পুরোনো স্ল্যাং-হারানো স্ল্যাং

সত্রাজিৎ গোস্বামী

যদি বলি, হাসবেন? যদি বলি, মানুষের জন্মহারের থেকে মাত্র কিছুটা কম তার মুখের ভাষায় নতুন নতুন শব্দের জন্মহার। আর এটাও তো সকলের জানা- ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’। শব্দ যত দ্রুতহারে জন্মায়, তেমন অনবরত মরতেও থাকে। বিশেষ করে শব্দের এই জন্মমৃত্যুর হার যেকোনো দেশে সবচেয়ে বেশি স্ল্যাং-এর ক্ষেত্রে। তবে ঠিক যে কারণে পৃথিবীতে জনবিস্ফোরণ ঘটছে, প্রায় সেই একই ভাবে, যত ব্যাপক হারে স্ল্যাং-এর জন্ম হয়, ঠিক তার তুল্য হারে মৃত্যু হয় না বলে ভাষাভাণ্ডারে জমা হতে থাকে পুঞ্জ পুঞ্জ সেসব শব্দাবলী।

তবু শব্দের এই মরে যাওয়া, প্রাণশক্তিতে ভরপুর কিছু কিছু স্ল্যাং-এর এই মরে যাওয়াও হয়তো অনেক সময় আমাদের সামাজিক ইতিহাসেরই অঙ্গ। শুধু সামাজিক ইতিহাসই বা বলি কেন? রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের চলমানতাই যেমন নতুন নতুন স্ল্যাং-এর জন্ম দেয়, তেমনি তার কবরও তো তৈরি করে।

যেমন ধরুন, ঔপনিবেশিক আমলে যখন পুলিশের ইউনিফর্মের অঙ্গ ছিল লাল রঙের পাগড়ি, তখন লোকমুখে পুলিশ হয়ে উঠেছিল, ‘লাল পাগড়ি’। স্বাধীন ভারতে পুলিশের সেই ইউনিফর্মও নেই, অতএব আমাদের স্ল্যাং-ভাণ্ডার থেকে লাল পাগড়িও উধাও।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির ফিল্ম এখনও আমাদের নস্টালজিয়াকে উস্‌কে দেয় ঠিকই, কিন্তু আজকের যুব প্রজন্মের কাছে ওই প্রেমের প্রকাশ-প্রকরণ নিতান্ত সেকেলে- অনাধুনিক। বরং এখন রণবীর-দীপিকা বা হৃতিক-ক্যাটরিনা অথবা নেহাত বাঙলা হলে দেব-কোয়েল জুটি এ প্রজন্মের কাছে এই হার্ট-থ্রব। অতএব এক কালের শিহুরে যুব সমাজের মুখে মুখে উচ্চারিত ‘ইউ এস এ’ (উত্তম-সুচিত্রা অ্যাসোসিয়েশন) শব্দটা এখন অনুচ্চারিত, মৃত।

বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনে যখন জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন লোডশেডিং হলেই ঝুপ্পুস অন্ধকার থেকে কেউ ফুট্‌ কাটত- ‘ঐ যাঃ! জ্যোতিবাবু চলে গেলেন!’ লোডশেডিং এখনও কমবেশি আছে, কিন্তু ওই বাক্‌ব্যবহারটি স্বাভাবিকভাবেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে।

বিশ শতকেও কলকাতা শহরের রাস্তায় চার ঘোড়ার গাড়ি জুটত ধনী অভিজাত মানুষদের নিয়ে। অতএব আভিজাত্যের রমরমা বোঝাতে ‘চৌঘুড়ি হাঁকানো’ শব্দটার দিব্যি চল ছিল। উনিশ শতক চলে গেছ্ব, অনেকদিন, সঙ্গে নিয়ে গেছে শব্দটাকেও। উনিশ শতকের আরও কতো শব্দই পূর্বপুরুষের ড্যাম্পধরা হলদেটে ছবির মতো শুধু লটকে আছে আমাদের স্মৃতির দেওয়ালে আর পুরোনো বইয়ের পাতায়- অষ্টমীর পাঁঠা, উড়ন পেকে, গট্‌রা (অট্টহাস্য), আহাম্মকের চরকি (অতি বোকা), নাগরগদাই (কথায় ও আচরণে রসিক), শ্রাদ্ধের ঠেকা (নাছোড় দায়), শিন্নি বাটা গিন্নি (যে গৃহিণী অতি অল্প অল্প পরিবেশন করে), অদম চুড়া (বিপুলদেহী অকর্মা)। আজকে যখন লাখ টাকার সম্পত্তি নিতান্ত ছাপোষা মধ্যবিত্তের কাছেও আহামরি কিছু নয়, তখন বিত্তবান বোঝাতে ‘লাখের জমিদারি’ শব্দটা হাস্যকর নয়? গত শতকের সত্তরের দশকে বাংলাদেশের ওপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানের বাহিনী, তখন দুর্বৃত্ত বোঝাতে চালু হয়েছিল ‘খানসেনা’ শব্দটা। এখন আর সে শব্দের ধার কোথায়? ‘চৈতন’ শব্দটার অর্থ যে টিকি, সেটা আজকের ছেলেমেয়েদের কাছেও অজানা নয়, তবু ‘চৈতন’ শব্দটা এখন কে আর ফক্কুড়ি করেও উচ্চারণ করে বলুন?