‘মন খারাপ হলে লাট্টুর মত পাক খেতে খেতে ফিরে আসে ফাঁকা মাঠ’

তপতী বাগচী


সম্পাদক মশাই একটা হারিয়ে যাবার গল্পকথা লিখতে বলেছিলেন…নিরুদ্দিষ্ট ের কথা । মুহূর্তে মুহূর্তে কত কিই যে হারাচ্ছি ।ঢুকে যাচ্ছি সময়ের পরবর্ত্তি প্রকোষ্ঠে।আর একটুও না থেমে অন্ধকার খাদে গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে আমাদের যাপিত জীবন…আমাদের বিন্দু বিন্দু বেঁচে থাকা…আমাদের পাওয়া আর হারিয়ে ফেলা গুলো।
আসলে তো এই পাওয়াগুলোকে না হারালে ঠিক চেনা যায়না…।তবু তাদের সবগুলোই কি নিরুদ্দেশ ? আসেনা কাছে…যখন ইচ্ছে হয়? অথবা যখন প্রবল অনিচ্ছে ? প্রবল মনখারাপ ? সময়ের কপিকল ঘুরিয়ে স্মৃতিজল থেকে যদি তুলে আনতে চাই তাকে !জানি অতটাও সহজ নয়।তবু হয়তো সে আসে।আমার সমস্ত ধূসর ঢেকে দিয়ে বিরল দিনে এখনো তার লুকোচুরি খেলা…আমার সাথেই।
একটুকরো শৈশবভূমি। আকাশের নীল রঙে আর সবুজের নানা টানে এঁকে ফেলা যেত তাকে। শহর থেকে নিয়ে গিয়ে একদিন মাঝরাতে চা-বাগানের ট্রাক যেখানে পৌঁছে দিয়েছিল আমাদের।আমরা ভাইবোনেরা সবাই তখন সফরের ক্লান্তিতে একেবারে নেতিয়ে পড়েছি।লন্ঠনের মিটমিটে আলোয় একটা আধো অন্ধকার ভুতুড়ে ঘরে সবাই মিলে ঢুকেছিলাম ।সেটা চা বাগানের গেস্টহাউস। অনেকদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে ছিল। সাদা রঙের কাঠের রেলিং ঘেরা একখানা ছোট্টো বারান্দা বাইরে। ততোধিক ছোটো একখানা ভেতরের দিকে। ঘর বলতে একখানাই। আর তাতে একটিমাত্র চৌকি।এককোণে বাথরুম। এখানেই ঘরের গল্প শেষ ।সেই চৌকিতেই কোনোমতে বিছানা করে মা শুইয়ে দিয়েছিল আমাদের।
সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি আমাদের চারদিকে কি এক অন্য পৃথিবী।বারান্দার এক চিলতে ঘেরা জায়গায় মা কাঠের উনুন ধরাতে নাস্তানাবুদ হচ্ছিলেন ।মার মুখ প্রচন্ড ভারী।দু’চোখ ধোঁয়ায় লাল, জলে ভরা।দু’গাল ফুলিয়ে ফুঁ দিয়ে দিয়েও কাঠে ঠিকমত আগুন ধরছিলনা।আমরা কিন্তু মহাখুশী,মহা উত্তেজিত আমাদের নতুন দুনিয়াকে পেয়ে।তাকে চারদিক থেকে প্রাণ ভরে দেখে নিচ্ছিলাম।রীতিমত হৈ চৈ শুরু হয়ে গিয়েছিল। শোন শোন এদিকে দেখবি আয় !…সব গাছগুলো কিরকম স-মা-ন…কি করে হল রে ! ওর ওপর দিয়ে হাঁটা যাবে ? ওদিকে ওটা নীল নীল কি বলতো ? মেঘ ? এম্মা!তুই পাহাড় চিনিস না ? ওটা তো পাহাড়! বারান্দায় আসতেই দেখি সামনে মস্তবড় এক সবুজ মাঠ। তারই এক কোণায় আমাদের গেস্টহাউসটা একলা দাঁড়িয়ে ।পেছনে বড়সড় খাদ। পরে দেখেছি সেখানে টি-ওয়েস্ট ফেলা হত। তার পেছনে টানা বিছানো চা পাতার সবুজ কচি পাতারা দিগন্ত পেরিয়ে চলে গিয়েছে যার মাঝে মাঝে ছায়াগাছগুলো দাঁড়িয়ে।দু’চোখ দিয়ে সেই সবুজ যেন শুষে নিচ্ছিলাম।
সামনে মাঠ পেরোলে কারখানার শেড উঁচু তার দিয়ে ঘেরা । তার ভেতর থেকে আসছে জেনারেটর চলার ভট ভট শব্দের সাথে মিলে মিশে থাকা নানান রকম যান্ত্রিক আওয়াজ।বাতাসে কাঁচা চা পাতার গন্ধ। মাঠের মাঝখান দিয়ে একটা সরু পায়ে চলা পথ সিঁথির মতো জেগে আছে। অবাক হয়ে দেখছিলাম পাতা তুলুনী মেয়েরা বাগানে পাতা তুলে যাচ্ছে…দুটি পাতা একটি কুঁড়িতে তাদের দু’হাতের মুঠো ভরে গেলেই ছুঁড়ে দিচ্ছে মাথার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া পিঠের ঝোলায় । মধ্যমা আর বুড়ো আঙুলের ব্যবহারে দ্রুত পাতা তোলার সেই কায়দা পরে বাগানে ঢুকে অনেক দিন চেষ্টা করেছি।

‘এ মা!তুমিতো খড়ির উনান ধরাইতেই জাননা !’ আমি আগন্তুককে দু চোখ পাকিয়ে বলি ,তুমি জানো ? -‘হ্যাঁ---!দাঁড়াও, আমি আসতেছি।’ বোঁ করে ছেলেটা বেরিয়ে গেল। মিনিট দশেকের মধ্যেই আবার উপস্থিত ।এবার সঙ্গে মুশকিল-আসান ঝোলা । ‘সরো সরো কাকীমা…।’ সঙ্গে আনা চটের থলের থেকে বেরোলো কাগজের ঠোঙ্গা।তার ভেতর থেকে দুমুঠো ছাই ঢালা হল কাঠের টুকরোর ওপর,সেটার ওপর আবার খানিকটা কেরোসিন ঢালা হল শিশি থেকে।যেটা ওই থলে থেকেই বেরোলো।আরো বেরোলো কতগুলো শুকনো বাঁশের বাতা ।অদ্ভুত তো ! সেসব দিয়ে ছেলেটা দিব্যি কায়দা করে ধরিয়ে ফেলল উনুন টা…জানা গেল তার নাম মাণিক। রাস্তা পেরিয়ে যেখানে স্টাফ কোয়ার্টারগুলো এক সারিতে দাঁড়িয়ে তার বাসাও সেখানেই। সে কিছুক্ষণ পরে আবার বয়ে এনেছিল কিছু শুকনো কাঠ আর নিজেদের সব্জীবাগান থেকে তুলে আনা টাটকা সব্জীভরা থলে।‘এই নাও কাকীমা, আজকে এইগুলা দিয়াই চালাও।’ পরে দেখেছি এসব ওখানে চলত। বাসাসংলগ্ন জমিতেই সবাই শাক-সব্জী ফলাত।আর নিজের বাগানের সব্জী সবাইকে বিলি করে ভারী আহ্লাদ পেত। আহ্লাদের স্বাদ ছিল আরো অনেক রকম। সকাল সকাল পাড়া টহল দিতে এসে রাঙ্গাদিদা হয়তো দেখেগেলেন আমার মা ডাল বাটছেন।বড়ি দেয়া হবে। বাসায় ফিরে মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন, ‘যা তো বুলা!বৌটা অত গুলান বড়ি একা একা দিয়া উঠতে পারবে না।’

