ভাষাবস্তু অবয়বে ধরে রাখে ভাষাচিন্তারেখা

মুজিব মেহদী


ধর্মতত্ত্ব, বিবর্তনতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে অত্যল্প জানাশোনা আমাকে এরকম একটা গড় ধারণা দেয় যে, মানবপ্রজাতি আদিতে এক গোষ্ঠীভুক্ত ছিল। বিকাশের ক্রমপরিণতিতে তারা বহুধাবিভক্ত হয়ে যায়। বিকশিতের তথা প্রতিষ্ঠিতমাত্রের কিছু মূল্যানুগত্য থাকে, রংচঙে দাপট থাকে। তার প্রতি অননুগতের তখন অচলায়তন ডিঙিয়ে শুধু বেরিয়ে পড়ার থাকে, থাকে অবকাশও। এই বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ভাষা, যা ছিল পরস্পরের মধ্যে ভাববিনিময়ে ব্যবহৃত ধ্বনি, পরে যা ক্রমে প্রতীকে রূপলাভ করে। ধারণা করা হয়, এক গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের ভাষাও ছিল একটিই, কথনের ব্যাকরণও ছিল এক, যদি ওটাকে অন্তত আমরা ব্যাকরণ বলতে সম্মত হই। এই সেই একাকার অবস্থা, একার্ণব। কথিত ওই অর্ণবে জল যত বেড়েছে, তত তা উপচে উঠেছে, সূচিত হয়েছে নতুন নতুন ধারা-উপধারা-প্রবাহ, সবদিক থেকে; এমনকি সেদিক থেকেও, যেদিকে কৃত্রিম নিষেধের লাল দেয়াল ওঠানো ছিল। এই উপচে পড়া জলসম্ভাবনাই জগতের আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশিষ্টতাসমূহের জননকর্তা, বৈচিত্র্যবিকাশে উৎসাহবাতাস সরবরাহকর্তা, বিপুলতাসঞ্চারে প্রেরণাপাখির উৎপাদনকর্তা, ইত্যাদি। পৃথিবী ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, ভাষিক ইত্যাদি নানা খণ্ডে বিভক্ত। বিভক্ত মানুষ থেকে মানুষ। পরস্পরের সংস্পর্শরহিত আজ তারা। এই চরম বিচ্ছিন্নতা ফের আরেকটা পালটা বিস্ফোরণসম্ভাবনার বীজ বুনে দিয়েছে মানবসমাজে। এ বীজের নাম বিশ্বায়ন। আবার করে মানুষ একার্ণবের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অথবা দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে। এখনকার এ একার্ণব অর্থব্যবস্থার, জীবনব্যবস্থার নয়। এজন্য পরস্পরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেও অন্তরে মিশছে না অন্তর।
ভাষাহীনতায় অর্থব্যবস্থার বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। ভাষাই তার বিকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। আমরা দেখছি, অর্থব্যবস্থাভিত্তিক একার্ণবে খবরদারিত্ব করায় গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা পালন করে চলেছে ইংরেজি ভাষা। নিজস্ব ভূখণ্ড ছাড়িয়ে ইংরেজি আজ দ্বিতীয়-তৃতীয় ভাষা হিসেবে জাঁকিয়ে বসেছে পৃথিবীর বহু বহু জাতিগোষ্ঠীর ওপর। এ বিবেচনায় মৃত ও প্রচলিত সমুদয় ভাষার মধ্যে ইংরেজিই প্রধান মাস্তান। নেটিভ কথকের সংখ্যাবিবেচনায় যদিও তা ম্যান্ডারিন (চাইনিজ)-এর চেয়ে অনেকানেক পিছিয়ে, পিছিয়ে এমনকি স্পেনিশের চেয়েও। তবু ইংরেজির তোপের মুখে পড়ে পৃথিবীর ম্যালা ভাষা আজ প্রমাদ গুনছে। ভাষা জাতীয়তাবাদে আস্থা থাকুক বা না-থাকুক, এ অবস্থার চরমাপকর্ষের প্রদর্শনী দিনের পর দিন দেখে যাওয়া কারো কারো কাছে স্বস্তিপ্রদ না-ও লাগতে পারে। অবস্থা আজ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ভাষামাস্তানকুলশিরোমণ ি ইংরেজির আগ্রাসনের কথা মনে রেখেও তার দিকে পিঠ দিয়ে আমরা বাঁচতে পারি না (দুই শতকের অধীনতার অমোচনীয় ক্ষত), বুক দিতেও প্রেমবোধ করি না (সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ক্রমবিকশিত চেতনা)। এই সঙ্গিন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমাদের ভাষা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। এখানে আসন পেতে ভাষা বিষয়ে কীরকম রাজনীতিতে আমাদের আস্থা রাখা সংগত? আন্তর্জাতিকতাবাদ, জাতীয়তাবাদ নাকি আঞ্চলিকতাবাদ? আমি জানি না, একদমই জানি না!
