কোই লৌটাদে মেরে বিতে হুয়ে দিন...

রীনা ভৌমিক


এভাবেই আক্ষেপ তরঙ্গ ইনিয়ে বিনিয়ে ।অলক্ষ্যে তুমি যদি হাত রাখো বুকে বুকে, জেনো ভূমিকম্পে কেঁপে উঠবে নির্জন ভাষা ।শ্যাম্পুর বাবলের উড়ালে রঙ বেরঙের নক্কাশি । পুটুশফুল, তুমি জানো....আমি তবু ফিরবো না.....কিছুতেই ফিরবো না....অবুঝ-সবুজের রঙিন ঘুড়িওড়া " বিতে হুয়ে দিনে ".....

সেইসব অবুঝ বেলার কথা মনে আসতেই এক ' মা কই, মা কই' তীব্র আঁতুড়ঘর মাখা খোঁজারু আচ্ছন্নতা । জামতলার ঘরের জামগাছটার ছায়ার রঙ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে মাটির সাথে ' রাজ কী বাতে ' আক্রান্ত হয়। এক অপরিণত মন শরৎবাবুর অরক্ষাণীয়ার নায়িকা হয়ে কাটা ঘুড়ির ভো-কাট্টায় বিবশতা রাখে ।মুখ থুবড়াতে চায় তেপান্তরের বেপথু বঞ্জরে ।অবশ্য দাদুভাই ছিল অনমনীয়, নির্মাণে বিনির্মাণে....

হিটলার দাদুর সাম্রাজ্যে হামেশাই আমর "ভ্যাঁ"-এর পিনবসা রেকর্ড প্লেয়ার ।জানো পুটুশফুল, যেদিন স্লেট ভেঙে কলমরাজ্যে প্রবেশ করলাম, দাদু একটা সুন্দর কাঠের কলম দিয়েছিল । কাঠের শরীর লোহার নিব....দোয়াতে নিব ডোবাও, মনে যা আসে লেখো খসখস....সেই বয়সে উফ্ কী এক্সাইটিং.....আর যেদিন প্রথম স্কুল....সুলেখাকালি ভরা ঝরনাকলম । দোয়াতে মুখ ডোবাবার বালাই নেই ।পেটেই ভুরিভুরি গল্প ।কাগজে নিবের মুখ চেপে ধরো হাজারো দামাল শব্দের দাপট । শব্দের হাত ধরেই তো জীবনের চিত্রময়তার স্পর্শ...

চালচিত্রে নেচে বেড়ায় কতোই না ঝিকিমিকি । বুক পর্য্যন্ত ফ্রক পরা বাঁদর....'কি খাবার মন বুড়ি/ কি খাবার মন...', গলা কাঁপিয়ে হাসিয়ে বেড়ায় শ্যাম বহুরূপী, 'না ভালো কানে দেখতে পাই/ না ভালো চোখে শুনতে পাই/ বুঢ়া মানুষ তো ...', বায়োস্কোপের 'প্যায়সা ফেঁকো/ তামাশা দেখো'-র ভিন্ স্বাদের দুনিয়া । বায়োস্কোপে লেগে থাকে শায়রাবানু ! টানা চোখ টিঁকালো নাকের রূপসী ।পাড়ার দাদারা লেবুলজেন্স মার্কা আদরে ক্ষ্যাপাতো 'সায়রাবানু' । ছোট্ট আমি সেই শব্দের অর্থ উদ্ধারের অক্ষমতায় "ভ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্ যঁ"-এর কোলাজ ।তারাই কান্না থামাতে তড়িঘড়ি ছড়ায়, 'রেলগাড়ি রেলগাড়ি/ ঝিক্ ঝিক্ ঝিক্/মিনু যাবে মামাবাড়ি.....

কু - উ - উ ঝিক্ - ঝিক্, ঘুম ভাঙতো সুরিলায় ।পাখির কিচিমিচি থেকেও কু - ঝিকে অনেক বেশী মহুল-মাতাল মাদকতা ।রেল কোয়ার্টার....পিছনে বিশাল মাঠ....সীমারেখা এঁকেছে উঁচু মাটির ঢিপি, যাতে জংলী ঝাড়....ওপাশে রেললাইন। রেললাইনে মালগাড়ী....প্যাসেঞ্জার ট্রেন.....বাচ্চারা কখনো ঢিপিতে চেপে কখনো কাঠের পুলে দাঁড়িয়ে 'টা - টা'-য় । স্টিম ইঞ্জিন লকলকে আগুন খিদেয়। খালাসি আংকেল ঘচ্ করে বেলচা দিয়ে কালোসোনা তুলে সেই আগুনে....ইঞ্জিনের কর্ণধার বড়কাকু ।

