ফিনিক্স পাখীর মত আমার মাতৃভাষা গান হয়ে থেকো

তমাল রায়


নদীর ধারে, যেখানে বট গাছটা হেলে পড়ে জল ছুঁয়েছে ঠিক তার পাশে আমরা কজন বসেছিলাম। একটা আগুন কুণ্ডলীকে গোল করে ঘিরে। কেউ আলোচনা করছিলো তার স্নেহ নিয়ে, কেউ শাসন। ও পাশে বসেছিলাম আমরা দুজন, আগুনের দিকে ঠিক সোজাসুজি। তখন লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁতে চাইছে। সব্বার ডান দিকে যে, ও বলছিলো- এক বার লজেন্স কিনতে পয়সা চুরির পর কীভাবে বকেছিলেন তিনি। কেউ শুনছিলো, কেউ বা নদীর বয়ে যাওয়া দেখছিলো, ডান দিকের জনের পাশে বসে যে ঘাস ছিঁড়ছিলো, সে বলছিলো – একবার গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পথে ডাকাত পড়লো, আর সব্বাই চুপ, ভয়ে কাঁপছে, তিনি কীভাবে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের। সব থেকে ছোট যে আমার পাশে বসা, ওই জিজ্ঞেস করলো প্রথম – আমরা কে কী দিয়েছিলাম তাঁকে? প্রথমজন – আমি বেড়াতে নিয়ে গেছিলাম তাকে দিল্লী, আগ্রা, মথুরা,বৃন্দাবন। বাকিরা হাসলো তাতে। দ্বিতীয়, সে টাকা দিতো মাসে, হাজার টাকা। মনে হোলো কেউ তার কথায় কান দিলো না। আমার পাশের জন বলে উঠলো, আমি কিছু দিইনি। নিয়েছি অনেক। বাকিরা স্তম্ভিত, আমিও চুপ। বাক ও তো কখনো রুদ্ধ থাকাও প্রয়োজন হয়। বাতাসের বেগ বাড়লো। আগুন আরো তীব্রতায় মেতে উঠেছে। এ আগুনও তো এক খেলা। অনিয়ন্ত্রিত, রুদ্ধশ্বাস- যেখানে শুরু আছে শেষ নেই।
আকাশে কখন মেঘ করে এলো খেয়াল নেই। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রথম টিপটিপ পরে ঝমঝম। আর পালাচ্ছে সবাই, যারা ছিলো। আর আমি হাসছি একা, শোক গোপন করে। আর দেখি তিনি উঠে আসছেন ঐ অগ্নিকুণ্ড থেকে একা।
আর প্রবল বিস্ময়ে বাকিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ফিনিক্স পাখীর মত তিনি উঠে আসছেন। মা। আমাদের মাতৃভাষা। জল, মাটি, সবুজ এ তৃণ প্রান্তরকে স্পর্শ করে তিনি উঠে আসছেন। তার দৃষ্টিতে মায়া, চুল এলোকেশী, তিনি এগিয়ে আসছেন ধীর অথচ গভীর প্রত্যয় নিয়ে। এইবার এসে হাত ধরবেন আমাদের আর নিয়ে যাবেন ভূবনডাঙার মাঠে। ওখানেই তো জ্যোৎস্নায় চুল শুকোতে শুকোতে তিনি শুনিয়েছিলেন কোনো এক ত্রিভূবন বিজয়েরর গল্প। মায়া, প্রেম বা অলৌকিকে এভাবেই নির্মাণ হয় ইতিহাস। যা ‘একুশ’ করতে পেরেছিলো।
এবার ঐহিক ‘শ্রী চরনেষু মা’কে’, একুশের কথায় স্মরণ করবে সন্ত্রাস, অন্তর্ঘাত, ট্যাঙ্কার, মিলিটারির বুটের নীচ থেকে মাথা তুলে উঠে আসা এক হার না মানা সংগ্রামকে, যা আমাদের রক্তে মাতন ধরিয়ে জন্ম দিয়েছিলো এক স্পর্ধিত অহংকারের। আমাদের শ্রদ্ধা আবদুস সালাম, আবুল বরকত, ন’বছরের অয়িউল্লাহ সহ সব ভাষা শহীদদের।
ভীতু বেড়াল ছানার মত এ বাঙালী জীবন ওই একবার অন্তত চোখে চোখ, নখে নখ, পাঞ্জায় পাঞ্জা রেখে আমাদের পৌঁছে দিয়েছিলো স্যারিডন নয় স্বর্গে, গড়ে তুলেছিলো বাঙালী জাতি সত্ত্বার প্রথম পাহাড়। মাউন্ট এভারেস্ট এর থেকেও সেই উঁচু শৃঙ্গে বসে আজ বেহালা বাজানোর দিন। আমার মাতৃভাষার অপরূপ ভায়োলিন সুর ছড়িয়ে পড়ুক বহু দূর দূরান্ত পেরিয়ে কোনো এক আফ্রিকান উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামের পথেও। সন্তান কোলে নিয়ে হেঁটে চলা কোনো এক কালো মেয়ে, তার সার্বভৌমত্বও যেন বেঁচে থাকে তার মাতৃভাষায়।
‘দুষমণ এর উখিতে তোর এক পুত্র দিলো প্রাণ
আজ তোরে মা বলে ডাকে হাজারো সন্তান’।
কে বলে তুই সন্তান হারা?’
এবার ঐহিক মাতৃ তর্পণে...
কাঁটাতার পেরিয়ে কী জাদু বাংলা ভাষা গান হয়ে মিলাক আকাশে।