২.
বিশ্বায়নের হাত ধরে বিকশিত তথ্যপ্রবাহের তোড়ে ভাসতে ভাসতে আজ আমরা ঘরে বসেই পৃথিবীকে দেখি ও জানি, আমরা নেটিজেন, আমরা বিশ্বনাগরিক। নেটিজেন হওয়া মানে আমার হাতে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট; বাকি থাকে ভিসা, ওটা হলো ভাষা। আমার হাতে যখন কেবলই মাতৃভাষা বাংলার ভিসা, তখন আমার দ্বারা সর্বত্র ভ্রমণ অনুমোদিত না; যখন ম্যান্ডারিন, স্পেনিস, হিন্দি-উর্দু, আরবি, পর্তুগিজ, রাশান, জাপানিজ, জার্মান; তখনো না। যার যত বড়ো ভিসা দেবার ক্ষমতা, সে তত বড়ো মাস্তান। আমরাও দশ মাস্তানের এক মাস্তান, কোনো কোনো সূত্র মতে আমরা মাস্তান তালিকার চার নম্বরে; কোনো সূত্রে পাঁচ নম্বর, কোনো সূত্রে ছয়। অবস্থান যেখানেই হোক, ২৫ কোটি কথক নিয়ে আমরাও মাস্তান। আমাদের মাস্তানির স্বরূপ বুঝতে চাইলে তাকাতে হবে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষাসমূহের দিকে, যেসবের বিকাশ সম্ভাবনা আমাদের রাজভাষা (!) বাংলার দাপটের কাছে রহিত ও পর্যুদস্ত।
কারো ভাষা যখন নোয়াখাইল্যা, সিলেইট্টা, মৈমনসিঙ্গা, যশোইর্যা , চাটগাঁইয়া; কিংবা যখন চাকমা, ত্রিপুরা, সাঁওতালি, মণিপুরি, হাজং; তখনো কি তার হাতে মাস্তান ভিসা? না, অতিশয় সীমিত গণ্ডির জন্য ভিসাদানের ক্ষমতা আছে এসব ভাষার। গুটিকয়ের পরিমণ্ডলই এ ভিসার দ্রষ্টব্য। যে ভাষা যত বড়ো মাস্তান, তার তত বেশি আধিপত্য। অধিপতির প্রতি সমীহপ্রয়াস জারি রাখা মানুষের সহজাত। অস্তিত্ব বিপন্ন করবার ঝুঁকি মানুষ হামেশাই নিতে চায় না। আর অধুনা অস্তিত্ব নির্ভর করে অনেকটাই অর্থনীতির ওপর। এ কারণে দাপুটে অধিপতির আধিপত্য ছড়িয়ে পড়ে অন্য সবার, এমনকি ছোট অধিপতির শোবার ঘর পর্যন্ত। দাবড়ে বেড়ায়। নইলে বাংলা মাতৃভাষা যে বাংলাদেশে, সে দেশের পেশাবাজারেও ইংরেজিতে দক্ষ (বাংলায় দুর্বল) লোকেদের কদর বাংলায় পণ্ডিতদের থেকেও বেশি হবে কেন? কেন বাংলা ভাষা এদেশে এখনো সব ধরনের কাজের ভাষা হয়ে উঠতে পারল না? কেন এখনো পর্যন্ত অনেক বিষয়ে মাতৃভাষায় পড়াশোনার কোনো সুযোগই আমরা তৈরি করতে পারি নি? ভাষা জানায় দোষ নেই। বহু ভাষায় দখল, চিন্তারাজ্য ও শিল্পদুনিয়ার বহু বহু দুর্গের চাবি (ভিসা) হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার। সবাই সেটা জানবেন না, জানতে পারবেন না। কিন্তু আত্মভোলা-পরমুখাপেক্ষ তাকে নিজের পরিবারে বেশি কৃতিত্বের কাজ বলে বন্দনা করা কি দাসত্বের নমুনা নয়? এই হেন দাসত্ব আমরা কেন করি? জীবিকার চোখরাঙানিতে অর্থব্যবস্থার প্যাঁচের মধ্যে বন্দি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার কারণেই কি? আমি জানি না, একদমই জানি না!
