লিখালিখি

অমিতাভ প্রহরাজ


লিখতে শুরু করেছিলাম হারিয়ে যাওয়া ভাষা নিয়ে। নাঃ, এটার জন্য নয়, আমার কাজের জন্য কয়েক মাস আগে আমি পড়ছিলাম হিয়েরোগ্লিফিক (হিয়েরোগ্লিফিককে হিয়েরোগ্লিফিক্স বলা হবে কেন এই নিয়েও তুমুল বিতর্ক আছে) ভাষা নিয়ে। কাকাবাবু বা মিশর রহস্য দেখার সুফল নয়, তারও আগে থেকে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতো, হিয়েরোগ্লিফিক তো ছবিমূলক ভাষা, স্ক্রিপ্‌ট নেই, তবে তার উচ্চারণ কি করে হয়, কি অনুসারে? মৌমাছি আঁকা থাকলে কি মৌমাছির আওয়াজ+, তাহলে সূর্য আঁকা থাকলে কিসের আওয়াজ? যদি সেই আওয়াজ ফিক্সডই থাকে তার মানে হিয়েরোগ্লিফিক আগে মৌখিক ভাষা রূপে তৈরী হয়েছে। তারওপর, হলিউডের ইজিপ্ট ভিত্তিক সিনেমা “স্টারগেট” বা ব্রেন্ডান ফ্রেজারের “মামি-এক, দুই” ইত্যাদিতে যে ফারাও রাণিদের কলকল করে কথা বলতে শুনি, বা অতদূর যাওয়ার দরকার নেই। এই আমরা প্রায় সক্কলেই জানি মিশরীয় সূর্য দেবতার নাম “রা”। সেটা কোথথেকে এলো??? মানে সূর্যদেব বোধক যে গ্লিফ (গ্লিফ মানে বর্ণমালার পরিবর্তে যে ছবি ব্যবহৃত হয়) সেটার উচ্চারণ যে “রা” সেটা কোন বর্ণমালায়, কিভাবে লেখা আছে?। এই ধাঁধার সমাধানে নামতে গিয়ে প্রথমেই যা আবিষ্কার করলাম তা বিষ্ফোরক। সেটি হচ্ছে হিয়েরোগ্লিফিক এমন একটি বর্ণমালা যাতে ভাওয়েল নেই। অর্থাৎ আন্দাজে সঠিকই ভেবেছিলাম আমি, হিয়েরোগ্লিফিক উচ্চারণযোগ্য ভাষা নয়। তাহলে গ্রীকের মধ্যে যে অনেক ইজিপশিয়ান শব্দ দেখা যায় উচ্চারণযোগ্য, তাদের আবির্ভাব কোথথেকে? আসলে এর উত্তর লুকিয়ে আছে হিয়েরোগ্লিফিক ভাষার ইতিহাসে আর কাঠামোয়।
আশ্চর্য যে একটি ভাষার উৎপত্তি উচ্চারণঅযোগ্য জায়গা থেকে। তিন ধাপের এই ভাষার উৎপত্তি। ওল্ড ইজিপশিয়ান, যার মধ্যে আছে আর্কাইক পিরিয়ড (I & II Dynasty, 3100-2680 BC) এবং ওল্ড কিংডম (III-IV Dynasties, 2680-2176 BC) ছিল উচ্চারণ অযোগ্য পিওর হিয়েরোগ্লিফিক। মিডল কিংডম (XII Dynasty, 1991-1786 BC) থেকে আবির্ভাব হয় হিয়েরোগ্লিফিকের কার্সিভ ভার্সান অর্থাৎ আঁকা বাঁকা রেখা দিয়ে লেখার মতো ভার্সান হিয়েরাটিক (Hieratic)। তারপরেও উচ্চারণের আভাস পাওয়া যায় New Kingdom (XVIII-XX Dynasties, 1575-1087) এবং Third Intermediate Period (XXI-XXIV Dynasties, 1087-715) থেকে যাকে নিউ বা লেট ইজিপশিয়ানও বলা হয়। ইজিপশিয়ান উচ্চারণ উদ্ধার করতে সবচেয়ে সাহায্য করে Amenhotep-III এবং Akhenaton এর ডিপ্লোম্যাটিক আর্কাইভ যা Amarna তে পাওয়া যায়। কিন্তু মজার কথা ওই ডকুমেন্টগুলি ছিল আক্কাডিয়ান ভাষায় (Akkadian) ইজিপশিয়ানে নয়। আক্কাডিয়ান ছিল রাজভাষা (অনেকটা আমাদের দেবভাষা সংস্কৃতের মতো) যার ছেলে ব্যাবিলোনিয়ান আর আসিরিয়ান (সেই আসিরিয়ান যার কিউনিফর্ম নামক একটি লিখন পদ্ধতি ছিল)। মহাপুরুষ স্যার এ্যালান গার্ডিনারের ইজিপশিয়ান গ্রামারেও যে ভাষার সাহায্য নেওয়া হয়েছে তা আক্কাডিয়ান। এই আক্কাডিয়ান ভাষার দুটি কথ্য রূপ লেট ইজিপশিয়ান ভাষায় দেখা যায়। একটা ডেমোটিক (Demotic 715 BC-470AD) আর কপটিক (Coptic 400 AD-1600AD), প্রাচীন গ্রীকে যে ইজিপশিয়ান শব্দগুলি নেওয়া সেগুলি সম্ভবতঃ ডেমোটিক থেকে ( গ্রীক, ডেমোটিকস- জনপ্রিয়)। ডেমোটিকের নিজস্ব স্ক্রিপ্ট ছিল। শেষ হিয়েরোগ্লিফিক স্ক্রিপ্ট দেখা যায় ফিলা তে 394 AD, ঠিক যখন খ্রীস্টান রোমান সম্রাট থিওডোসিয়াস-১ হুকুম জারি করছেন সমস্ত প্যাগান মন্দির (অর্থাৎ মূর্তিপূজা করে যারা) বন্ধ করতে হবে। এই মহাধর্মসঙ্কটে ইজিপশিয়ানরা খ্রীস্টানিটি গ্রহণ করে, এবং ডেমোটিক ভাষাটিও লোপ পায়। তখন তারা প্রাচীন গ্রীক আলফাবেট গ্রহণ করে তার সঙ্গে সাতটি ডেমোটিক বর্ণ ঢুকিয়ে। অর্থাৎ কিঞ্চিত মীশরীয়তা রেখে। ফলে লেট ইজিপশিয়ানে যে ভাষাটি আমরা পাই, যেহেতু তা প্রাচীন গ্রীক থেকে অধিকাংশই নেওয়া, তার “কমপ্লিট ভোক্যালাইজেশান” সম্ভব হয়, এবং তার নাম হয় কপটিক। "Coptic," from the Arabic term for Egyptian Christians, the Copts, al-Qubt. (or Qibt.). মজাটা হয়, তার বর্ণমালা রূপটি তখনো থেকে যায় হিয়েরোগ্লিফিক… যেমন…

