ভাষা

মিতুল দত্ত


ভাষা তো ইন্দ্রর মেয়ে। পেছন পেছন ঘুরে বেড়াত। আমার মোবাইল, আমার কানের দুল, চুড়ি, আমার কবেকার বন্ধ হয়ে যাওয়া হাতঘড়ি, এসবেই ছিল ওর মনোযোগ। দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। মেয়েদের বড় হয়ে যাওয়ার গল্পগুলো যেরকম হয় আর কী। সবার গল্প অবশ্য সমান নয়। কারও কারও বেড়ে ওঠার গায়ে নখের দাগ, দাঁতের দাগ থাকে। ভাষার গায়ে সেই দাগ থাকবে না, জানি। ভাষাকে ওর বাংলা মিডিয়ামের বাপ-মা বাঁচিয়ে রাখবে।

আমার বাপ-মা যদিও, বাঁচাতে পারেনি। আমার কচিবেলার গায়ে দাঁত-নখ লেগে গিয়েছিল। আমার বাংলা মিডিয়ামের স্কুলড্রেসহীন, খড়ি-ওঠা পায়ে লেগে গিয়েছিল প্যারীচাঁদ রিডারসের, ভার্জিন স্প্রিং-এর সম্পূর্ণ বিজাতীয় পাপ। রক্তে ভেসে যেতে যেতে, নারকোল আইসক্রিম পুরোটা মুখের মধ্যে পুরে ফেলে, অস্ফুটে আমি বাংলা নামতা বলে ফেলেছিলাম, চার তেরোং বাহান্ন। অমনি সেই রক্ত, আর আমার রইল না। আমার বাংলা মিডিয়ামের গায়ে, আমার বাংলাভাষার গায়ে লেগে গেল সেই রক্ত। আমাদের খোঁড়া হেডমাস্টারমশাইয়ের ট্রেনে কাটা পড়া বাঁ-পায়ে, পড়া না পারলে দু-আঙুলের মধ্যে পেনসিল ঢুকিয়ে চেপে দেওয়া পূর্ণেন্দু মাস্টারের প্রতিক্রিয়াশীল পায়ে, সবসময় ক্যাঁচোড়ম্যাচোড় করতে থাকা ছেলেমেয়েদের জুতোপরা বা জুতোছাড়া পায়ে লোহিতসাগরের মতো আছড়ে পড়ল রক্ত। কেউ টেরটিও পেল না। শুধু আমাদের ম্লান স্কুলটা শুকনো রক্তের দাগ নিয়ে দিনের পর দিন আরও আবছা হয়ে গেল।

তারপর থেকে তেরোর ঘরের নামতা আমি আর মনে করতে পারি না। তারপর থেকে বাংলাভাষার গায়ে আমি ওই দাগটা দেখতে পাই, এমনকী উঁচু ক্লাসের নীল ড্রেসে উঠে যাওয়ার পরেও, দেখতে পাই বিদেশী ভাষার পাপ তাকে রক্তাক্ত করতে করতে ঢুকে পড়ছে ক্রমশ, আরও আরও গভীর মেহনের দিকে। আইসক্রিম আর যন্ত্রণা গিলে ফেলতে ফেলতে সে যে কী বলতে চাইছে, হিন্দী-ইংরিজি মেশানো এক বিতিকিচ্ছিরি ভাষায়, কেউই তার কিছু বুঝতে পারছে না।

শুধু, বছরের একটামাত্র দিনে, কয়েকটা মানুষ, নাকি প্রেত, আকাশ কালো করে নেমে আসছে। আগলে দাঁড়াচ্ছে তার শরীর। রক্ত মুছে দিচ্ছে তার, তাদের মাতৃভাষার গা থেকে। তারপর গভীর রাতে, উড়ে যাচ্ছে আবার, ছিন্নভিন্ন শরীর নিয়ে। একটা গোটা বছরের জন্য, বধ্যভূমির মতো এক অন্ধকার ক্লাসঘরে, তাদের মাকে একা ফেলে রেখে।