৩.
বস্তুতপক্ষে সাহিত্যের ভাষা কখনোই শতভাগ প্রমিত ভাষা হয় না। অভিধান ও ব্যাকরণ কোনো নির্দিষ্ট ভাষা ও ভাষাভুক্ত শব্দ ব্যবহারের যে শৃঙ্খলা দাগিয়ে রাখে, কোনো সৃজনশীল লেখকই তার গোটা লেখকজীবন ধরে কোনো ধরনের স্খলন ব্যতিরেকে ওই খাপে পা ফেলে আক্ষরিক নিষ্ঠায় পথ চলতে পারেন না। প্রমিতপ্রেমে শতভাগ নিষ্ঠা সৃজনশীলতার পথে বিঘ্ন সৃষ্টিকারক। লেখক যদি ভাষাশৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, সমাজশৃঙ্খলা না-ই ভাঙতে পারেন, তাহলে ওই লেখকের দিকে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থেকেও সাময়িকতা-অতিক্রমী বিশদ কোনো সুফল লাভ সম্ভব হতে পারে না, আমরা জানি।
ভাষার যে প্রমিতকরণ, ওর যে শ্রেণীকরণ, বরাবরই সেসব করে এসেছে ক্ষমতা। ক্ষমতা সর্বদাই স্থিতাবস্থার পক্ষে। লেখকের কাজ ওই স্থিতাবস্থার শান্তবৃক্ষে ঝাঁকি দিয়ে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যাতে বদ্ধ স্থিতাবস্থায় কাঁপন জাগে। সেটা করতে গেলে ভাষার চেনা রূপ ও ব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়, জানিয়ে দিতে হয় প্রচলে অনাস্থা। এটা তখনই সম্ভব, যখন প্রমিতসীমার বাইরে পা চালিয়ে দেয়া যায়, অবিমিশ্রতার অহঙ্কার ভেঙে ফেলা যায় অভূতপূর্ব অথচ প্রার্থিত মিশ্রণের ঘটনা ঘটিয়ে। এজন্যেই হবে হয়ত যে, সকল সৃজনশীল লেখকই প্রমিত ভাষার স্থির নির্দিষ্ট ডোবায় প্রয়োজন বোধ করা মাত্র প্রকাশ্যে ঢিল ছুড়ে মারেন, নতুন শব্দের জোগান দেন, পুরানো শব্দে জাগান নতুন অর্থ, দাগিয়ে রাখেন শব্দসমূহের নতুনতর বিন্যাস।
দেখা যায়, ক্ষমতার প্রশ্রয়ে প্রমিতকরণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা গ্রহণযোগ্যতার একটা অধিপতি-বান্ধব মানদণ্ড তৈরি করে দৃশ্যমান পরিবর্তনসমূহের একাংশকে পরে প্রমিতরূপে বরণ করে নেন, একাংশ যদিও অবহেলায় উপেক্ষিত থাকে। এই উপেক্ষাটা হয় ক্ষমতার রাজনীতি অনুযায়ী। ক্ষমতা এটা বোঝাতে চায় যে আমরা উদার, সৃজনশীল লেখকের উদ্ভাবনাকে আমরা মূল্য দিই, সেগুলোকে গ্রহণ করে নিই। কিন্তু তার মানে তো আর এ নয় যে, সবটাই নেয়া যাবে। তাঁরা বলেন, যতটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে আমরা ততটা নিয়েছি। অথচ এখানে প্রশ্ন করার থাকে যে, ক্ষমতার নেয়া না-নেয়া বা নিতে পারা না-পারাটা গ্রহণযোগ্যতার কোনো সর্বজনীন মানদণ্ড কি না? ক্ষমতা গ্রহণ করে না এমন অনেক শব্দ গণমানুষ হামেশা ব্যবহার করে থাকে; সেগুলো প্রমিত নয় প্রচলিত, ক্ষমতার ভাষায় ‘স্ল্যাং’। কাজেই ক্ষমতার মুখে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বাক্যাংশ শুনে এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হবার কোনো সুযোগ নেই যে, তা আসলেই সবৈব অগ্রহণযোগ্য।
লেখক যদি প্রকৃতই সৃজনশীল হন, তিনি যদি সৌন্দর্যের প্রশ্নে নিরাপোষ হন, বক্তব্যের নৈখুত্য নিশ্চিত করার ব্যাপারে যদি যত্নবান হন, তবে তাঁর সকল বিশিষ্ট প্রয়োগই অর্থপূর্ণ, সকল শৃঙ্খলাভঙ্গই তাৎপর্যপূর্ণ। এরকম ক্ষেত্রে তাঁর সমুদয় প্রয়োগই বস্তুতপক্ষে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু লেখক যদি সৃজনশীল হয়ে বা না-হয়ে সৃজনশীলতার প্রয়োজনকে ছাপিয়ে ভাষারাজনীতি বা অন্য কোনো ঔপনিবেশিক বোধতাড়িত বিবেচনায় ভাষাকে কোনো বিশেষ রঙে রাঙাতে তৎপর হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর দিকে সন্দেহের চোখে তাকানো জরুরি। আমরা কেউই এ সন্দেহের ঊর্ধ্বে নই। আমরা সন্দেহের আওতার বাইরে কি না, আমাদের ভাষাকার্যক্রমই সেটা চেনা-বোঝার উপায়। এ বিষয়টি দেখভাল করার জন্য কোনো ভাষায়ই কোনো বিশেষ কর্তৃপক্ষ থাকার দরকার হয় না। এটা করেন মহান পাঠক নিজ দায়িত্বে, স্বাধীনভাবে। পাঠকরা নির্দিষ্ট লেখককে অগ্রহণ বা বর্জন করে করতে পারেন সব চাইতে বড়ো কাজটি। এক্ষেত্রে অগ্রহণ বা বর্জনই লেখককে নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট কি না তা আমি জানি না, একদমই জানি না!
৪.
