নিঃসঙ্গ '৯'

সোমাভ রায়চৌধুরী


ফ্রি-স্কুল স্ট্রীটের সেই '৯' নামক পুরনো রেকর্ডের দোকানটি বেমালুম গায়েব
হয়ে গেল। দীর্ঘদেহী আব্বাজান ও তাঁর দুই পুত্রই দেখাশোনা করতো। আব্বাজান
মালিক। দুই সন্তান trainee। তিনজনের মধ্যে বৈশিষ্ট্য ছিলো যে তিনজনেই
ছিলো ট্যারা, ইংরেজিতে যাকে বলে 'squint'। পাশাপাশি প্রচুর দোকান ছিলো।
কিন্তু সংগ্রহের দিক থেকে দেখতে গেলে ৯ অনন্য। আমি ও আমার বন্ধু বিলে তখন
পাশ্চাত্য আধুনিক গানের out & out ভক্ত।
প্রথম দিন ৯-এর মালিক
আমাদের - বাইরে, র‍্যাকে সাজানো যে রেকর্ডগুলো ছিলো, সেইগুলো দেখিয়ে
সন্তুষ্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। তারপর, তিনি যখন দেখলেন আমাদের মন
ভরছেনা, তখন ভেতরে কোথায় ছেলেদের পাঠাতে লাগলেন এবং তারা আরো রেকর্ড হাতে
ছুটতে ছুটতে আমাদের কাছে আসতে লাগলো। ইংরেজি আধুনিক গানের খাজানা ছিলো '৯'।
তখন, যেহেতু ক্যাসেটের যুগ এসে গেছে, রেকর্ড বনাম টেপ - একটা লড়াই চালু
হয়ে গেছে। তখন 'অ্যানালগ' সময়। এখন যেমন 'ডিজিটাল'। এটাও ৯-এর অঙ্গ। আসল
রেকর্ড বিক্রি করা হ'তো না। মেলট্র্যাক বা TDK-র ফাঁকা ক্যাসেটে গান
রেকর্ড ক'রে দেওয়া হ'তো। তবে, রেকর্ড কেনা যেতো। তার দাম ছিলো অনেক।
সর্বক্ষেত্রে পকেট পারমিট করতো না।
এবার, আমার আর বিলের
মনে প্রশ্ন জাগলো - ছেলেদুটো যায় কোথায় ? আর অ্যাতো অ্যাতো রেকর্ড নিয়ে
হাজির হয় !? প্রশ্ন করলে উত্তর মিলতোনা। তারপর হঠাত একদিন আলিবাবার গুহার
মতো ৯-এর দরজা খুলে গেল। ঘর ভর্তি থরে থরে রেকর্ড। কাকে ছেড়ে কাকে দেখি
!!! Neil Diamond, John Denver, Beatles, Aretha Franklin, Cliff Richard
... এ ছাড়াও হাজারো ছোটো ছোটো ৯। ক্রমশঃ ওই মুসলিম পরিবারটির কাছে আমরা
দুই বন্ধু অ্যাতোটাই বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠলাম যে ৯ আমাদের জিম্মায় রেখে,
আব্বু তাঁর সন্তানদের নিয়ে নাস্তা করতে যেতেন। আমরাও কোনোদিন তাঁদের
বিশ্বাসের অমর্যাদা করিনি।
শহরের ওই অংশটি আমাদের
কাছে ৯ হিসেবেই পরিচিত হয়ে গেল। রেস্তোরাঁ, সিনেমা-হল - সব ৯ হয়ে গেল। এই
মোলো যা ! ৯- দাঁতটা খট ক'রে ভেঙে গেল। এবার ছোটো পুরুষানুক্রমে চৈনিক
ডাক্তার ৯-র কাছে ! ধ্যুত ! পরে দেখা যাবে।
যাই হোক। ৯ স্ট্রীটে ঈষৎ
বিয়ার পান ক'রে ৯-র 'খানা-খাজানা'-য় প্রবেশ করতাম। কতো রথী মহারথীদের
সঙ্গে যে পরিচয় হতে লাগলো, তা বলার নয়। ঝিম-মারা-দুপুরে দুটো টুল নিয়ে,
আমি আর বিলে, ব'সে থাকতাম ৯-র অন্দরমহলে। পরিচিত হচ্ছি মাসী-পিসীদের
সাথে। শুয়ে থাকছি গ্রীষ্মের দুপুরে তাদের কোলে মাথা রেখে। সেই কলেজ কাটা
দুপুর, কেটে যাওয়া ঘুড়ি, আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা। ফিরিয়ে দেবেনা Suzanne,
Annie, Kathy, Ceciliaদের... তাদের হাত ধ'রে আমরা পৌঁছে গেছি তিন-তলা ৯
