নো র‍্যাগিং - হোয়াইল ইট ইজ জাস্ট অ্যান ইনট্রোডাকশন

শৌনক চ্যাটার্জী


খোলসা করে বলি, দুমাস আগের পাওয়া sack letter টা আমার জীবনের সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে,সঙ্গে ভুলিয়েও দিয়েছে যে একদা কলেজ লাইফের হিরোও ছিলাম আমি :-
গল্প নয়, সত্যি ঘটনা লিখছি অবসরে।তবে লেখার ধরন দেখে বুঝতে পারবেন, যে আদতে লেখক আমি নই, অন্য কিছু।আবার দেখতে গেলে অন্য কিছুও না।আসলে যে আমি কি, ঠিক বুঝতে পারছিনা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে।অবসর টাও তো আর অবসর নেই,অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এ ক’দিনে।শুধু কিছু পুরনো কথা মনে পরছে,পাপবোধ টাও জাঁকিয়ে বসছে।আর সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে।এখন তো আবার নিজের হিরো সত্ত্বাটার ওপর ও সন্দেহ জাগছে...............
অন্যদের মতো নয়,বাবা মার রাখা নামেই জনপ্রিয় হয়েছিলাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হস্টেলে ঢোকার পরপরই-বিপ্লব।মনে আছে আমি কলেজে পা রেখেছিলাম ক্লাস শুরু হওয়ার সপ্তাহ খানেক পরে।আর বাবা বলে পাঠিয়েছিল-“র‍্যাগিং ফ্রি ক্যাম্পাস, কেউ কিছু করলে সোজা জেলে ভরে দেব, জাস্ট একটা ফোন করবি তুই আমায়।” প্রথম দিন ই দেখলাম একাডেমিক ব্লকে ঢোকবার মুখে বড় বড় করে লেখা-
“ Say No To Ragging”

আর কিসব সুপ্রিম কোর্টের বুলি আওড়ানো।মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলাম লাইন বাই লাইন।এইসব নিয়ে যে তখনও বিশাল কিছু ভাবিনি। তবে রাতে যখন লাইনে দাঁড়ালাম আমাদের জুনিয়র হস্টেলের সামনে মন তখন একটা কেমন অদ্ভুত অনুভূতি আমায় আনচান করে তুলছিল।প্রথমে একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখলাম কি হয়।এক সিনিয়র ইশারা করল আমাদের ইয়ারের একটা ছেলেকে,ছেলেটা পকেট থেকে একটা খাতার পাতা বের করল। তারপর আমার দিকে আঙ্গুল তুলে ছেলেটাকে বলল, “যা পড়ে শোনা।” ছেলেটা শুরু করল –
“10 Rules for juniors……….. rule no 1 ……”
আমি শুনতে শুনতে চারদিক টা একবার আলত করে চোখ বোলালাম। একটা করে সিনিয়র দু- তিনটে করে ছেলেকে ধরে কিসব ফিরিস্তি নিচ্ছে,বলা ভাল যেন কোনটা খাসি সেটার এস্টিমেট নেওয়া চলছে। আর এক মাতাল সিনিয়র যে কাউকে ধরেনি চিল্লিয়ে প্রলাপ গাইছিল-
“It Is Not Ragging, While It is Introduction।
আমরা কি কাউকে পিটেছিছিছি...?পিটিনিইই ইই।
আমরা কি কারোর মা-বোন এক করেছিছিছি...?করিরিনিনি ি।
আমরা কি জুনিয়রকে ব্ল্যাক-মেল করে ওর পয়সায় মদ গিলেছিছিছি...? গিলিনিনিনি।
আমরা যা করেছিইই It Is Not Ragging, While It is Introduction
র‍্যাগিংকে নিরুদ্দ্দ্দদ্দেশ করে দিয়েছি আমাদের কলেজ থেকে।
কয়েক বছর দাঁড়াও ,করে দেব পুরোওওওও পৃথিবী থেকে।
মনে রাখবে ভাইরা, Ragging is injurious to health,
সুপ্রিম কোর্ট বলেছেএএএ “ Say no to Ragging”
আর আমরা বলছি আমরা তোমাদের পাশেই আছিইইই।
And It Is Not Ragging, while It Is Introduction
আমরা কি কাউকে পিটেছিছিছি...?পিটিনিইই ইই............”
