সব তারারা নেই; দিনের আলোর গভীরে

ঊষসী কাজলী


যখন প্রথম শুনি কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই তখন বয়েস ওই দশ এগারো। কফি হাউস কী তা আমাদের পশ্চিম বাঙলার তস্য গ্রামে বসে একটি দশ এগারো বয়েস কি জানত? একুশ শতকের শুরু। অথচ এই বাঙলার গ্রামগুলি কীভাবে বেঁচে থাকে? হ্যারিকেন জ্বেলে। হ্যাঁ সত্যি। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। উঠোন পেরিয়ে লঙ্কা আর বেগুনের ছোট্ট খেত। দাওয়ায় জীর্ন মাদুরে হ্যারিকেন জ্বেলে দুটি ভাই বোন। গুবরে পোকা পালটি খেয়ে পাশেই পড়ে গরগর করছে। আর দাদার হাতে ঝাঁটার কাঠি। বলপেনের রিফিলের মুখ খুলে ফেলে পেছন থেকে সে ভরে দিল কাঠি। ঠোঁটে লেগে আছে নীল কালি। সেই সুযোগে বোনের হাতে প্রিয় টকটকি পোকা, দেশলাই বক্সে ভরে দিলেও বোকার মতন নিজের ঘাড় মটকে মটকে টকাস টকাস করে যাবে। কী আমোদ!! তখন সদ্য ইলেকট্রিক এসেছে, ঘরে ঘরে ১০০, ২০০ ভোল্টের বিজলি বাতি। বাল্বের আলোয় মায়ের কড়াই ফর্সা হয়না, রাজ্জ্যের পোকা মাকড় এসে জোটে। দুম করে সব অন্ধকার। সিনেমার অন্ধকার নয়। সিনেমার অন্ধকারে নায়ক নায়িকাকে অনায়াসে দেখা যায়। এ অন্ধকার নিকষ, তখন বোঝা যায় কৃষ্ণ পক্ষ। কফি হাউস ফিরে আসে ফের ইলেক্ট্রিকের সঙ্গে সঙ্গে। কফি হাউস আছে কফিহাউসেই (বইপাড়াতেই), অথচ কী যে মাঝখান থেকে গুবলেট হয়ে গেল তাকে ঠিক ধরা যায় না। তার নাম অন্ধকার, যার সঙ্গে কফি হাউসের সুতো নেই, তবু কারুর কারুর আছে। অন্ধকারের পুরনো একটা শোক ঋজুদের রোজকার অফিসে ওঠার খয়ে যাওয়া সিড়ির মতন। ছিল- আছে - অথচ ...
ইতুদি, রঞ্জুর জেঠু যার ভালনাম দিয়েছিলেন শেফালি তাকে কি কেউ ওই নামে ডাকত? জানি না, একবার স্কুল থেকে একটা চিঠি পৌঁছে দেবার ভার পড়েছিল, তাতে লেখাছিল শেফালি রায়। পিতা- অনঙ্গনাথ ধর। হ্যাঁ, ইতুদির খুব রাগ ছিল ধর টাইটেলটা নিয়ে। তা সে বিয়ের পর রায় হয়েছিল তা যেমন জানতাম না তেমনি ইতুদির অমন ব্রণওলা গোলগাল মুখ কীকরে শেফালি হতে পারে তাও মেলানো যায়নি। সেকথা থাক এখন। সেই ইতুদিকে সব্বাই ডাকত, নাক আর কান ফোঁড় করানোর সে ছিল ওস্তাদ। আর এই ইস্যুতে তার পাড়া বেড়ানোর সাথে সাথে খুচরো পয়সা, গন্ধ তেল, ভাজা চাল, বাগানের বেল কখনওবা পুরোনো তেতুল এসব জুটে যেত। ইতুদি বলত তার নীলিমা দিদিমনিকে নাকি একেবারেই ভাল লাগত না কেবল ওই মধ্যবয়সেও নাক বিঁধানোর জন্যে তাঁকে রাজি করে ফেলবার পর সেই সিড়িভাঙা অঙ্কের নীলিমাদিও ইতুদির খুব বন্ধু হয়ে যায়। নাক কান বিঁধিয়ে দেয়ার পাশাপাশি কার শেল কোথায় বিঁধিয়ে দিলে কাজ হবে সেসব ভালই জানত ইতুদি। কুটুমবাঁদির মেয়েদের নাক এখন আর বেঁধানো দেখি না। ইতুদিকে এ কথা জানালে সে কী দুঃখ পাবে! ইতুদিরা শেফালি রায় হয়ে আসানসোল চলে গেলে আর কারুর নাক বিঁধানো হয় না। পাড়াতুতো কাকা ভাইঝির অবৈধ ছাদ, দীলিপ সাহার বাঁজা বৌয়ের ঘাড়ের তিল সবই এখনও একই রীদমে কীভাবে পাঁচকান হয়ে যায়। আর সেই সব দিনে লাগানি ভাঙানি মানেই ইতুদি, কত মুখ ঝামটা, কত মা বাপ তোলা, আবার সেই রিন্টুর মাসিক জ্বর সারবার মহৌষধ কান বিঁধানো। কেমন যে আছে আমার শিল্পী ইতুদি...
আমাদের ছাদের ঘরে একটা পুরানো ট্রাঙ্কে যে অমন সুন্দর নকশা তোলা কিছু আসন ছিল জানতামই না। দশমীর দিনে এবার শেষবারের মতন ব্রাহ্মণ ভোজন! কেন যে শেষ বার বাবা সেসব কিছুই বলেননি। কিন্তু আমার চোখ ওই আসন গুলো থেকে সরেই না। পানা পুকুরের ভিতরের জলের মতই শান্ত আর সুরক্ষিত স্মৃতি আমাকে চুপিচুপি ডেকে নিয়ে চলল। সময়টা দুপুর গড়ানো অবসর। মা জেঠিমার কোলে ঝুঁকে ঝুঁকে ঘর গুনছে আর নিজের কোলে তার জেঠিমার অনুকরণ। হয়ত জেঠিমার মুখে একটা বিজয়িনীর হাসি ছিল, আমি তা দেখিনি, কেবল পিঠ বিছানো তেল চপচপে চুলের এক অবয়ব খেলে যায় চোখে। কত আসন তৈরি হয়েছিল এই সব দুপুরে তার ইয়ত্তা আছে?? জ্যাঠামশায় ছিলেন সে সময়ের আধুনিক। লাঠি ঠুকে ঠুকে বারবার বারঘরের ওদিকে চলে যেতেন। প্রাকৃতিক কাজ সেরে ফিরবার পথে বিড়বিড় করতেন- মেইছেলান গুলার ই এক নেশা!! বিড়ির নেশার চিয়েও নেশা। ইদের চোখ গুলান যে খারাব হচ্ছে কত খারাব হচ্ছে... কথার সবটুকু শোনা যেত না। সে কারণেই হয়ত তাঁর দুশ্চিন্তা মেয়েলী আসরে স্নেহ বলে মনে হত। সুন্দর আসনগুলি কেবল অতিথিদের। আমাদের জন্যে অর্বাচীনের ভুল ফোঁড়ের মকশো করা আসন, সে আবার পাড়বিহীন। সেরা হাতের কাজগুলি দেখা যেত ক্বচিৎ। রঙের কীসব মনোহরণ কম্বিনেশান। এত সেন্স যে তারা কোথায় পেয়েছিল ! তাদের এক একজনকে আধুনিক চলচিত্রকার যদি পয়সা দিয়ে পালেন তাদের লাভ বই ক্ষতি হবে না। পেখম তোলা ময়ূর, বাহারী গোলাপ, সুখী কোলাজ, নায়িকাভিসার আরও কত কী ফুটে উঠত ওই সব দুপুরের নির্ঘুম মনোযোগে, সরু সরু আঙুলের দুঘর দুঘর চাল বড় মন্থর আর গহীন। যাবতীয় কারুকৃতির পরে ছোটকার উপর এসে পড়ত শেষ ভার। কমল ঠাকুরণের বাড়ি এই সব আনকোরা আসন চলে যেত নানা কিসিমের পাড়সহ সেজে আসতে। আমাদের নূতন কাকিমা সব সময় হেথা সেথা থেকে পাড় সংগ্রহ করতেন। তার বাপের বাড়ি হালিসহর, সে শহর যে কেমন তা কেবল নূপুর পিসি জানত, যত গল্প তা তো নূতন কাকিমা কেবল তাকেই শোনাত। বাপের বাড়ি থেকেও অভিনব ধরনের পাড় আসত আসনে বসানোর জন্যে। আর কেউ তেমন একটা ভাল পাড় রাখত না। নাকি চাইলেও পেত না, কে জানে! একটা চাপা অহংকার ছিল নূতন কাকিমার সেসবের জন্যে। সেই সব পাড় সহ যখন আসন ফিরে আসত, আমাদের কী আমোদ। অনামী শিল্পীদের মুখে কারোর অসন্তোষ ও ধরা পড়ত। আবার হারিয়েও যেত এটা সেটার গল্পে। সে আমলের কিছু আসন হয়ত মা ঘুছিয়ে রেখেছিলেন বা সেই সব দিনের শিখে নেওয়া নকশা। আজ মাকে ধরতেই হবে ডিনারে আসন পেতে দিতে ...
গত দুদিন আগে প্রিয় মাস্টারমশায়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। ওঁদের বাড়ি থেকে বেরোবার মুখে একটা টিউবকল হাতলহীন কী দুর্দশায় পড়ে আছে দেখে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। এই সব ছ্যাঁতের মানে কেউ কেউ বোঝে, তারা গরমের দুপুরে বাঁশঝাড়ের ভিতর কড়কড় শব্দ অনুসরন করতে করতে কোনো এক সাধারণ দিনে নাম না জানা সাপের সঙ্গম দেখে ফেলে। মাস্টারমশাই আমাকে এগিয়ে দিতে বাইরে এসেছিলেন খালি পায়েই। তাই বেশি দূর এগোননি অথচ আমার ওই থমকে পড়া সাইকেলের বাঁ পা ঠেকানো অবস্থা তাঁকে হয়তবা ভাবিয়েছিল। উনি ভিতরে গিয়ে চটি পরে আসেন। কী করে বুঝলেন ওনার আসা অব্দি আমিও থেমে থাকব। যেসবের যুক্তি হয় না কেউ কেউ বলেন আসলে হয়, সেই হওয়াটা স্পষ্ট হয়ে গেলে মজা থাকে না। থাকে না বুঝি? স্যার এসে দাঁড়ালেন কলতলায়। পাশেই একটা পেয়ারার বুড়ো গাছ নুয়ে আছে। তার ছায়ায় এসে কিছুক্ষণ সময়টাকে ভুলে গেলাম। আমাদের বাড়িতেও খাটের তলায় এমন সব তৈজস রাখা আছে অব্যবহারে তাদের রূপ - রঙ- গন্ধ ঝিম মেরে আছে। বিকেল নাগাদ কলসী কাঁখে ফেরা এক ষোড়শী এই সময় একজন চিত্রকরের বিষয় হতে পারে কী ? স্নানের ঘাট গুলোয় বড় বড় লতা গুল্ম। আর সেই বিকেলের রমনীয় বৈঠকী কলতলা?? শুনশান, একা আর ক্ষয়াটে। বিপুল তৃষ্ণায় টিউসুনি ফেরত সদ্য যুবার করতল ভরে উঠত এখানে। তার কন্ঠার ওঠানামার সাক্ষী এই টিউবওয়েল। যে মেয়েটির ওড়না ভিজে যায় জল খেতে গিয়ে সেও হারিয়ে গেছে কবেই। কলতলায় কলসীর ঠোকাঠুকির দিন শেষ। মেয়েলী আড্ডা আর আগন্তুকের তৃষ্ণা কলতলাকে ধরে রাখতে পারেনি। যেভাবে সন্ধ্যা সিরিয়ালগুলো গিলে ফেলেছে শীতের দিনের ধান ওঠা মাঠের যাত্রাপালা। নিতাই কাকা অদ্ভুত জোরে জোরে পাট মুখস্ত করত, জানালা দিয়ে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তাম কৌতুকে। বাতাবি লেবুর গন্ধে নিতাই কাকা যতই বুঝে যাক ছেলেছোঁড়ারা জানালার আড়ালে হাসছে তবু তার পার্ট বন্ধ হত না। সারাদিন নিতাই কাকা হাতুড়ি মেরে নরম লোহাকে সেপ দিত আর বিকেলে একা একা বিচিত্র সব ডায়লগ। রাসের মাঠে কী ঝুলন পুর্নিমায় নিতাই কাকা গালের হুদমো জড়ুলটায় বেমক্কা পাউডার ঢেলে সেনাপতি হয়ে যেত। আমরাও ভুলে যেতাম নিতাই কাকার অমন কুৎসিত জড়ুল! আগে থেকে সব খড় বিছিয়ে জায়গা দখল করবার ভার ছিল লেড়ুয়ার। কেন যে ওর নাম লেড়ুয়া, ওর পদবি ছিল কিনা সেসব মনে নেই। লেড়ুয়া সাঁওতাল ছেলে, বাগালি তার কাজ। আর যাত্রার দিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চার আনা করে নিয়ে নিত আগাম। বিনিময়ে সবচেয়ে সেরা যায়গাটা দখল করে রাখত সে। কতবার যে সে গাঙ্গুলি বাবুদের পাশে ভৌমিক গিন্নিদের যায়গা রেখে মার খেয়েছে! হা হা বেচারা কী বুঝবে ভৌমিকের গুড়ের ব্যবসার কাঁচা টাকা যতই থাক গাঙ্গুলিদের আভিজাত্যের পাশে ওসব নেহাত পানসে! আমরা কখনও চার আনা খরচা করে জায়গা রাখার কথা ভাবিওনি। যেখানে মাচা শেষ মানে ওই স্টেজের এক্কেরে ফ্রন্টে বসে পড়তাম, কোঁচড়ে মুড়ি। মুড়ি চিবোনোর শব্দে যাত্রা পার্টির অভিনেতার পার্ট ভুলে যাবার যোগাড়। তবে কিনা ঘাড়ে ব্যথা করত খুব। একভাবে ঠায় জিরাফ হয়ে থাকতে হত যে.......
আগাপাশতলা একই বেড়ের একটা ড্রামের উপর কালো টুপি লাগানো বক্স গুলো যে পোস্টবক্স সেটা জেনেছিলাম বাবার সাথে প্রথম কলকাতা বেড়াতে এসে। গ্রামে আমাদের পিন নম্বর ছিল, চিঠি ও আসত কিন্তু কালো টুপি আর লাল গায়ের পোস্টবক্স আমি দেখিনি। আকাশ রঙের ইনল্যান্ড খামে কেবল ছোটোকাকার চিঠি আসত। তাও যখন ছোটোকাকা টাউন স্কুলের বড় ছুটিতে বাড়ি ফিরত তখন। ছোট কাকার গন্ধ ছিল আলাদা, আমাদের গ্রামে অমন গন্ধ নেই। অন্ধ ন্যাপলাও ছোটো কাকার গন্ধে আমাদের উঠোনে এসে বসে থাকত। ছোটো কাকা এলেই রান্নার বহর বেড়ে যেত কিনা। কাকার বাদে বাবারও চিঠি আসত। কোনোটা খামে ভরা দরকারী চিঠি, আবার পোস্টকার্ড ও আসত। আমার পছন্দের ছিল এইসব পোস্টকার্ড। পোস্টম্যান গোপাল ভদ্র। লোকে তাকে পদবীসহ নামেই ডাকত। বাবা কেবল ভদ্রই বলতেন। ভদ্রকাকুর ঠোঁটে লাল কষ মিশে থাকত পানের। যে ঠোঁট আমার ভাল লাগত পোস্টকার্ডের মতই। এমন ম্লান রঙের একটা মোটা টুকরো কাগজ আমার সংগ্রহে অনেক অনেক আছে। ডাঁই করা। পুপাইকে আমি সেদিন কাবুলিওলার গল্প শোনাচ্ছিলাম। কেন যে পোস্টকার্ডের কথা উঠল। সে আমাকে ধরে পড়ল চিঠি লেখা শিখিয়ে দিতে হবে। আবার তার বিড়বিড়ে অনুযোগ চিঠি ইটস টু হার্ড! ক্লাস সিক্সের ওই বালকের কাছে আমি কীকরে বোঝাব অপেক্ষার সেরা ফসল চিঠি! গোপাল ভদ্র আসে এখনও। তবে ঝিমলি পিসির মতন দৌড়ে গিয়ে আর কাউকে শুধোতে শুনি নি - গোপাল দা......... কোনও চিঠি আছে? ভদ্রকাকু কেবল মাথা নেড়ে সাইকেলে গতি তুলেছিল সেগুনের পাতা মচমচিয়ে। আর ঝিমলি পিসির হারিয়ে যাওয়া নাকি পালিয়ে যাওয়া বরও ওই সাইকেলের তালে তালে অনেক অনেক দূরে হারিয়ে গেছিল। কর্নেলের মত ঝিমলি পিসি পোস্টঅফিস অব্দি হয়ত আর এগোয়নি, হয়ত...

