জাহাজডুবির পর

তমাল রায়


কেউ মানুক বা না মানুক আমাদের একটা আগ্নেয়গিরিও ছিল।একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।না, সে আগে জেগেই ছিলো।যেমন তুমি,আমি,আমরা।তারপর ধুলো এলো,এলো বালির ঝড়,আর আমরা ভুলেই গেলাম তার কথা।সে কিন্তু তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।তার ওপরেই আমাদের ঘর বাড়ি হোলো।মন্দির,মসজিদ।আর সময় যত এগোতে লাগলো আমরা তার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে লাগলাম।সে কিন্তু তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। শরীরে হাত রাখলে সে উসকে দিতো ওম।আর হাত উল্টোলেই ঘুম।
দাদুরা তো সব সেই ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় চলে এলো এপারে।সাথে কি করে যে নিয়ে এসেছিলো এই খোদার খাসি খাটটাকে ভাবলে আজও অবাক হই।নিরন্ন,প্রাণের তাগিদে সীমানা পার হয়ে চলে আসছে,তখনো সীমানা অবশ্য তৈরী হয়নি।তবু শিকড়হীন মানুষ আর সাথে এই আধ দামড়া খাট,পূব বাংলা থেকে সোজা উত্তর কোলকাতার গোপী মোহন দত্ত লেন,ব্যাপারটা এতো সোজা বোধহয় ছিলো না।নিশ্চিত অনেক জায়গায় হল্ট করতে করতে,ভল্ট খেতে খেতে তবে এখানে এসে পৌঁছেছিলো।কিন্তু ছবিটা বেমানান না।এই গোপী মোহন দত্ত লেনে ছিলো দুজন লিজেন্ড।একজন শক্তি চট্টোপাধ্যায়,আর আমার দাদুর খাট। শক্তি থাকতেন তার মামার বাড়িতে। আর খাট আমাদের ভাগের বাড়িতে।যাকে আদর করে বাবা বলতেন পালঙ্ক , তার সাথে আমাদের একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিলো । আমরা তার ওপর শরীর রাখলেই সে বলে উঠতো ‘খোকন সোনা’। হ্যাঁ , ও সত্যি কথা বলতো । আমার প্রথম এ বি সি ডি শেখাও তো ওর ওপরেই বসে ।যেমন প্রথম ভয় পাওয়া । ওর দুপাশে দুটো ডানা আঁকা ছিলো । কেন কে জানে । খাটের আবার ডানা থাকে নাকি ! বাবা বলতেন সে আমলে নাকি থাকতো । তাহলে থাকতো । অত প্রশ্ন করে তো কোনো লাভ নেই । কিছু কিছু জিনিস মেনে নিতে হয় । যেমন আমরা সব হেরে যাবো , আর কেউ কেউ জিতবে , জিতেই চলবে । কারা জিতবে , আর কারা হারবে তা অবশ্য সবারই জানা । ওই খাটটার সামনে দিকে ছিলো এক ময়ূরপঙ্খীর মুখ । এর কারণও জানা নেই । খুব ছোটো যখন তখন বাবা একদিন বলেছিলেন ওই খাটটা উড়ে উড়ে আমাদের বাড়ি এসেছে । আমরা বিশ্বাস করেছিলাম । সেটা তো বিশ্বাস করারই সময় । আমার কিন্তু ওটা দেখলেই মনে হত একটা কালো হাঁস । পেখম মেলে আমাদের দিকে ভেসে আসছে । আমরা ওর শরীরে উঠেই বলতাম - ‘নাও , এবার চল’ । ওমা সে চলতে শুরু করতো ।ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ করতে করতে সে চলতে থাকতো। কি মজা লাগত , আমাদের । গায়ের রংটা ছিলো কালো আবলুস কাঠের মত । গায়ে অজস্র কাজ । সেই যেবার খুব বন্যা হল, সালটা মনে নেই , সারা কোলকাতা ভেসে গেলো , আমাদের গলি পেরিয়ে জল ঢুকে পড়লো বাড়ির ভেতর , একতলার অর্ধেকটা জলে ভরে গেছে, সকলে মিলে উঠে বসেছিলাম ওর ওপরেই । ও আমাদের অভয় দিয়েছিল – ‘ভয় কিরে পাগল আমি তো আছি,কিছু হবে না খোকন , সোনা । কেবল আমার ওপর শক্ত করে ধরে বসে থাকো’ । বাবার নাম খোকন , আর মা- সোনা । ও তো দাদুর বন্ধু ছিল , তাই বাবা আর মাকে ডাক নামে ডাকতো । সেবার আমরা থেকেও ছিলাম টানা দু - দিন দু - রাত ওই খাটের ওপর।খাটে বসেই সকলে পেচ্ছাব পায়খানা করেছিলাম কি’না সে কথা অবশ্য মনে নেই। আর তখনই আমি ওর নাম দিই জাহাজ ।কেন দিলাম? কারণ ও জলের মধ্যে ভাসছিলো। আমার আর দিদির যত দস্যিপনাও ছিলো ওই জাহাজের ওপর । ও কিন্তু মিটিমিটি হাসতো, আর মেনেও নিতো সব অত্যাচার । দাদুর বন্ধু , কেনই বা সহ্য করবে না । তারপর কোথা দিয়ে যে সময় পেরিয়ে যেতে লাগলো ।