সেতু

তমাল রায়

সেতুর ওপারে যে বা যারা তাঁদের আমি চিনতাম না। জানতাম না ওদের সকালের কাগজ, বিকেলের আলো অথবা রাতের মৈথুন। কেবল সময়ের পর সময় গড়িয়ে গেলে বুঝতাম ওরাও সেতুর এপারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বহুদিন ধরে। যেমন নিতেন আমাদের শ্যামকাকা, মদন ঘোষ, বাচ্চু চৌধুরীরা।
রজনীকান্তের ফ্যান ক্লাবের সংখ্যা ষাট হাজার। বিগ-বির কুড়ি, বাচ্চু চৌধুরির একটাও নয়। একটা ছেঁড়া বাজারের থলে, বাইশ ইঞ্চি সাইকেল আর ডাঁটি ভাঙ্গা চশমা দিয়ে তো আর ফ্যান ক্লাব হয় না। অগত্যা কারখানার ভোঁ বাজালে বাচ্চু বেরিয়ে পড়ে। ভোর থেকে কারখানা বেরোনো অবধি শুনতে হয় ঝাঁঝালো চণ্ডীপাঠ। পাঠ করেন গিন্নী, উদ্দেশ্য বাচ্চু। ছেলেটা পার্টি করে, রক ফাটিয়ে আড্ডা মারে। মেয়ে অনেক রাতে বাড়ী ফেরে, কে বা কারা গাড়ী করে নামিয়ে দিয়ে যায়। সন্ধ্যের পর বাচ্চু বাড়ী ফিরে মুড়ি চিবোন। এফ.এম রেডিও শোনা আর বসে বসে ঢোলা। কেবল রাত নামলে সবার অলক্ষ্যে সেতুর লেজটা এসে বাচ্চুর পায়ের কাছে লাগে। নীলচে আলোয়। ঘর্মাক্ত শরীরে শুরু হয় বাচ্চুর সেতু আরোহণ। বাইরে তখন নেড়িকুত্তাগুলো ডাকছে। কাঁদছে কিনা কে জানে।
বিদর্ভে কাল আরও তিনজন চাষী আত্মহত্যা করেছে। এই নিয়ে জানুয়ারী থেকে মোট চারশ’ পঁয়ত্রিশ। সৌরভ আবার একদিনের দলে। এবং ভরা জৈষ্ঠ্যে কোকিলা ডাকলেও মদন ঘোষের যে খুব একটা হেলদোল হবে তা হলফ করে বলা যাবে না। কারণ লোকের হাত না দেখেই গড়গড় করে ভবিষ্যৎ বনানেওয়ালা মদনের কোন কিছুতেই আর তেমন......ওটাই পেশা। তবে নেশাও আছে। মেয়েমানুষের। বাবা-মা, যৌবন এবং অর্থ কোনকিছুই যখন চিরস্থায়ী নয় তখন আর বিয়ে শাদি নিয়ে খুব একটা দিল্লাগি কোনোদিনই মদনের নেই। ফলে অকৃতদার। আর বিয়ে-টিয়ে মানেই তো দায়িত্ব! ‘দায়িত্ব’ শব্দটাই অনেকটা কর্পূর, উদ্বায়ী। যেমন মেঘ কতদিনই বা আশ্রয় দেয় বৃষ্টিকে। তারপর তো সেই নোংরা-আস্তাকুঁড়, কাদা, লোকের পায়ে পায়ে। নাক সিটকোন। আর মদন তো পারেও নি এগারো বছরের ফুটফুটে বোনটাকে ধরে রাখতে, সামান্য কটা ওষুধ, পয়সার অভাবে জোগাড় করতেই পারেনি। পারে না, আসলে মানুষ অনেক কিছুই পারেনা। আর এই অনেক ‘না পারা’-র সমষ্টিই জীবন। এর চেয়ে সোজা যন্ত্রের মতো লোকের ভবিষ্যৎ বলে যাওয়া। যার মিলবে পয়সা দেবে। যার মিলবে না দেবে না। ভারি তো একটা জীবন, ঠিক চলে যাবে। তবু সন্ধ্যে ঘনালে বেগুনটুলীর মেয়ে মানুষ ঘাঁটতে ঘাঁটতে শরীর যখন ক্লান্ত, চোখ জুড়ে নেমে আসে এক নীলচে আলো আর প্রাগৈতিহাসিক কাছিমের মতো এক সেতুর এক প্রান্ত ধরে সরীসৃপের মতই বেয়ে উঠতে থাকে মদন। হয়তো মেঘ তখন চাঁদের মুখ ঢাকছে,............ঘেন্নার থুতু ছুঁড়ে দেয় মেঘের দিকে। সে থুতু মেঘকে ছুঁক আর না ছুঁক পৃথিবীকে স্পর্শ করে একটু পরেই।