সব নূতন বন্ধুর সাথেই গল্পে গল্পে ছেলেবেলা উঠে আসে মেয়েবেলার আগে পিছে। প্রাইমারী স্কুলের ধূলা একেবারে গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে মায়া হয়! বড্ড মায়া! খালি পা, দাদা দিদির পরিত্যক্ত রঙ জ্বলা একটা ঝোলা আমাদের ইস্কুল বেলা। ইকড়িম মিকড়িম শুরুয়াত আর দুপুর গড়ালে ঢ্যাঙা মাস্টারের ঘুমের তালে তালে কু ঝিক ঝিক। ইস্কুলের বাউণ্ডারি নেই, ছ্যাতলা পড়া টালির ছাদ, আর জন্মের পুরনো সাইনবোর্ড কুটুমবাঁদি বিদ্যায়তন। প্রাকৃতিক কাজকর্ম বড় রাস্তার ওপারে, ঝোপের আড়ালে। সারি ধরে বাদল, অনুপ, মিনতি, তপন, আমিও। দলে দলে হাত মাটি। মাস্টারের ঘুম ভাঙলেই এক হুকুম, নামতা মুখস্ত চাইই চাই। নইলে বেতের ঘা। অনেকদিন বাদে গ্রামে ফিরে বাবলুকে নিয়ে চলে গেছিলাম । ইস্কুল আছে তেমনই শান্ত নাকি একটু বেশিই! পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটা কেটে ফেলেছে কারা। আমাদের ছাড়িয়ে মারুতি ভ্যানে চলে গেল একঝাঁক ছেলেমেয়ে। নূতন ইংলিশ মিডিয়াম। তকতকে মেঝে, সারি দেয়া বেঞ্চ,বড় প্লে গ্রাউড, কেয়ারী করা ফুলের গাছ, ছেলে মেয়েদের গলায় আইডেন্টিটি কার্ড। সৌজন্যে রামকৃষ্ণ মিশন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাঁ খাঁ করা প্রাচীনের পাশে দাঁড়িয়ে পরিবর্তন দেখছি। খুশি খুশি হাওয়ায় ম্যাগির গন্ধ ভেসে আসছে। বুড়া দোকানির গুমটি টা এখনও আছে। গিয়ে বসলাম। চোখ চারিয়ে একটা বয়াম খুঁজছিলাম। বুড়া দোকানির ছেলে আমাকে হয়ত চেনেনা। কী দিব গো বলে উঠলেই আমার সম্বিত ফেরে। লেবু লজেন্স আছে? মৃদু হেসে সে খানিক খুঁজে একটু ডান দিকের বয়াম থেকে একটা অরেঞ্জ রঙের লজেন্স হাতে দেয়। আর জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি কী বলব ভেবে পাইনা। কমলা লেবুর কোয়ার ভিতর আমাদের প্রাইমারী স্কুল একটা আলগা বেনিয়মের দিন সহ হারিয়ে গেল। হারিয়ে তো যেতই। ঠায় কে আর দাঁড়িয়ে থাকে বৃক্ষ ছাড়া। কবি জানেন সময় কীভাবে গিলে নেয় অপ্রয়োজন। আমাদের সেই সব হারিয়ে যাওয়া টিকে থাকল কিছু মরসুমি হাওয়ায় আর কিছু জোনাকির মৃত্যু ঘটল নিরুচ্চার...