সিনেমাহলে। The Goonies, Gremlins, E.T., Poltergeist... আমাদের নিয়ে
গেছে সাই ফাই-এর জগতে। পড়তে শুরু করেছি ৯ Asimov-এর Foundation Series,
Jules ৯-র Twenty Thousand Leagues under the Sea। এক অমোঘ গ্রন্থ। চলতে
শুরু করেছি 'টাইম মেশিনে' চেপে Space Odyssey 2001। হারিয়ে গিয়েও রয়ে
গেছে চিরন্তন ৯। যেমন, বিলে আজ নেই। দুর্ঘটনায় নিহত। কিন্তু আমার
মস্তিষ্কে, সেই সময়টা রেকর্ডেড। আমার মগজ যেদিন চ'লে যাবে, সেইদিন আমার
জীবনের ৯ বিদায় নেবে।
রেকর্ডগুলো প্রায়শই
কাটা থাকতো। ফলতঃ, সেখান থেকে রেকর্ডেড ক্যাসেটে ঝিকঝিক, খুটখাট, - আওয়াজ
থাকতো। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম ওই শব্দগুলোর সঙ্গে। কিন্তু সাউন্ডের
গভীরতা আমাদের নিয়ে যেতো অন্য এক জগতে। তাকে ৯ ছাড়া অন্য কিছু বলা সম্ভব
নয়। যা আজ - থেকেও নেই ; না থেকেও আছে। আছে শ্রুতিতে, স্মৃতিতে ; নেই
টিনের চালে পেচ্ছাব করা ডিজিটাল বর্তমানে। উপস্থিত এখনো বেঁচে যাওয়া
সংখ্যালঘু কিছু ক্যাসেটে। অবর্তমান সহজেই অ-গায়ককে সু-গায়ক বানানোর
'মেলোডাইন' সফটওয়্যারে। সব-ই ৯-এর খেলা। ৯ সব পারে। যেমন, মাল্টিমিডিয়ায়,
সুকুমার-কে নতুন একটা অর্থ দিতে। আনতে পারে আকাশের গায়ে টক টক গন্ধ। এটা
৯-এর উত্তর-আধুনিকতা। ৯ প্রয়োজনে সনাতন ; প্রয়োজনে পুনরাধুনিকও বটে। ৯
পাল্টাতে পারে তার স্টাইল, তার ফর্ম - তার আগাপাশতলা। এটা বোঝার ব্যাপার।
এটা না ধরতে পারলে ৯-কে চেনা যাবেনা। আসলে, ৯ হ'লো, "... এক ধরণের পাগলা
জগাই... "।
কয়েকটা ব্ল্যাঙ্ক মেলট্র্যাক
ক্যাসেট নিয়ে ব'সে আছি ৯ Pub-এ। বার্গার সঙ্গতে একটু গলা ভিজিয়ে, ৯-র
গুদামঘরে ঢুকবো। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি, মনে হচ্ছে বোধহয় কয়ামত নেমে আসছে।
কিন্তু, নাঃ। ৯ তা হতে দেবেনা। অনেক গান শোনা বাকি। রেকর্ডগুলোর ওপর
প্লাস্টিক বিছানো। দুই ছেলে মিলে সাহায্য করেছে তাদের আব্বাকে। Pub-এর
বিল মিটিয়ে ঘরে গিয়ে বসলাম। তদ্দিনে মুখস্থ হয়ে গেছে কোন দিকে কোন কোন
রেকর্ড রয়েছে। বাইরের র‍্যাকগুলো তো তার অনেক আগেই... । মাঝে মাঝেই মাথায়
কু-মতলব আসতো। "আচ্ছা বিলে ! কয়েকটা রেকর্ড ঝাড়লে হয়না ? কী বলিস ?" ব'লে
নিজেরাই খ্যাক খ্যাক ক'রে হাসতাম। কী বিশ্বাস !!! এই হ'লো শালা ৯-এর
ধর্ম। এক মুসলিম পিতা ও তাঁর দুই পুত্র, দুই হিন্দু ছেলের জিম্মায় তাঁদের
সমস্ত সম্পত্তি গচ্ছিত রেখে আরাম-সে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ কেবল ৯-তেই সম্ভব।
যা চিরকাল ছিলো এবং থাকবে।
যখন একাদশ
শ্রেণীতে পড়ি তখন মনে হয়েছে ৯-কে নিয়ে অনেক কিছুই, অনেক কথাই। যেমন
অশোকবাবু'কে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছে - '৯' বর্ণটাকে নিয়ে কী করবো ?
