যেখানে একটি নদী চলতে চলতে অদৃশ্য হয়ে যায় ...

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়


লম্ফের আলোটা কাঁপছে তিরতির করে । নদী পেরিয়ে অনেকদূরে স্টিম ইঞ্জিনের হুইসল । এক অলীক অস্থিরতা ছুয়ে রাত গড়িয়ে যাচ্ছে অনিবার্য আমন্ত্রনে । এই উদাসীন হারিয়ে যাওয়া দৃশ্য নীরব উচ্চারণের নিরম্বু উত্তাপ পেরিয়ে শব্দকল্পে জেগে উঠছে নিভু নিভু আলো । অপেক্ষার মুহূর্ত , ক্লান্তির অভিলাষ , বহুকৌনিক বিচ্ছুরণ । সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে কখন । ভরাট স্যুটকেশ জুড়ে শীত । তবু এক নিরিন্দ্রিয় অনুভূতি জ্বেলে স্বপ্নার্ত পল্লীতে টুসু পরব ..
.চল টুসু চল খেইলতে যাবঅ রানীগঞ্জের বটতলা / ফিরার পথে দ্যাখাই আইনব কয়লাখাদের জল তুলা।
বল টুসুধনি তোকে ক্যা দিল গ চার আনি ।
আমার টুসু দখিন যাবেক / খিদা লাইগলে খাবেক কি ?/ আন টুসু পাইড়ে গামছা / ঘিয়ের মিঠাই বাইন্ধে দিই ।
এইসব প্রানসঞ্চারী সমবেত শব্দের কোলাহলে দুলে ওঠে আলপথ । মাঠ পেরিয়ে গোরুর গাড়িতে চড়ে ঠাণ্ডা বাতাস এসে চৌহদ্দি কাঁপায় । আর অবিরাম ঢেঁকির শব্দ জানান দেয় পউষ এসে গেছে । অফুরন্ত আনন্দের বিমূর্ত ঢেঁকিঘরে চিরবন্দী ফ্রেমে আটকে আছে উৎসববুনন । গাঢ় হয়ে ওঠা থমথমে অন্ধকারের উপর ক্রমাগত পাহার দিচ্ছে অক্লান্ত পা । পৃথিবীতে তো প্রতিদিন নতুন উৎসব । কৃষি মাতৃক গ্রামীন আদলে রঙের পালিশ । বদলে বদলে যায় চিরায়ত রূপের মদিরতা । তুস থেকেই তো টুসু কৃষিজীবি মানুষের পরব লোকায়ত উন্মাদনা ।
নদীটি হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে । এক কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে দিশেহারা অনন্তের অনুভূতি । জৌলুস ও উন্মাদনা ম্লান হয়ে আসছে । আবহলালিত অবস্থান থেকে সরে গেছে ঋতুকাল । বদলে যাচ্ছে চারপাশ । নিরুপায় শুকিয়ে আসার দৃশ্য এই মোহাচ্ছন পল্লীতে । আর সে হড়পা বান নেই নদীজলে । মরা নদীতে ঝির ঝির করে কোন রকমে বয়ে চলে মানভুমী স্রোত । পলাশ ও পুটুশের এই গ্রাম বাঙলায় করম এক জনপ্রিয় পরব । ভাদ্রমাসে এই উৎসবে গাওয়া হয় জাওয়া গীত । সন্ধ্যেবেলায় হেলে পড়া সূর্যের মলিন আলোয় যুবতী মেয়েরা হয়তো এখনও পরস্পরের হাত ধরে গায় সেই জাওয়া গান । সেই সুরের বিভঙ্গে নেচে ওঠে কচি ধানশীস বিস্তৃত মাঠের সবুজে । ? জাওয়া গানের মতই বুলবুলি নাচ ঘড়ালাচ ( ঘোড়া নাচ ) নাচনী নাচ ঝুমুর জাতগান বা ঝাপানের সেই প্রানময়তাও নিঃস্পন্দ বিষাদের ছায়া –আস্বাদ সেই গ্রাম্য নীল জলে ।

নদীটি হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে । এক কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে দিশেহারা অনন্তের অনুভূতি । জৌলুস ও উন্মাদনা ম্লান হয়ে আসছে । আবহলালিত অবস্থান থেকে সরে গেছে ঋতুকাল । বদলে যাচ্ছে চারপাশ । নিরুপায় শুকিয়ে আসার দৃশ্য এই মোহাচ্ছন পল্লীতে । আর সে হড়পা বান নেই নদীজলে । মরা নদীতে ঝির ঝির করে কোন রকমে বয়ে চলে শুকনো স্রোত । যে জানলা গুলো দিয়ে গ্রামজীবনএর ধুলো বালি সমেত আশ্চর্য অমলিন এক ভালোবাসার ছায়ামূর্তি দেখা যেত তা অল্প অল্প করে সরে গেছে । তালপাতার বাতাসের স্নেহময় আন্তরিকতা থেকে সরে গেছে এক বিমূর্ত আস্ফালনের দিকে । এই ক্ষতচিহ্নের পাণ্ডুলিপি সাজানো ছাড়া কি আছে এই নিরুদ্ভিদ সময়ে ?
তাহলে কি প্রশ্ন উঠবে ঐতিহ্যের নামে আমরা লাশবন্দনা শুরু করছি ? মেতে উঠছি শবকামুকতায় ? না , সম্ভাবনা এবং বিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েও আমরা ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে দেখতে চাইছি ফেলে আসা প্রেক্ষাপট , দৈনন্দিনের ব্যালকনি যা হাতের মুঠো থেকে সরে গেছে তালাবন্ধ আস্তানার দিকে । জীবনপ্রাচুর্যের চওড়া ও মহার্ঘ্য পরিমণ্ডলের মধ্যে অনুপ্রবেশের ইচ্ছে নিয়ে চাবি খুলছি । অসুখকে বিশ্রাম দিয়ে নস্টালজিয়ার কচুরিপানা সরাচ্ছি । হাহাকার থেকে নয় আনন্দের নিবিড় আকুতি থেকেই হাত বাড়াচ্ছি উদ্বাস্তু চ্যুতভুমির দিকে । এই অন্তরাল থেকে আগাছার আড়াল থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা অতীত থেকে উন্মত্ত অমরতাকাঙ্খী স্মৃতি ছিনিয়ে আনছি । পেড়ে আনছি সেই চিরহরিত রোজলিপি । শুশ্রূষার মত জল বয়ে চলে বাঁধনা পরবের গানে – ঝিঙা ফুলের কলিরে বাবুহো / সাঁঝে ফুটে বিহানে মলিন । ক্রম মলিন এই জীবনচিহ্ন ।... বেলা যে পড়ে এল জলকে চল । সারি সারি বালিকার দলবদ্ধ যাত্রা । কোথায় যাবে ? নদীটাই তো হারিয়ে গেছে । একটু একটু ধূসর হয়ে আসছে গ্রাম্য হ্যারিকেনের আলো । রাঙা লালমাটির রাস্তার দখল নিয়েছে বিটুমিনাসের কঠোরতা । কারা যেন চলে যায় চিরজনমের মত । শিরা উপশিরা বেয়ে নেমে আসে নতুনপথের গুপ্তধাপ ।আমাদের স্বপ্নগুলি ফুরোতে চায়না তবু । ঝাপসা হাওয়ায় মিশে থাকে গন্ধের আত্মীয়তা । লুপ্ত সংস্কৃতির সংকল্পের শারীরিক বিভা জেগে থাকে অলিন্দে । এ শুধু ছবি কোন ভাষাপথে অনুবাদ করবো তাকে ?