মাতৃভাষা- একটি সত্য অনুভূতি

মুক্তি মণ্ডল


মাতৃভাষার কাছে ঋণী। মনুষ্য আচরণ ও জীবনযাপন যখন অনুভবের পরিবীক্ষণের কাচে ফেলে পাঠ করি তখন ভাষার মধ্য দিয়েই তা করি, সে আমাকে অনুভবের পর্দায় নান্দনিক হয়ে উঠতে সহায়কের ভূমিকা পালন করে, যা পরবর্তীতে কবিতার অবয়বের মত সচেতনভাবেই সামাজিক ক্রিয়ার ভাষ্যও যেন নির্মাণ করে, যদিও তা আকাশবাণীর মত নয়, যেন তা সহি চৈতন্য নির্মাণশৈলীর ভূবনডাঙ্গা।

এই ভাষার স্বরে ও সাম্যেই আমার মায়া যেন কোথাও না কোথাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা আমার বিচ্ছিন্নতা ও বিষাদের টিলাকেও মাঝে মাঝে নড়িয়ে দেয়, যা আবার সামাজিক ক্রিয়ার ভেতর সভ্য ও সচেতন ব্যক্তির উপলব্ধিগত ধারণার স্ফুরিত অনুভবও, একে আমি লালন করি, জীবনের নানাবিধ জটিলতার ভেতরও সে আমাকে যেন জড়িয়ে থাকে, তাকে আমি ছুঁড়ে ফেলতে পারি না, তাকে আমিও মনের ঘোরে জড়িয়ে ধরি, চুমুটুমুও খাই, এসবই বাহ্যিক ও অর্ন্তগত সামাজিক মানুষের আচরণেও একটু একটু করে হয়ত হাত বাড়িয়ে দেয়, ভাষার মধ্যে এরকম ইশারা হরদম আমি টের পাই, যা আমার সামাজিকীকরণে সমৃদ্ধ করে, ঋদ্ধ করে। একারণে তাকে আশ্রয় করেই এ জীবনকে এক ভাষাক্ষেত্র মনে করে চিরসত্য নয়, সদা পরিবর্তনের ফলক উন্মোচন করে চলেছি যেন, যার চিহ্ন আমার লেখার ভেতরও টুকে রাখি।

মানবজগতের মনকাঠামোয় প্রোথিত শিল্প-সাহিত্যের যে বৃহত্তর আঙিনা, তার ভেতর যে জনগোষ্ঠীর স্রোত তা সামাজিক জীবনের অনুপুঙ্খ ভাবনাবিশ্বও, এই বিশ্বের শরীরে যে দৃশ্যসমূহ লেপটে থাকে, যার সহজ ও সরল সান্নিধ্যে যে জীবনযাপন আমি করতে চাই, তা যেন লেপটে আছে আমার মাতৃভাষার স্বর ও বর্ণের কলা ও শৈলীর মধ্যে, যা থেকে আমি আহরণ করি সামাজিকভাবে অস্বীকৃত চিন্তা-পদ্ধতির নতুন কলাকৌশল যা আমার দেখার আয়নামহলও, ওখানেই বিম্বিত হয় আমার যাপনশৈলীর কলা ও নতুন এক নির্মিত সমাজ ও জীবনধরণ, এটা ওই ভাষারই বীক্ষণ। দারুণ এক বেঁচে থাকার স্ফূর্তি ও রসও এর মধ্যে নিহিত। যা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, এটা কোন সদ্য নির্মিত ব্রিজ নয়, মাতৃভাষার টোলঘর। এ ঘরেই আমি টিকে থাকতে চাই। এর ভেতরই আমার ফ্যান্টাসি ও সামাজিক পার্ভাসনকে আমি চিহ্নিত করি কবিতায়, শব্দে ও দৃশ্যে।

ভাষার কাছে যে বা যারা ঋণী থাকে না তাঁরা মনুষ্যচর্বির পাহড়ের ঢালে অন্য আরসব প্রাণীর মতই, এই ভাষার মধ্যে থেকেই আমি তাঁদের লোলপড়া গালকে পড়তে চাই, কোন ব্যাখামূলক তত্ত্ব নির্মাণে যেতে চাই না, সামাজিক ব্যক্তির চিন্তনপদ্ধতির ভিতর ঢুকে তাঁদের টোপখাওয়া মুখের ছিদ্র দেখতে চাই, সমাজ বিকশিত হওয়ার এবং সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অলিগলিগুলিরে ভালভাবে নিরিখ করতে চাই, মানুষের যাপিত জীবন ও জীবন থেকে খসে যাওয়া গাল-গল্পকে টুকে রাখতে চাই, এজন্য এই ভাষার কাছে আমি নতজানু হই, এর নানারকম ভাষাচরিত্র মানুষের ভিতর যেন ডুবে ডুবে জীবনদৃষ্টির প্রক্ষেপণ দেখতে চাই।