বড়কাকু এক আশ্চর্য্য রামধনু.....যার সাতরঙে উচ্চতা, ওজন,আনন্দময়তা ,ধৈর্য্য , জ্ঞানবিজ্ঞান, আত্মবিশ্বাস আর একলা চলার সহজপাঠ । বড়কাকুর ফল্গুস্নেহে ঠাকুরমার ঝুলি , ম্যানড্রেক থেকে একলাফে কৈশোরেই কিভাবে মৈত্রেয়ী দেবীর ' ন হন্যতে ' বা গোর্কীর 'মা'-এ পৌঁছানোর কৌশল....স্বাধীনতা কিভাবে রক্ষাকবচ হয় তা রপ্ত করা । আমার ছায়াসঙ্গিনী ছিল টুবলু ।

টুবলু আমার ল্যাঙ্গোটিয়া সখী ।ওর হাত ধরেই প্রথম স্কুল চত্তর । ওর ছিল অনেক কালেকশান । বিস্মিত হয়ে দেখতাম ।খালি হোমিওপ্যাথির শিশিতে কয়েক ডজন জোনাকি, কাঁচপোকা, ভেলভেট পোকা ।টুবলুই জানতো অন্ধকারে কোচপাথর ঠুকে আগুন জ্বালাবার রহস্য ।ম্যামেলিয়া প্রজাতি কিভাবে লেজ খসে মানুষ, এই ঐতিহাসিক পাঠ আত্মসাৎ করতে করতেই কৈশোরে দাদা বৌদির বন্ধ দরজায় আড়ি পেতে পড়ে ফেলেছিল জীবনের গূঢ় তত্ত্ব ।আমার সাথে শেয়ার করতো ।উত্তেজনায় বুক ঢিপঢিপ করতো আমার ।ভরা শ্রাবণে দামোদরের ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য্য দেখার মতোই সে উন্মাদনা ।

আমাদের বাবুপাড়ার কোয়ার্টারের অনতিদূরে মহুয়াখুলি ।ভোর চারটে থেকে বিহারী কাকুরা রামখচাখচ খোল কীর্তনে । তারও সামান্য দূরে দামোদর ।দামোদর গান গেয়ে হাতছানি দিত ।যেমন পাশের বাড়ির শুভেন্দুদা ।আমার তখন মন উড়ু উড়ু ভরন্ত কৈশোর । শুভেন্দুদা যখন উদাত্ত গাইতো, "এ মনের একতারাতে/ একটি শুধুই সুর/ সে শুধু তোমারি নাম / তোমাতে মধুর ", মনে শুভেন্দুদা বাজতেই থাকতো ......

জানালাফ্রেমে পুতুল ছিল । ছিল ইয়ার - দোস্ত - খুনসুটি । আম-জাম পেয়ারা চুরি ।ছিল আবৃত্তি নাটক জলসা আর পাঁচটা স্বতঃস্ফূর্ত শৈশবের মতোই হুবহু ।আর ছিল, পুটুশফুল, তোমার সাথে নিভৃত বকবকম ।কিন্তু ......। এই কিন্তুই আমার সেই মাধূর্য্যবেলায় না - ফেরার মাইলস্টোন ।দূর্দ্দান্ত প্রভাবশালিনী বড়কাকীর মুখটা প্রায়ই ভ্যাম্পায়ারের মতো হয়ে উঠতো ।প্রচন্ড পৈশাচিক স্ফূর্তিতে চুলে ক্ষুর চালাবার মতোই দ্রুত কাটতে থাকতো আমার তাবৎ সবুজ ।অপ্রত্যাশিত নির্মমতায় অবুঝ বুকে কী ভীষণ ভাঙচুর ! ' গেল-গেল' হাহাকারে মথিত হতো হৃদয় আকাশ...

সান্ত্বনায় যে জিয়ন কাঠির ছোঁয়ায় মরা গাছে ফুল ফুটতো, তার নাম ঠাকুমা ।ষাটোর্দ্ধ টুকটুকে যশোর - নন্দিনীর শুভ্র মনের মতোই ছিল তার জুঁইগন্ধী শ্বেত শাড়ীর আঁচল ।তাতে আরব্যরজনীর গল্পশৃঙ্খলা ।ঠাকুমা আমায় সেই আঁচলে লুকিয়ে সন্তর্পণে আঁচলের পাল্লা নাড়িয়ে নাড়িয়ে তাড়াতে চেষ্টা করতো ভূত-প্রেত ....পিশাচ...

ঠাকুমার কি সাধ্য বলো, ওইটুকু আঁচলে আমাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ?সেই থেকে দুঃস্বপ্নের তাড়নায় কেবলি ছুটে চলেছি অনিশ্চিত সম্মুখে ।পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে হোঁচট খেতে খেতে.....তাই তো আর ফিরি না...ফিরতে চাইনা গো.....বিতে হুয়ে দিনে......