সুখদা

অঞ্জলি গুপ্ত


সুখদার চিরকালের এই এক অভ্যাস, রোদে রাখা জলে স্নান করা। সকালে উঠেই এক বড়ো বালতি জল বাইরের দাওয়াতে রেখে দেবে। ওপরে একটা পাতলা গামছা বা পরিষ্কার ন্যাকড়া ঢাকা দেবে যাতে ধূলোবালি না পড়ে। শীতের দিনে একটু দেরী হয়। গরম কালে নটার মধ্যেই জল যথেষ্ট গরম হয়ে ওঠে। ঠান্ডা জল সুখদা একেবারেই সহ্য করতে পারেনা। দাওয়াটা এককালে সুরকী পেটানো ছিল, এখন এখানে ওখানে খাবলা খাবলা চটা উঠে গেছে। কবে যে ভেঙেছে এগুলো বা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেছে এবাড়িতে বসবাসকারী কারও মনে বা চোখে পড়েনি এগুলো। সকালে প্রাতঃসূর্যের সোনালী রোদ এসে পড়ে এই দাওয়াতে। শীতকালে এখানে বসা বা চেয়ারে মাদুরে বিছানা, বড়ি, আচার রোদে দেওয়া খুব সুখের।
এবাড়ির সামনেই একটা চৌকোনা ছোট্ট মাঠ মতো, সবাই বলে চক্‌। চকের চারপাশেই বাড়ি। বাড়িগুলোর যত অনুষ্ঠান সব এই চকেই হয়। বিয়ে পৈতে নান্দীমুখ অশুভ প্রেতকর্ম সবই এই চকে। একদিকে নির্মাল্য সেনের বাড়ি, অন্যদিকে গুপ্ত বাড়ির ঠাকুরদালান, আর এক দিকে বিরজা সেনেদের ভাঙ্গাচোরা বাড়ি। যে বাড়ির দাওয়ায় সুখদা এখন তার স্নানের জল রোদে দিয়েছে, একপাশে, কোনের দিকে। এদিকে স্নান করলে ঘর দুয়ার সব ছত্রাকার হয়ে যাবে। সুখদা সূর্যের দিকে পিঠ করে হাঁটু মুড়ে বসেছিলো। বুকের ওপর লাল টুকটুকে গামছাটা মেলে দিয়েছিলো। শীতের সকালের নরম রোদ পিঠের ওপর তাপ ছড়াচ্ছিলো খুব আরামের। সুখদা পেতলের ঘটি করে জল তুলে মাথায় ঢালছিল। রঙ খানা দেখবার মত সুখদার। গোলাপের মতো টুকটুকে। চুলগুলো সোনালি, ঠোঁটদুটো লাল। জলে ভিজে পাতলা সাদা থান বুকে পাছায় পিঠে সেঁটে বসেছে। কাপড়ের ওপর দিয়ে ফুটে বেরোচ্ছে গায়ের রঙ।
দেওয়ালের দিকে মুখ করে গামছাটা খুলে নিয়ে সুখী চুলগুলো জড়িয়ে চিপে চিপে জল বের করল। গামছাটা পাকিয়ে চুলগুলো ঝাড়া দিয়ে একটা খোঁপা বাঁধলো। আবার বুকের ওপর গামছাটা মেলে সূর্যের দিকে মুখ করে প্রণাম করতে গিয়ে দেখল উলটো দিকের উঁচু বাঁধানো ধাপিতে বসে বসে নগেন নিমের ডাল চিবিয়ে চিবিয়ে দাঁতন করছে। ওর দুই চোখে অনেক কৌতুহল আর আকুলতা। দুই চোখে যেন সুখীর সর্ব্বাংগ গিলছিল ও। সুখদা আবার পিছন ফিরল। বিড়বিড় করল নিজের মনে---হাড় হতচ্ছাড়া বজ্জাত! একটুকু চান করবার কি জো আছে! সুখী পরমা সুন্দরী মধ্য বয়সের বিধবা, কিন্তু ওর জিভের বড্ড ধার, গলা খানাও খানদানী।গলা তুলে বলল---সূর্য অনেক ওপরে উঠে গেছে। এবার ঘরে যাও বোনাই, চা খাও গে। নগেন থু থু করে নিমের ডাল চিবোনো ফেলল, হ্যা হ্যা করে হাসল রসালো হাসি। বলল---তোমার চান করা দেখছিলাম গো ছোটগিন্নী। মাইরি! এত রূপ তোমার, এত যৌবন জলেই গেল। সুখদা ঘরে যেতে যেতে বলল --- মুখে আগুন তোমার, মুখপোড়া!
ঘরে গিয়ে সুখী এবার একটা শুকনো মটকার ধুতি পড়ল, গলায় আঁচল জড়িয়ে সুর্যপ্রণাম করল। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল --- ছোটবৌ, তরকারী থাকে তো কিছু দাও নইলে আমি ভাতে ভাত বসিয়ে দিচ্ছি। ভাইয়ের বৌ সন্ধ্যা তরকারী কুটছিলো। বলল—ওই তো ঝুড়িতে কটা আলু আর পেঁপে আছে। নিয়ে যান। বাজার আর কই করল আপনার ভাই। চারটা বড়িও নিয়ে যান।সন্ধ্যাও দেখতে সুন্দরী। মাথার ঘোমটা খসেনা কখনো, কিন্তু মুখে সর্বদাই বিরক্তি। ননদ বয়সে ওর স্বামী বিনোদের চেয়ে বড়ো, কিন্তু সন্ধ্যা কোনওসময় ননদের সঙ্গে হেসে কথা বলেনা। সুখদা বলল --- চাল দিও গো এককৌটো। আবার যোগ করল --- আমার বাবার জমির চাল তোমার কাছে চেয়ে নিতে হবে কেন, আমি তো নিজেই নিতে পারি। তাছাড়া এককৌটো চালের ভাত কি আমার পেটে আঁটে? নেহাত পারুটা স্কুল থেকে ফিরে আমার কাছে চারটি খেতে চায়, তাই। কথাগুলো খুবই অপ্রাসঙ্গিক। চাল নিয়ে সন্ধ্যা কোনদিনই কিছু বলেনা। কিন্তু সুখী রোজই একবার করে বাবার জমির চাল কথাটা বলবেই!
পুরাতন ঘরের ওপর তলায় ভেঙ্গে পড়া ঘরের অর্ধেক অংশ মেরামত করে একটা ছোট ঘরের মত করে নেওয়া হয়েছে। পোড়ো ইঁটের পাঁজার ওপর দিয়ে তিন চারটে ধাপি গেঁথে ওপরে ওঠার সিঁড়ি বানানো হয়েছে। ঘরের অর্ধেক অংশ সামনের দিকে খোলাই আছে। সেখানে সুখদার শিল নোড়া উনুন, সংসারের টুকিটাকি জিনিস। ঘরে একটা তক্তাপোষের ওপরে বিছানা, তলায় রান্নার কাঁসার বাসন, হাঁড়িকুড়ি, মশলাপাতির কৌটোবাটা। ঘরের পাশে নিচের তলার মস্ত বড়ো ছাদ পড়ে আছে। মাথার দিকে একটা বিরাট বড়ো জানলা। সেখানে কোনো ছাদ নেই তাই রাত্রে খোলা থাকলে বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। গরমের দিনে পারুকে নিয়ে সুখদা জানলাটা খুলেই শোয়। জানলা দিয়ে নিচের দাওয়াটা চক সব কিছুই দেখা যায়।
সুখী ঘুঁটেকয়লার উনুনে আঁচ দিয়েছিল, গন্‌গনে আঁচ উঠেছে। পেতলের ছোট বোক্‌নো করে আলুসেদ্ধ ভাত বসালো। আলু বড়ি পেঁপের ঝোল করবে। পারুর জন্য রেখে দেবে একটু। বিকেলে মেয়েটা স্কুল থেকে ফিরে খাবে। ওবেলা আর খাওয়া নেই। শশা আনবে সমিতি থেকে ফেরার সময়, মুড়ি দিয়ে খাবে রাতে। সুখীর এখন সমিতি যাবার তাড়া। পি আই সি’র অধীন প্রোজেক্টে তিনবছর পর্যন্ত বাচ্চাদের গ্রামের সমিতিতে দুধ খাওয়ানো হয়, ওষুধ দেওয়া হয়। গর্ভবতী মায়েদের নানান পরামর্শ আর ভিটামিন আয়রণ ইত্যাদি বিতরণ করা হয়। মায়েদের ছোটখাটো সেলাই হাতের কাজ এগুলোও শেখানো হয়। গ্রাম সেবিকা, মুখ্য সেবিকা ইত্যাদি অনেক রকম ভাগ আছে এই প্রোজেক্টে। সুখদা এইরকম একটা সহায়িকার কাজ করে। মাসিক বেতন পঁচিশ টাকা।
পারু, দশ বছরের পারু, বিনোদের বড়ো মেয়ে। আরো তিনটে ছেলেমেয়ে আছে বিনোদের, কিন্তু পারুই সুখীর প্রাণ। পিসির একেবারে গায়ে গায়ে লেগে থাকে পারু। ধুপ্‌ধুপ্‌ করে ওপরে উঠে এল পারু, পিসি তোমার খাওয়া হয়ে গেল? সুখীর মুখ ভর্তি ভাত, ছোট্ট একটা কাঠের পিঁড়িতে উবু হয়ে বসেছে। ভারি গলায় বলল এই হলো বলে। ভাত ঝোল থাকলো, স্কুল থেকে ফিরে খেয়ে নিবি। চাবি মা’র কাছে থাকবে। মাকে বলবি দুধ দিয়ে গেলে রান্নার পর উনুনে বসিয়ে রাখবে। সরলার মা দুধে বুঝি জল দিচ্ছে। চায়ে রঙ হয়না কেন কে জানে। পাওলি ঘটি থেকে গলায় জল ঢালল উঁচু করে। থালা বাটি দরজার কাছে রেখে বলল---তুই খেয়ে এখানে থালা রেখে দিস, আমি এসে ধোব। সুখী খুব পরিপাটি করে সাজে। মাথার ওপর দিয়ে একটা ফিতে থুতনীতে গিঁট দিয়ে উঁচু করে একটা খোঁপা বাঁধে, সাদা সাদা কাটা গুঁজে ফিতেটা খুলে হাত দিয়ে কানের ওপর পাতা কেটে দেয়। সেমিজের ওপর সাদা ধপ্‌ধপে থান, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা, পানের রসে রাঙ্গানো টুকটুকে ঠোঁট, পায়ে কালো চটি। হাতে কাঁথা কাজ করা সুন্দর একটা বটুয়া। বটুয়াতে পানের মশলা, টাকা পয়সা, বাজারের ছোট একটা ব্যাগ---এইসব থাকে। শীত পড়েছে একটু একটু। বিকেলে সুখি কিছু সবজি আনে। ঢ্যঁড়শ, ধুঁধুঁল, পেঁপে মেয়েরা সব ভালবেসে গাছ থেকে পেড়ে দেয়। ব্যাগটা সন্ধ্যার হাতে দিয়ে বলল—নিরামিশ করে রেঁধ, তাইলে আমিও একটু খেতে পাবো। এক বালতি জল নিয়ে সুখী ওপরে উঠলো। পারুকে বলল, মা’র কাছ থেকে এক কাপ চা আর লন্ঠন নিয়ে তুই ওপরে আয়। আমি সব কাজ সেরে নি তারপর তুই পড়বি আমি সুতো কাটব।
সুখী তকলিতে সুতো কাটে। ওর হাতের সুতো খুব সুন্দর। দুই আঙ্গুলের ফাঁকে পেঁজা কাপাস তুলো রেখে তকলি ঘুরিয়ে সুতো কাটে। চরকা একটা দিয়েছিল মহিলা সমিতি থেকে দুটো চাকা দেওয়া। ঢাকা দেওয়া একটা বাক্সের মধ্যে সেটা তলা আছে, অনেকটা সময় থাকলে সুখদা সেটা ব্যবহার করে। এখন এই তকলির সুতো দিয়েই গোটা দশেক পৈতে কাটা হয়ে যাবে। তিন খি (গাছি) করে সুতো নিয়ে হাতের মাপের কুড়ি বাইশ হাত সুতো গোল করে কড়ে আঙ্গুলের মাথায় জড়িয়ে একটা করে গিঁট লাগায়। এগুলো আবার পিটুলি গোলাতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। দুদিন পর তুলে সুতোগুলো খুলে দুটো খুঁটীতে মেলে দিতে হবে তারপর নারকেলের ছোবা জলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে সুতোগুলো মাজতে হবে। শুকিয়ে গেলে আবার আঙ্গুলে জড়িয়ে গোল করে গিঁট দেওয়ার পালা। এ সুতো যেমন শক্ত তেমন ঝকঝকে সাদা। এ গ্রামে পৈতের খুব চাহিদা। ঋক বেদ, সাম্‌ বেদ ইত্যাদি অনুসারে পৈতের ঝুলের তারতম্য হয়। এ গ্রামে বামুন আর বদ্যিরা পৈতে পরে। কায়স্থদের মধ্যে কোনও কোনো গোত্র, আবার গোয়ালারাও অনেকে পৈতে পরে। এক আনায় চারটে পৈতে। খাটুনি একটু হয় বটে, তবে পয়সাটা হাতে এলে পান দোক্তার খরচটা ওঠে। রাখী পাখীর মাও পৈতে কাটে, তবে সুতো কাটেনা। বাজারের কাটা সুতো নিয়ে আসে। রাখীর মা সংসার সামলে অবশ্য বেশি পৈতে কাটতে পারেনা।
পারুর ক্লাশ ফোর। এখানকার গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে পড়ে। পারুর পড়া হয়ে গেলে সুখী বঁটী পেতে শশা কাটে। অন্য একটা বাটীতে তেল দিয়ে মুড়ি মাখে। শশা মুড়ি এক বাটীতে রেখে বিধবা মানুষকে খেতে নেই, তাই আলাদা বাটী। পারুকে বলে, যা ভাত খেয়ে আয়। পারু খাটের ধারে মুখ ঝুলিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে বলে, আমার পেট ভরা, সন্ধ্যেবেলা খেয়ে এসেছি। তারপর বলে,ও পিসি তোমার ওইটুকু মুড়িতে পেট ভরবে পিসি? রাত্রে খিদে পাবেনা? সুখী বলে, না পাবেনা। বিধবা মাগীর অত নোলা কিসের রে! এক ঘটী জল খেয়ে নেব, পেট ভরে যাবে। একটু পরে তো ঘুমিয়েই পড়বো। নে না একমুঠো মুড়ি। পারু বলে, ঐটুকুনি থেকে আর আমাকে দিতে হবেনা, তুমিই খাও। সুখী বলল, আমার গতরখানা দেখেচিস? সাতটা বাঘে খেতে পারবেনা। জানিস না রাঁড় হলে ষাঁড় হয়? আজ আঠেরো বছর ধরে এই খেয়েই তো বেঁচে আছি। দাঁড়া দুধটা গরম করি, তোকে একটু দেব। আবার সকালের চায়ের রাখতে হবে, তোর মাকেও একটু দিতে হবে।
বাইরে রাখা ছাইভর্তি উনুনে পাতা কাগজ জ্বেলে অ্যালুমিনিয়ামের বাটী বসিয়ে দুধ গরম করে সুখদা। ঘরে এসে বলল, কাল আবার একাদশী, খাওয়া নেই। বাঁচা, গেল, রাঁধতে হবেনা। পারু বলল, সারাদিন না খেয়ে থাকবে? সুখি বলল, কাল রবিবার অফিসও নেই। সকালে তো চা খাব। দুকুরে চান করে সরবত খাব একটু। পান দোক্তা মুখে দিলে গলাটা ভেজা থাকে, তেষ্টা পায়না। রাতে নাহয় চুরমা ভাজা করব একটু। ---- চুরমা কি পিসী? ---- কাল রেশনে তেল দেবে। কদিন সর তুলে জমিয়েছি, কাল ঘি করব। ঘি দিয়ে শুকনো আটা ভাজব। ওকে চুরমা বলে। চিনি মেখে বেশ লাগে খেতে। তোকেও দেব খাস। ---- আমি তাহলে রাত্রে ওটাই খাব, ভাত খাবনা পিসী। সুখীর গলায় ধমক --- ভাত খাবনা কি? অনেক দেব নাকি পেট খারাপ হবার জন্য? আমিও দুমুঠো খাব। শিশিতে রেখে দেব আর একদিন খাওয়া যাবে।
সুখীর বিছানায় সাদা চাদরে ছোট ছোট ফুলপাতা আঁকা, কাঁথাফোঁড় তুলে। পারুকে বলল, দেওয়ালের দিকে ফিরে শো। ভোরবেলা শীত লাগবে, চাদরটা ঢাকা দিয়ে নে। অনেক রাত্রে ঘরের দরজায় ঢকঢক করে শব্দ হয়। কে যেন ডাকে---ছোটগিন্নী দরজাটা খোল। সুখীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘরের কোনে টিমটিম করে লণ্ঠন জ্বলছে। সুখী চাপা গলায় হিস্‌হিস করে---ঘরে যাও বোনাই। ঘরে দা বটী, শিলের নোড়া আছে। দরজা খুললে তুমি আস্ত থাকবে না। আরেকবার বিরক্ত করলে বিনুকে ডাকব! দরজাতে আর দু চারবার শব্দ হয়। সুখী পারুকে বুকে জড়িয়ে শোয়। ঘরে সোমত্ত বৌ রেখেও নগেনটা রোজ ছোঁকছোঁক করে সুখীর জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলল!
পরদিন দুপুরে মিষ্টি রোদে মাদুর পাতা হয়েছে। তাসের আসর বসেছে। খেলুড়েরা এখনো সব আসেনি। সুখী বলল --- বিনু, খেলবি তো আয়। বিনোদ বিছানায় গড়াচ্ছিল। বলল—তোদের ঐ মেয়েছেলের বিন্তি খেলায় আমি নেই। সুখী বলে — আয় আয়, টোয়েন্টি নাইনই খেলব আয়। এই আঁখি পাখি, তোদের মা কে ডাক রে! একতু পরেই আঁচলে হাত মুছতে মুছতে আঁখি পাখি’র মা হাজির। পিছন পিছন বরুণের মা’ও এসে পড়লো ধুতির খুঁটে মুখ মুছতে মুছতে। বলল, একটা পান দাও তো খাই, গলাটা শুকোচ্ছে। বরুণের মার পরণে মোটা ধুতি, সোডায় কাচা পরিষ্কার। বলল, ছেলেমেয়ে দুটোকে খাইয়ে তবে আসতে পারলাম। আমার তো আজ খাওয়া নেই, তো ওদের কি কম বায়না! পোস্তর বড়া কর, ডিমের মামলেট কর, ডাল কর ...। আসলে বরুণের মা’র রান্নার ফিরিস্তি খুব। বাস্তবে হয়ত কাঁঠাল বিচি ভাজা আর বুনো ডুমুর সেদ্ধ দিয়ে ফেনা ভাত রেঁধে বাচ্চাদুটোকে খাইয়েছে। পাবে কোথায়! দুটো নাবালক ছেলেমেয়ে রেখে বরুণের বাবা টিবিতে মারা গেল, দাহ সংস্কারের সামর্থ্যও ছিলোনা। বরুণের মা ভদ্র বাড়ির বৌ। লোকের বাড়ি বাসন মাজা, কাপর কাচার কাজে সম্মান নেই। তাই সেনেদের বাড়ি বা চক্রবর্তীদের বাড়ি জল দেয়। নির্মাল্য সেনেদের খোলা ইঁদারা থেকে জল তুলে কোমরে কলসী নিয়ে বাথরুমের চৌবাচ্চা ড্রাম ভর্তি করে দেয়, রান্নাঘরে সারি সারি কলসী বসিয়ে দেয়। দেওয়ালে দাগ কেটে কেটে জলের হিসেব রাখে---এক পয়সার পাঁচ কলসী। কখনো কারও বাড়ি চাল ঝেড়ে তাদের অনুমতি নিয়ে খুদ কটা আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসে। কারও বাড়ি রোদে বসে ছাদ ভর্তি বড়ি দিয়ে দেয়। কখনো কারও রান্নাঘরের সামনে সঙ্কুচিত কুণ্ঠিত হয়ে দাঁড়ায়। গৃহিনী হয়ত বলে, দাওতো বরুনের মা মোচাটা কেটে বা শাকটা বেছে---কৃতার্থ বরুণের মা সযত্নে কুটনো কুটে দেয়, ফেলে দেওয়া খোসা ডাঁটা বুকে জড়ো করে তুলে নিয়ে আসে। সন্ধ্যেবালা কারও বাড়ি গল্প করতে গিয়ে রান্নাঘরে পিঁড়ে পেতে বসে। কেউ বলে, দাও তো বরুণের মা রুটি কটা বেলে। যাওয়ার সময় দুখানা রুটি একটু গুড় কাগজে মুড়ে আঁচলে বেঁধে দেয়---ছেলেমেয়ে দুটোকে দিও গো, চুপ করে নিয়ে যাও। প্রায় প্রতিদিনই বরুণের মা’র একাদশী। কোনদিন জলমুড়ি কোনদিন বা একটু বাতাসা বা গুড় দিয়ে একঘটী জল। পানের রসে টুকটুকে মুখ দেখে কেউ সন্দেহ করেনা সারাদিন কি জুটল। বরুণের মা কোনদিন দুখকাঁদুনি গাইতে পারেনা। তবে তাস খেলাতে বরুণের মা খুব দড়। সারাদিন কেটে গেলেও খিদে তেষ্টা ভুলে যাবে। সুখী বলল, এসো গো বরুণের মা। তোমাকে না হলে আসর যে জমেই না!
অবলা পিসী তাস খেলতে পারেনা, তাও আড্ডার একপাশে রোদে বসে। সকলের মাঝে বসলে সময়টা কেটে যায়, খিদেটাও আর চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনা। খেলার মাঝখানে বিনোদ বলল, দিদি, তোর একটা চিঠি এসেছে মির্জাপুর থেকে। কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রীটে সুখদার শ্বশুরবাড়ি। তাসের দান দিতে দিতে সুখদা বলল, নিশ্চয়ই আমার ভাশুর লিখেছে। দ্যাখ গিয়ে কারও বৌএর আবার বাচ্চাকাচ্চা হবে নইলে কারো ছেলের পরীক্ষা টরীক্ষা আছে।---না রে, তোর ভাশুরের মেজ মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে সামনের মাঘে। আঁখির মা বলল, যাওনা, ভোজ খেয়ে আসবে। সুখী বলে, থাম্‌ তো! ভোজ! বাড়িতে বাইশজন লোক ছেলেপিলে মিলে। আরো আত্মীয়স্বজন আসবে। অত লোকের হাঁড়ি ঠেলবে কে! সেজ খুড়ি তোমার হাতের মোচা খুব ভালো। সেজ খুড়ি সুক্তো কী ভালো রাঁধে! ডালটা দারুণ হয়েছে! সারাদিন রান্নাঘরে হাঁপিয়ে মর্! ---- তুমি ওখান থেকে ফিরলে তোমার চেহারা কিন্তু খুব ভালো হয় ।
---হবেনা? ভাতের পাতে ঘি, রাতে লুচি, মিষ্টি। ওরাও খাচ্ছে, আমাকেও দিচ্ছে। আমিই তো করব সব। তোয়াজ না করলে চলবে কেন?
অবলা পিসিমা বলল, তোর ভাশুর তো শুনি টাকা পাঠায় তোকে। সুখদা বলল, সে কি প্রত্যেক মাসে পাঠায়? কখনো সখনো পঞ্চাশ টাকার মানি অর্ডার আসে। ওরা যে আমার ভাগের ঘরটা ভোগ করছে, তার বেলা? সুবলের মা বলে, কলকাতায় তোমার ঘরবাড়ি পড়ে আছে, এখানে কোন সুখে পড়ে আছ? সুখী মুখ ঝামটা দেয়, মরণ! কলকাতায় দেওর ভাশুরের ভালোবাসায় বেঁচে থাকব? এখানে সুখ নেই, কিন্তু শান্তি তো আছে। বলে না বাপের ভাত, দাপের ভাত! বাপের ভিটে, মাথার ওপর ছাদ আর জমির চাল দুমুঠো জোটে তো। অবশ্য ভাইয়ের বৌ আমাকে আঁশ বঁটীতে কাটে দুবেলা---এবার সন্ধ্যা কটকট করে ওঠে, ওই দ্যাখ! আমাকে লিয়ে পড়লে? আমি আবার কি করলাম? সুখীও ঝনঝন করে ওঠে, করোনি আবার কি? তোমার তো সবসময় তেলা হাঁড়ির মত মুখ। কপাল পুড়িয়ে এখানে এসেছি আর হাত পুড়িয়ে খাচ্ছি! সন্ধ্যা বলল, আমি তো আপনাকে রেঁধে দিতে পারি। আপনিই তো খাবেননা। সুখীর গলা চড়লো, খাব কি করে? তোমার কোলে বাচ্চা। এঁটোকাঁটা গু-মুত সব ছত্রাকার। বিধবা মানুষ ওসব খেতে পারে?
অবলা পিসি বলে, আমি তো সাত বছরে বিয়ে হয়ে ন’বছরে বিধবা হয়েছি। সারাজীবন পেতলের সরা মেজে, ঘাট থেকে জল এনে আতপ চালের ভাত হাত পুড়িয়েই খাচ্ছি। ঠাকুমা তাইই শিখিয়ে গেছে। নিজের কপাল ছাড়া আর কাকে দোষ দেব! ওতে অশান্তি বাড়ে। সুখী তাসের দান দিতে দিতে বলল, বাবা বলত সুন্দরী মেয়ে আমার সকলকে সুখী করবে, নাম রাখল সুখদা। শ্বশুর সোনার মত রং দেখে নাম রেখেছিল হিরণ্ময়ী। আমার কপালে কি সংসার হলো? বারোয় বিয়ে হয়েছিল। স্বামী ব্যবসার কাজে দেশ বিদেশ ঘুরত, পারিবারিক ব্যবসা। একবার আসাম থেকে জ্বর নিয়ে ফিরল , আর ভালো হলো না। কত ডাক্তার কবরেজ, হাকিম—আমার গা ভর্তি গয়না সব চলে গেল। শেষে গোটা শরীর ফুলে গেল। সুখী ফিস্‌ফিস করে বলে, অন্ডকোষটা ফুলে বালিশের মত হয়েছিল। আমাকে কেবলই বলত, তোমাকে সুখ দিতে পারলাম না, কোলে একটা বাচ্চা দিতে পারলাম না। ঐটুকুনি বয়সে কিছু বুঝতামও না। ও মারা যাবার পর আমাদের বংশের গুরুদেব আমাকে দেখে বলেছিলেন। এতো সত্যিকারের বিধবা নয়, বিবাহিত জীবন কি ও জানেই না। এ আগুনের মালসা কোথায় রাখবে তোমরা! একে আবার বিয়ে দাও। ভাশুর শ্বশুর কেউ মত দিলোনা। শ্বাশুড়ি বললেন, অলক্ষুণে মেয়েদের একবার সুখ না হলে আর কোনদিনই হবে না। এত রূপ কী ভালো? ওরা আমাকে বাবার কাছে পাঠিয়ে দিলো।
অবলা পিসিমা বলল, আমি তো ঐটুকুনি মেয়ে। তখন বিদ্যাসাগরমশাই বিধবা বিবাহ চালু করেছে। সবাই বলল, বৌকে ঘরেই রাখো, দেওরের সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। আমার বাপের বাড়ির অমত ছিলো না। কিন্তু আমার দেওর বললো, ঐ কালো মেয়েকে আমি বিয়ে করবো না। ফর্সা মেয়ে দেখে শুনে দেওরের বিয়ে হলো। ক’বছর পর দুটো ছেলে একটা মেয়ে রেখে বৌটা মরে গেল। ভাত রাঁধবে কে? বাচ্চা মানুষ করবে কে? ওরা এসেছিল সম্বন্ধ নিয়ে। আমার তখন ষোল , আঠেরো। বিধবার জীবন অভ্যেস হয়ে গেছে, আর রাজী হইনি।
তাস খেলা কখন যেন থেমে গেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। সন্ধ্যা অনেকক্ষণ তার ঘরের কাজে উঠে গেছে। এই তিন বাল্য বিধবা হতভাগিনী স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কখন যে স্তব্ধ হয়ে গেছে নিজেরাও বুঝতে পারেনি। আকাশে একগালি চাঁদ বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে দেখা দিয়েছে। দুএকটা শেয়াল কোথাও ডেকে উঠল। শাঁখের ফুঁ শোনা যাচ্ছে গৃহস্থবাড়িতে। নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে সুখী বলে ওঠে, চল্‌ ওঠ সব, সন্ধ্যাপ্রদীপ দেওয়ার সময় হলো যে!