কল্পমায়া,চতুর্থ পর্ব

নীলাদ্রি বাগচী


মফস্বলের ঐশ্বর্য তার গলি। তার প্রকাশ ও সঙ্কট দুইই সর্ব অর্থে গলিতে। গলি, তস্য গলি, তস্য তস্য গলি তন্নতন্নে মফস্বল তার সমস্ত রহস্য খুলে দেয় অনুসন্ধানীর কাছে। সব রহস্যের শেষ আসলে অপার রহস্য। সরু, এলোমেলো গঠনের এবড়ো খেবড়ো গলির গায়ে সার দিয়ে সাজানো বেখাপ্পা ও রকমদারি বসতবাড়ির ঠাসাঠাসি। মাঝে মধ্যে ঝোপ, নিচু জমি, বিদ্যুতের পোল এই মিলিয়ে যে সমাধান তা আসলে অসমাধান- ই। কেননা বাঁকের পরবর্তী বীক্ষণ হয়তো সব ছবি বদলে দেবে। হটাৎ দেখা যাবে ধানক্ষেতের কোলে গলি ফুরিয়ে গিয়েছে। বা গলি এসে কালভারটের হাত ধরে বড় রাস্তায় মিশেছে। গলি অপার, অসম্ভব। আজও আমি আপ্লুত আমার মফস্বলি গলিতে।

সেই আজব বয়সে আমার সঙ্গী হারকিউলিস সাইকেল, হারকিউলিস না এটলাস এখন ঠিক মনে নেই, যা হোক, তাকে নিয়ে যে বিকেলগুলো লাইব্রেরি যেতাম না, পাক খেতে বেড়িয়ে পরতাম। এই পাক খাওয়ার কি উদ্দেশ্য ছিল আমি জানি না বা এখন মনে নেই, যতদূর মনে পড়ে কোনও উদ্দেশ্য না থাকাটাই উদ্দেশ্য ছিল আর গলি আমাকে পাগলের মতো টানত। হাইড্রেনের পাশ দিয়ে বাঁক নেয়া অসমান ও ভাঙাচোরা গলির রাস্তায় বিপদজনক ঝাঁকুনি খেত সাইকেল। হয়তো তত বিপদজনক নয়, কিন্তু শৈশবে তাকে মনে হত অসীম বিপদজনক। আর বিপদের আনন্দ দুর্নিবার। যার বিপদের নেশা সে স্বস্তিকে পরোয়াই করে না। তাই বিপদই টানত। এক আধদিন পড়ে যাওয়া গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। হাঁটুর নীচে কাটা বা অল্প গোড়ালি ফুলে থাকা ছিল নিত্যকার। সন্ধের মুখে মুখে বাড়িতে ঢুকে জামা ছাড়া কি পা ধোয়ার সময় মা ঠাকুরঘরে উচু স্বরে পড়া শুরু করত-
দোল পূর্ণিমার নিশি, নির্মল আকাশ
ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস
লক্ষ্মী দেবী বামে করি বসি নারায়ণ
করিতেছে নানা কথা সুখে আলাপন...

প্রতি বৃহস্পতিবারই অবন্তী নগরীর গল্প পাঁচালীর আট ছয়ে বাঁধা পড়ে কানে আসত। আর মাথায় তখন গলি, তস্য গলি, ঘন মফস্বল। তার ছবি যদি পাখির চোখে দেখা যায় তবে সবটাই সবুজ। এত গাছ, এত নানান রকমের গাছ তার শরীরের সর্বত্র। তবু সে শহর। গলির শহর। আমার সে বয়সের রাজধানী, গলি মফস্বল। বড় রাস্তা (নামেই বড়, আসলে সেটাও গলি, আমার গলির থেকে মেরেকেটে পনের হাত বেশী চওড়া) থেকে এক গলিতে ঢুকে আর এক তস্য গলিতে ছিল খেলনা টিন সিমেন্টের রাজপ্রাসাদ আমার। একটা পাড়া ছিল সেটা। মফস্বল গলিকে পাড়ার অহংকারে সুন্দর সুন্দর নাম দিয়েছিল। কখনও সেই নাম বসবাসকারী জনজাতিকে বোঝাতে, কখনও তাদের পেশাকে বোঝাতে, কখনও নিছক পৃথক করার জন্য ব্যবহৃত হত। সে বয়সে পাড়া ছিল অহংকারের শেষ কথা। স্কুলে যে কোনও ঝামেলায়, আররে আমি না ওই পাড়ার... যথেষ্ট ছিল চমকে দিতে। কেননা পাড়ার কুখ্যাতিই তখন আমার শক্তি। আমার পাড়া যদিও মোটাদাগে ভদ্রশ্রেণীর নিরীহ পল্লী কিন্তু তার সংলগ্ন বাজার আর বাজারের অন্ধিসন্ধি মানে গলি এ পাড়াকে যথেষ্ট বদনাম করেছিল।

তবে সপ্তাহ তো শুধু বৃহস্পতিবার নয়। আরও ছটা দিন আছে। তেমনই এক দিন। কালবৈশাখী বলবো না প্রাক মরশুমি বৃষ্টিপাত বলবো জানি না। কিন্তু সন্ধে থেকেই আকাশ সেজে উঠছে। আসলে সাজ শুরু হয়েছে শেষ বিকেলে। ঘোলা অন্ধকারের আদরে ঘন কালো মেঘের ভিড়ে। সাজ যখন সম্পূর্ণ আর সে যখন অহরহ বিদ্যুতে প্রকাশ করছে নিজেকে যে দেখ, এই আমার রূপ, আমার সম্পদ, আমার রহস্য; ঠিক সেই সময়ে বাতাস ওঠে, ঝলসানো মেঘের দ্যুতিকে যেন সে লাবণ্যর ছোঁয়া দেয়। ছোটো জানালার ছোটো পর্দা সেই লাবণ্যের টানে অস্থির হয়ে ওঠে। ক্রমান্বয়ে সে নিজেকে মেলে ধরতে থাকে শূন্যে, আরও শূন্যে। যেন এই যে স্প্রিঙের তুচ্ছ বন্ধন, একে ছিঁড়ে ফেলতে পারলেই তার মুক্তি, অসীমে মুক্তি। সেও এই ঘনঘোর রাতে বাতাসের লাবণ্যে ইলোপ করতে পারে, সেই লাবণ্যেই নিজেকে বিলীন করে দিতে। আর যথা নিয়মে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। আসলে এই বাতাসে যে কোনও জায়গায় বিদ্যুতের তার লাবণ্যের টানে নেমে আসতে পারে পথে, আর সামান্য ধারাপাতেই সেই পথ হয়ে উঠবে মৃত্যুফাঁদ, এ এক ভয়। নয়তো কোনও প্রৌঢ় বৃক্ষ এই তীব্র লাবণ্যের কৌতুকে অস্থির হয়ে মুচড়ে পড়ে যায় বিদ্যুৎ তারে আর বিদ্যুৎ সংযোগের ইতি হয়ে যায়।

ঘরে কেঁপে কেঁপে জ্বলে সামান্য লণ্ঠন। সেই সামান্য আলোক পড়াশুনোর অনুপযোগী বলে আমার ছুটি হয়ে যায়। আমি বাইরের ঘরের দরজা খুলে বসে পড়ি। সামনের বাড়ি, আশের বাড়ি, পাশের বাড়ির ফাঁক দিয়ে যতটা আকাশ তাকে দেখব বলে। আকাশ দেখারও কোনও কারন নেই, একমাত্র আকাশকে দেখাই তার কারন। আসলে না জানা লাবণ্যের টানই হয়তো বসিয়ে দেয় বাইরের ঘরে, চেয়ারে। প্রায় সারাদিনই এই ঘর বাবার ছাত্রদের দখলে থাকে, সন্ধের পর থেকে খালি হলেও এ ঘরে আমার খুব যাতায়াত নেই, তাই এই ঘরে এই দুটো কাঠের টেবিল আর গোটা পাঁচ ছয় চেয়ারের গায়ে লাগা বইয়ের আলমারি- এই বিন্যাস চেনা হয়েও অচেনা। আর ওই আকাশও। এক অন্ধকারে বসে অন্য অন্ধকারকে অনুভব করতে থাকি আমি স্খলিত বিদ্যুতের সূত্র ধরে আর তার ঈষৎ পরের গগনবিদারী ধ্বনি রোমাঞ্চ জাগায় শরীরে আর কাঠের চেয়ারে শক্ত কাঠ হয়ে বসে থাকি আমি।
ক্রমশ...