ঐ গেস্টহাউসের এক পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে বাসরাস্তা। সাড়ে তিনটের বাঁশী (সাইরেন)শুনে সেই রাস্তা ধরে ছুটতে ছুটতে কারখানার গেটের ভেতর ঢুকে যেত মদেশিয়া আর নেপালী মেয়ে পুরুষরা।তাদের মাথার সঙ্গে ঝোলানো ঝোলা গুলোর পেট তখন চা-পাতায় ভর্তি হয়ে গোল হয়ে থাকত।ঝোলাগুলো ওজন করা হবে।সেই ওজনের পরিমাপ লেখা চিরকুট হাতে নিয়ে ওরা সারি দিয়ে খর্চা মানে মজুরী তুলবে । সেই রাস্তায় কখনো ম্যানেজারের আয়া বিশাল অ্যালসেশিয়ান কুকুর নিয়ে হেঁটে যেত।বা কখনো পেরাম্বুলেটরে বাচ্চা নিয়ে মেমসাহেবেরা।
আমাদের বন্ধু জুটতে খুব বেশী দেরী হয়নি।বিকেলে আমরা খেলতাম অনেক দল হয়ে। চি-বুড়ি, দাঁড়িয়া বাঁধা, হাডুডু, কখনো রুমাল চোর। আমি একেবারে কাঁচা খেলুড়ে,কেউ খেলা নিতেই চাইতনা।দুধ-ভাত করে রেখে দিত।দিদির বেশ কদর ছিল তীরের মত ছুটতে পারত বলে। ছেলেগুলো বল খেলত বাতাবিলেবু দিয়ে। অনেক সময় আমরা মেয়েরাও সেটাতে লাথি কষাতাম। সন্ধেবেলায় বন্ধুরা সবাই যে যার বাড়ি চলে যেত ।মাথার ওপর দিয়ে টিয়ার ঝাঁক ফিরত ট্যাঁ ট্যাঁ করতে করতে।গরুমোষ চরিয়ে নিয়ে ফিরতো রাখাল ছেলেরা । গরু মোষের গলায় ঝোলানো ধাতব ঘন্টার গায়ে ভেতরের কাঠের দন্ড দুলে দুলে আঘাত করতো ।আর ডুং ডুং করে ভারী মিষ্টি একটা আওয়াজ উঠত।যে দলে গরুমোষের সংখ্যা যত বেশী সে দলের আওয়াজ তত বেশী জোরালো।সন্ধের আবহে ফুটে উঠত ঘরে ফেরার ছবি।গেস্ট হাউসের ঘরে লণ্ঠন জ্বলত।শাঁখে ফুঁ পড়ত ।মাঠ তখন এক নক্ষত্র জ্বলা আকাশ । কারখানার ভেতর থেকে ইলেক্ট্রিক আলোর আভাস এসে পড়লেও প্রায় গোটা মাঠটাই অন্ধকার আর পুরোটা জুড়ে মিটমিট করে জ্বলছে লক্ষলক্ষ জোনাকী । অনেক রাত পর্যন্ত কুলী লাইন থেকে ভেসে আসতো মাদলের আওয়াজ। রাতের বিছানায় সেই দিম দ্রিদিম দিম দ্রিদিম শব্দে আমাদের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসত ।
মাঠের একধারে দাঁড়ানো তিনটে জারুল গাছ।ফুলের ঋতুতে দেখেছি তাদের নীলচে বেগুনী সমারোহ।শরতের সকালে সে মাঠে যেখানে রোদ পড়ত সেখানেই ঝলমল করে উঠত হীরে-জহরত। হেমন্তে সারা মাঠ জুড়ে নামত থমথমে পিন্ডাকৃতি কুয়াশা।তার ওপর জ্যোৎস্না পড়ে কেমন রহস্যময় হয়ে উঠত সে। বর্ষায় আকুল করা বৃস্টি দেখতাম চুপ করে বারান্দায় বসে।কাগজের নৌকো বানানো শিখিয়ে দিয়েছিলেন বাবা।ভাইবোনেরা নাম লিখে লিখে সেই নৌকো গুলো জলে ভাসিয়ে দিতাম ।সে যে কি বৃস্টি। মনে হত চরাচরে শুধু জল আর জল …চারিদিক ঝাপসা, শুধু আমাদের গেস্টহাউসটাই তার ভেতর যা একটু জেগে … জলে ভেসে থাকা একটা জাহাজ যেন।