এটি হওয়ার কথা H.wtk3pth. (house of the soul of Ptah), Ptah ছিলেন প্যাট্রন গড মেমফিসের। মেমফিসের রিপ্রেজেন্টেশান ছিল Mnnfr, যার অর্থ enduring beauty. Hwtk3pth বা Mnnfr কোনটাই উচ্চারণযোগ্য নয়। কিন্তু কপটিক অনুযায়ী আগের ছবিটার উচ্চারণ দাঁড়িইয়ে যায় “মেমফিস”। অর্থাৎ এই কাকাবাবুর এই হিয়েরোগ্লিফিকের অর্থ নিষ্কাশন বা “পাঠ” এবং ব্রেন্ডান ফ্রেজিয়ারের এই মামির ডায়লগ, কোনটাই ইজিপশিয়ান নয়, এই কপটিক ভাষার পাঠ মাত্র (তাও সত্যি ধরলে)। যদিও কপটিক কথ্য ভাষা হিসেবে সপ্তদশ শতকে মৃত। তবুও এখনো ৬% মিশরীয় যারা কপটিক চার্চের অন্তর্গত তাদের চার্চ ল্যাংগুয়েজ এই কপটিক।

যদিও একথা অনস্বীকার্য যে Jean Francois Champollion কপটিক শিখেছিলেন এই ভেবে যে প্রবাদপ্রতিম রসেটা স্টোনে যে হিয়েরোগ্লিফিক আছে তা কপটিক ভাষাতেই লেখা। এবং এই কিঞ্চিৎ ভুল ভাবনার ফলেই হিয়েরোগ্লিফিকের উদ্ধার সম্ভব হয়…
(এতটা লিখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অনেক কিছু মাথায় ছিল। এখনো বহু কিছু লেখার আছে, ইডিওগ্রাম, অর্থাৎ ছবিতে কনসেপ্ট প্রকাশ। কনসেপ্টগুলি ছবিতে কি করে যুক্ত হলো। কি করে ভাষাটি ফর্ম করলো। ইত্যাদি। হঠাৎ দেখি সামনে ফারাও আমেনহোটেপ-১ এবং তাঁর মামি, দুজনেই দাঁড়িয়ে। কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে। শুনেছিলুম বটে হিয়েরোগ্লিফিক চর্চার নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটে, কিন্তু সে তো পণ্ডিতদের সাথে। প্রথমে সহজ ভাবনাটাই ভাবলুম যে স্বপ্ন দেখছি। ফারাও এর জোড়া পায়ের লাথ খেয়ে সেই সহজ এসকেপ রুটটি চূর্ণ বিচূর্ণ হলো। ফলাফলে যা হলো কথোপকথন। নিখাদ বাংলাতেই
আমেনহোটেপ- কি নিয়ে লিখছিস
আমি- ৯, মানে লি, বিশ্বাস করুন তমালদা বলেছিল
আমেনহোটেপ- ৯ কি জিনিস জানিস? ৯ আর ৯ এর প্রয়োগ একই?? বাঞ্চোত, ভাষা আর ভাষাপ্রয়োগ একই??
আমি- না, কক্ষনো একই না, আমি নিজে প্রবন্ধ লিখেছি এই নিয়ে (উল্লসিত)
আমেনহোটেপ- (এক থাবড়া) প্রবন্ধ লিখেছি!!! পণ্ডিত প্রাবন্ধিক এলেন!!!! (আর এক থাবড়া) তোর সামনে কি দাঁড়িয়ে আছে?
আমি- আপনি আর আপনার মামি... মানে মাম্মম্ম... মানে সুরক্ষিত মৃতদেহ...
আমেনহোটেপ- (রামথাবড়া)
আমি- মাচ্ছেন কেন (ক্রন্দনরত প্রায়)
আমেনহোটেপ- তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৯ আর ৯ এর প্রয়োগ, বুঝলি বোকাচোদা??
আমি- বুঝলাম, হ্যাঁ... তাইতো বটে
আমেনহোটেপ- তো ৯ নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাদেরকে টানলি কেন??? তোর নিজের ৯ নেই??? ৯ এর প্রয়োগ নেই??? প্রতিটা মানুষের ৯ আছে আর ৯ এর প্রয়োগ আছে... নিজের ৯ নিয়ে লিখতে পারিস না বা ৯খতে পারিস না??? ৯ প্রয়োগ নিয়ে??? স্মৃতি আছে কি জন্য???? নাকি আমাদের নিয়ে লেখা নিজের পণ্ডিতি দেখানোর জন্য???

ব্যাস, এটা শোনা মাত্র আমার ওই যে বলে না, তেরেকেটেধিন হয়ে গেল মাথায়। আর আমি আবার লিখতে শুরু করলাম।
এই যে ব্র্যাকেটের মাঝের অংশটুকু এটা সমস্ত লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর লেখা। মানে সবার শেষে এটাকে মাঝে ঢুকিয়েছি)

প্রথম অধ্যায়-
আমার খুব আগে, খুবই আগে। D Sector Primary School এ পড়ি। Section C। আর যে বাসে যাই, বাস নঃ-৫। আমি উঠি জয়দেব এভিনিউ থেকে, ভারতী মার্কেট থেকে লিলি রুদ্র, অমিত আর রেশমীও ওঠে। আরেকটা ভূটানি মেয়ে ওঠে তানসেন মার্কেট থেকে। প্রসেনজিৎ বলেছিল বলে তাকে “ভুটিয়া, ভুটিয়া” বলে ডেকেছিলাম আর স্টাফ রুমে বলে দিয়েছিল। ইন্‌চার্জ মিস মানে মিলতী মিস স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ করে দিয়েছিল। যে কারনে এ কথা বলা , সেকশান সি তে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল জয়দীপ নন্দি। সেকশান এ তে সায়ন, ঘোষাল জেঠুর ছেলে, সেও বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল কিন্তু অতটা নয়। জয়দীপ ছিল বেস্ট বেস্ট ফ্রেন্ড। সেকশান এ তে অনির্বান বসুর অনেকগুলো বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। জয়দীপ একবার ক্লাস মনিটর ছিল। আমি ভূটিয়া, ভূটিয়া বলে জোরে চেঁচিয়েছিলাম। ভূটিয়া কমপ্লেন লিখেছিল কমপ্লেন খাতায়। কিন্তু জয়দীপ ওর কমপ্লেন রিপোর্টের ওপরে কাটাকুটি করে এমন করেছিল যেন স্কেচ করা আছে। পরের পিরিয়ডে বড় কৃষ্ণা মিস মনিটর খাতায় আঁকার জন্য জয়দীপকে স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ করে দিয়েছিল। আমার কিছুই হয়নি। কিন্তু আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, কেঁদেওছিলাম, যদি জয়দীপ আমাকে ব্যাড ফ্রেন্ড করে দেয়। ক্লাসে কাঁদছি দেখে বড় কৃষ্ণা মিস আমাকেও স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ করে দিয়েছিল। তখন কি মজা!! জয়দীপের পাশে আমিও স্ট্যান্ড আপ হয়ে গেছি। জয়দীপ কানে কানে বলেছিল তখন আমি ওর বেস্ট বেস্ট বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর আর কোন বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলনা ক্লাসে আমি ছাড়া । তবু আমাকে বেস্ট বেস্ট বেস্ট, তিনটে বেস্ট ফ্রেন্ড করেছিল। জয়দীপই আমাকে বলেছিল, বেস্ট বেস্ট বেস্ট বেস্ট বেস্ট বেস্ট, অনেক বেস্ট ফ্রেন্ড ও নাকি হয়। ওর বেস্ট বেস্ট বেস্ট বেস্ট বেস্ট, অনেক বেস্ট ফ্রেন্ড নাকি আছে, ক্লাশে নেই, ঘরে আছে। তার কথা খুব সিক্রেট। জয়দীপ পরে আমাকে বলবে বলেছিল, লিখে লিখে। আমার খুব স্যাড হয়েছিল শুনে। জয়দীপকে ছোট টিফিনে বলেওছিলাম, আমার অনেকটা স্যাড হয়েছে। তাতে জয়দীপ বলেছিল, স্কুলে ওর থ্রি বেস্ট ফ্রেন্ড শুধু আমি। আমাদের আবার বুড়ো আঙুলে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে “happy, happy, go go, ভাব ভাব” হয়ে গেছিল। সিক্রেট কেমন করে হয় জয়দীপ বলেছিল শিখিয়ে দেবে। সিক্রেট না হলে বড়দের মতো হয় না। জয়দীপের একটা এক্সট্রা কপি ছিল। আমারও একটা এক্সট্রা কপি ছিল। আমি জয়দীপকে সেটা দিয়েছিলাম। জয়দীপ খুব ভালো মলাট করতে পারতো। ও দুটো কপি মলাট করে একসাথে করেছিল। আমি নাম দিয়েছিলাম “Best best best অমনিবাস copy”। আসলে আমার যত ফেভারিট বুক ছিল তাতে কোন অমনিবাস ছিলনা, কিন্তু মা পড়তো, বড়দের বই এ অমনিবাস ছিল। শরৎচন্দ্র অমনিবাস, শঙ্কর অমনিবাস। জয়দীপ বলেছিল এটা আমাদের সিক্রেট কপি। এতে শুধু আমরা লিখব। এতে মার্কিং হবেনা, good, bad হবেনা। একদিন আমি, পরের দিন ও লিখবে।