বলা হয়, পৃথিবীটা একটা বিশ্বগ্রাম বা ভুবনগাঁও, বৃহৎ একটাই অভিন্ন একক। সে পাটাতনে দাঁড়িয়ে দেখলে, আন্তর্জাতিক ভাষার খেতাবপ্রাপ্ত ইংরেজি বাদে সকল ভাষাই এক বিবেচনায় আঞ্চলিক ভাষা। কারণ প্রতিটা ভাষা ভুবনগাঁয়ের ছোটবড়ো কোনো-না-কোনো পাড়াকেই মাত্র প্রতিনিধিত্ব করে। মহামাস্তান ভাষাগুলো বড়ো অঞ্চলজুড়ে দাপটের সাথে বিরাজিত ও ব্যবহৃত, পাতিমাস্তান ভাষাগুলো ছোট ছোট অঞ্চলজুড়ে বিনয়ের সাথে, আর নিরীহ ও অতিনিরীহরা আছে কোনাকাঞ্চিতে; কাচুমাচু, লাজুক, বিপর্যন্ত ও মরমর। এ দৃষ্টিতে দেখলে প্রায় সকল ভাষাব্যবহারকারীই আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারকারী, প্রায় সকল লেখকই আঞ্চলিক ভাষার লেখক। এ প্রেক্ষাপটে একজন আরবি ভাষা ব্যবহারকারী কবির সাথে একজন নোয়াখাইল্যা ভাষা ব্যবহারকারী কবির মিল এই যে, দুজনই আঞ্চলিক ভাষায় লিখেন; আর অমিল এই যে, আরবি কবির কবিতার প্রকল্পিত সরাসরি পাঠকসম্প্রদায় যেখানে ৪০ কোটি মানুষের আয়তনে ব্যাপ্ত, সেখানে নোয়াখাইল্যা কবির সরাসরি পাঠকসম্প্রদায় মাত্র ৪০ লক্ষ মানুষে সঙ্কুচিত। কিন্তু এ পরিসংখ্যান নোয়াখাইল্যা ভাষায় কবিতা লেখা যাবে না, এরকম কোনো তত্ত্ব প্রতিপাদনে সক্ষম নয়। একজন কবি মাত্র ৪০ লক্ষ মানুষের ভাষায় যদি তাঁর সমুদয় জীবনসার বিলিয়ে দিতে চান, শর্তহীনভাবেই তাঁর সে অধিকার আছে। একজন লেখক হিসেবে আমি তাঁকে নিরস্ত করতে পারি না। তাঁকে নিরস্ত করার সামর্থ্য যেমন আমার নেই, নেই নিরুৎসাহিত করার নৈতিক ও আইনগত ভিত্তিও। কিন্তু আমি নিরুৎসাহিত করব ও করতে চাইব যদি একজন বাংলাভাষাভাষী কবি ২৫ কোটি বাংলাভাষাভাষীকে উদ্দেশ্য করার ছলে বাংলাভাষার ছকে ফেলে আরবি বা ফারসি কবিতা লিখে যেতে থাকেন, কিংবা লিখেন সংস্কৃত কবিতা অথবা ইংরেজি। সেরকম চেষ্টা কখনো কখনো হয়েছে এদেশে। ব্যক্তি পর্যায়ে এরকম চেষ্টা হলে আমি তাকে নিরস্ত করতে কোনো ভূমিকা রাখতে যাব না, যাবার দরকারও হবে না, কারণ সেটা আহামরি কোনো প্রভাব সঞ্চার করার আগে নিজে নিজেই ক্রমে নিষ্প্রভ ও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ক্ষমতা যদি সেরকম কিছু করবার উদ্যোগ নেয়, করতে বাধ্য করতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া আমার দায়িত্ব বলে মনে করব। যেরকমটা আমাদের পূর্বনারীপুরুষেরা করে দেখিয়েছেন।
আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লিখলে কবিতাভাষার মান বা শিল্পসম্ভাবনা নষ্ট হয় কি না, এ প্রশ্নটা কাজেই সবৈব বাহুল্য। অবশ্য, আমার আলাপের ভঙ্গিতে যদি প্রশ্নটাকে অনুবাদ করে একটু অন্যভাবে ভাবি, তাহলে কথাটা দাঁড়ায়, অল্পসংখ্যক কথকের ভাষায় কবিতা লিখলে কবিতার শিল্পমান ক্ষুণ্ন হয় কি না? আমি বলব, হয় না। কোন ভাষার কথক-পাঠক কতজন সেটা জেনেও একজন কবি যখন স্বল্পসংখ্যকের ভাষায় কবিতা লিখতে প্রবৃত্ত হন, তখন তিনি যে ঝুঁকিটা নেন সেটা শিল্পহীনতার নয়, পাঠকস্বল্পতার। কম পাঠকের উপযোগী রচনায় শিল্পমান কম হবার কোনো সংগত যুক্তি নেই, যদি কবির শিল্পবিষয়ক এলেম কম না-হয়। আর শিল্পবিষয়ক এলেম কম থাকলে কিংবা শিল্প সৃজনসক্ষমতা না-থাকলে প্রধান মাস্তান ভাষা ইংরেজিতে কবিতা লিখেও শিল্প পয়দা করা সম্ভব নয়। পাঠক-কথকের সংখ্যার সাথে শিল্পমানের কোনো গাণিতিক বা জ্যামিতিক সম্পর্ক নেই। এরকম প্রশ্ন উঠতে পারে হয়ত তখন, যখন কেউ উপাদানভিন্নতাকে আমলে না-নিয়ে ঝিনুক দিয়ে নির্মিত কারুকর্মের সৌন্দর্যটাই খড়নির্মিত কারুবস্তুতে খুঁজে পেতে চান। ঘর নির্মাণ করা যায় বহু উপাদান দিয়ে বহু পন্থায়; যেমন মার্বেল পাথর, স্টেইনলেস স্টিল, ইট-সিমেন্ট-বালি, কাঠ-খড়-বাঁশ, মাটি ইত্যাদি। এই পাঁচরকমের বাড়িই সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে, তবে পাঁচটি হবে পাঁচ রকম সুন্দর। মার্বেল পাথরের মসৃণতা, স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য যদি কেউ মাটির বাড়ির কাছে আশা করেন, কিংবা মাটির বাড়িরটা পাথরের বাড়ির কাছে, তা কি সংগত হবে? কেউ যদি বলেন যে একটি অন্যটির মতো মসৃণ হয় নি, স্থায়িত্বশীল হয় নি, সৌন্দর্যমণ্ডিত হয় নি, তাহলে কি তিনি একের গুণপনা অন্যের কাছে আশা করছেন না, যার যেটার সঙ্গে কোনো সংশ্রবই নেই? মাটির বিচার মাটির সাপেক্ষেই যথার্থ, পাথরের বিচার পাথরের। এর বাইরে অন্য কোনো বিচার এখানে প্রযোজ্য কি না তা আমি জানি না, একদমই জানি না!
৫.