ছ’মাস বাদে গেস্টহাউস থেকে আমরা যে কোয়ার্টারে চলে এসেছিলাম সেটাই বাবুপাড়ার শেষ কোয়ার্টার। মনে হত বুঝি তার পেছন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে ভুটান পাহাড়। ছায়াগাছ গুলোর আড়াল দিয়ে দেখা যেত তার নীল ঢেউ খেলানো পিঠ।বৃস্টি শেষে কোনো কোনো দিন তার গায়ে গাছের নীলচে সবুজ মাথাগুলো দেখে ফেলতাম আমরা।যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলব ।সেই পাহাড়কে হিমালয় ভেবে সে সময় আমাদের অবোধ মনে এক বিশেষ ধরণের গর্ব হত। আমাদের কোয়ার্টারটা ছিল ফ্যাক্টরী থেকে বেশ দূরে ,বাগানের এক কোণে। আর চারপাশে ছিল প্রচুর ঝোপজঙ্গল আর নিস্তব্ধতা ।তারপর এগোলেই গভীর বাঁশবন।বাগানে দুষ্টু বাচ্চারা মাত্রা ছাড়ালেই বলা হত, বাঁশবাড়িতে দিয়ে আসব কিন্তু !ফল অব্যর্থ ।সেই বাঁশবাড়ি চিরেই বাগান থেকে বেরোনোর একমাত্র রাস্তাটি। বাগানের গাড়ি করে যখন দুর্গাপুজোর বাজার করতে, পুজো দেখতে বা অন্য কোনো কারণে বেরোতাম আমরা , আমাদের হৈ হল্লা নিমেষে স্তব্ধ হয়ে যেত গাড়ি বাঁশবাড়িতে ঢুকলেই,শরীর ভারী হয়ে আসত ।এক কিলোমিটারের কাছাকাছি হবে সেই ভয়ের রাস্তা…বিশাল লম্বা সব বাঁশগাছ ঝুঁকে ঝুঁকে এসেছে দুপাশ দিয়ে…তেমন সূর্য্যের আলো ঢুকতনা।দিনের বেলাতেও অন্ধকার হয়ে থাকত।সেখানে কিসের ভয় ছিল না ? হাতি আসত সদলবলে…বাঁশের কোঁড় খেতে…তাদের সেটা ভারী প্রিয় খাবার।নিস্তব্ধ রাতে শুয়ে শুয়ে শুনতে পেতাম মড়্ মড়্ শব্দে হাতি বাঁশ গাছ ভাঙছে। ভয়ে বোনেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরতাম…।
বাঁশবাড়ির ভেতর ছিল হাতীনালা। তার ওপরে একটা বড় কাঠের সেতু।সেই সেতু ছিল অন্য রকম ভয়ের উৎস। তখন ইংরেজ কর্মচারীরা থাকতেন বাগানের তত্ত্বাবধানে।তাঁদের একজন ক্লাব থেকে ফেরবার পথে সেতু থেকে পড়ে সপরিবারে মারা যান। এই ঘটনা আমরা ওবাগানে যাবার আনেক আগের।শোনা যায় সেদিন তিনি মদ্যপ অবস্থায় ক্লাব থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং সঙ্গে ড্রাইভার ছিলনা।সেই জীপের আলো আমরা বহুদিন দেখেছি।