সাদা পৃষ্ঠার ওপিঠে

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়


 অসময়ের বৃষ্টি ডিঙিয়ে বিকেল যেখান থেকে ঘরে ফিরছে, তার একটু তফাতে এলোমেলো ছাতার আড়াল নিয়ে এক মা আর তার শৈশব ছোঁয়া মেয়ে। ঝুরো জল গড়িয়ে নামা চলমান জানলায় একখন্ড ছবি। ময়নাগুড়ি রোডের রেললাইন পেরোলো বাস। এই সমান্তরাল ধাতব পাত ছুঁয়ে ট্রেন ছোটে না কোনও। অব্যবহৃত জং ধরা লোহার গা থেকে হঠাৎ-বৃষ্টির ধূলো ধুয়ে যাওয়া বাদামি সাবধানে পার হয়ে দুটি মেয়ে হেঁটে চলে গেল—মা নামক ও কন্যা নামক মেয়েদুটি। ছোট্ট টেলারিং শপ থেকে উড়ে উড়ে ভিজছে গোলাপি ওড়না। সিগ্‌ন্যালে দাঁড়িয়ে বাসের হেল্পার চেঁচায়---সিঙ্গল্‌ -সিঙ্গল্!! এই কথা শুনেই কিরকম একা ফাঁকা হয়ে গেল চারপাশ। কার যেন রিংটোনে বেজে উঠলো—আভি না যাও ছোড়কে ইয়ে দিল্‌ আভি ভরা নেহি”। এই ছবি ধরে রাখার জন্য ইন্দ্রিয় যৎপরোনাস্তি টানটান করেও চুরচুর হয়ে ভেঙ্গে পড়ে যায় অক্ষরমালা। তার সাথেই আকাশ ভেঙে বাজ পড়লো কোথাও। এই ভিজে যাওয়া অনেক অনেকদূর অবধি সাদা হয়ে ছড়িয়ে থাকে। তার ওপর পায়ের পাতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে পাপড়ি মেলে রাখছে, দেখি। যেকোন দিকেই যাওয়া যায়---কেন যাব প্রশ্নমাত্র না করে। অথচ কি’যেন সেই কথাটা—যা বলার জন্য এই একশ আটষট্টিতম শব্দে এসেও বলে উঠতে পারছিইনা। এই ধ্বনি, এই ঘ্রাণ, এই আলো নিভে আসা আলো, এই ভেজা হয়ে থাকা মখমলি---আহ্‌ শব্দ! সারাদিনের ঝমঝম শব্দগাড়ি থেকে স্বেচ্ছা আড়াল তুলে একটা স্রোত ভিতরদিকে আর সেখানে তুমুল ধস্তাধস্তি করে জায়গা মেপে নিচ্ছে কতগুলো দৃশ্যকল্প। প্রবল আবেদনে আদিম তাড়নার মত ঠেলে ফেলে দিচ্ছে সর্বনাশের দিকে—ঘুমের ভেতর গলা টিপে ধরছে অতর্কিতে---বলো, বলতেই হবে তোমায়। কিভাবে বলবে, কি ভাষায়---তার দায় তোমাকেই নিতে হবে। অন্যায়, অনভিপ্রেত, অসময়ের প্রেমে পড়ে যাওয়ার দায় যেমন একা একা বহন করে যেতে হয়। কিন্তু মুক্তি নেই। সংকেতের হাত ধরে পথ খুঁজে পেতে আরো আরো গোলকধাঁধায়। দৃশ্যের জন্ম হতে থাকে শব্দেরই ছায়ার অগোচরে। “আলো” শব্দের ভেতর দিয়ে যে গান বেজে ওঠে, “স্তব্ধতা” যেভাবে থমকে থাকে ভাষাহীনতায়---সেই ভাসানের পথে পথে স্বর ও ব্যঞ্জন। নিরুত্তরের দিকে প্রশ্নহীন কথা সাজতে থাকে-- অন্ধ, কনিনীকাহীন। এসো, চোখ আঁকো। যে চোখের দিকে তাকিয়ে আমি পড়ে নিতে পারি ঢেউ আর লবণের লেখচিত্রলিপি। ব্যকরণবর্জিত সেই শব্দের খোসা উড়িয়ে বীজপত্রের আড়াল ভেঙে খোঁড়া শালিক ঠুকরে তুলছে যে শস্যদানা তার দিকে তাকিয়ে বেজে উঠছে দুপুরবেলার পুরোনো হারমোনিয়াম। সরগম থেকে হারিয়ে যাওয়া পা কুড়িয়ে নিয়ে সে দিব্যি লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে সাদাকালো জেব্রা-ক্রশিং। আর অন্ধের ভূমিকায় বাড়ানো হাতের অজুহাতে ছুঁয়ে দেখছি তোমার হাতের উষ্ণতা। তাকেই লিখতে চাইছি। মাঝখানে একটা স্পেস্‌---সেখানে যতটুকু অক্ষরহীন তাকে পড়ে নেবার দায় তোমার, তোমারই।