আমার অসহ্য লাগছিল, তাই একটু সাহস করেই জিজ্ঞেস করলাম “দাদা এগুলো কেন মানতে হয়? মানে না মানলে কি হয়??” চারদিক ধেকে সবাই আমায় এমন ভাবে ধেয়ে এল যেন আমি গ্রেগ চ্যাপেল।সবার মুখেই একটাই কথা, সাহস তো কম না।ওদের পথ আটকিয়ে দিল ওই মাতাল সিনিয়রই।
“Adolescence টইটম্বুররর বলে আজ ছেড়ে দিলাম।অবশ্য গায়ে হাত কোনদিনই তুলতাম না।আমাদের সঙ্গে যা হয়েছে তা কক্ষনো তোমাদের সঙ্গে নয়। খালি বলে দিই বাবা, professional studies এ এগুলো মাইনতে হয়, আর সিনিয়রকে একটু সম্মান দিইইইতে হয়। নাহলে ওই যেটার পরে যেটা হয়,যেটার পরে যেটা হয়।সম্পর্ক টা খারাপ হবে,সেটা অবশ্য বাকি দিনগুলোতে আমরা তোমার থেকে বুঝে নেব।আগামী দিনে professional field ও তোমার থেকে পাওনা গণ্ডায় সেসব হিসেব বুঝে নেবে........ ”।
আমি আমার ইয়ারের ছেলেগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম যে ওরাও কষ্ট পাচ্ছে খালি মুখ টা খোলার সাহসটুকু নেই ওদের, বা পরিস্থিতি সঙ্গ দেয়নি,হয়তো বা উপযুক্ত লিডার পেলে ওরাও ঘুরে দাঁড়াবে।ভয় টা ছোটবেলায় পাশের বাড়ির ছেলেটার চোয়াল ফাটানোর দিন থেকেই ছিল না।আর ছিল না এই সিস্টেমে আমার বিশ্বাস। অগত্যা আমি বিপ্লব, নামে ও কামে।
ঘটনার জল অনেক দূর গড়ায় আর এসব সিস্টেম ধুয়ে মুছে কিছু দিনেই। introduction এর রীতি টার নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা করে দিয়ে ছিলাম আমরাই, ওরফে কলেজের আর পাঁচ ছেলে মেয়ের ভাষায় আমি। সুতরাং উত্থানের পথটা ধরতে আমার অসুবিধা হওয়ার কথা না,সুন্দরী মেয়েদের প্রেম নিবেদন পেতে দেরি হওয়ার কথা না,যেকোনো কেউ পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে তার কাছ থেকে সৌজন্যমূলক হাঁসিটাও মিস হওয়ার কথা না। ভুলে গেছি বলতে কেউ কিন্তু আমায় ছুঁতেও পারেনি।অতএব আমি নায়ক......
আমি নায়ক ,অন্তত যতদিন ওদের চোখের সামনে ছিলাম। খালি এটুকু আড়চোখে দেখেছিলাম যে ইয়ারগুলো আর আগের মত একে অপরের মধ্যে মিশে যেতে পারেনা,থাকে।সিনিয়র-জু িয়র ভাই-বোন কোনওটার দোহাই দিয়েই নয়। প্রত্যেকে প্রত্যেকের মত থাকে।আর সেই দিন টা- দুপুর দুপুরই ওরা মদ খেয়ে ছিল কলেজটাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে, আর একটা ছেলে আমায় সেদিন মারতে এসেছিল। “কলেজ টার প্রান কেড়ে নিয়েছিস তুই ,শালা তোর জন্য সব সম্পর্ক খারাপ হয়েছে।” সেই রাতের মাতাল টাই আবার আটকেছিল।
বাদ দাও সেসব কথা, হিরোর মতই চাকরি নিয়ে কলেজ ছাড়লাম।কিন্তু সঙ্গে নিয়ে ছাড়লাম হিরোগিরি করার বদ অভ্যাস নিয়ে(যদিও তখন বুঝিনি ‘বদ’ )।হিরো হওয়ার সঠিক সুযোগ আসার আগেই terminating letter টা হাতে এসে পৌঁছাল। বসের কেবিনে গিয়ে চোখে চোখ রেখে বললাম “কেন?কারণ টা কি জানতে পারি? একটাও কারণ দেখাতে পারবেন আপনি?”
“শোনো বিপ্লব, যদিও কারণ দেখাতে আমি বাধ্য নই। তাও একটা নয়, একের অধিক কারণ আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে একটা সাদা কাগজে গোদা বাংলায় লিখে তোমার ডেস্কে পাঠিয়ে দেব।কেন জানো?”
কোনো এক কৃত্তিম হাসিমুখে সে বলল-
“Because I’ve always liked your damn bad confidence. Again I m telling because I’ve always liked your damn bad confidence. হয়েছে?now you may leave.”
১) ছেঁড়া ফাটা জিন্স, মাথায় বার্গান্ডি চাকরিতে ঢোকার একমাসের মধ্যে?
এটা তো আজকাল কার ফ্যাশন, ভাবতে না ভাবতেই বজ্রপাতের মত মাথায় এলো সিনিয়রের রুল নম্বর ওয়ান।
• “এক বছর ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট, ছোটো করে চুল কাটা থাকে যেন।”
কোন রকমে মন টা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম, আর পড়তে শুরু করলাম আবার।চিঠিতে এও লেখা ছিল যে, এ বিষয়ে করা শো-কজের উত্তর না দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছি নাকি আমি। কিন্তু কোনও শো-কজ লেটার তো আমি পাইনি। গোপনে খোঁজ খবর লাগালাম, আর বুঝলাম পিওন ইন্দ্রর কাজ এটা।বুঝতে অসুবিধা হলনা যে ও আমাকে সহ্য করতে পারত না সেই বকশিস না দেওয়ার দিন থেকেই।আরও একবার অদ্ভুত ভাবে মনের ভেতরে হাঁসতে থাকল সেই রুল।
• “ক্যান্টিনের কাকা থেকে ঝাড়ু দেওয়া মাসি সবার সাথে ভাল ব্যবহার আর কেউ যেন অসন্তুষ্ট না হয় তোমার প্রতি।”
প্রচণ্ড রাগ ধরলেও ইন্দ্রকে মিথ্যা প্রমান করার মত রেপুটেশন আমার তৈরি হয়নি। আগে বাড়লাম চিঠি টার। লেখা আছে বড় বড় করে যে সিনিয়র কলিগ কে কোন সহযোগিতা নাকি আমি করিনা আর নাকি টিম ওয়ার্ক এর কোন চিহ্নই নাকি আমার মধ্যে নেই। বুঝলাম এটা সমীর সেনের কারসাজি। ডিউটি শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগে অফিস ছেড়ে বেরোনোর জন্য জুনিয়র ছেলে গুলোর হাতে নিজের কাজ টা হাঁসি মুখে ধড়িয়ে আর না করলে বসের কানে ফুঁসে উনি ওনার সিনিয়রিটি বজায় রাখেন। আমি বুঝে পেতাম না, আমি যখন নিজের বন্ধু দের অতিরিক্ত কাজ করতাম না বা নিজের কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করাই না, তখন ওনার কাজ তাই বা করতে যাব কেন অযথা। চার বছর আগের পুরনো কয়েকটা রুল হঠাৎ এভাবে উজ্জীবিত হয়ে উঠে সে তার চিতকারসম হাঁসি দিয়ে আমার মন টা এফোঁড় ওফোঁড় করতে শুরু করেছিলো। সেই রাতের কথা , সেই সিনিয়রের মাতাল কণ্ঠস্বর আমার মুখের লালাগ্রন্থির ক্ষরণ বন্ধ করে দিয়েছিল। চিঠি টা আবার পড়তে শুরু করলাম।