আমরাও ডাংগুলি , গোল্লাচোর খেলা বন্ধ করলাম , বাবাও বুড়ো হল , মার হাই প্রেসার , সুগার । দিদির বিয়ে হয়ে গেলো । পাল্টে যেতে লাগলো ঘর বাহির দুনিয়া খুব দ্রুত । স্কুল পেরিয়ে আমি ঢুকলাম কলেজে । জাহাজ ও মনে হয় ততদিনে একটু বুড়ো হয়েছে । এখন না চললেও মাঝে মাঝে একটু ক্যাঁচ-কোঁচ আওয়াজ হয়। সত্যি বলতে কি আমাদের জীবনে জাহাজের তখন আর সে গুরুত্বও নেই আগের মত । মার অনেক দিনের শখ এই যৌথ পরিবারের ভাগের বাড়ি ছেড়ে বাবা একটা নতুন বাড়ি করুক । বাবা প্রথম দিকে শুনতেন না , রিটায়ার করলো আর মার কথা কে বেদবাক্য মনে হলো,যতদিন শরীরের রক্ত গরম ছিলো শোনেনি। অনেকগুলো টাকা পেলো একসাথে। মারোয়ারি হলে তা দিয়ে ব্যবসা করতো,বাবা স্থির করলো একটা বাড়ি কিনবে । ব্যস , অমনি বাড়িতে দালালদের উৎপাত শুরু হোলো । রোজই বাবা আর মা বেরিয়ে যায় দুপুরে যেন ম্যাটিনি শো - এ সিনেমা দেখতে যাচ্ছে। । আর বাড়ি ফিরে এসে তার মেরিটস্ ডিমেরিটস্ নিয়ে আলোচনা শুরু করে রাতের খাওয়া খেতে খেতে , শেষমেশ বাড়ি ফাইনালও হয়ে গেলো । রেজিস্ট্রিও । জাহাজকে কেউ কিন্তু জিজ্ঞেস করেনি তার এতে সায় আছে কিনা । অথচ সেও তো আমাদের পরিবারের একজন সদস্য না’কি ! আর এরপরই নেওয়া হলো সেই কঠিন সিদ্ধান্ত , জাহাজ কে বেচে দেওয়া হবে । এই জগদ্দল পাথরের মত শরীরের জাহাজকে বয়ে নিয়ে বেড়ানো খুবই কঠিন । খদ্দের দেখার ভার পড়ল আমার ওপর ।দিব্য পড়াশুনা,বান্ধবীদের সাথে আড্ডা,কবিতা একটু আধটু ছুইমুই করে কেটে যাচ্ছিলো তা’না কঠিন যত কাজ।ভাল হলে প্রশংসা নেই,খারাপ হলে নিন্দে অপর্যাপ্ত। আমি সোজা জাহাজের পায়ে পড়ে ক্ষমা-টমা চেয়ে নেমে পড়লাম সে কাজে । একটা মারোয়ারী ,একটা হিন্দুস্থানি,আর একটা বাঙালী । তিন জনকে দেখানো হল । আর সাথে সাথে বলা হল ওর সেগুণ কাঠের শরীরের কথা , শৈল্পিক কাজের কথা,খানদানী ইতিহাসের কথা । বাঙালী রাজি হয়ে গেলো । মোটামুটি ভাল দামেই , তাকে বেচে দেওয়া হবে । নতুন বাড়িতে ঢুকবে বক্স খাট । জাহাজ ডোন্ট মাইন্ড প্লীজ,ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরী । জাহাজ সব শুনলো । মিটিমিটি হাসলো ।আমি জাহাজের কানে কানে বলে এলাম - দুঃখ করে না সোনা । এরা বেচুক , আমি তোমায় ঠিক ফিরিয়ে নিয়ে আসবো । ও দেখলাম খানিকক্ষণ চুপ করে কি ভাবলো আর তারপর অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এর মত হাসলো । আমি পালিয়ে এলাম । খুব ভয় লাগছিলো ।
কারো বা অস্টিন ছিলো,কারো বা টানা রিক্সা,আমাদের কিন্তু একটা আগ্নেয়গিরিও ছিল।একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।না, সে আগে জেগেই ছিলো।যেমন তুমি,আমি,আমরা।তারপর ধুলো এলো,এলো বালির ঝড়,আর আমরা ভুলেই গেলাম তার কথা।সে কিন্তু তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।তার ওপরেই আমাদের ঘর বাড়ি হোলো।মন্দির,মসজিদ।আর সময় যত এগোতে লাগলো আমরা তার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে লাগলাম।সে কিন্তু তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। শরীরে হাত রাখলে সে উসকে দিতো ওম।আর হাত উল্টোলেই ঘুম।
বাইরে তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে , পাখীরা ঘরে ফিরছে , দিদিকে ফোন করলাম শ্বশুরবাড়িতে । – কাল একবার আসবি ? জাহাজ কে বেচে দেওয়া হচ্ছে । ওর নীচ থেকে সব মালপত্তর বার করতে হবে ।কি জানি দিদিরও বোধহয় শুনে মন খারাপ হল । বললো- ‘হ্যাঁ , আসবো’ । আমাদের পুরোনো বাড়িতে তো লফটি ছিলো না , বাঙ্কারও না । যা কিছু অচল সব ওই জাহাজের নীচে ।