দ্বিতীয় অধ্যায়-
ফের ঘুরে এলাম সাইকেল নিয়ে। D. Sector Primary School। এই বিল্ডিং এখন ইউথ কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার (গভঃ এ্যাফিঃ)। এভাবেই মানুষ বড় হয় সকলের কাজে লাগে।
আমাদের খাতা বড় হয়েছিল। যারা লেখে তাদের অন্য নাম নিতে হয়, ছদ্মনাম। জয়দীপ নাম নিয়েছিল ডালটন। ওর ডাকনাম। কি ভালো!! আর আমার ডাকনাম বাবাই। সে তো বাবাই এর নামও বাবাই। আমি নাম নিলাম ইন্দ্রনাথ। ওই খাতায় লেখা হবে ডিটেকটিভ অমনিবাস। যেহেতু আমাদের অমনিবাস পড়তে দেওয়া হয়না, অমনিবাস বড়দের, আমরা ঠিক করলাম অমনিবাসই লিখবো প্রথমে। অমনিবাসে উপন্যাস থাকে, আমিও জানি, জয়দীপও জানে। তাই আমিই নাম দিয়ে শুরু করলাম “তিনমূর্ত্তির এ্যাডভেঞ্চার”। তিনজন গোয়েন্দা। অজিত, কমল, অনীশ। অজিত হীরো, পাইপ খায় আর চিরকূট, কাগজের টুকরো, পোড়া সিগারেট দেখেই ধরে ফ্যালে কোথায় গেলে স্মাগলার পাওয়া যাবে। অনীশ কম বয়স, দারুন ক্যারাটে জানে। আর কমল চুপচাপ থাকে, খুব কম কথা বলে, বিপদের সময় শেষ মুহূর্তে ওর চেহারা বদলে যায়; জাস্ট তাকিয়ে হিপনোটাইজ করে দিতে পারে বা অনীশও জানেনা এমন কায়দায় ক্যারাটে মারে শেষ মুহূর্তে। অজিত লীডার, তবু স্মাগলারদের দিকে ও যখন দু হাতে পিস্তল নিয়ে ঠাঁই ঠাঁই করে দিচ্ছে, তখন কমল মুচকি হেসে, সিগারেট ধরিয়ে, নানচাকু বের করে একহাতে ঘুরিয়ে পেছন থেকে আসা দুটো গুলি আটকে দেয়।
তো এই ছিল তিনমূর্ত্তি। জয়দীপ বললো আমরাতো দুজন, তিনজন হয়ে কি করে লিখবো? আমি বললাম, “কেন তুই, আমি আর ইন্দ্রনাথ। আমি আর ইন্দ্রনাথ same same নয় কিন্তু।” তারপর একদিন আমি আর পরের দিন জয়দীপ লেখে। জয়দীপ কি ভালো লেখে!! ও লিখে আনলে সেটা পড়তে কি ভালো লাগে! আচ্ছা, আমারটা পড়তে জয়দীপের কেমন লাগে? নিশ্চয়ই ভাল্লাগেনা ওরটার পরে। তবুও জয়দীপ বলে দারুণ লিখেছি। মিথ্যে কথা না তো? ও তিনসত্যি করেছে, মাকালী করেছে। তবু কেমন লাগে আমার। ওর লেখা পার্টগুলো অনেক অনেক ভালো আমার লেখা পার্টগুলোর থেকে। তবু কেন জয়দীপ বলে আমারটা ভালো লাগে? হ্যাঁ, ওই যে সিক্রেট, জয়দীপের best, best, best, best, best, best, অনেকটা best friend, সেই অনেকটা best friend জয়দীপের বোধহয় আমি। আমিও কারোর best, best, best, best, best, অনেকটা best friend, এটা ভেবে কি দারুন লাগে! আমি বড় হলে অনেকজনের best, best, best, অনেকটা best friend হবো।