শীতে যে গাছ রুখু-শুখু বসন্তে সে গাছই চিকচিকে সবুজ। আলো চমকায়, জীবনও! ভালবাসলে দক্ষিণা বাতাসে গাল রেখে বলে উঠতে হয় – এই তো জীবন। নইলে শ্যামকাকার কি দরকার ছিল বাবুদের বাড়ীর ডাস্টবিন, নার্সিংহোমের ভ্যাট থেকে দুধের শিশুগুলোকে কুড়িয়ে আনার। নিজের দুটো ছেলে মেয়ে আর মুমূর্ষূ বৌ নিয়েই তো কাটিয়ে ফেলতে পারত জীবন। কটা আর দিন! কিন্তু ওই যে নেশা – ওই দ্যাখ ওরা হাসছে আর আমার উঠোন জুড়ে ফুটফুটে জোছনা! আনন্দ হয়, রাগও হয় প্রায়শই। নিজের চুল ছেঁড়ে, উঠোনের ঘাস ছেঁড়ে, নিজের গায়েই গরম খুন্তি দিয়ে নিজেই ছ্যাঁকা দেয়............কেউ তো শেখায়নি, কেউ তো দিব্যি দিয়ে বলেনি, শ্যামকাকা তুমি পারবে – সুখপৃথিবীর যত উৎপাটিত আগাছা সব তোমার, তোমার দায়িত্ব। কি বা রোজগার হতো উকিলবাড়ীর গাড়ী চালিয়ে। কোথা দিয়ে সব ছেঁড়া কম্বল জোগাড় করে আনত, দুধেল মায়েদের বুকের দুধ খাওয়াবে। অনেকেই হাসি ঠাট্টা করত। লাল চোখ দেখিয়ে অনেকেই বলত – ব্যবসা। তবে সবাই চোখ বড় করে দেখত যখন শ্যামকাকা পুজোর সময় উকিলবাড়ীর গাড়ীটা নিয়ে ঠাকুর দেখাতে বেরোতো বাচ্চাগুলোকে। উদয়াস্ত খাটতো মানুষটা। কেবল মুমূর্ষু বৌটা যখন অজ্ঞান হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকতো, ও কাঁদত উবু হয়ে বসে। ওকে ঘিরে কাঁদতে বসত বাচ্চাগুলো, পুরো উঠোন জুড়ে। সে ভারি অদ্ভুত দৃশ্য! রাত হলে চাটাই পেরে শ্যামকাকা শুতে যেত। আর সাথে সেই বাচ্চারা। আর নীলচে সেই আলো এসে স্পর্শ করত ওদের। সেই যে সেই সেতু হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যেত ওদের কাছে আর হাতছানি দিয়ে ডাকত। হয়ত তখন পাশের ঝোপ থেকে কেউ উঁকি মারছে............দেখছে কি হয়। কি হয়!
রাতের অস্পষ্ট আলোয় একটা কালো বিশাল সাপ দ্রুত এগিয়ে আসছে সেতুর ওপারে, অন্তত ওপর থেকে বেশ ওপর থেকে দেখলে তাই মনে হয়। কাছে আসলে দেখা যায় সার সার কালো মাথা। সেতুর ওপারের দিকে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। পেছন পেছন লেজ নাড়াতে নাড়াতে হেঁটে চলেছে নেড়ি কুত্তাগুলো, চলেছে বেগুনটুলীর শরীর খাটা মেয়ে মানুষ, আর বেশ একটু দূরে হর্ণ বাজাতে বাজাতে চলেছে উকিলবাড়ীর সেই গাড়ী। গাড়ীর জানলা দিয়ে বাচ্চারা উড়িয়ে দিয়েছে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ সব বেলুন। সেতুর ওপর যখন এইসব ঘটনা ঘটছে পৃথিবীতে তখন দিন গড়িয়ে রাত। তবে নীলচে অন্ধকার নয়, মোমের মতো জোছনা। আর মুশকিল তো এটাই, এইসব সেতুরোহন ঘটে নীলচে অন্ধকার থেকে মোম-জোছনার অবসরে।