একটা বোকার ডাইরী

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়


একটা কালো রঙের ইঞ্জিন হারিয়ে গেছে । টিনের চালের কোয়ার্টারও। পুরানো আমগাছটাও। রেললাইন, কয়লাগাদা সব মুছে গেছে । কাঠপুল ,নিমতলা, রামলীলা , মাটির মিষ্টি আরমা , বাবা, দিদি এরাও তো। হারিয়ে যাওয়া বুঝি সবার কাজ । লুকোচুরি খেলতে যারা টুকি করত তারাও হারিয়ে গেল । বউ বলছে কিছুই গুছিয়ে রাখতে পারো না , জায়গার জিনিস জায়গায় রাখো না তাই হারিয়ে যায় । কতো কষ্টে বাঁধানো ইন্দ্রজাল কমিকসগুলো হারিয়ে গেলো ।নুনকাদাকে দিয়েছিলাম । সে বলল যেবিয়ে করে কোথায় যে সব ওলোট পালোট হয়ে গেছে । যেন মনে হচ্ছে
বউ এর বুকের খাঁজে রেখেছিল । শ্লা , এক নম্বর হারামি মাইরি , মাল ঝেঁপে দিয়েছে । আর বলে কি না হারিয়ে
গেছে ।
কাঁচা বয়েসে ডায়নার কাঁচুলিতে কতোবার ঠোঁট .... সে সময় আজকের মতো এতোকিছু জানতাম না। এ মার্কা
ফ্লিম দেখা নিষেধের তালিকায় । টেলিভিশন নেই। যুগান্তর এ পড়তাম জেমস্ বন্ড 007 কার্টুন আর আনন্দবাজারে ম্যানড্রেক আর অরণ্যদেব । আমাদের এ মার্কা ছবি । মেয়েদের জামার পেছনে আকর্ষণীয় আকারের আকর কিছু একটা আছে বেশ অনুভব করতাম । কো এডে পড়বার সময় সেই অনুভবটাই হারিয়ে
গেলো ।
জালের ভেতর ইন্দ্রের যাদু পি সি সরকার ফেল টানছে বালক বয়স । এটাই ইন্দ্রজাল । অরণ্যদেব আর ডায়না ভিজে পোশাকে গড়াগড়ি দিচ্ছে সোনার বালিতে আর তাদের জন্য তৈরী হনিমুন কুটীর । ওই কুটিরের ভেতর কি হলো সেই নিয়ে শরীরে যাদু । উঁকি মারলেই ধরা পড়ে যাবো । জানলার বাইরে পড়ে থাকা কনডোমকে তখন বেলুন ভাবতাম । অরণ্য দেবের ঢিসুম ঢাসুমের থেকে এই প্রেম বেশ রস দিত আর খরচও
হতো প্রচুর ।
ম্যানড্রেক , লোথার, অরণ্যদেব , মজবুড়ো নিয়ে বেশ ছিল সেই পিগমি দিন। আজকের মতো পিরানহা সব
মাংস অনুভব কেটে নিয়ে হাড় বাঁচিয়ে ফেলে রেখে যায় নি। সুজয়দা মেসে কিনে এনেছে ইন্দ্রজাল কমিকস আর আমি কেড়ে নিয়ে শেষ করে ফেলে বাইরে কাগজওয়ালাকে বলছি অমর চিত্রকথা দিতে । আমার কমিকস দাদার
বন্ধু নিয়েছে , পড়েছে আর আমিও মুদিদোকানে না গিয়ে মেসে ঢুকে কমিকস গিলছি । কমিকসের ব্যাপারে আমরা সমবয়সী । তারপর এলো ফ্ল্যাশ গরগর্ডন আর আনন্দমেলা নেওয়া মানেই টিনটিন পড়ার সুযোগ । কমিকস হারিয়ে গেছে বলে কমেডি ওআর আমার ভেতর বিষাদ সঙ্গীত আর ছবিতে গল্প পড়তে পারে না শুধু দেখে আর কার্টুন হয়ে যায় কুরকুরে চিবুতে চিবুতে । আজও বইমেলায় চোখ নন্টে ফন্টে ,বাঁটুল , হাঁদাভোঁদা পায় কিন্তু ইন্দ্রজাল .....
কমিকস নয়। ছোটবেলার কমেডি । আজকের ট্রাজিক আর ট্রাপিজের খেলায় যার কোনো জায়গা নেই। হীরোর পিঠে একটা লং ড্রাইভের স্বপ্ন আর পাশ দিয়ে ছুটে আসছে ডেভিল , কুকুর নয়, নেকড়ে । খুলি পাহাড়ের কাছাকাছি এসে সেই স্বপ্নে ক্র্যাশ । একটা গাছবাড়িতে কিম্বা জানাডুতে নার্দার পাশে শুয়ে আছি । কোমরের বেল্টে চাপ দিয়ে মহাকাশে উড়ছি ফ্ল্যাশ গর্ডনের মতো । ডাক্তার স্পন্ডিলাইটিসের ব্যথার জন্য কোমরে বেল্ট পরিয়ে দিয়েছে । অনেক শীতল
হাত আর উড়ন্ত চাকী থেকে নামা এলিয়েনরা আমাদের একা করে দিচ্ছে । হারিয়ে যাচ্ছে । হেরে যাচ্ছি । হাওয়ায় হাড়ের ভাঙা শব্দরা আর কুয়াশার পিছনে আমার ইন্দ্রজাল কমিকসের পাতা ....... বোকা বোকা কতগুলো শব্দ দিয়ে কেমন বোকা বানালাম তোমাদের । এখন এই ফেসবুকের ইন্দ্রজাল আমাদের কেমন কাঠঠোকরা করে
দিয়েছে । কাঠ কাঠ লেখা , রস নেই , কষ গড়িয়ে নামছে ঠোঁটের পাশ থেকে । ছেলে বড় হতে চলল । মজবুড়োর মতো পুরনো লাইব্রেরী পাহারা দিচ্ছি । মঙ্গলগ্রহে চলে গেল ভারতের ইসরো । ইস্!