বাস রাস্তায় সেতুর ওপর রাতের বেলা সে আলো অনেকেই দেখেছে। হিম হয়ে আসতো হাত পা।দূরের মোড় থেকে সোজাসুজি সেই সেতুর দিকে চোখ পড়লে দেখা যেত একবিন্দু আলো খুব ধীরে ধীরে বড় হয়ে গোল আকার ধারণ করছে ,তারপর সেটা কমতে কমতে ফের বিন্দু হয়ে একসময় হারিয়ে গেল।তখন সেখানে থাকত নিরেট অন্ধকার।আমরা ফিস ফিস করে একে অপরকে ছুঁয়ে থেকে রাম নাম জপ করতাম।এছাড়াও ছিল বাঁশ ভূতের ভয় ।শোয়ানো বাঁশ পার হতে গিয়ে যেইনা কেউ এক পা দিয়েছে ওপারে অমনি বাঁশ ভুত সটান সোজা উঠে যাবে তাকে নিয়ে …তারপর কি হতো তা আর কারুকে প্রশ্ন করতে সাহস হয়নি। শুনেছি সন্ধের পর কি ভর-দুপুরেও সেখানে সাদা কাপড় পরা কে যেন ঘুরে বেড়াত যাকে দেখে ফেললে বাড়ি ফিরে নির্ঘাত প্রলাপ-জ্বর। কপাল খারাপ থাকলে তার দর্শনে মানুষ নাকি বোবা ও হয়ে যেতে পারে ।

সেই বাঁশবাড়ি থেকেই একদিন এক বুনো হাতি সটান বাগানের লোকালয়ে ঢুকে পড়ে ছিল।এমনিতে ফরেস্ট বস্তির দিকটায় রাতে বা সন্ধেয় হাতি ঢুকে পড়াটা বিচিত্র কিছু ছিলনা। কিন্তু এ একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে…তখন সকাল সাড়ে ন’টা হবে।চা-বাগানের অফিসগুলো সকাল সাড়ে ছ’টায় শুরু হয়ে যায় বলে এ সময় একটা জলখাবারের বিরিতি থাকে। বাবা সেই বিরতিতে বাড়িতে এসেছিলেন। ফিরে যাচ্ছেন ,হঠাৎ উলটো দিক থেকে কতগুলো লোক ‘বাবু হাতি!হাতি! ভাগ যাইয়ে…রাস্তা সে উতর যাইয়ে’ বলে সমবেত চিৎকার জুড়ে দিয়েছে। বাবা প্রথমটায় কিছু খেয়াল না করে নিজের মনে হেঁটেই যাচ্ছিলেন।হয়তো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ইঙ্গিতেই পেছন ফিরে যা দেখলেন তাতে শরীরের সমস্ত রক্ত জল …পেছনে শুঁড় দুলিয়ে গজেন্দ্র গমনে হেঁটে আসছে এক বিরাট হাতি। বাবা রাস্তার ঢাল ধরে নেমে এলেন নীচের মাঠে…ছুটতে ছুটতে কোয়ার্টারে ফিরে আমাদের সবাইকে হাতি দেখাতে নিয়ে এলেন বাইরে।সেখানে আরো অনেকে জুটে গেল।সে তখন নির্বিকার হেঁটে চলে যাচ্ছে উঁচুরাস্তা ধরে।আমরা হাঁ করে দেখছি।নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছেনা। মা’র হাত খামচে ধরে আছি।বুকের ভেতর ঢেঁকীর পাড়। আমার বোন হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল ,হাতী তোর পায়ের তলায় কুলের বিঁচি! বেচারা বুঝতে পারেনি এটা সার্কাসের খেলা দেখানো পোষ মানা পরাধীন হাতী নয়।