পরদিন দুপুর দুপুর দিদি চলে এলো । আমি আর দিদি খাটের নীচে ঢুকলাম ‘অপারেশন মাল সরাও’তে। প্রথমেই বিগত ষাট বছরের অতীত ধুলো - বাহিনী আমাদের স্বাগত জানালো । দিদি তো হেঁচে , কেশে অস্থির । আমি বললাম - মুখে আর নাকে রুমাল বাঁধ । দেখিস না ডাক্তারেরা অপারেশনের সময় কেমন বাঁধে । আর তারপর আমরা সময়ের গলিতে ঢুকে পড়লাম জাহাজের পেটের ভেতর । বাইরে তখন বিকেল আসতে আসতে সন্ধ্যের দিকে এগোচ্ছে । প্রবেশের সাথে সাথেই মাকড়শার জালে জড়িয়ে গেলাম আমরা ।এত্তো বড় জাল আগে কখনো দেখিনি ।ঢোকা মাত্রই ট্রাপিজের খেলা শুরু হল।শূন্যে খানিকটা ভেসে উঠলাম দুজনেই ।আর তারপর যেভাবে সাইকেলের প্যাডেল করে সেভাবে জাল বেয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম ।এমা দেখি আমার হাত-পায়ের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। শরীরটা ক্রমশ ছোটো হয়ে যাচ্ছে । প্রথমেই হুস হুস করে চলে গেলাম খাটের উত্তর কোণে । যেখানে শুয়ে শুয়ে আমি হিসি করতাম ছোটবেলায় , আর হিসি গড়িয়ে গিয়ে পড়ত খাটের ওই উত্তর কোণে । সেই অয়েলক্লথের ঠিক ওপর চলে এলাম । কি গন্ধ ! ইস্ । ঠিক পাশেই দেখি একটা বড় পেতলের গামলা । দিদি কে বললাম -এটা কিরে ? ও বললো -‘ তোর স্নান করার গামলা । আমার বেলা বাবা এসব আনেনি । তুই ছেলে তো , তাই বড় পিসীর বাড়ি গিয়ে নিয়ে এসেছিলো বাবা । এটা ঠাকুমার গামলা পিসী কে দিয়েছিলো বিয়ের সময়’ ।আমি বললাম - চল না এখন একটু স্নান করে নি । দিদি চোখ বড় করলো-‘তুই কি এখনো ততটা ছোটো আছিস? ’ আমি বললাম - হ্যাঁ , তাকিয়ে দ্যাখ। দিদি এতক্ষণ খেয়াল করেনি যে মাকড়শার জালে জড়ানোর পর আমাদের শরীরটা একদম ছোট্টটি হয়ে গেছে । নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দিদি কান্না জুড়লো । আমার কিন্তু বেশ মজা লাগছে ।- এই দিদি ওটা কিরে ।
–‘আই ওটা আমার । হাত দিবি না ।
- কি বলবি তো? দিদি বললো
–‘পুঁথির হার । যখন পাঁচ বছর বয়স মা রাগ করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো’ ।
- কেনো? –‘খালি হার পরতাম , দুল পরতাম।পড়াশুনা করতাম না । মা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো । জানিস আমি সেদিন রাতে খাইনি ।
- বেশ করেছিলি।মাও তো খুব জিদ্দি ছিলো।
- ওটা আমাকে দে ।
আমি দিয়ে দিলাম । -এই দ্যাখ তো এটা কি ? দিদি মুখে আঙুল দিয়ে বললো – ‘চুপ’ । আমি ফিসফিস করে বললাম – ‘কেন’ ?
- এটা বাবার মদের বোতল । একবার মার ওপর রাগ করে বাবা বাড়িতে মদের বোতল নিয়ে এসে খেতে শুরু করেছিলো । মা একটানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো । দেখিস ওটা কিন্তু ভাঙা । হাতে না ফুটে যায় কাঁচ ।
- দিদি মা কিন্তু খুব জাঁদরেল মহিলা ছিলো বল? এই দিদি এটা থেকে এখনো কেমন একটা গন্ধ বেরোচ্ছে নেশা নেশা ।
- ও ন্যাকামি । তুমি যেন সাধু পুরুষ । আমি যেন জানি না কিছু । আমি চুপ ।- এই দিদি চল ওদিকে । দিদি উত্তর দিকের পায়াটা ধরে ঝুলে আছে । আমি বললাম- কিরে চল্ ।
- না ওদিকে কিছু নেই । যাস না ।
- আমি তো পাবলিক সেয়ানা । বুঝলাম কেস গড়বড় ।
- ঠিক আছে আমিই যাচ্ছি । এক তাড়া চিঠি । গার্ডার মোড়া । খুলে যেই না পড়তে শুরু করেছি দিদি এসে হাজির । – ‘ও গুলো লাল্টুদার চিঠি । খবরদার হাত দিবিনা’ । ছিনিয়ে নেওয়ার আগেই আমি তো ততক্ষণে পড়ে ফেলেছি ।‘প্রিয়তমা তপু , তোমাকে ইস্কুল থেকে না ফিরতে দেখলে আমার যে মনটা কেমন কুকুরের মত কুঁইকুঁই করে’ ।
- কি লিখেছে রে দিদি, ‘কুঁই কুঁই’! কি হাসি পেলো । ততক্ষণে দিদি আমার হাত থেকে চিঠিগুলো কেড়ে নিয়েছে । ঠিক আছে সোনা দিদি এবার তো বল এগুলো এখানে কেনো ?
- মা সেদিন আমায় ধরে ফেলেছিলো । বলেছিলো ‘তোর বাবাকে সব বলবো , আর তোর মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে রাস্তা দিয়ে হাঁটাবো’ ।
- ব্যস ? আর তুই ভয়ে ফেলে দিলি চিঠিগুলো ? দিদি দেখি কাঁদছে । আমি বললাম -আর কেঁদোনা আর কেঁদোনা ছোলা ভাজা দেবো , আর ও ফিক্ করে হেসে ফেললো ।-ওই দিকটাতে যাবি দিদি?
সকালের কিশোরী অলঙ্কার ছিলো,সন্ধ্যের অফুরান নেশা,আমাদের কিন্তু একটা আগ্নেয়গিরিও ছিল।একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।না, সে আগে জেগেই ছিলো।যেমন তুমি,আমি,আমরা।তারপর ধুলো এলো,এলো বালির ঝড়,আর আমরা ভুলেই গেলাম তার কথা।সে কিন্তু তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।তার ওপরেই আমাদের ঘর বাড়ি হোলো।মন্দির,মসজিদ।আর সময় যত এগোতে লাগলো আমরা তার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে লাগলাম।সে কিন্তু তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। শরীরে হাত রাখলে সে উসকে দিতো ওম।আর হাত উল্টোলেই ঘুম।

আমরা প্যাডেল করতে জাল ধরে এগিয়ে গেলাম সেই দিকে যেখানে দুর্গ ছিলো । দিদি বললো -‘ মনে পরে তোর ? আমি বললাম – কি ? সেই যে লাল ফৌজ চলেছে যুদ্ধে , রেড মার্চ করতে করতে , আর তুই একটু দূর থেকে দেখছিস । কি শৃঙ্খলা ওদের । সামনে একটা নদী পড়ল । তোরই তৈরী করা নদী , আর একটু দাঁড়ালো , নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে রুট চেঞ্জ করে নিলো । পুরো সেনা বাহিনী বেঁকে চুরে একটা ‘৯’ এর মত স্ট্রাকচার তৈরী করল , আর তুই নাচছিস -‘৯’ কার ‘৯’ কার বলে , তুই খুব দুষ্টু ছিলি কিন্তু বাবু । সে যাই হোক ওরা তো চলেছে ওদের দুর্গের দিকে , আর তুই চলেছিস পেছন পেছন ,শেষে বায়না ধরলি ওদের দুর্গ দেখবি বলে , মা কত বোঝালো কে শোনে কার কথা , দেখতে গিয়ে দিলি ভেঙ্গে ওদের দুর্গ , ওরাও ছাড়ে না’কি । যোদ্ধার জাত বলে কথা , করলো তোকে আক্রমণ । আর তুই ভ্যাঁ..করে কান্না জুড়ে মারতে শুরু করলি ওদের । তারপর সে যুদ্ধ ক্ষেত্রে সারি সারি লাল সৈন্যের মৃতদেহ পড়ে...
- হ্যাঁরে দিদি । সে রাতে মার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম মনে আছে , আর বলেছিলাম- আর কারোকে এভাবে মারবো না । সে লাল পিঁপড়েই হোক বা মানুষ ।
- হুম মনে আছে । তারপরই তো মা তোকে খেতে দিলো । তার আগে তো দেয়নি , সারা দিন উপোস করিয়ে রেখেছিলো ।ওই দ্যাখ ভাই এটা ।
- দিদি দ্যাখ এতো জল এলো কোথা থেকে , দিদির মুখ থেকে যে লালা বেরোচ্ছে তা দিয়ে তৈরী হয়ে যাচ্ছে সরু সুতো , আর আমরা সেই সুতো ধরে প্যাডেল করে এগিয়ে চলেছি জাহাজের নীচে আরও একটা দিকে ।
- এইটা কিরে দিদি ?
- আরে এটা তো ফোটো ফ্রেম ।
- কই দেখিনি তো আগে ।
- কি করে দেখবি ? এতো তোর জন্মানর আগের ঘটনা । বাবা কে ছোটো মাসী করে দিয়েছিলো বাবার জন্মদিনে , তার জাম্বুকে ।
- এতে তো লেখা – ‘যে ভালবাসে সে ব্যথাও বোঝে - সুমি’ । সুমিতা তো ছোটো মাসীর
নাম ছিল রে।
- হ্যাঁ , আর এটা দেখে মা’র কি রাগ । বাবার সাথে টানা পনেরো দিন কথা বলেনি । শেষমেশ সেই উপহারের ঠাঁই হল খাটের নীচে ? কি আর করবে বেচারা বাবা ।
- দিদি মা খুব ভালোবাসতো না’রে বাবাকে ?
- বোকা বোকা কথা বলিস না ।
- দিদি তুই ভালবাসিস অঞ্জনদা কে ?দিদি কোনো উত্তর করলো না। দিদির মুখটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল , কি জানি কেন চোখের কোণে জল । আমি প্রসঙ্গ বদলালাম ।


ছিলো বৃষ্টির ঘ্রাণময় অবিরাম দুর্গ,ঝর্না শহর ছিলো ফ্রেমে ফ্রেমে আঁকা। আমাদের কিন্তু একটা আগ্নেয়গিরিও ছিল।একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।না, সে আগে জেগেই ছিলো।যেমন তুমি,আমি,আমরা।তারপর ধুলো এলো,এলো বালির ঝড়,আর আমরা ভুলেই গেলাম তার কথা।সে কিন্তু তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।তার ওপরেই আমাদের ঘর বাড়ি হোলো।মন্দির,মসজিদ।আর সময় যত এগোতে লাগলো আমরা তার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে লাগলাম।সে কিন্তু তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। শরীরে হাত রাখলে সে উসকে দিতো ওম।আর হাত উল্টোলেই ঘুম।


- দিদি ওই দিকে চল তোকে একটা জিনিস দেখাবো।
- কি’রে?
- চল না,গেলেই দেখতে পাবি।জল কিন্তু ঢুকেই যাচ্ছে । কোথা থেকে আসে এতো জল কে জানে ? জাহাজ কি কাঁদছে তবে ।দিদি খাটের গা বেয়ে বেয়ে চল । নাহলে মুশকিল । দিদি সম্মতির ঘাঢ় নাড়ল । আমিও এগিয়ে চললাম – ‘বাবু এই দ্যাখ তোর আর এক কীর্তি’ । - কি’রে ? এই যে বাবুই এর বাসা । মনে পড়ছে কিছু ?’ - হুম পড়ছে ।
- সেবার তো ম্যাকলাস্কিগঞ্জে গেছিলাম । বাংলোর হাতায় বসে বসে গল্প করছিলো বাবা , মা , আর ছোটো পিসী । আমি একটু দূরে ।
- দূরে কেন ছিলি আমি জানতাম , তার আগেই তো লাল্টুদার সাথে তোর ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে । মা উত্তম মধ্যম দিয়েছিলো ।
- তুই চুপ করবি । আর তুমিতো শ্রীমান চলে গেছো ছোটো পিসীর ছেলে অলীককে নিয়ে । কোথায় কে জানে । মা অনেকক্ষণ ধরেই তোদের জন্য উসখুস করছিল। তোরা তো এলি , কি আনন্দ তোর চোখে মুখে ।
- হ্যাঁ,এলাম তো।
- ‘আর তুই কি করলি , মা তখন বসে এক মনে উল বুনছে , সেবার তো মার জন্যই যাওয়া । কি প্রবল অসুস্থ মা ।ডাক্তারকাকু বলেছিলো বাবাকে – ‘স্ত্রী কে নিয়ে একটু
চেঞ্জ - এ যাও’।সেখানেও তোর টেনশন না দিলেই চলছিলো না। তোরা এলি যেন যুদ্ধ জয় করে এমন একটা ভাব । পেছন থেকে মার চোখটা জাপটে ধরলি । মা বলছে- ‘ছাড় ছাড়’ । তুই বললি - ‘মা তোমার জন্য কি এনেছি দ্যাখো’ । মা চোখ খুলতেই শকড্ । তোর হাতে ধরা বাবুই পাখীর বাসা । কোথা থেকে এনেছিলি কে জানে । মা তো রেগে কাঁই । তুই তখন বলছিস মাকে । ‘তুমি যে বলো আমার একটাও বাসা নেই । তাই তো এনে দিলাম’ । মা দিলো একটা ঠাস করে চড় বসিয়ে ।আর তুই ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করেছিস ।যাই বলিস বাবু,খুব ছিঁচকাঁদুনে ছিলি কিন্তু তুই।
– আমি অত বুঝিনিরে দিদি । আমি ভেবেছিলাম মা কেবল বাসা বাসা করে , তাই এনেছিলাম কত কাঠ খড় পুড়িয়ে । জানিস তখন তো মা চড় মারলো । পরে যখন তোরা সব্বাই ঘুমিয়ে পরেছিস মা আমার কাছে আসলো । অনেক হাত বোলালো মাথায় ।
বললো -‘ আর কখনো এমন করবে না বাবু।কারো বাসা ভেঙ্গে দিতে নেই’ । আমি মার কাছে ক্ষমা চেয়েনিলাম সে রাতে। ওই তো দ্যাখ সেই বাবুই এর বাসাটা । আমি লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলাম হোল্ডঅল এর ভেতর করে । আর নিয়ে এসে পাছে মা দেখে ফেলে তাই জাহাজের নীচে...
এদিকে জাহাজের তলা জলে ভরে গেছে । জালের ওপর এতক্ষণের জানা প্যাডলিং বিদ্যেতে আর কাজ চলছে না,জালে প্যাডলিং করাই যাচ্ছেনা। এবার শুরু সাঁতার । ওমা দেখি পায়ের পাতাগুলো কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে , আর আঙ্গুলগুলো জুড়ে যাচ্ছে ...
- চল দিদি ওদিকে ।
- ওদিকে কি আছে?
- এই যে,মা’র এক বেলোর হারমোনিয়াম।
- জানিস বাবু মা’র খুব শখ ছিলো গায়িকা হওয়ার।
- দিদি হঠাৎ মা’র হয়ে কথা ? তুই আবার কবে থেকে মা সোহাগী হয়েছিস? আমি তো জানতাম মা আর তোর আদায় কাঁচকলা।
- চুপ কর,মেয়েদের কষ্ট মেয়েরাই বোঝে।মা কি ভালো গান গাইতো। আমাকে কত গুলো গান শিখিয়েছিলো । আমি সে সব গান গেয়ে কম্পিটিশনে প্রাইজ ও পেয়েছি । তুই আর সে সব খবর জানবি কি করে।
- দিদি তোরই মনে নেই মা আমাকেও গান শিখিয়েছিলো।তুমি নির্মল কর,মঙ্গল করে...তা বলে এই হারমোনিয়ামটা কিন্তু হরিবল।‘সা’ টিপলে ‘মা’ বাজতো।কোথা থেকে পেয়েছিলো বলতো?
- এক অন্ধ ভিখিরীর থেকে,সে নাকি মামা বাড়িতেই থাকতো।মা তাকে খুব ভালোবাসতো,যত্ন - আত্তি করতো।তাই দিয়েছিলো।মা গান সত্যিই ভালোবাসতো।তাই তো আমাদেরও গান শেখাতো। কিন্তু আমরা সে ইচ্ছের আর মর্যাদা দিতে পারলাম কই !
- তারপর তো তোকে ভাল একটা ভালো হারমোনিয়াম কিনে দিলো মা।তুই ও খুব ফাঁকিবাজ ছিলি দিদি।
দিদি আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচাল। আমি এগিয়ে গিয়ে ওই হারমোনিয়ামটার বেলো নাড়তে লাগলাম।জলে তো সবই ডুবে,কোনো সাউন্ড হোলো না।কিছু বুদবুদ উঠে এলো শুধু।কি জানি ওরও হয়তো কিছু বলার আছে।
- দিদি তুই কোথায় রে?
- এই দিকে রে।
- কি করছিস?
দিদি দেখি একমনে গান গাইছে জলে সাঁতার কাটতে কাটতে – ‘রিমি ঝিমি গিরে সাওন’
- কি’রে দিদি হঠাৎ এত ফুর্তি মনে?
- এসব গান তুই শুনিসনি।
আমি সাথ দিলাম – ‘সুলাগ সুলাগ যায়ে মন’
- দিদি হেসে বললো তুই আবার এসব গান জানিস?
- হুম লতা আর কিশোর।
- বইটার নাম বলতে পারবি ?
- হুম,মঞ্জিল।১৯৭৯।
- বাবা তুই এতো জানিস?
আমি কতগুলো ক্যুইজ চ্যাম্পিয়ন তুই জানিস ?
আধ ভেজানো দরজার ওপারে ছিলো প্রতীক্ষার বাসা,দুঃস্বপ্নের ও ছিলো নশ্বর সঙ্গীত।আমাদের কিন্তু একটা আগ্নেয়গিরিও ছিল।একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।না, সে আগে জেগেই ছিলো।যেমন তুমি,আমি,আমরা।তারপর ধুলো এলো,এলো বালির ঝড়,আর আমরা ভুলেই গেলাম তার কথা।সে কিন্তু তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।তার ওপরেই আমাদের ঘর বাড়ি হোলো।মন্দির,মসজিদ।আর সময় যত এগোতে লাগলো আমরা তার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে লাগলাম।সে কিন্তু তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। শরীরে হাত রাখলে সে উসকে দিতো ওম।আর হাত উল্টোলেই ঘুম।


- দিদি শোন এবার এদিকে আয়।
- ‘ওদিকে তো অনেক কুয়াশা রে বাবু, কি করে যাবো?’।
- তুই না বিয়ে করে কেমন যেন ভোঁদাই হয়ে গেছিস।আগেতো দিব্বি আম গাছ,জাম গাছ করে বেড়াতিস। তেমন করেই আসবি কুয়াশার ভেতর যেমন করে লোকে সাঁতার কাটে । কিন্তু জাহাজের নীচে এতো কুয়াশা এলো কোথা থেকে বলতো ?অ্যাই দিদি কোথায় গেলি রে ? দিদি সাড়া দিচ্ছে না ।আরে ওই লোকটা তো চেনা লাগছে , ঠিক আমার মত দেখতে - কে উনি ? দিদি ততক্ষণে ভ্যানিসড্ । যাক বাবা এবার খুঁজে পেয়েছি দিদিকে । - এই দিদি ওই লোকটাকে চিনতে পারছিস? দিদি কানে কানে বললো – ‘দাদু।নিজের দাদুকেও চিনিস না ! কি লজ্জ্বা !’ আমি বললাম – না’রে । সে কোন আমার দু বছর বয়সে দাদু তো মরে হেজে ভূত হয়ে গেছে । এখানে এলো কি করে? – ‘আমাদের ডাকছেন উনি,চল যাই’। একটা হাল্কা আলোর মধ্যে একা দাঁড়িয়ে দাদু । পাশে ঘোমটা পরা উনি কি ঠাকুমা? একটা মেঘের ঢেউ এলো আর সমস্ত কেমন যেন আবছা হয়ে গেলো । দেখি মাছেরা আমার পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে । ছোটো ডলফিনগুলো আমাদের সাথে খেলতে চাইছে।ইস্ একটা প্লাস্টিকের বল যদি আনতাম দিব্বি খেলা যেতো ব্যাটাদের সাথে। আমি আর দিদিও ভাসছি । পাশে ভাসছে আমাদের সেকালের সেই ইয়া বড় রেডিওটা । ওতে তখন শিশুমহল চলছে । কারা যেন গান গাইছে , আর গান শেষ হলেই হাততালি।আমরাও হাততালি দিলাম । সকালের একটা হাল্কা আলো এসে পড়েছে জলের মধ্যে , কি মিষ্টি আলো । ওমা দেখি বয়স কমে যাচ্ছে আমাদের , হাতের পাতায় আর কোনো রুক্ষু ভাব নেই ,গাল মসৃণ ।
- দিদি তোর ও তাই হচ্ছে? চল নতুন করে সব শুরু করবি? ।দিদি প্রথমেই ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কেঁদে ফেললো , তারপর বললো –‘আমি কিন্তু লাল্টুদা কেই বিয়ে করবো তাহলে’ । – আর অঞ্জনদা ? দিদি উত্তর করলো না । দিদির চোখ থেকে জল এসে জাহাজের খোলের মধ্যে থাকা নীল জলে মিশছে । আমার ও খুব মন খারাপ হয়ে গেলো । তবু কথা বলেই চললাম। বললাম - আমি কিন্তু এবার খুব ভালো করে পড়াশুনা করবো । আর মাকে আর কোনো কষ্ট দেবো না প্রমিস । কথা বলতে বলতে দেখি পাস দিয়ে আমাদের বাড়ির সেই কবেকার পোষা ভুলু কুকুরটা ভেসে যাচ্ছে সাঁতরাতে সাঁতরাতে । - আরে দিদি এতো পাক্কা দশ বছর হল মরে গেছে রে । দিদি বললো –‘কেমন জুলজুল করে তাকিয়ে আছে দ্যাখ’।
- আমাদের দিকেই আসছে । চিনতে পেরেছে ঠিক ।ও ডাকলো ‘ঘেউ’ আমি শুনলাম ‘বাবু , কেমন
আছিস ?’ আমি বললাম - আমাদের সাথে যাবি ? ওই দ্যাখ দিদি তোর সেই ব্যাগটা ও মুখে করে নিয়ে এসেছে , সেই যে যেটা হারিয়ে গেলো বলে তোর কি দুঃখ । কি কান্না । সেটা ও ঠিক খুঁজে বার করে এনেছে । দিদি ভুলুর মাথায় হাত বোলালো । ও খুব খুশী । জলের মধ্যেই পরিষ্কার বুঝলাম ও লেজ নাড়িয়ে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলছে । আবার আমাদের ডাকছে ও। আমরা এখন ওর পাশে পাশে ভাসতে ভাসতে যাচ্ছি । ভুলু আমাকে মুখে করে এনে দিলো একটা কৃপাণ । দিদি বললো –‘এটা কিরে ভাই?’ আমি বললাম - সেই যেবার ইন্দিরা গান্ধী মারা গেলো , আমাদের গোপী মোহন দত্ত লেনের সামনে যে পেট্রোল পাম্প সেখানে একটা পাঞ্জাবী ড্রাইভার এসেছিলো কিএকটা কাজে যেন । ওকে সব্বাই ঘিরে ধরে যখন মারতে যাবে , আমি কি করে যেন ঢুকে পড়েছিলাম ভীড়টার মধ্যে । আর মারকুটে লোকগুলো কে,ভীড় কে ভয় না করে হঠাৎ বলে বসেছিলাম – ‘উনি আমাদের বাড়ীতে এসেছেন ।ওকে কেউ মারবে না’ ।কি জানি অত সাহস সেদিন কি করে এসেছিলো অত্তটুকু বয়সে । আর তারপর ওই সর্দারজিকে বাড়ীতে নিয়ে এসে জল খাওয়ালাম । মাকে সব বললাম । মা বললো-‘খুব বড় কাজ করেছো’ ।সেই প্রথম কাছ থেকে দেখা মৃত্যু ভয় । লোকটা তখনো কাঁপছে । আমাকে বললো- ‘খোকা বাবু এই নাও এটা তোমায় দিলাম’ -বলে ওর কৃপাণটা আমায় দিলো ।আমি সেটা সটান জাহাজের নীচে চালান করে দিলাম। পাছে মা কিছু বলে। দিদি আমার পিঠ চাপড়ে দিলো । ভুলু আবার ডাকছে । এবার নিয়ে গেলো আমার সেই ছোট্টবেলার ট্রাই সাইকেলটার দিকে।আমি দেখা মাত্রই ফিদা - অ্যাই দিদি চড়বি?

- তোর মাথা খারাপ হয়েছে না’কি?
- কেন?
- এই হেভি শরীর নিয়ে চড়ি আর পরে হাত পা ভাঙ্গি আর কি।
- ধুর দিদি তুইও না,এখন তো তোর কোনো ওজনই নেই,তুই তো জলে ভেসে।
- ও তাই? তাই যদি হয় তবে সাইকেলটারও তো ওজন নেই রে ভাই।ও কি করে আমাদের নেবে?
বলতে বলতেই দেখি সাইকেল টা দুবার নড়ে উঠলো।মাথা নেড়ে দিদির কথায় সম্মতি দিলো বোধহয় । এই জলের মধ্যে এই সব অসভ্যতা ওর ও পছন্দ নয়।
প্রজন্ম থেকে জন্মান্তর,কেউ অকারণে বিশ্বাসের গলায় ঘন্টা বেঁধে ছিলো,মৃদু হাসি সাইকেলের মতো সরি বলে চলে গেলো জীবন ।আমাদের কিন্তু একটা আগ্নেয়গিরিও ছিল।একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।না, সে আগে জেগেই ছিলো।যেমন তুমি,আমি,আমরা।তারপর ধুলো এলো,এলো বালির ঝড়,আর আমরা ভুলেই গেলাম তার কথা।সে কিন্তু তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।তার ওপরেই আমাদের ঘর বাড়ি হোলো।মন্দির,মসজিদ।আর সময় যত এগোতে লাগলো আমরা তার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে লাগলাম।সে কিন্তু তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। শরীরে হাত রাখলে সে উসকে দিতো ওম।আর হাত উল্টোলেই ঘুম।

আবার দাদু ডাকছে । সারা ঘর জলে জল । আর আমরা ভেসে বেড়াচ্ছি । দিদি বললো – ‘দাদু কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে , চল এবার’। যেতে যেতেই পেলাম আমার পুরোনো প্লাস্টিকের বল , দিদির মাথার কাঁটা , ব্রিটল হয়ে যাওয়া ঠাকুরমার ঝুলি ,ঠাকুমার পান রাখার বাটি,বাবার পার্কার পেন,মায় দাদুর ওপার বাংলার ম্যাট্রিক পাসের সার্টিফিকেট ও । দাদু একটু দূরে কেমন একটা কুয়াশা মাখা পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে । বললো –‘এতোক্ষণে সময় হল?’ আমি লাজুক হাসলাম । শোনো তোমাদের সাথে আমার একটা জরুরী কথা আছে । তোমরা না’কি জাহাজকে বেচে দেবে স্থির করেছো ? আমি চুপ । দিদিও । বাইরে তখন রাত নেমেছে। ... মাছেরা ঘরে ফেরার সময় পাশ দিয়ে যেতে যেতে ঠাট্টা করে গেলো - ‘নাও এবার উত্তর কর বাবু’ ।আমি তা শুনে রাগ করে বলেই ফেললাম – ‘বেল পাকলে কাকের কি?’ওরা ততক্ষনে চলেই গেছে অন্য কোনো জায়গায়,বেকার রাগ করলাম,দিদি কে বললাম সে কথা। এই জলের মধ্যে থেকেও দেখি ঘেমে যাচ্ছি ।কি যে উত্তর করি দাদুকে ... ওদিক থেকে মা ডাকছে - ‘বাবু সন্ধ্যে হয়ে গেলো যে । আর কতক্ষণ?’ ওই কোণ এর দিক টর্চ হাতে সাঁতার কেটে আসছে আমাদের বন্দনা মাসি মানে আমাদের কাজের মাসি, মার খুব বন্ধু। মা বোধহয় খুঁজতে পাঠিয়েছে আমাদের । - দিদি,এই সুযোগ, চল দাদুর পেছনে গিয়ে লুকোই । ওমা ওদিকটা তো পুরো কুয়াশায় ঢাকা , কিছু দেখা যাচ্ছে না-দিদি কোথায় তুই????
জাহাজ ডুবির পর কি জানি এতো কুয়াশা এসে ভীড় করে কেন ? দাদু আমাদের আড়াল করে দাঁড়িয়ে , আর আমরা কুয়াশায় মিশে যাচ্ছি ,জাহাজ তখন একটু নড়ে চড়ে বসলো আর তারপর চলতে শুরু করলো।না আর কোনো ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ নেই মোটেই। পিরানহা,আর শার্ক দের পাশে ফেলে জাহাজ চললো ...দাদু ডেকের ওপর ক্যাপ্টেনের মত দাঁড়িয়ে। হাতে সার্চ লাইটের বদলে আকাশপ্রদীপ। দাদুর ঠিক পেছনে ঘোমটা পরা ঠাকুমা,আর সাথে আমরা। আমরা মানে আমি,দিদি,ভুলু কুকুর,এক বেলোর হারমোনিয়াম,তিন চাকার সাইকেল,দিদির সাইড ব্যাগ আরও কত কি।জাহাজ ঘর,চৌকাঠ পেরিয়ে যাত্রা করেছে ততক্ষণে পেছন দিকে,কোথায় কে জানে???...মা আর বাবা ভয়ে চীৎকার করে ডাকছে আমাদের নাম ধরে,দিদির হাতে শক্ত করে ধরা লাল্টু দার চিঠির তোড়া,আর আমার হাতে বাবুই এর বাসা। বিষুবরেখার নীচে আলতো নীল সন্ধ্যা কে ছুঁয়ে পরিযায়ী পাখি,মাস্তুলের ছায়া, শ্যাওলা,আর মাছেদের বন্ধু হয়ে বালি খুঁড়ে খুঁড়ে আমরাও রওয়ানা দিলাম সামনের টান ফেলে পিছন পানে।মা হাত নেড়ে যেতে বারণ
করছে,বাবা,বন্দনা মাসী ... সব্বাই, কেন এত ভয় ওদের কে জানে এত কিছু হারানোর পর ও ।
আমাদের কিন্তু একটা আগ্নেয়গিরিও ছিল।একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।না, সে আগে জেগেই ছিলো।যেমন তুমি,আমি,আমরা।তারপর ধুলো এলো,এলো বালির ঝড়,আর আমরা ভুলেই গেলাম তার কথা।সে কিন্তু তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।তার ওপরেই আমাদের ঘর বাড়ি হোলো।মন্দির,মসজিদ।আর সময় যত এগোতে লাগলো আমরা তার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়তে লাগলাম।সে কিন্তু তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। শরীরে হাত রাখলে সে উসকে দিতো ওম।আর হাত উল্টোলেই ঘুম।
সে রাতে সমস্তক্ষণ জুড়ে পিপাসার মতো অগ্ন্যুৎপাত হলো,সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো শিশির আর অজ্ঞতার বস্তুমূলক দ্বন্দ সহ সব গোপন নকশা । তত্ত্ব আর প্রজ্ঞার ভীড়ে লোকগাঁথা ঘুমিয়ে থাকলো,বাইরে কড়া নাড়ছে রাশি রাশি ছাই,সে পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে বিষাদ – লাভা।ধোঁয়া উঠছে প্রবল।কোথাও হয়তো ভাত ফুটছে,আর জল নেই এক ফোঁটা জল নেই,আর পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী।একটু পর সে হাঁড়ি থেকে ভাত তুলে নেবে কোনো এক উচ্চবর্গীয়,এবং অবশ্যই নিম্নবর্গের কেউ ও।পোকামাকড়রা ওড়াউড়ি করছে কান্নার শব্দে। ওদের ও তো ভাই আছে,পিতা,মাতা। কি জানি কি করে যেন ডুবো জাহাজ গিয়ে ধাক্কা মেরেছে ওই ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিতে।আর তারপর...যা কিছু তারপর অথবা আগেই ঘটেছিলো।