এজন্যই বাংলা ভাষার ভেতর আমি আমারই উপলব্ধগত প্রত্যয়ের সন্ধান করি আরও মানুষের আচারআচরণগত শৈলী ও বীক্ষণের সাপেক্ষে, যেখানে হয়ত পাওয়া যেতে পারে সামাজিক নানাবিধ ঘটনার নৃত্যশীল বৈভব, উদ্ভব হতে পারে মনুষ্য বীপ্সা ও পারম্পর্য, যার মধ্যে আমি অনুধাবন করার পায়তারা করি নিজস্ব উলল্ফন। এর ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয় আমার বেঁচে থাকার নতুন প্রকল্প, নির্মাণ করার চেষ্টা করি ব্যাপৃত চিন্তামণির মুখ, যাকে অনুভবে জড়িয়ে ধরি, যার মাধ্যমেই টিকে থাকার অভীপ্সাকে উসকে দিতে চাই।

এটাই আমার ভাষা জগত; কখনও কখনও বেঢপ, মুখফোলা বুদ্ধিজীবীর পেটের মতো ফুলে ফেঁপে ওঠে আমার মনোবীণায়, তার সাথেই আমার বসবাস। এ জগতেই আমার সাংস্কৃতিক জীবননদ বয়ে চলেছে। তাকে সেলুট জানাই।

ভাষার মধ্য দিয়েই আমি বর্তমান ও ভাবীকালের পেটের ভেতর লুকিয়ে রাখি আমার স্বাধীন রাষ্ট্র ও সমাজ, সেখানে কোন স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ নেই, বল প্রয়োগের কোন প্রচেষ্টা খড়গও নেই। সেখানে আমি ধসে যাওয়া ধুলোর মত স্বাধীন এক কণা মাত্র, অফুরান শব্দ ও স্বরের ঢেউয়ে বুঁদ হয়ে থাকি। প্রকৃতির খেয়ালের সাথেও যেন সম্পূর্ণভাবে অসম্পৃক্ত নই, তার শব্দ ও স্বরের সাথেও যেন নিগুম এক সম্পর্ক তৈরি করা যেন, যেন সেই প্রাকৃতিক জগতের মধ্যেও নিজেকে পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবন করা যায়, তারও একটা ভাষ্যও নির্মাণ যেন করা যায়, ভাষার মাধ্যমে এবং সেই ভাষ্যে মানবিক বিশ্বের অন্তরঙ্গ আচরণও যেন লীন হতে চায়, এই ভাষা-পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবন করেই আমি ঢুকে পড়তে চাই মনুষ্যহাড়ের কম্পনের মধ্যে, ঢুকতে চাই সামাজিক সম্পর্ক ও তার রীতিনীতির টোলপড়া গালে।

ভাষায়’ই আমার মানবিকচোখ তৈরি করে তার জগতবোধের ভেতর ঠেলে দেয়, আমি দেখতে থাকি ভেঙে যাওয়া আলতার শিশি, শশিভূষণ, এর মধ্যে কোন অবোধ্যতাও যদি থাকে তাকেও আমি কাছে টেনে নিতে চাই, তাকে একটু আদর করতে চাই, মানবিক বোধের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে তাকেই আমি বলতে চাই ওম শান্তি! ওম শান্তি!

ভাষা আমার চেতনার প্রতিরুপ, তাকে আমি বয়ে বেড়াই, বয়ে বেড়াতেই চাই, তার আদলেই আমি তৈরি করতে চাই মানব চৈতন্যের পিলার, তার গা জড়িয়ে আমি ঘুমাতে চাই, জাগতেও। মনে করি ভাষার মধ্যেই আমার কাঙ্খিত সমাজের বন্ধু ও বন্ধন জীবন ঠেলে চলুক, ঠাহর করুক ভাষার মধ্যেই তাদের জীবনবোধের ছাদ, তার গা বেয়ে উঠুক তাদের জীবনযাত্রার ধরণ, লতিয়ে উঠুক ভাষার স্বর ও সুর।