আমি ৫ নং বাসে যেতাম। ফেরার সময় ৫ নম্বর নয়তো ৪ নম্বর বাসেও আসতাম কোন কোন সময়। ৪ নম্বর বাসে এলে নামতাম চিত্রালয় সিনেমার কাছে। তারপর আমি, লিলি রুদ্র আর রবীন্দ্রনাথ হেঁটে হেঁটে ফিরতাম। তখন ক্লাস ফোর হয়ে গেছে। বাসস্ট্যান্ড থেকে আমি একা একা ফিরি। আগে বাবাই কিংবা ছোক্কা যখন ছিল ছোক্কা, চাঁদামামা যখন ছিল চাঁদামামানিতে আসতো। একবার হঠাৎ রাঙাকাকু নিতে এসেছিল। বিদ্যাপতির রোটারিটা ঘুরতেই দেখি জয়দেব বাসস্ট্যান্ডে রাঙাকাকু!! রাঙাকাকু খুব ব্যস্ত, অনেক দূরে, কলকাতায় নানানা তখন ত্রিপুরায় থাকে। রাঙাকাকু খুব ব্যস্ত কারন রাঙাকাকু প্রফেসর আর খুব ভালো অনেকটা পার্টি করে। বাবাইও পার্টি করে, তবে এতটা পার্টি করে না। আমি জানতামই না রাঙাকাকুর আসার কথা আছে!!! মোড়টা ঘুরতেই যেই দেখেছি রাঙাকাকুর চৌকো কালো ফ্রেমের চশমা, আমি সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিলাম নামবো বলে, ভুলেই গেছি বাসটা থামেনি, “রাঙাকাকু” বলে চীৎকার করে নেমে গেছি, ব্যাস!! রাঙাকাকু আমাকে ফুরো ফিল্ডারের মতো ডাইভ দিয়ে ক্যাচ করেছিল!!! সত্যি সত্যি!!! আরো মজার, আমি তো ভেবেছিলাম বাবাই টেট্রাসাইক্লিন দিয়ে মারবে। খুব ভয়ে ছিলাম। রাঙাকাকু ছিল বলে কিচ্ছু বলেনি। মা বকেছিল খুব, জামা খুলতে খুলতে বলেছিল “বেশী আদিখ্যেতা”। আদিখ্যেতা মানে নাকি শুধু বড়রাই জানে। ও বলাই তো হয়নি, বাবাই এর ছাত্রদের মারবার যে লাঠি, তারই নাম টেট্রাসাইক্লিন। বাপীদাদের ব্যাচের কে একজন লাঠিটার গায়ে লিখে দিয়েছিল “টেট্রাসাইক্লিন”। এটা বড়দের খুব মজার ঘটনা। যদিও আমি কিছুই বুঝিনি। মা, এই গল্পটা বলে খুব হাসতো কেউ এলে। বাবাই ও শব্দ করে হাসতো, আর যে এসেছে, আলোজেঠু, ভালোজেঠু বা বুধজেঠু, ওরাও হাসতো। এরকম এক দিনে মা টেট্রাসাইক্লিনের গল্প বলে খুব হাসছে আর আমিও (বুঝিনা বলে খুব রাগ হয়েছিল) যেন সাঙ্ঘাতিক বুঝেছি, এইভাবে হাসতে হাসতে পেটে খিল দিয়েছিলাম ইচ্ছে করে। মা আমাকে খুব জোরে nonsense বললো। বাবাই খুব জোরে তাকালো। এমনিতে মা বকলে বলতো nonsense আর বাবাই বকলে বলতো senseless। এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে, কি আছে জানতাম না। জানার জন্য কম লোককে জিজ্ঞেস করেছি? বহুদিন বাদে টুয়া বা অপালা, একমাত্র গার্লফ্রেন্ড, সবেধন নীলমণি; আমার, চাটুর, ছোটর, জাম্বোর, সায়নের, সবারই একমাত্র বেস্ট বান্ধবী... টুয়া বলেছিল ডিফারেন্সটা হচ্ছে rough-খাতা আর fair- করার খাতায় rough page গুলোর মধ্যে যেমন, তেমন।

