মাতৃভাষা

পল্লব ভট্টাচার্য


গতকাল আগরতলা বইমেলায় গিয়ে , শুনলাম , এক প্রকাশক সামান্য বিদ্রুপ মেশানো স্বরে , একজনকে বলছেন ,- “আপনার কথা শুনে তো বোঝাই যায় না , আপনি এখানকার ! অন্যরা এমন অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে কেন !”
তিনি হয়তো প্রথম এসেছেন , এবং তাঁর কানে এখানকার মানুষের কথার ধরণ হয়তো অদ্ভুতই শোনাচ্ছে , কিন্তু আমার মতো যারা ষড়যন্ত্র মামলার আগরতলায় জন্মেছি , তাদের অনেকেই তো লিখি , আমাদের মাতৃভাষা বাংলা । তবে কি , আমরা ঠিক বাংলাভাষায় কথা বলি না ? অই প্রকাশকের কথা অনুযায়ী “অদ্ভুত ভাষা”য় কথা বলি ? এটা সত্য যে আমার এই বাংলাটা ঠিক “কলকাত্বার মত” নয় । আর নয় বলেই কি , একদার তিনটি গন্ডগ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা এক নগরের কাছে , তা “অদ্ভুত ভাষা”র উপহাস কুড়িয়ে নেবে ? আর আমি তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে ওঠার ভয়ে আমার ভাষা ভুলে যেতে চাইব ?
ঐহিক পত্রিকার তমাল রায় , আমার মাতৃভাষা ভাবনা নিয়ে একটা লেখা চেয়েছেন আজ দুপুরে । আর তখনই আবার এইসব ভাবনা মনে এলো । ব্যাপারটাকে মান্যভাষার সঙ্গে আঞ্চলিকভাষার দ্বন্দ্ব, এমন ভাবার দরকার নেই । বরং , ভাষার অন্তর্নিহিত কোনও গুণে নয় , আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক কারণে , গড়ে ওঠা এই যে ক্ষমতার ভাষার একটা উন্নাসিক মনোভাব, তা তুচ্ছ করে তুলতে চায় চারপাশের অন্যভাষাকে ,এমন কি নিজের ভাষার ভেতরের ছোট ছোট ভাষাপ্রকাশকেও, এই মনোভাবটাকেই বুঝতে হবে । নিজেকে প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অন্যকে বাতিল করে দেওয়ার এই যে মনোভাব , এর বিরোধিতাও কিন্তু চলতেই থাকে একক ব্যক্তি বা বহুর মধ্যে । কখনও গোপনে , কখনও প্রকাশ্যে । ২১শে ফেব্রুয়ারি এরকম একটা বিরোধিতার প্রকাশ ঘটিয়েছিল ১৯৫২য় । তারপর ১৯৭১ অব্দি অপেক্ষা করতে হয়েছে একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য । আর সাফল্যই যেহেতু উদযাপিত হয় , আমরাও , ভাষার জন্য বিন্দুমাত্র রক্ত না দিয়েও , ২১শে ফেব্রুয়ারিতে পালন করে যাচ্ছি আন্তর্জাতিকভাবে মাতৃভাষা দিবস । কিন্তু বদলায় নি আমাদের ভেতরের উন্নাসিক ও আগ্রাসী মনোভাবের । তাই দিব্যি ভুলে থাকি , ১৯৬১র ১৯শে মে । ভুলে থাকি ১৯৯৬য়ে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরি ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে শহীদ হওয়া সুদেষ্ণা সিংহকে ।
কেন যেন মনে হয় , ভুলে থাকি কারণ আমাদের ভেতরে কোথাও শিকড় গেড়েছে একটা একশিলা মন । সে চায় , বহু নয় , সব একই রকম হোক । আমার মতো হোক । যেন আমিই সম্পূর্ণ । অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না , প্রকৃতি যেখানে কাউকেই তুচ্ছ ভাবে নি , কিছুকেই ভাবে নি অপ্রয়োজনীয় , সেখানে আমরা কীভাবে অর্জন করলাম এই মন , যা ক্রমশ ছুটে চলছে দমন অবদমনে এক করার দিকে ! এক ক্লোন সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিমুখে !
খুব ইচ্ছে করে , সেই প্রকাশক বন্ধুটিকে একবার বলি ,- “তোমাদের ভাষা খুব ক্যাডবেরি , মেনে নেওয়া গেল /তবুও ভাষার কিছু বাকি থেকে যায় ।”
এই বাকি থাকাটুকু হারিয়ে গেলে , ভাষা থেকে হারিয়ে যাবে এমন অসংখ্য শব্দ আর অজস্র স্বর যা আর কোনও দিনই ফিরে পাওয়া যাবে না । সরু ও মসৃন অর্থে নোয়াখালীর “মইন”শব্দটি হারিয়ে গেলে কি , বাঙ্গলাভাষারই একটি শব্দ হারিয়ে গেল না ? কিংবা বাংলাদেশ বিমানের বিজ্ঞাপনের সেই “বেলাবেলি” শব্দটি ?
আজকে ভাষা হারিয়ে যাওয়ার এত আশংকা , ভয় , অসহায়তার মধ্যেও আমার খুব গর্ব হয় , যে আমি ত্রিপুরার মতো একটি রাজ্যে জন্মেছিলাম এবং এখনও আছি । যেখানে বহু ভাষার মানুষ একই সঙ্গে নিজের নিজের মাতৃভাষায় কথা বলে অন্যের মাতৃভাষাকে অশ্রদ্ধা না করে । এখানে “ককবরক”ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে বাংলাভাষী মানুষ সামিল হয়েছেন আন্দোলনে । এখানে ককবরক ভাষায় , চাকমা ভাষায় , মগ ভাষায় অনূদিত হন রবীন্দ্রনাথ , নজরুল , জীবনানন্দ । এখানে ককবরক ভাষা থেকে বাংলায় অনূদিত হয় কবিতা গল্প উপন্যাস । এখানে মনিপুরি ও বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরি ভাষা স্বীকৃতি পায় ভালোবাসায় । চা বাগিচা শ্রমিকের ছিলোমিলো ভাষায় লেখা প্রকাশ করেন বাঙালি প্রকাশক । এবং স্বাভাবিকভাবেই , আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার অনেক আগেই , ১৯৯৬য়ে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে এ রাজ্যেই প্রথম সরকারিভাবে পালন করা হয়েছে “মাতৃভাষা দিবস” হিসাবে ।
আমার মাতৃভাষা তাই এমন অদ্ভুত , যা বাউল , ভাটিয়ালি , ভাওয়াইয়া , জারি সারির সঙ্গে ঝুমুর , বিহু ,লেবাং বুমানির সুরে সুর মেলাতে পারে । আমার মাতৃভাষা মনে মনে জানে , “প্রতিটি মায়ের মুখের ভাষায় মায়ের ভাষা , আমাকে শেখায় পৃথিবীর রূপ , মানুষের ভালোবাসা ।”