এ হচ্ছে বনের স্বাধীন স্বরাট বাসিন্দা।সঙ্গে সঙ্গে মা ওর মুখ চেপে ধরেছেন।ওদিকে তখন মশাল নিয়ে হৈ হৈ করে তাকে ভয় দেখানোর একটা প্রচেষ্টা চলছে…ক্যানেস্ত্রা পেটানো হচ্ছে।পটকা ফাটানো হচ্ছে…কোনো কিছুকে পাত্তা না দিয়ে সে রাণীর মত হেঁটে যাচ্ছে সোজা।রাণীর মত বললাম। কারণ ওটা ছিল মাদী হাতি।টানা মোড় অব্দি হেঁটে গিয়ে সে শুঁড় তুলে শংখের আওয়াজে ডাকল দুবার…তারপর যেমন সে এসেছিল তেমনি শান্ত হেঁটে ফিরে গেল বাঁশবাড়ীর ভেতর ।কেমন করুণ লেগেছিল সেই আওয়াজ। ওর দুচোখ কি জলে ভেজা ছিল? একজন বলেছিল ওটা মা- হাতী।ফাঁদ পেতে ক’দিন আগে ওর বাচ্চাকে নাকি ধরা হয়েছে । বাচ্চার শোকে তাই পাগল হয়ে গিয়েছে মা।বাচ্চাকে খুঁজছে চারদিকে।সেদিন সে মানুষ নামক নিষ্ঠুর প্রাণীগুলোকে যে কোনো শাস্তি দিতে পারতো।কিন্তু কিচ্ছুটি না করে বিষণ্ণ পা ফেলে একা একা ফিরে গিয়েছে।

আমাদের পাশের কোয়ার্টারে থাকতেন বাগানের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক।তিনি একদিন ‘চল স্কুলে ভর্তি হবি’ বলে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিলেন। ভারী সুন্দর সেই স্কুলের অবস্থান।টানা চা বাগানের ভেতর এক ফালি মাঠে দাঁড়িয়ে সে । স্কুলের বারান্দায় ঝোলানো একটুকরো লোহার গায়ে আরেকটি লোহার লম্বাটে টুকরো দিয়ে টুং টুং করে বাজানো হত ঘন্টা।আমরা বলতাম ‘টুন্ টুন্ গির গয়া রে?’ ( ওয়ার্ণিং বেল কি পড়ে গিয়েছে ?)টিফিনে আমরা বাড়িতে চলে আসতাম।যাতায়াতের পথটা সোজাসুজি হতনা কখনো। চাবাগানের ভেতর ঢুকে লুকোচুরি খেলতে খেলতে যাওয়া।এভাবে সাপের খপ্পরেও পড়েছি।চা গাছের ফুল থেকে মধু চুষে খেতাম।সবুজ বৃন্তের চারিদিকে সাদা গোল গোল পাঁপড়ি সাজানো। মধ্যে হলুদ দন্ডগুলোতে রেণু মাখা।চা ফলগুলো দেখতে অদ্ভুত।দুটো টিনটে মার্বেলকে একত্রে কেউ সবুজ আস্তরণে ঢেকে ফেললে যেমন হয় অনেকটা তেমনি।কাঁচা চা ফলের ভেতর জল রঙের জেলি ভরা থাকত। জলের মতই স্বাদ। খোলা ফাটিয়ে সেই জেলি চেঁছে তুলে খাওয়া আমাদের আনন্দ ছিল।চা ফল পেকে গেলে এই জেলির অংশটা জমে শক্ত সাদা হয়ে যেত । সেটা খেতে বিষ তেতো।পাকা ফল গড়িয়ে মার্বেল খেলা যেত।
