ভাসায় ভাষা

স্বপন রায়


কোন এক অচিরবাঁকের বিনয়ে রাখা ছিল সামান্য বেড়া দেওয়া বাড়িটি!সাইকেলের চেন লাগাতে লাগাতে পিপাসা জেঁকে বসলো!যেমন করে থাকি,আমি একা,একাই দেখাগুলো ছিন্ন সহায় উঠছে তখন,সহায় কারণ আমি যে কারণেই হোক কাকে যেন বলতে পারিনি,তুই সর্ষেফুলের কুর্তি পরিস না,আই লুজ মাইসেলফ,আই লুজ মাই ব্রেক....পারিনি বলতে যে ব্রেক বারে বারে ফেল করলে আঙুলের কষ্ট বাড়ে,লাগাতে লাগাতে মনে হয় সাইকেলের চেন থেকেই কেন আমার বিশদে গ্রিজের গন্ধ লেগে যায়,মনে হয় যন্ত্রণাভুতির সঙ্গে আঠার খচরামিও আসে,পিপাসা বাড়ে,হাতে লেগে থাকা চেনের কালোয় আমি আর আমার না বলা কথার চার্জ ফুরিয়ে যায়!

পিপাসা!

“তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়...”বাজছে!এই নিদারুণ সময়েই!!আমি নিজের একুশের পিপাসা নিয়ে সেই বাড়িটির দিকে এগোই,বাইরের গেট খুলে দরজায় নক করি,দরজা খোলে...”আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়..”মাই গুডনেস...পুরো ছোঁয়াই তো দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে,ভ্রুয়ে সামান্য বাঁকপ্রতিমা,চোখে জিজ্ঞাসার ভয়,মুখের ডানদিকে ঝাঁপানো অলকদামের অভিসন্ধি হাত দিয়ে সরিয়ে সে বলে ওঠে,বাবা তো বাড়ি নেই!
হাউ কাম বাবা?মেয়েটি বোধহয় ঘাবড়ে গেছে!
“বাবা নয়,একগ্লাস জল চাই...খুব তেষ্টা পেয়েছে!”আমি এ ভাবে বলায় মেয়েটি সামান্য হাসে,আমায় দাঁড়াতে বলে চলে যায়,আর সেই যাওয়াকালীন নৈশব্দে হারিয়ে যায় আরতি মুখোপাধ্যায়ের গান,সর্ষেফুলের কুর্তিতে রাখা আমার না বলা কথার সেটপিস,আমি অসহায় হয়ে শুনতে পাই পাখি্র স্বভাবে ভেজা বদমায়েশি লাগিয়ে দিতে আষাঢ় এসে গেছে আর তাতে অবাক করা জলপানের আসন্ন বিনিময়ের টুং টাং..

সে জল আনে,সঙ্গে একটুকরো সন্দেশ!
-এটা কেন?
-শুধু জল দিতে নেই!
আমি থমকে যাই,যেন শুনলাম,জল দিতে নেই,যদি সামান্য মিষ্টি না থাকে!
আমি হাসি!
মেয়েটি বলে,আপনি কোথায় যাবেন?
-জানিনা...আমি এম্নি এম্নিই বেরিয়ে পড়েছি!
-এই দমবন্ধ করা গরমে?আপনি কি পাগল?
-পাগল?কে জানে!তবে আমি তো এরকমই,আর এ ভাবে না বেরোলে এমন জল আর মিষ্টিও তো পাওয়া হতো না!
ভেতর থেকে ডাক আসে,সম্ভবত মা,মেয়েটি বলে,আমায় যেতে হবে আর আপনিও সাবধানে যাবেন,মেঘ উঠছে....

সে চলে যায়...আমিও আবার সাইকেলে উঠি,দেখি মেঘের কাঁধে চেপে ঠান্ডা হাওয়া এসে পড়েছে,মুছিয়ে দিচ্ছে আমায়!
মোড় ঘুরতেই দুটি ছেলে আমায় দাঁড় করায়!
লম্বা,একহারা ছেলেটি কঠিন গলায় বলে,রিয়ার সঙ্গে কি কথা হচ্ছিল?
-এম্নিই
-এম্নি মানে?
-এই বৃষ্টি হবে কিনা...হলে কতক্ষণ হবে এই আর কি..
-কেন,তুমি কি আবহাওয়া দপ্তর নাকি?কোন চালাকি মারাবে না,রিয়া আমার গার্লফ্রেন্ড!
-আরে বস তুমি রিয়ার প্রেমিক?গ্ল্যাড টু মিট ইউ...
-মানে?তুমি কে বলতো?ওর সঙ্গে তোমার রিলেশনটা কি?
বেশ বিভ্রান্ত ছেলেটি আমায় জিজ্ঞেস করে আর নিজের বন্ধুর দিকে তাকায়!
-আমি কেউ না বস...দেখো মেঘ কত কাছে এসে গেছে,এ সবই রিয়াকে বলার ছিল আর কি,আমার নাম আকাশ
-আকাশ!তো,তাতে কি যায় আসে,মানেটা কি এ সবের?
-রিয়েকে জিজ্ঞেস করো,ও বোধহয় আকাশের মানে জানে....

আমি চলে আসি!

বহুদিন পরে লিখে ফেলিঃ
“মেঘাসিনি আবার সারিয়ে দিচ্ছে ট্রপিক্যাল রেললাইন

এই মটরদানা মেশানো আলো তোর শরীরের রং হোক
বলিনি
এখন বলছি
তোর আঙুলে একটা ওয়ারড্রোবের টুকরো ছন করে উঠুক

আমার জন্য পতাকা হেলিয়ে দিক আষাঢ়ের প্রথম মার্চপাস্ট.....”(ডায়েরির ডানা/২১/০১/১৯৯২)

বাংলা ছাড়া আর কি ভাবে লিখতাম এইসব,এতকিছু...