কবি কোন ভাষায় তাঁর কবিতা লিখবেন, তা কবির একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। এ ব্যাপারে তাঁর বাইরে অন্য কারো কথাই খাটবে না। তবে পাঠক হিসেবে যে কেউ কবির চাওয়া না-চাওয়াকে তোয়াক্কা না-করেই তাঁর কবিতার ভাষা নিয়ে কথা বলতে পারেন, পাঠোত্তরে যেকোনোরকম প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতে পারেন। যেমন নোয়াখালী বা চট্টগ্রামের উপভাষায় লেখা যেকোনো কবিতা আমার কাছে দুর্বোধ্য, কখনো-বা অবোধ্য ঠেকবে। এ কারণে আমি তা পড়ব না, অথবা পড়বার চেষ্টা করে রণেভঙ্গ দেবো। কিন্তু কেউ কেউ সে কবিতার সঙ্গে চমৎকার যোগাযোগ ঘটাতে পারবেন এবং পড়বেন। যাঁরা পারবেন ও পড়বেন, তাঁদের আমি দোষ দিতে পারব না ও দেবো না। যখন আমার লিখবার প্রশ্ন, তখন আমি ময়মনসিংহের উপভাষায় না-লিখে প্রমিত বাংলায়ই লিখতে চাইব, যদিও পূর্ব ময়মনসিংহের ভাষায় লৈখিক ও গীতসাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে। ভাষার স্বাভাবিক চরিত্র অনুযায়ীই মধ্যযুগে রচিত মৈমনসিংহ গীতিকার ভাষা পর্যন্ত অত্রাঞ্চলের কথ্যভাষা থেমে নেই (বলতে কী, চন্দ্রকুমার দে মৈমনসিংহ গীতিকাভুক্ত পালাগুলো যখন সংগ্রহ করেছেন, তখনো এ অঞ্চলের কথ্যভাষা পালার ভাষা থেকে কিছুটা দূরের ছিল। লিখতে গিয়ে তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর মতো করে সংস্কার করে নিয়েছিলেন)। এতদিনে ওই লৈখিক রূপ থেকে অত্রাঞ্চলের কথ্যভাষায় আরো পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তনের হাওয়ায় প্রমিতবাংলা থেকে ক্রমশই তার দূরত্ব বেড়েছে এবং তা কেবল ক্রিয়াপদে নয়, অন্যান্য পদেও। অর্থাৎ ওখানকার বর্তমান কথ্যরূপের বিশ্বস্ত লেখ্যরূপ সকল বাংলাভাষাভাষী মানুষের কাছে সহজবোধ্য না-ও হতে পারে। কিন্তু আমি আমার কবিতা দিয়ে বাংলাভাষাভাষী সকল পাঠকের সঙ্গেই যোগাযোগ ঘটাতে চাই। এক্ষেত্রে এটাই আমার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। এরকম বিবেচনা খুব সম্ভব অন্য কবিদের বেলায়ও কাজ করে থাকে। নইলে কোনো-না-কোনো উপভাষা থেকে উঠে আসা সিংহভাগ কবি স্ব স্ব এলাকার আঞ্চলিক বাংলায় না-লিখে বিনাপ্রশ্নে প্রমিত বাংলায় লিখে চলেছেন কেন? এক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল আরো কোনো তাৎপর্যপূর্ণ বিবেচনা কোথাও রয়েছে কি না তা আমি জানি না, একদমই জানি না!
