ছ’ইয়ারী গল্প,চতুর্থ পর্ব

অলোকপর্ণা

গদের আঠার কৌটোটা শ্যামলী এগিয়ে দেয় মায়ের দিকে। কৌটোর গায়ে আঠা জমতে জমতে কৌটোটাই আঠা হয়ে যাচ্ছে বা আঠাই কৌটো, এইসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতে শ্যামলী ছ্যাড় ছ্যাড় করে খবরের কাগজ ছিঁড়তে থাকে, অভ্যস বশত প্রতিটা টুকরো নিখুঁত ভাবে ছেঁড়া হয়ে গেলে সে আঠা দিয়ে “যুবক খুন”- এর সাথে “ভারতের বিশ্বকাপ জয়”কে সপাটে লাগিয়ে দেয়, ঠোঙার কাগজের টুকরোয় বিরোধী পক্ষের মুখপাত্রকে জড়িয়ে বসে পড়েন শাসক দলের সভাপতি। শ্রীমতী ছায়ারানী বিশ্বাস এতসব বোঝেননা। তবে কোথাও নিজের নাম লেখা থাকলে চটপট ধরে ফেলতে পারেন। শ্যামলী তার মা’কে ওটুকু চিনিয়ে দিয়েছে।

“আইজকাল নাদুডা আর আয় না ক্যান!”
শ্যামলী জবাব দেয় না।
“অরে দ্যাখলে কইস তো, মায় খবর দিসে”
শ্যামলী গুণগুণ করে ওঠে, সে জানে নাদুদা কেন আসছে না আর। গেল রোববার মেঝোপুকুর থেকে ভেজা গামছা গায়ে উঠে আসতে আসতেই শ্যামলী দেখেছিল নাদুদা আসছে আপনমনে।
“কই চল্লে নাদুদা?”
“টেশান”
“এই দুপরে!”
মুখ তুলে শ্যামলীকে কিছুক্ষণ দেখতে পায়নি নাদু। শ্যামলীর চাপকা চাপকা গোল দুটো বুকে তার নজর আটকে গেছিল। খেয়াল হতে “কাজ আসে” বলে পালিয়েছিল সে।

শ্যামলী হিহি করে হেসে উঠতে ছায়ারানী বলেন, “চুনপেচি একখান, ভর সন্ধেয় হাইসতাসে দ্যাহ! কাইজডা সার জলদি!”
বেচারা নাদুদা। কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে শ্যামলীর কষ্ট হয়, কিন্তু আগ্রহ জাগে না, রোববার স্নান সেরে ঘরে ফিরে সে ভেবেছিল, আজ যদি নাদুদার জায়গায় বিরিঞ্চিবাবা থাকতেন! ইস, কেন এমন হয় না! ফাল্গুন পূর্নিমায় বাবার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে সে প্রার্থনা করবে, একটি বার যেন স্নান সেরে ফেরার সময় মেঝোপুকুরের পথে বাবার দেখা পায় সে।
গুণগুণ করে ওঠে শ্যামলী, বেচারা নাদুদা, তার কষ্ট হয়, নাদুদার বউটা নিমাই।

বেচারা আশুতোষ, তার দাড়ি নেই।
বেচারা আবদুল, তার গোঁফ নেই।
বেচারা বিবেকানন্দ, তার না আছে দাড়ি, না আছে গোঁফ।
এইসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতে শ্যামলীর মন খারাপ গুণগুণ করে, সেই সুরে বাইরে জোনাকিরা জ্বলে যায়, জোনাকিরা নিভে ওঠে।