অনেক রকম পোকামাকড় সে সময় আমরা দেখেছি ।সুপুরী পোকার কথা খুব মনে পড়ে।হলদে আর কালো ডোরা দেয়া এক ইঞ্চি লম্বা আর অর্ধেক ইঞ্চি চওড়া একধরণের পোকা তার কয়েকশো লোমের মত পা নিয়ে হাঁটা চলা করত ।মাথায় দুটো ছোট্টো কালো শুঁড় ছিল।মজাটা হচ্ছে তার গায়ে কোনো কিছু ছোয়াঁলেই নিমেষে সে নিজেকে গুটিয়ে সুপুরির আকার ধারণ করত।তার গা তখন মসৃণ খোলায় আবৃত।তাকে আমরা এদিক থেকে গড়িয়ে ওদিকে দিতাম সে কিচ্ছুটি করতনা।তাকে মাটিতে রেখে দিয়ে আমরা চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকলে সে কিছুক্ষণ পরে ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরে হাঁটতে শুরু করত।আমরা আবার তাকে টুক করে কিছু দিয়ে ছুঁয়ে দিতাম।সে আবার সুপুরি।এখন মনে হয় খেলাটার ভেতর একধরণের নিষ্ঠুরতা ছিল।
শৈশবের নানারকম অচেনার আনন্দের মাঝে মূর্তিমতী বিভীষিকা ছিলেন পিসীমা।তিনি বাগানের আপামর জনসাধারণেরই পিসীমা ।পিসীমার ভাই ছিলেন ওই বাগানের কম্পাউন্ডার।বাল্যবিধ বা পিসীমা ভাইয়ের সংসারে থাকতেন। কিন্তু স্বনির্ভর হয়ে।ক্লাস ওয়ান থেকে ফোর পর্যন্ত বাগানের সমস্ত বাঙালী ছেলেমেয়েদের তিনি সকাল সন্ধ্যা পড়াতেন নামমাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে।বারান্দায় শতরঞ্চি বিছিয়ে আমরা গোল হয়ে বসতাম মাঝখানে একটি মোড়ায় তিনি বসতেন বেত হাতে নিয়ে।ফর্সা ছোটোখাটো চেহারা।হাঁটুর একটু নীচ অব্দি সাদা থান সাবেকী ভাবে পরা।মাথায় কদমছাঁট চুলের ওপর ঘোমটা।সবাই যমের মত ভয় পেতাম তাঁকে। আমার এক বন্ধু তাঁর হুঙ্কারে সবার সামনেই ছড় ছড় করে প্যান্টে পেচ্ছাপ করে ফেলেছিল।আমাকে তিনি তাঁর এই টোলে প্রথম দিনই আপ্যায়ণ করেছিলেন পশ্চাদ্দেশে বেতের বাড়ি দিয়ে।যথেষ্ট কারণও ছিল। তিনি আমাকে তিনটে রসাল ফলের নাম বলতে বলেছিলেন।আমি আম কাঁঠালের সঙ্গে রসগোল্লার নামও বলে ফেলেছিলাম।সেটা বোধহয় পিসীমা সন্দর্শনে অতিমাত্রায় ঘাবড়ে গিয়েই। -‘আয় তরে রসগোল্লা খাওয়াই…বলদা বুর্বক কাহীঁকা!ফল ও চেনস না ? পড়তে আইছস !’ ইত্যাদি চন্ডীবচন শোনার সঙ্গে সঙ্গে বেতের বাড়িতে আমার বিশেষ অঙ্গ জ্বালা করছিল।বলা বাহুল্য কোনোদিনই এই মহিলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মধুর হয়নি ।মুস্কিল হচ্ছে তাঁর হাত থেকে বাঁচার কোনো রাস্তাও আমাদের জানা ছিলনা।আমি প্রায়ই দুহাতে বেতের দাগ নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।ওই বয়সেই পাঠ্য বইয়ের ভেতর গল্প বই নিয়ে পড়ার নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল ।গল্পবই বলতে উঁচুক্লাসের বাংলা দ্রুতপঠনের বই অথবা বাংলা পাঠ্যবই…ছুটি আদরিণী মহেশ এই গল্পগুলো আমার ক্লাস থ্রীতেই পড়া হয়ে গিয়েছিল।রামের সুমতি পড়তে পড়তে চোখের জল এসে যায়।আর ধরাও পড়ি সেই কারণেই। তারপরও চোখের জল পড়েছিল কিন্তু সেটা পিসীমার বেদম মারের চোটে।