৬.
পড়া-লেখা-বলা সর্বক্ষেত্রেই বর্তমানে আমি প্রমিত বাংলার চর্চা করলেও স্মৃতিতে শৈশব-কৈশোরে চর্চিত দক্ষিণ ময়মনসিংহের উপভাষার ভাণ্ডারটি কমবেশি সংরক্ষিত আছে। নিম্নবর্গের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনসংশ্লিষ্ট কথালাপ ছাড়াও স্বকর্ণে আমি ও-ভাষায় দার্শনিক-কাব্যিক বাতচিতও শুনেছি। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার একটা গ্রাম থেকে অর্জিত ভাষাসম্পর্কিত আমার কৈশোরিক অভিজ্ঞতা এমন বলে যে, ওই ভাষায় খিস্তি যেমন আসে, আসে দর্শনও। তবু আমি ও-ভাষাকে আমার কবিতার বাহন করতে চাই না। অবশ্য এমন হতে পারে ও হয় যে, কবিতায় কোনো একটি আঞ্চলিক শব্দ প্রমিত বাংলার কোনো একটি শব্দের চাইতেও অনেক বেশি যথাযথ ও তাৎপর্যপূর্ণ লাগতে পারে ও লাগে। তখন আমি অবশ্যই তা ব্যবহার করার পক্ষে, যেরকম ব্যবহার আমি করেছিও। অবশ্য গ্রামের পটভূমিতে রচিত কোনো আখ্যানের চরিত্রভাষ্য হিসেবে আমি এই উপভাষার প্রয়োগ কখনো করব বলে ভাবি।
ক.
যাগ্যা, তর বইনের জানি কী নাম, ইসকলো যাবার সুমে দেহা অইছিল, বাইট্টা মতন লাম্বা, খাডা আরহি। তর চেহারার লগে অবশ্যি কুনো মিল নাই, ওরে যে পুঙ্গির পুতে রাস্তায় ডিস্টাপ কোরতো, হেই হালায় এমুন সুমে আমারে ফুন দিলো যে মুনডায় কইছিল, আছাড় মাইরা বাইঙ্গা হালাই চেপার মটকা, লাত্থি মাইরা উড়াইয়া দেই পিডার গুড়া, কিন্তুক হাজার অইলেও ত হুমুন্ধি, অর লগে ত ইরহম ব্যবহার করুন যায় না, তর কী মুনে অয়...
খ.
এক্টা রাস্তার শেষে তেরডা তালগাছ তেরডা মুচুড়
যুদি খাডিডা বাইছ্যা লইতে পারস
তাইলে তুই খাডি
পচাডা বাছলে পচা
বাহি এগারডায় যে হালারা চলে তারা মাঝারি মানুষ
হেগোর কাছে কুনো তালগাছেরই কিছু চাওনের নাই
গ.