বাগানের মাঝখানে একটা টুল পেতে রোদে বসে আছেন রবিকান্ত রায়। তার গায়ে জড়িয়ে রাখা হয়েছে একটা নামাবলী। হাতের কাছে গামছা না পাওয়ায় এই ব্যবস্থা। একহাতে একটা আয়না নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখছেন তিনি। পিছনে দাঁড়িয়ে তাঁর চুল ছাটছে চার নম্বর। চুল ছাটা হলে দাড়ি ছাটানো শুরু। রবিকান্ত দাড়ি কামান না। কামিয়ে দেখেছেন, তাঁকে হুবহু বিশ্বর মত দেখায়, শুধু গোঁফ রাখলেও বিশ্ব, শুধু দাড়ি রাখলেও বিশ্ব, দাড়ি বাড়ালেও অবধারিত ভাবে তাঁকে বিশ্বর মতই দেখাবে বলে তিনি দাড়ি ছাটেন। চার নম্বর এই দাড়ি ছাটার কাজে অসম্ভব পটু। তেমনই দু নম্বর বাগানের কাজে, তিন নম্বর বাঁশি বাজানো, ছয় নম্বর বাজার করা আর এক নম্বর ধুনো দিতে ওস্তাদ। পাঁচ নম্বরের কেরামতি অন্যরকম। তার কাছে মনের কথা বলতে শুরু করলে, কখনো কখনো শুধু পাশে বসে থাকলেই দুম করে মন খারাপ হয়ে যাবে। তবে এদের একটা অদ্ভুত মিল আছে, এরা কেউই কোনো কথা বলে না। অথচ এদের কাজকর্ম সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। এই ছজন মিলেই রবিকান্ত রায়ের বাড়ি সামাল দিয়ে রাখে, সামাল দিয়ে এসেছে রবিকান্তের জন্ম ইস্তক।

চুল দাড়ি ছাটা হলে চার নম্বর রবি রায়ের গা থেকে নামাবলী খুলে ঝেড়ে নিয়ে নিজের গলায় জড়ায়। তারপর রবি রায়ের মুখের খুব কাছে মুখ এনে খুব মন দিয়ে দেখে নেয়, তার মুখে তখন হাসি ফুটে ওঠে। এরপর রবিকান্ত স্নানে গেলে সে শিস দিতে দিতে বাগানের এককোনে গাছের ছায়ায় গিয়ে শোয়। ঠিক তখনই একটা ফড়িং গঁ গঁ করতে করতে তার নাকে এসে বসে পড়ে।
“ওই চারক্ষর!”
“উম...”
“ওঠ মাল”
চার নম্বর চোখ খুলে দেখে ফড়িংটা দুহাত ঘষছে তার নাকে বসে।
“হুম?”
“বিরিঞ্চি মেরে দিল তো রে...”
“হুম!?”
“আরে তোর সুন্টুমুন্টু সোমাকে রে, বিরিঞ্চিটা প্রতিদিন আসছে”
“!!! উম”
“তুমি ছেড়ো এখানে বসে, আরো চুয়ান্ন বার শোবে নাকি!”
চার নম্বর ধড়মড় করে উঠে বসল, “উঁউঁউঁ!!!!”
“কি উঁউঁ... তোমার সোমাও কম যায় না, সেদিন দেখলাম, একদম ঠেসে ধরেছে স্লা ঐখানে”
চার নম্বর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে, নামাবলী দিয়ে কপালের ঘাম মোছে।
“আরে, শান্ত হ’, শান্ত হ’, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে, বুইলি...”
ঘাসের ওপর ধপ করে বসে পড়ে চার নম্বর।
ফড়িংটা এসে বসে তার কাঁধে, “রান্নাঘরের দক্ষিণের জানালার নীচে যে তাক আছে...”
“উম?”
“তার বাঁদিকের কোণায় দেখবি একটা ছুড়ি, আরে রবিকান্তের বউ যেটা পেটে ঢোকাল সেই বন্যার বছর,”
“হুম...?”
“আরে যেটা তুই স্লা নিজের হাতে মেঝো পুকুর থেকে রক্ত টক্ত সাফ করে রবিকে ফেরত দিলি, সেইটা”
“হুম।”
“সেটা নিবি, নিয়ে আজ সন্ধ্যেবেলা বাগানে লুকিয়ে থাকবি। বিশ্ব এলে রবিকান্ত ব্যস্ত হয়ে গেলেই ঠাকুর ঘরে ঢুকে মেরে দিয়ে আসবি, বুইলি?”
“উম?”
“কাকে আবার, বিরিঞ্চিকে, সে তোর ইচ্ছে হলে সোমাকেও মারতে পারিস। চাপ নেই।”
“হুম...”
“ঠিকাচে?”
চার নম্বর মাথা নাড়ে।
“চলি রে চারক্ষর”, ফড়িংটা হঠাৎই উড়ে উড়ে যেন সুর্যের দিকে চলে যায়, সেদিকে তাকিয়ে থাকায় চার নম্বরের চোখে ধাঁধাঁ লেগে আসে।