আমার মায়ের মুখ

বারীন ঘোষাল

 প্রথম চোখ চেয়ে যাকে সামনে দেখেছি, প্রথম কোল পেয়েছি, প্রথম আমাকে দোল দিয়েছে, চুমু খেয়েছে, স্নান করিয়েছে, সে আমার মা। যার বুকের দুধ আমার জীবনের প্রথম খাদ্য ছিল তা আমার মায়ের। আমাকে জড়িয়ে ধরা, আদর করা, স্নান করানো, চুমু খাওয়া, জামা পরানো সব সব মা। এই সবকিছু পরেও পেয়েছি প্রেমিকাদের কাছে, স্ত্রীর কাছে নতুন করে বারে বারে, তাতে প্রেম ছিল কিন্তু ছিল না মায়ের স্নেহ। তাই প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা হয়তো বিশিষ্ট থাকল না আর, কিন্তু এই যে কথাগুলো লিখছি, উচ্চারণ করে পড়ছি, জিভ আলজিভ অনায়াসে ধ্বনি করছে সেই সব, আমার মুখে সেই ভাষা দিয়েছিল আমার মা। কথা বলতে শিখিয়েছিল। আদর করে ছড়া, রূপকথা, কল্পনার জগতে নিয়ে গিয়েছিল মা।
আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিল মা। অ, আ, ক, খ ... গল্প, গান, ক্রমে বই পড়া, স্কুলের পড়া দেখে দেওয়া, ক্রমশ খবরের কাগজ, গল্পের বই, উপন্যাস সব সব মায়ের দেখাদেখি। ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম মায়ের ছায়া। এই ভাষাকেই জেনেছি বাংলা ভাষা বলে। ক্রমশ বাংলা ভাষার উৎস, গুরুত্ব আর মহত্ব জানলাম। এই ভাষাই আমার মাতৃভাষা। বাংলা ভাষার লাবণ্য, সহজাত লয় মাত্রা, লিরিক, না শিখেও এসে গেল আমার ভাষায়। যে সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছি তার শিকড়ের খোঁজ ও চিহ্ন জানতে হবে বৈকি। যে যত গভীর ভাবে তার ভাষাকে জানে সে তত সহজে অন্য ভাষা আয়ত্ব করতে পারে আমি বুঝেছি নিজের চেষ্টায়। বাংলা থেকে বিভাষায় বা, বিভাষা থেকে বাংলায় পুনরনুবাদ ও অনুসৃজন করতে গিয়ে আমার এই অভিজ্ঞতা। অনুচ্চারিত, অপ্রকাশ্য, নীরব ভাষা, কবিতার ভাষার জন্য মাতৃভাষাকে ভালবেসে জড়িয়ে থাকতে হয়।
প্রথমে আমাদের ভাষা ছিল অস্ট্রিক। তারপর দ্রাবিড় মিশ্রণ। ক্রমশ হুন, মোঙ্গল, সংস্কৃত, উর্দু, হিন্দী, ইংরাজি মেশার পরে আজ এই আমাদের প্রিয় ভাষা। রবীন্দ্রনাথ শুদ্ধ্বতম বাংলা ভাষা ব্যবহার করেছিলেন কথ্যরূপ এবং ধ্রুপদী রূপের মিশ্রণে। ক্রমশ ভাষা পথে এসে দাঁড়ায়। আলগা হয়ে আসে শিকড়। ভাষার সমকালীন রূপটি বিকৃত হতে থাকে যখন ভাষাবিদায়ের ঘন্টা বাজে। আজ ছেলে মেয়েরা যখন হিন্দী মেশানো, সিনেমার, বিজ্ঞাপনের ভাষায় কথা বলে, কথায় কথায় ইংরাজি ব্যবহার করে, তখন স্কুলে বাংলাভাষা শেখানো হচ্ছে না বলে মন খারাপ করি না। মন খারাপ হয় তাদের মায়ের ভাষায় অনাগ্রহ দেখে। আমি অ্যাকটিভিস্ট নই। বাংলা বাঁচাও কমিটির লোক নই। হতে চাই না। আমি ২১ শে ফেব্রুয়ারি পথে পতাকা হাতে নেমে মার্চ করে স্লোগান দিয়ে দেশোদ্ধার করতে যাইনি। পূর্ব পাকিস্তানে, আসামে, ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল জনতাকে একমুখি ফোকাস দেবার রাজনৈতিক আবেগে। সাফল্যও এসেছিল। সেই স্ট্র্যাটেজি সত্যিই ছিল মহান। অথচ আমার নিজেকে দেখে লজ্জা হয় না সেরকম কোন আবেগের আতিশয্য নেই বলে। আজ স্কুল থেকে বাংলা ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা কমে যাচ্ছে বলে আমার কোন দুঃখ নেই। পৃথিবীতে সব ভাষারই আছে স্বাভাবিক উত্থান ও বিলয়। বিশ্বায়নের কারণগুলো আমি মুছতে পারব না। আর করবই বা কেন ? ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল বাজারে লেন-দেনের সুবিধার জন্য। আবার লেনদেনের নতুন সুবিধা উপস্থিত। আমি নাকে কান্না কাঁদতে যাবো কেন ?
আমার মাতৃভাষা, আমি তোমায় ভালবাসি। এই ভালবাসা নিয়েই যেন মরে যাই। আমার মৃত্যুর পরে তোমরা একটা এপিটাফ রেখো চিতার ওপর। -- “লোকটা মাতৃভাষাকে ভালবাসতো”।
১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫।