‘নয়া’ দেশের পট,দ্বিতীয় পর্ব

প্রসেনজিৎ দত্ত


দিন যায় কথা থাকে, সময় যায় ফাঁকে ফাঁকে...। আবেগ সামলে খাঁদু চিত্রকরের ঘরে। মনচাষা খাঁদু পটুয়া জাতে চিত্রকর, আবার কথাকারও। কথকতায় তিনি আঁকেন কথাশিল্প। শিল্পধর্মে বিশ্বাসী মানুষটি বললেন, ‘আমার মানে লাগেনি ভিক্ষে চাইতে। কেনই বা লাগবে? মাধুকরী না পেলি তো ভাত নাই! খাবার জুটত না। বাপের সাথি সক্কালে বেরুতাম। বাটী-বাটী যেতুম। যা জুটত, সংসার চলত...’। ‘মাধুকরী হও নয়নমোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি...’। চোখ স্থির। ধরা গলা। আর, নীরব শ্রোতা। প্রসঙ্গ ধরতেই প্রশ্ন,
— পট আঁকছেন কবে থেকে?
— মায়ের পেটে থাকতেই।
— জন্ম কবে?
— ষাট সালে।
— পট আঁকেন কেন?
উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন, ‘জল খান কেন?’
জলের মতো সহজ কথাগুলো। কিন্তু সমুদ্রের মতো গভীর। এরপর? আপন খেয়ালেই গেয়ে উঠলেন, ‘দাঁড়িয়া মাছের বিয়া দিতে যাব রে রঙিলা/কাতলামাছ বলে তোমায়, কাঁধে নয়ে যাব রে রঙিলা...’।
— আপনার লেখা?
— হঁ।
— মাছের বিয়ে দেবেন?
উত্তরে হাসি!
শিল্পীকে বোঝা কি অতই সহজ? প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই হেঁয়ালির আওতায় রয়েছি! ছাইপাশ ভাবনায় অবলার মুখে বল জোগালো খাঁদুদাই। ‘জানো, আমার বয়স যখন তিরিশ, ঝাড়গ্রামে একটা মেলাতে গেছিলাম!’ মেলাটির আহ্বায়ক ছিল ‘রং মাটি মানুষ’ আর্ট স্কুল। ওই বছরই তাঁকে বর্ধমান জোনের ডিসি হ্যান্ডিক্যাপ সংস্থা থেকে পাঠানো হয় হরিয়ানায়, সূরজকুণ্ড মেলায়। এতদিনে মাধুকরী ছিল চাল-ডাল-আধুলি। বদলে মাধুকরী হল হাজার তিন। বাড়ি ফিরলেন নব্বই টাকা দিয়ে একটা কম্বল কিনে। মুখশুদ্ধিপর্ব বোধহয় একেই বলে! তবুও আপশোস! অনেক পটুয়াই আজ পটশিল্প থেকে সরে গেছেন। ঘরে-ঘরে টিভি এসেছে। ওখানেই তো সব দেখায়। কত অনুষ্ঠান। কত চ্যানেল। পটের গান শোনার সময় কই এখন! পট লোকপুরাণের কাহিনি গায়, বিবিধ দেবদেবীর মহিমার কথাও গায়। কিন্তু ফুরসত কই মানুষের? ‘হিঁদু হোক বা মুসলিম হোক, ধম্মকথা না শুনলি কার বা কি এসে যাবা!’ পটের গান কেউ শোনে না ডিসকো গানের এই দুনিয়া!