মাগি, ফাইজলামি রাখ, দিবি যদি দে, ছেনালিপনার আর জা’গা পাস না, এমনে ত দেহি রাইত নাই দিন নাই শালার পৌষ মাসেও শন শন, বাপ-মেয়ে ঘরে বসা ত জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে বাতিটা নিভিয়ে দিলি দপ্, পিচ্চি পোলা থালায় করে মুড়ি খাচ্ছে ত উড়িয়ে নিয়ে গেলি ঝর, লাজুক মেয়ে পথ হাঁটছে ত লোকজনের সামনে ওড়না ধরে দিলি টান ফাৎ, বৃদ্ধা আয়া উঠান ঝাট্ দিচ্ছে ত পেছন থেকে কাপড় উঠিয়ে দিলি ছ্যাৎ, কোন দুষ্টামিটা তুই না করলি বল, একবার পারলে সুলেমান বাদশার কাছে নালিশেও রাজি
তা তুই করলিটা কী বল, একজন কেউ হতে পারে জীবনযন্ত্রণায় কাতর, তা বলে সে দম বন্ধ হয়ে মরতে লাগবে তুই দেখবি না, এমনটা ত হয় না, তা ছাড়া, দেখবি ত চুতিয়া যে দোষটা কার
তেইশ বছরের যুবকের বাপের সাধ্যি কী ছিল যে তোর সাহায্য ছাড়া তেইশ দিন বাঁচে, ছেনালিপনা করবিই যদি আঁতুড় ঘরে করতিস, আগুনে সংসারে তার পা-ই পড়ত না
সব ঠিকঠাকই ছিল, গণ্ডগোলটা বাঁধাল শালার বাপে, ধম্মকম্মে উন্মত্ত হয়ে বহু আগেই ব্যাটা সবটা কাণ্ডজ্ঞান ভর্তা করে খেয়ে বসে আছে, এখন শূন্য টাকশাল নিয়েও অযথা প্রজাপীড়ন, হারামি, মানুষ ত একটু রয়েসয়ে একটা কাজ করে, তা-না, যেন সে একটা যন্ত্র
তেইশ বছর হিমালয় থেকে শীতলতা ধরে এনে জীবনে পরিপুষ্টি দিয়েছিস, সঙ্গে এনেছিস বিচিত্র গন্ধ, আর আজ চোখের সামনে একজনের ফুসফুসকে নিষ্ক্রিয় হতে দিয়ে তুই আরামসে কলতলার নারকেলগাছের পাতা দোলাচ্ছিস, শালি
বলি ও মাগি, যে বানচোত এ গণ্ডগোলের হোতা, হে কি তর দ্বিতীয় তরফের লাঙ অয়
(বাতাসের কাজবাজ চিরকালই ভালোমন্দ মেশা, ‘খড়বিচালির দুর্গ’ থেকে)
এ ডায়লেক্টে মনের সব কথা বলতে চাওয়া ঠিক কি না সে বিষয়ে আমি নিঃসন্ধিগ্ধ নই। এর কি মর্যাদা আছে সর্বত্র পঠিত ও উচ্চারিত হবার? এ তো অক্ষমের ভাষা, আক্রমণাভিলাষী। এ ভাষা খাটো, অবদমিতের। এ ভাষা গড়ে উঠতে উঠতে আর গড়ে উঠতে পারে নি, থেমে আছে পুরোটাই কথ্যভাষা হয়ে। এর কোনো পাঠকগোষ্ঠী নেই। এত বাক্য একসাথে চিঠি ছাড়া অন্য কোথাও কেউ কখনো লিখে রাখে নি। বাংলা উপভাষার একটা ধারার এই অনুপুঙ্খ কথ্যরূপকে (‘গ’ চিহ্নিত উদ্ধৃতির ক্রিয়ারূপ ও অন্যান্য শব্দ কিছুটা সংস্কারকৃত, বানানো) কোনোরূপ সংস্কার ব্যতিরেকে কবিতার ভাষা হিসেবে মেনে নিতে কজন রাজি হবেন? এই সংশয়প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বাংলা উপভাষায় কবিতা লেখা বিষয়ে চূড়ান্তভাবে আমার কী মত প্রকাশ করা দরকার তা আমি জানি না, একদমই জানি না!