তৃতীয় অধ্যায়-

যে কথায় বসেছিলাম আগে। পারোমিতা পুরকায়স্থ first girl ছিল ক্লাস থ্রীতে, সায়ন second, আর আমি third হয়েছিলাম all section মিলে। মা আর বাবাই দুজনেই বলেছিল এই রেজাল্ট যেন খুবই খারাপ রেজাল্ট বলে ভাবি। নীল পাতলা কার্ডবোর্ডের মার্কশীট, ভাঁজ করা। আজো মনে আছে টোটালটা, 363 out of 400। 363 লাল কালি দিয়ে গোল্লা করে আরো মার্ক দিয়ে লেখা আছে থার্ড। প্রাইজ ডিসট্রিবিউশানে এ থার্ড প্রাইজ নিতে উঠেছিলাম, ব্রোঞ্জের মেডেল আর গেরুয়া কাগজে মোড়া Aesop’s Fable and other folktales। মনে পড়ে শান্তনুর মা, কাকিমা জিজ্ঞেস করেছিলেন “কি রেজাল্ট হয়েছে অমিতাভ?”, আমি প্রথমবার মেডেল পেয়েছি (ওয়ান, টু তে মেডেল ছিলনা) খুব হাসিখুশী বলেছিলাম “থার্ড হয়েছি”। মা খুব বকেছিল “থার্ড হয়েছ বলতে লজ্জা করে না? থার্ড ক্লাস রেজাল্ট একটা।

(এ কিন্তু এমন যেন মনে না হয় বাবা মা র প্রতি ক্ষোভ, ইঁদুর দৌড়, কমপিটিশান এইসব ক্লিশে অভিযোগ নিয়ে মামলা ঠুকছি। এ একটা হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথা বলছি। যখন জানতাম পৃথিবীর সবাই কোয়ার্টারে থাকে। মানুষ তিন প্রকার, আমরা, নন বেঙ্গলী আর বাঙাল। নন বেঙ্গলী ফ্যামিলি পাশের কোয়ার্টারে থাকলে লাইফ নাকি হেল হয়ে যায়। সবাইকেই রোজ রাত্রে পাশের বিশ্বাসজেঠুদের বাড়িতে স্টেটসম্যান দিয়ে এসে তাদের যুগান্তর নিয়ে আসতে হয়। পৃথিবীর সবাই গুলের উনুনে রান্না করে, রান্না হলে তরকারি বাটিতে করে পাশের বাড়িতে দিয়ে আসতে হয়, বিশেষতঃ মাংস হলে আর পৃথিবীর সবাইকেই থার্ড হলে খুব লজ্জ্বায় থাকতে হয়)