খাঁদু পটুয়া

তবুও অকাল গেল সুকাল এল। খাঁদুদার কাজ মুগ্ধ করেছে অনেককেই। কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে যুক্ত দিল্লির একটি সংস্থার সঙ্গে। মাননীয়া জয়া জেটলি ওই সংস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তাঁর তত্ত্বাবধানে দিল্লিতে সুযোগ এল। নয়ার পট পাড়ি দিল রাজধানীতে। খাঁদুদা সঙ্গে নিয়েছিলেন আরও অনেককেই। আত্মপ্রচার নয়, চেয়েছিলেন এই শিল্পটির প্রচার। চেয়েছিলেন শখ আর পেশা এক হোক পটুয়াদের। বাধা পেয়েছেন। কিন্তু নুইয়ে পড়েননি। তবে এখন দিন পালটেছে। অত বাধা-বারণ নেই এখন। দেখাদেখি মেয়েরাও আজ ছবি আঁকে। গান গায়। ‘যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে...’। বিয়ের গান। সাঁওতালদের কাছ থেকে শিখে এসেছেন মাজিপট। মাজিপট অর্থাৎ জন্মকাহিনির আখর কথা। পিলচুবুরি-পিলচোহারা নামে হাঁস-হাঁসির গান। ‘পিন্দারে পলাশের বন পালাবি পালাবি মন/ন্যাংটা ইন্দুরে ঢোল কাটে/বতরে পিরিতের ফুল ফুটে...’।
একটি সাঁওতাল পট। সংগ্রহ : খাঁদু চিত্রকরের পরিবার থেকে
পিরিতের ফুলে জন্মও হল নতুন পটের। আঁকা আছে মায়াবি জগৎ। জগতে যা কিছু আছে, আছে তাঁর অনুষঙ্গে। পট। যার আটপৌরে চলন আবারও ফিনিক্স। সুনামি হলে তিনি গান গান। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হলে তাঁর চোখ চিকচিক করে শব্দ সেলাই করে। নিজের পড়াশোনো চতুর্থ অবধি। কিন্তু নিরক্ষরতার অভিশাপের আঁচ ফেলতে চান না পরবর্তী প্রজন্মের উপর। সমাজের সংশোধন তাঁর সাধ্যি নয়, সে কথা বোঝেন। তবু কি চুপ থাকা যায়? চুপ থাকেনওনি। পণপ্রথা, নেশাবর্জন এই সব নিয়েও সরব হয়েছে তাঁর কণ্ঠ। শিশুকল্যাণ নিয়েও তিনি সমান দরদি। এইভাবে বেঁচে আছেন খাঁদু চিত্রকর, প্রাণ আর গান এক করে। ‘দম আছে যতদিন, গাইব। হাত যতদিন না কাঁপবে, আঁকব।’ বিধাতা শুনেছেন। এত অভাবের মধ্যেও জেলায় জেলায় ঘুরেছেন। কখনও সংস্থার ডাকে। কখনও নিজে নিজেই। ২০০১ সালে পূর্বক্ষেত্র সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘বোলপুর সৃজনী’র ডাকে বোলপুরে পসরা সাজিয়েছেন কখনও। আবার কখনও ইন্দিরা গান্ধি রাষ্ট্রীয় মানব সংগ্রহালয়ের তত্ত্বাবধানে ভোপালে নিয়ে গেছেন পট। বর্ধমান ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়েও গেছেন বেশ কয়েকবার। ২০০২ সালে গিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৪ সালে ‘বঙ্গীয় সংগীত পরিষদ’-এর ডাক পেয়েছিলেন। সরকারি ডাকে হাজারিবাগ গিয়েছিলেন ২০০৬ সালে। ২০১০ ‘কথাকলা সংস্থা’র আয়োজনে দিল্লি চলো। খাঁদুদা আজও চলেছেন পট শিল্পের প্রচারে। শিল্পের অছিলা বাঁধনে বেঁধেছেন অন্য পটুয়াদেরও। স্বপ্ন দেখেন বিদেশ ছোঁয়ার। ‘এইখানেতে প্রভুর কথা সমাপ্ত যে হল/একবাটি চাল দিয়ে হরি হরি বল।’ গান থেমে থাকবে না কোনওদিনও। জান আছে, তাই গান আছে। প্রতিকূল কখনও শিল্পকে হত্যা করতে পারেনি।
ঘোর লাগা রেশ তখনও ছিল। খাঁদুদার ছেলে বাপি চিত্রকরও চাটাইয়ে বসল আমাদের সঙ্গে। জানতে পারলাম গ্রামটির বয়স আনুমানিক ষাট বছর। এর আগে শূন্যভূমিই ছিল। বেদুইন পটুয়ারা একে একে এসে বাস শুরু করলেন পশ্চিম মেদনিপুরের পিংলা থানার নয়ায়।...

(ক্রমশ)

ছবি : লেখক