আমরা আর কোয়ার্টারে থাকি না । একটা ঘুপচি ঘর যেখানে দশভাইদু বোন জ্যাঠা জ্যাঠিমা বাবা মা কাকা নিয়ে থাকতাম খাটে মাটিতেবারান্দায় । এখন পাকা বাড়ি নিজেদের । ফ্ল্যাট নিজের । সব পেয়েছির আসর করতে করতে সব পেয়েছির দেশে । কিন্তু সেইইন্দ্রজালটাই তো নেই । মাড়ভাতে চুমুক দিয়ে চট আরটিনের বাক্স বাজিয়ে স্কুল যাওয়া আর রাতের বেলা টিনেরচালে আম পড়লে ভূত বলে মাকে জড়িয়ে ধরা । সকালেকয়লা গাদা পেরিয়ে পিছন মাঠে পৌঁছানো স্কুলের পাঁচিলটপকে । আয়নার সামনে যাত্রা দেখে এসে অ্যাক্টো করেছি ।পাড়ার নেড়িকুত্তা ডেভিলের মাথায় হাত দিয়ে নিজেকেঅরণ্যদেব ভেবেছি । নিমতলার পিছনে যে জঙ্গল সেখানেজন্মানো কুকুরের বাচ্চাগুলো বুকে তুলে নিয়ে এসেগা পরিস্কার করার জন্যে বাড়ির চৌবাচ্চায় ডুবিয়ে দিতাম ।লোমের জল ঝাড়তে ঝাড়তে দু দিন বাদে সে যে টেঁসেযাবে সেটার মতো বুদ্ধি ছিল না। ম্যানড্রেকের যাদু কাজদিত না।
না ম্যানড্রেকের যাদু ফিরিয়ে দিতে পারছে না সেই ছোটবেলার রক্তে জড়ানো একটা কাঠপুলকে । কাঠের সিঁড়িগুলোর
পাশে সাইকেল তোলার ঢাল । লোহার রেলিঙে ভর করে ঝুঁকে দেখতাম কালো ধোঁয়া ছাড়া ইঞ্জনের সঙ্গে জুড়ে
দেওয়া পাইপ বাহিত মালগাড়িগুলোকে। মালগাড়ির পকেটে কার্ড থাকত । সেগুলো নিয়ে আমরা খেলতাম ।
দুটো ভ্যাকুয়মের উপর ভর করে ফ্ল্যাশ গর্ডন হয়ে যেতাম ।আমার মরা খরগোশটা ছুঁড়ে দিয়ে এসেছিলাম মালগাড়িতে ।
দুঃখকে ছুঁড়ে দেওয়ার আনন্দ । কাঠপুলটাও যাদু করেভ্যানিশ করে দিল ম্যানড্রেক । আমাকে জানাডুতে নিয়ে
যাবে কথা দিয়েছিল । কিন্তু কেউই কথা রাখে নি।
শ্শ্মানের সঙ্গে পরিচয়ের পর হাঁটতে হাঁটতে এই কটা বছরে কখন যে খুলিগুহায় পৌঁছে গিয়েছি কে জানে । খুলিপাহাড়
পেরিয়ে খুলিগুহা । অসংখ্য মৃত মানুষের মাথা আমাকে হারিয়ে যাওয়া অ্যান্টেনার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথম
টিভির সাথে বাড়ির মাথায় অ্যান্টেনা উঠেছিল । বাতাসে ঘুরে গেলে অ্যান্টেনা দেখতে ছাদে যেতে হতো আর
ছাদ থেকে কতো দর্শন ,দূরদর্শনও হেরে যায় – জিটি রোডের গাড়ি পরে, মারামারি ,প্রেম, আদুল গায়ে চানযেন ডায়না পামারের বেলাভূমি থেকে বিকিনি পরে উঠে আসা সবই দেখে সেই বয়স থেকে চোখের দোষআর চশমা চারচোখে ক্রমশ হোজো হলাম জানি না।বাদলদা ম্যাজিক জানত কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মাদারিরখেলোয়াড়দের মতো নয় কিম্বা দশদিন একই জায়গায়সাইকেল চালানো ছেলেটির মতো নয়। বাদলদার ইন্দ্রজালদেখতে যেতাম যে হলটাতে সেই হলটাও ভ্যানিশ আরসেখানে এখন অনেক চলমান অশরীরী , খুলিগুহারসামনে ঘাপটি মেরে পিগমী আর বিষমাখানো তীর ।পিরানহা মাছেরা ওঁত পেতে আমার মাংস খুবলে খেতে ।গুলিডান্ডা , কাচের গুলি , লাট্টু লেত্তি, কারখানার
বলবেয়ারিং দিয়ে তৈরী করা কাঠের গাড়ি ,রামলীলা ,পুতুল নাচ ,নন্দন কানন কলাভবন সবই ভ্যানিশ করে দিলে বাদলদা ! এমনকি কান্নাটাও