কিন্তু অবাক ছিল রূপম, লিলি রুদ্র, অমিত, ভুটিয়া এমন কি জয়দীপ। ওরা কেউ 15th, 16th ছিল, জয়দীপ 5th হয়েছিল। 15th, 16th হলে তবে বাড়িতে কি হয়??!!! ভাবনায় আঁটতোনা। তবে জয়দীপ আমার best, best, best অনেকগুলো best দেওয়া ফ্রেন্ড বলে কি না জানি না, আমার মনে হতো 5th, 6th, 7th হওয়া দারুণ ব্যাপার। 5th হয়েছি বলতেও হেভি স্মার্ট। আমার 5th হওয়ার কথা ভাবাও বারন।
ফোর আর ফাইভ, হাফ ইয়ার্লি এ্যানুয়াল আমার 2nd আর 1st হয়ে কেটেছে। আমাকে তখন আরেক কারনে, অন্য সেকশানে বা লোয়ার ক্লাসে যেতে হয়। কেননা আমি খুব ভালো স্টোরি বলতে পারি মনিটর হয়ে, এ্যাবসেন্ট মিসের ক্লাস থাকে যখন। অনেক অনেকক্ষন হেড ডাউন করে থাকে ক্লাস, আমি আমার বানানো স্টোরি বলি। শুধু আমি আর জয়দীপ নিজেদের স্টোরি। জয়দীপ দারুন বলে নানারকম স্টোরি, ম্যাজিকের স্টোরি। আমি বলি অন্য কান্ট্রিতে বানানো ফেয়ারি টেল অথবা সায়েন্স ফিকশনের স্টোরি। আমরা দুজনেই আনফিনিশড স্টোরি বলি যাতে পরের এ্যাবসেন্ট মিসের ক্লাশে আমাদেরকেই বলতে হয়। একদিন দারুণ হয়েছিল। রূপম ক্লাস মনিটর ছিল, রূপম স্টোরি বলছিল। আমি জয়দীপকে বললাম নতুন গেম, স্টোরির মাঝখানে গো এ্যান্ড স্ট্যাচু খেলে হবে। সারা ক্লাস খেলবে। রূপম স্টোরি বলছে, এবার যে কেউ যদি বলে “রূপম স্ট্যাচু”, রূপম যেখানে বলছিল সেখানেই থেমে যাবে। সেখান থেকে স্টোরিটা বাড়াবো, বলে যাবো আমি। আমাকে স্ট্যাচু বললে আমি থেমে যাবো, জয়দীপ গো হয়ে যাবে, স্টোরি বলে যাবে। এবার কেউ “জয়দীপ স্ট্যাচু” বললেই ওখান থেকে আমি বলে যাবো, আবার “অমিতাভ স্ট্যাচু, জয়দীপ গো” বললেই আবার আবার জয়দীপ...... আমি স্টোরি বলছিলাম, হঠাৎ জয়দীপ বললো “অমিতাভ স্ট্যাচু, আপনারা গো”.........*

*(বড়রা আপনি বলে, আপনারা বলে। তাই আমি আর জয়দীপ মাঝে মাঝে আপনি আপনারা বলতাম, খেলার মধ্যেও। দারুণ লাগতো)