আমার বন্ধু চন্দনার একটা ধারণা ছিল বইয়ের যে পাতা একবার পড়া যায় সেটার আর কোনো দরকার নেই।অতএব পড়া হয়ে গেলেই বই থেকে পাতাটা সটান ছিঁড়ে নিয়ে সে কুচি কুচি করে বাতাসে উড়িয়ে দিত।পরীক্ষার আগে ফিরে পড়ার সময় তার বইয়ের শরীরে আর বিশেষ কিছু থাকতনা।এই তথ্যটি যেদিন পিসীমার কানে উঠল সেদিন চন্দনার হাতেও বেতের দাগ পড়ল। আমরা দুই দাগী আসামী গলাগলি করে কেঁদে ছিলাম।পরের রবিবার বাজার থেকে লজেন্স কিনে এনে নিভৃতে বাড়ির পেছনের ঝোপের ভেতর বসে আমরা একটা ভয়ানক প্রতিশোধ নিয়েছি। রাস্তার নুড়ি কুড়িয়ে ধুয়ে মুছে শিব ঠাকুর সাজিয়ে বুনো ফুল দিয়ে তাকে পুজো করেছিলাম।ভোগ হিসেবে নিবেদিত হয়েছিল দুখানি ঝাল লজেন্স আর বাড়ির ঠাকুর ঘর থেকে চুরি করা কয়েকটি বাতাসা। দুই ভক্ত কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেছিলাম পিসীমার এমন জ্বর হোক পিসীমা যেন আমাদের আর পড়াতে না পারে।শিব ঠাকুর নিশ্চয়ই আমাদের ওই যৎসামান্য ভোগে সন্তুষ্ট হননি।যত দিন ওখানে ছিলাম কোনোদিন পিসীমার অসুস্থতার জন্য ছুটি পাইনি।ক্লাস ফাইভে উঠে সেই চা বাগান আমাদের ছেড়ে আসতে হয়।ততদিন তিনি তাঁর অত্যাচার বহাল তবিয়তে চালিয়ে গিয়েছিলেন।
পিসিমা তো কবেই নেই হয়ে গেছেন।নেই সেই স্কুলবাড়িটাও।স্কুল ভেঙে ফেলে সেই ছোট্টো জমি চা গাছে ভরাট হয়ে গেছে।ভয় দেখানো বাঁশবনটা কেউ আর খুঁজে পাবেনা কোথাও।সুপুরী পোকা আর দেখিনি। নেই আমারও সবুজবেলাটুকু। সেই গেস্টহাউসের মাঠ যেখানে আমি ফুটে উঠতে দেখেছি অনেক ভোর সন্ধে রাত… বর্ষা শরত হেমন্তের কথকতা …সেটাও বসতিতে ভরাট হয়ে হয়ে এতদিনে এক চিলতে । মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই অতীতের লুকনো মুঠি খুলে মাথার ভেতর ঘুরে ফিরে আসে অবারিত সেই মাঠ … সেই রোদে ঝিকিয়ে ওঠা কোটি শিশিরবিন্দু ,ঘন বৃষ্টির ওপেক পর্দা…লক্ষ লক্ষ জোনাকির আলো…অথৈ কুয়াশা… দুকানে বেজে যায় ডুং ডুং ঘন্টাধ্বনি…গোধূলির…ঘ রে ফেরার।স্মৃতিজল বেয়ে ধীরে নামে অ্যারোমা থেরাপি…।