই তো মেয়েটা বাবা মাকে ছেড়ে সেন্টারে চলে এসেছিল, একলা ট্রেনে চেপে।
বৌদি আবার ওকে শিকড়ে ফিরিয়ে দিতে চায়, বাবা মায়ের সাথে কথাও বলবে গিয়ে। ওকে পড়ার খরচ যোগাবে সেন্টার। আর মাসে মাসে ওর খবর নেবে। বুড়ো বরের সাথে বিয়ে ওকে আরব দেশে পাথাতে দেবে না ওরা আর।
ওর সংরক্ষণ দরকার। বউবাসন্তী খেলার মতন ও-ও যেন হারিয়ে না যায়! ও যে বাংলা ভাষা!


ছেলেটির নাম সাধন। গাড়ি চালায়। আগে চালাত ভাড়ার গাড়ি। কলকাতা শহরে একশোটাকা শিফটে দিনে আর রাতে দু শিফট ড্রাইভিং করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবাকে খাওয়াতে পেরেছে। মায়ের, ভায়েদের দেখভাল করেছে। সেই কবে ১৭-১৮ বছর বয়স থেকে। কিন্তু এতটুকু দিয়ে কি আর সংসার চলে? ভাড়াগাড়ির মালিক ওর টাকাই মেটাতে চায় না।ট্রিপের পর ট্রিপ পার হয়ে যায়, টাকা চোকায় না। কিছু বললে বসিয়ে দেয়। শেষমেশ ২৪বছর বয়সে ও নিজের গাড়ি কিনল। ধার করা টাকায়। বেশ কতা দিন এক গভমেন্ট অফিসারের ডিউটি করল। গাড়ি চালাল যেন সরকারি স্টাইলে। ট্রাফিক পুলিশের তোয়াক্কা নেই। হু হু করে বেরিয়ে যেত। কত ভাল করে সাজিয়েছিল গাড়িটাকে। সামনে গভমেন্টের বোর্ড, পিছনে গভমেন্টের বোর্ড। সামনে লাল বাতি, ফ্ল্যাগ লাগাবার জন্য ডাঁটি। দু দুটো বাড়তি লাইট হেড লাইটের সঙ্গে। জানলায় সাদা পর্দা। নিজের জন্য নিজে ভাড়া খাটত সেই গাড়ি নিয়ে । একদম স্বাধীন। দু বছর যেতে যেতে আবার সেই পুরনো এজেন্সিতে ফিরে আসতে হল। নিজের সেই গাড়ি বেচে দিতে হল যে। লনের টাকা ফেরাতে পারেনি বলে। সে গাড়ি বেচে দিয়ে আবার কিছুদিন পুরনো মালিকের মুখ খারাপ সহ্য ভাড়াগাড়ি চালাতে হয়েছে।
এবছর আবার লোন নিয়েছে। এবার টাটা ইন্ডিকা। ডিজেল। নতুন একটা এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি।
এই এজেন্সিতে পেমেন্ট ভাল, নিয়মে নিয়মে পাওয়া যাবে। ফেলে রাখবে না।
সব লোন ৩ বছর গাড়ি চালিয়ে মিটিয়ে দেবে ও। দেবেই। ও যে বাংলাভাষা ওরে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।


বাবুলাল শ্যামবাজারে ঘোষবাড়ির দিদুর কাছে থাকত। টুকটাক বাজার করা, একটু ঘরের কাজ। বাসন মাজা, কাপড় কাচা। বাবা দেশ থেকে এসে দেখে যেত। ফসল ভাল হলে ঋনের টাকা মিটিয়ে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত বাবা। কাকারা কাছাকাছি আর দু তিনটে বাড়িতে ফাইফরমাস খাটত। পুরনো লোক বলে সবাই বিশ্বাস করত। তাই বাজার থেকে পয়সা সরালেও কেউ কিছু বলত না। ওকে শিখিয়ে দিয়েছিল কী করে পয়সা সরাতে হয়। হিসেব দেওয়ার সময় অঙ্কের মাথাটা ভাল চাই।
বাবুলালের অঙ্কের মাথাটা ভালই ছিল। নিজে দুটো ব্যাটারি, একটু তার আর একটা ফেলে দেওয়া টর্চ-এর বাল্ব দিয়ে কেমন সুন্দর একটা টর্চ বানিয়েছিল। দিদু দেখে অবাক।
ইংরিজি পড়াতেন দিদু ওকে, অঙ্ক করাতেন, বাংলা হাতের লেখা করাতেন। ঝকঝকে বাংলা হাতের লেখা বাবুলালের। তবু দিদু ওর ইংরিজিটা নিয়ে খুশি ছিলেন না। মেম-ইশকুলে পড়া দিদু বলতেন, তোর দ্বারা আর ইংরিজি হল না রে, যাক, অঙ্কটা ঠিক করে করিস। সারা পৃথিবীটাই তো দাঁড়িয়ে আছে ওই একটি জিনিসের উপরে।
বাবুলালের বাবা জমি বেচে দিয়ে কলকাতায় চলে আসে এই দু তিন বছর হল। ওর মা চায়নি। তুলসি মঞ্চটার জন্য, আর পুকুর পাড়টার জন্য মায়ের মন কেমন করেছিল। বাবাকে বলেছিল, জমিটাই তো এক আছে। ওটা গেলে দাঁড়াবো কোথায়?
ওর বাবা রেগে বলেছিল, তুই কি পিতিবাদি হবি নাকি? এ জমি রেখে কি হবে। মেয়েটারে বিয়ে দিতি বাজারে এত ধার। ৭৫০০০ হয়ে গিছে সুদি আসলি। ছেলেটাও তো চাষবাস করবে না।
বাবুলাল এখন সিকিউরিটির চাকরি করে। প্যান্টুলুন না কি যেন দোকান হয়েছে সেইখেনে।
মা বলে, যাহোক তাহোক, ছেলে আমার দারোয়ান। কত সনমান।
মা জানে না, প্রতিবার ঢোকা বেরনোর সময়ে প্যান্টের ভাঁজে , পকেটে , জামার ভিতর বুকে করে কিছু নিয়ে যাচ্ছে কি না চেক হয় ওই দোকানে। এ দিদুর বাজার করা পয়সা নয় যে সরালেও কেউ কিছু বলবে না।
মায়ের হাতে হাজা। নতুন আবাসনের ঝি হয়ে গেছে মা। তবু সবাই একসঙ্গে থাকে গ্যারেজের ঘরে, আর স্বপ্ন দেখে একটা আস্ত ঘরের। বারান্দায় লতা দুলিয়ে লাউ ফলাবে মা।
স্বপ্ন দেখতে ভুলো না, বাংলাভাষা !