শেষ না হওয়ার কথা-
একটা প্রশ্ন ধাঁই করে উঠে আসবে কি হলো?? মানে এতক্ষন কি হলো। আসলে কিছুই নয়, হারিয়ে যাওয়া ভাষা অলৌকিক ভাবে বেঁচে থাকে আমাদের ভেতরে, এটা লেখার সেই প্রাণক্ষমতা। ওই অজিত কমল অনীশের উপন্যাসের ভাষা, ক্লাসে স্টোরি বলার ভাষা এগুলো হারিয়ে গেছে লি এর মতো। তখনো কিন্তু সেই ভাষাটী, যার অদ্ভূত ইনোসেন্স আর সেন্স অফ ডেপিকশান, ভাষা হয়ে ছিল না। ছিল ভাষাপ্রয়োগ হয়ে। আমরা ভাষা আর ভাষাপ্রয়োগকে বড্ড গুলিয়ে ফেলি। ওই ভাষাটি হউতো উচ্চারণযোগ্য ছিল না কিন্তু তাতেই আমি বা জয়দীপ কথা বলেছি, স্টোরি বলেছি ক্লাসে। অজিত কমল অনীশ লিখেছি। ধীরে ধীরে তথ্য, তথ্য বিষ্ফোরণ ঢুকেছে মাথায়, ঢুকেছে স্বতন্ত্র হওয়ার এ্যানিম্যাল ইনস্টিংক্ট, মেধাকে নানা রকম ভাবে উচ্চ প্রজেকশানের তাগিদ আর ওই অনুচ্চার্য কিন্তু মজ্জাবাহিত ভাষাটি লোপ পেয়ে গেছে, বরং আমরা উঠেপড়ে লেগেছি “নিজস্ব ভাষা” সন্ধানে! আর নানা পারমুটেশান কম্বিনেশন কনসেপচুয়ালাইজেশান করে সরে গেছি ওই মূল আমাদের হিয়েরোগ্লিফিক থেকে। যা দিয়ে খাতার পাতায় নানারকম আঁকিবুঁকিতেই কম্যুনিকেশান চলতো চালু ক্লাসে।
কিন্তু অলৌকিক ভাবে সেই ভাষা বেঁচে থাকে। আজ আমেনহোটেপ-১ এর মারদাঙ্গা খেয়ে যখন ফিরে গেলাম (বলা ভালো যেতে চাইলাম) সেই ভাষাতে, ফীল করতে পারলাম সেই আশ্চর্য নিভৃত স্রোতটিকে। “জ্ঞান নয়, জ্ঞান নয় হে সুন্দর”, বরং একটা ঘটনা বলি
তিনমূর্ত্তির এ্যাডভেঞ্চারে দ্বিতীয় অভিযানে অজিত, কমল, অনীশ গেছিল তিব্বতে। আর প্রথম অভিযানে গেছিল মিশর। ওখানে অজিতকে যখন বন্দি করা হয়, রাতের বেলা অজিত পিরামিডের ভেতর থেকে জিভ দিয়ে টাকরায় টক টাক টক আওয়াজ করে সঙ্কেত পাঠিয়েছিল বাইরে থাকা অনীশকে। যেটা স্মাগলাররা ভেবেছিল গিরগিটি ডাকছে। আর জায়গাটা বোঝার জন্য বুট দিয়ে পাথরের গায়ে আঁকিবুঁকি করে গেছিলো, সুইচ টিপলেই ওর বুট থেকে একটা স্টীলের ডগা বেরিয়ে আসে।
এবার এখন পড়তে গিয়ে দেখলাম, আদি হিয়েরোগ্লিফিক, কপটিক বা হিয়েরাটিক আসার বহু আগে লেখা বা আঁকা হতো যে ফান্ডায় তা হলো। একটি আঁকা এক্সপ্রেসান হলো ইডিওগ্রাম (ideogram) যার মধ্যে দুটো ভাগে ভাগ করা থাকতো আঁকা টা। একটা অংশ হচ্ছে পিক্টোগ্রাম (pictogram), যা ছবি দিয়ে একটা ধরণ বোঝাতো। আর আরেকটা অংশ হচ্ছে ফোনোগ্রাম (phonogram) যা ছবি দিয়ে এর করেস্পন্ডিং ধ্বনিকে বোঝাতো।একটা ছবি বোঝাতো ধ্বনি, একটা ছবি বোঝাতো বস্তুটি, দুটো একসাথে করে যে ছবিটি হতো তাই বোঝাতো মূল ধারণাটি। উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধে হবে

 এটি একটি পিক্টোগ্রাম যা ভগবানকে রেফার করে

 এটি একটি ফোনোগ্রাম যা “র” জাতীয় ধ্বনি (কিন্তু জিভটিকে তালুর দিকে ঠেলে কম্পন সহকারে হাওয়া বের করলে যে ধরণের প্যালিয়েটিভ সাউন্ড হয়। ওল্ড ইজিপশিয়ান সমস্ত ধ্বনিই প্রায় আমাদের ফোনোলজি অন্তর্গত ধ্বনির বাইরে। যেমন এই “র”, নাক দিয়ে করা “ম”, জিভ দিয়ে তালুতে করা টিক টাক টো, ওই অজিত যেভাবে অনীশকে সঙ্কেত পাঠাচ্ছিলো)

 এটি দুটি মিলিত ফোনোগ্রাম যার উচ্চারন ওই র এর মতো তার সাথে সামান্য ওই তালুতে জিভ দিয়ে করা “টা” এর চাখনা

 সব মিলিয়ে এটি হলো ‘র’ আর সেই ‘টা’ এর চাখনা সঙ্গে ভগবান। অর্থাৎ সূর্যদেব বা হিয়েরোগ্লিফিকে RiT9। যাকে কপটিকে করে নেওয়া হয়েছে রা।

এবার দেখুন একটা ধ্বনি সঙ্কেত আর একটা দৃশ্য সঙ্কেত একসাথে জুড়ে একটা ধারণা সঙ্কেতের ছবি বা গ্লিফ (glyph) তৈরী করে। আর অজিত কিভাবে সঙ্কেত পাঠিয়েছিল অনীশকে ভেতর থেকে?? অলৌকিক না????? তখন ক্লাস ফোর আমরা, মিশর মানে পিরামিড, নাকভাঙা স্ফিংক্স, তুতেনখামেন, ক্লিওপেট্রা এর বেশী একটি অক্ষরও জানা নেই... কিভাবে সেই ৩০০০ বিসির হিয়েরোগ্লিফিকের কনসেপ্ট নিশ্চুপে, নীরবে ভেতরে ঢুকে চলছিল... ফারাও এর থাবড়া খেয়ে নিজেই বের করলাম... আর পেলাম অনেক কিছু... লাইফের একটা বেহদ খুবসুরত লি-ফেজ... সত্যিই অলৌকিক...