কারণ, ৯ আমায় হাফ প্যান্ট থেকে ভাবিয়েছে। সে কারো ঘাড়ে চাপেনা, সে কারো
নীচে শোয়না। বেশ্যাবৃত্তি বা জিগোলোগিরি ক'রে মালও লোটেনা। মাল খায়না
ফিলিম-উৎসবে। অন্য কোনো বর্ণের সঙ্গে মৈথুনে লিপ্ত হয়ে হরগৌরী ব'নে
যায়না। ফলে, সঙ্গমরতঃ অবস্থায় খাট থেকে প'ড়ে যাবারও ভয় নেই।
ভাবতে ভাবতে আমার সমস্ত শরীর বাঁকতে শুরু করে। শরীরে গজিয়ে উঠতে থাকে
আঁশটে পুরু ছাল। সেই সময়ে হঠাতই আমার সামনে খুলে যায় একটা দরজা। আয়নার
মুখোমুখি আমি। আর স্ব-প্রতিবিম্বে সেই অকেজো, নিষ্কর্মা, নিঃসঙ্গ,
অপদার্থ এক স্বরবর্ণ - '৯'।
প্রতিটা
উচ্চারণই পলিটিকাল। তুমিও জানো। আমিও জানি। এই যে '৯' নিয়ে অ্যাতো কথা,
এর মধ্যে লুকোনো রাজনীতি আছে। বুঝতে পারলে বুঝে নাও। রেকর্ড, ক্যাসেট,
MP3, CD, DVD, Software-এর দৌরাত্ম্য ? না না। CPM-TMC নয়। তবে আছে। খুব
সূক্ষ্ম। যাক গে !
আস্তে আস্তে, শহরটা মেগাসিটি হবার চক্করে। ৯-ক্যাসেট দোকানগুলো উঠে গেল।
উঠে গেল হাজরার মোড়, রাশবিহারী, দেশপ্রিয় পার্ক, গড়িয়াহাটার দুষ্প্রাপ্য
ক্যাসেট পাওয়ার দোকানগুলো। মূল ৯ রেকর্ড, ক্যাসেটের দোকানটা, এখন আর
বেঁচে নেই। থেকেই বা কী লাভ ? নয়ের দশকের শেষের দিকে শহরের সঙ্গীতকে খেয়ে
নিলো Internet বা আন্তরজাল নামক বস্তু। Torrent থেকে হরদম ডাউনলোড হতে
শুরু হলো গান। আর 'লট কে লট' গণকযন্ত্র ভাইরাস-আক্রান্ত হতে লাগলো। যাই
হোক, 'খুলে আম' পাইরেসির যুগ এসে গেল। আর ৯, - সত্যিই তার আপন মহিমায়
বিরাজমান হলো। সময় পাল্টালো স্ব-ধর্মে।
বহুকাল ফ্রি-স্কুল
স্ট্রীটে যাবার প্রয়োজন পড়েনি। ঘরে বসেই যদি ফ্রি-তে ৯-এর বিকৃতি পাই,
তাহলে কে আর খাটতে চাইবে !? কিন্তু ভুলিনি ৯-কে। একটা গান শোনার জন্যে যে
পাগলামি ৯ দিয়েছে ; বর্ষায় এভিসের জিন্স গুটিয়ে ছুটছি সেই মুসলিম
পরিবারের দোকানে - তা কি আর ইঁদুরের তর্জনী-ক্লিক দিতে পারে ? সে সময় আর
ফিরবেনা। ফিরবেনা কাটা রেকর্ডের বারম্বার আটকে যাওয়া ৯। বাধ্য হলাম সময়ের
সাক্ষী হয়ে ফিরে যেতে সেই সদ্য গোঁফ গজানো তরুণের কাছে। ফিরে যেতে
আর্কেডিয়ান '৯'-র কাছে। প্রশ্ন জাগছে। '৯'-র নস্টালজিয়া কি তাহলে মনের
অসুখ !!!???