“এবারের কারণ গুলোই একান্তই তোমার আর আমার। তোমার নিশ্চয়ই জানা উচিৎ,একজন নিউকামার প্রশিক্ষণরত কর্মীকে সর্বদা তার বস কে সন্তুষ্ট রাখতে হয়। কিন্তু সেসব তুমি তোমার পূর্ব জীবনে শিখেছো বলে আমার একদিনও মনে হয়নি। একাধিক দিন আমার পারকিং এ গাড়ি রেখেছ, পিছন থেকে ডেকেছি যখন শুনতে পাওনি। কারণ তোমার হেডফোন টার দাম হয়ত তোমার কাছে নিজের কেরিয়ারের থেকেও বেশি। আরও একটা কথা, কারোর রুমে ঢুকতে গেলে নক করতে হয় এই গ্রুমিং টাও কি তোমার ঠিক করে হয়নি?” নন্দিনী ম্যাম এর সাথে স্যারের অন্তরঙ্গ হওয়ার দৃশ্য আমি ভুল করে দেখে ফেলেছিলাম জানি, কিন্তু তার যে এই মূল্য চোকাতে হবে বুঝতে পারিনি।ভেবেছিলাম মন দিয়ে কাজ করাটাই হয়তো এই মন্দার বাজারে চাকরি টেকানোর একমাত্র উপায়। এখন তো মনে হচ্ছে বস যেদিন ড্রিংস অফার করেছিলো সময়ের অভাবে তা প্রত্যাখ্যান করাও আমার চাকরি খেয়ে নিতে পারে।
“জানত আমাদের professional field এ রেস্পেক্ট এর একটা দাম আছে। এই যে তুমি আজ আমার ঘরে এলে গুড মর্নিং উইশ করেছ? আচ্ছা তুমি কি তোমার কলেজে ফার্স্ট ব্যাচ? তোমার কোনও সিনিয়র ও কি তোমায় এসব শেখায়নি? আসলে কি হয়েছে......... ”
ব্যাস, ওই কাগজ টা আর আমি পড়িনি। মন খারাপ শুধু নয়, নিজেকে অনেক নিকৃষ্ট ও মনে হচ্ছিলো। বাড়ি এসে পুরনো কলেজের ফ্রেন্ডকে হোয়াটসঅ্যাপে জিজ্ঞেস করলাম-
“ আচ্ছা তোর সেই সিনিয়র দের দেওয়া রুল গুলো মনে আছে?”
“হ্যাঁ, আজ হঠাৎ কেন?”
“ওহো! প্রশ্ন করিস নাতো , লিখে পাঠা।”
• “এক বছর ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট, ছোটো করে চুল কাটা থাকে যেন।”
• “ক্যান্টিনের কাকা থেকে ঝাড়ু দেওয়া মাসি সবার সাথে ভাল ব্যবহার আর কেউ যেন অসন্তুষ্ট না হয় তোমার প্রতি।”

“ হেডফোন,স্পিকার এক বছর ব্যবহার করা যাবেনা। ”
“সিগারেট, মদ, গাঁজা এট ইয়োর ওউন রিস্ক, ধরা পরলে উপযুক্ত শাস্তি , তবে যারা খাও তারা যেন কোন সিনিয়র অফার করলে রিফিউস না করে ”
“সিনিয়রের দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট নিজের টার সমান গুরুত্ব দিয়ে লিখে দিতে হবে।”
“সিনিয়র হোস্টেল এ অযথা আসা যাবেনা, সিনিয়রের রুমে নক করে ঢুকতে হবে।”
“ক্যান্টিন ও কলেজ যাওয়ার জন্য সিনিয়রদের টা ছেড়ে আলাদা রাস্তা ব্যাবহার করতে হবে। ”
“নিজের ইয়ারের বন্ধু দের মধ্যে ঐক্য রাখতে হবে।সব বিপদের মোকাবিলা এক সাথে করতে হবে”
“সর্বদা সিনিয়রের মুখোমুখি হলেই গুড মর্নিং, গুড ইভনিং উইশ করতে হবে।”
“ Last but not the least , always respect your senior”

“কিরে, আর ওই মাতাল টার ডায়লগ টা মনে আছে তো ? র্যা গিং নিরুদ্দেশ করে দিয়েছি, and it is not ragging, while it is Introduction………”