সিন্ধুসারস

রাণা রায়চৌধুরী


আমি সাঁতার কাটতাম । আমি মাছ ধরতাম । আমি মাথা তুলে নীচে নাড়াচাড়া করতাম । আমার সেই বালকবয়সের নাড়াচাড়া গভীর জলের মাছেরা দেখেছে । সেই মাছেদের মধ্যে একটা গানজানা মাছও ছিল । মাছেরা জানে , জলের শ্যাওলারা জানে আমি কত ভালো সাঁতার কাটতাম । সাঁতার কাটতে কাটতে এতদূর ! এতদূরে এসে দেখি সেই পুকুরটা নেই । সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট , নাম – সিন্ধুসারস !
ঐ সিন্ধুসারসের নীচে আমার ছোটোবেলার সাঁতার , সাঁতারের আবেগ লুকিয়ে আছে । আমি বাজি ধরে সাঁতার কাটতাম । আপডাউন পঁচিশ বার । রবি সাতাশবার কাটলে , আমি আপডাউন ত্রিশবার দিতাম । সেই থেকে আপ আর ডাউনকে চিনি । সেই থেকে টপকে যাওয়া শিখি । টপকানো । কাউকে ল্যাং মেরে পিছনে ফেলে ফার্স্ট হওয়া , প্রথম হওয়া । আমি সাঁতারে ফার্স্ট হইনি । রবি হত । আমি মাছ ধরতেও ফার্স্ট হইনি । মাছের বদলে সাপ উঠত বঁড়শিতে । আমার দৃষ্টি ফাতনায় ছিল না , ছিল ঢেউয়ে । পুকুরের ছোটো ছোটো ঢেউ আমার ভিতরে তোলপাড় । সীতা স্কুল সেরে আমগাছের নীচে পুরোনো শ্যাওলাধরা বাথরুমে যেত টেপজামা ছাড়তে । আমিও পেছন পেছন বিষাক্ত গোখরোর মত ফণা তুলে পুরোনো শ্যাওলাধরা ইঁটের আড়ালে । খসখস খসখস । সীতার নতুন স্তন ভয়ে কেঁপে উঠত । আমি ফণা তুলে , ফণায় আঁকা জাতিচিহ্ন তুলে দেখতাম – বালিকা এক , গ্রামের হাট থেকে কেনা সস্তার “বক্ষ আবরণী” পরছে । সীতার নিষ্পাপ স্তনে পুকুরের শ্যাওলা , জলবিন্দু , মাছের আঁশ , জলের ঢেউ । একটা পুকুর যেন সীতার বুকে দোল খাচ্ছে – একটা পুরো উচ্ছাস যেন বিন্দু বিন্দু , সীতা গামছা দিয়ে মুছছে !
ঐ পুকুরপারে রেডিও নিয়ে বাবা বসতেন মাছ ধরতে । রেডিওতে অনুরোধের আসর । পিন্টু ভট্টাচার্য্য , তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় , সন্ধ্যা , মানবেন্দ্র , আরতী , নির্মলা , সতীনাথ এবং সবশেষে শচীনকত্তা ।
রেডিও মাঝেমাঝে বন্ধ হয়ে যেত । হঠাৎ গান যেত থেমে । বাবা ফাতনা থেকে চোখ সরিয়ে রেডিওতে একটা থাবড়া মারতেন । থাবড়া খেয়ে নির্মলা আবার গাইতে শুরু করতেন । বাবা বোরোলীন মাখতেন না , কিন্তু বোরোলীনের সংসার শুনতেন পুকুরের নির্জন পারে বসে । শ্রাবন্তী মজুমদার । রবিবারের দুপুরের নাটক । শম্ভু মিত্র , তাহার নামটি রঞ্জনা । তৃপ্তি মিত্র । শোভনলাল মুখোপাধ্যায় । শাঁওলির কন্ঠস্বর বাবাকে উদাস করে দিত । ওদিকে ফাতনা ডুবছে তো ডুবছেই । জল থেকে মাছকে যে টেনে তুলতে হবে বাবার খেয়াল নেই ।
আমার বেখেয়ালি বাবার , পুরো জীবনটাই ঐ পুকুরের জলে , সাদা ফাতনার সঙ্গে ডুবে গেছে । মাছে ঠুকরে ঠুকরে খেয়েছে বাবার উদাসীনতা । পুকুরপারের সজনে গাছ থেকে সাদা শুঁয়োপোকা পায়ে পায়ে এসে কখন যে বাবার জামায় উঠেছে , জামা থেকে ঘাড়ে বাবার খেয়াল নেই । ঘাড়ে হাত দিয়ে শুঁয়োপোকা । নিরীহ , নরম প্রাণী । বাবা শুঁয়োপোকার নরম কাঁটায় হাত বুলোতেন । পুকুরের ঠান্ডা হাওয়ায় তখন তাঁর কাঁচাপাকা চুল উড়ছে , মন উড়ছে !
আমার খুব গর্ব ছিল যে আমার মা সাঁতার জানে । বাদলের মা , শশীর মা , সমরের মা , পমপমের মা সাঁতার জানে না – আমার মা জানে । মা-ই আমায় শিখিয়েছিল – বুকসাঁতার , চিৎসাঁতার , ডুবসাঁতার । মা বলত শিখে রাখ , সারাজীবন কাজে লাগবে । আমি জীবনের কাজে লাগবে বলে শ্যাওলা সরিয়ে সরিয়ে ডুব সাঁতার দিতাম । চিৎ সাঁতার শ্যাওলা সরিয়ে সরিয়ে । যেমন এখনো সাঁতরাচ্ছি । জীবনের অনেক তেতো – অপ্রাসঙ্গিক – ষড়যন্ত্রের শ্যাওলা সরিয়ে সরিয়ে যাচ্ছি । পুকুরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত – সম্পর্কের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ।
একদিন শনিবারের দুপুরে , হাফছুটির স্কুল ফেরত এসে দেখি , পুকুরে সীতা একা সাঁতার কাটছে । সীতার পাশে একটা বিশাল জলঢোঁড়া সাপ । আমি শানবাঁধানো ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখছি সীতা যদি চিৎসাঁতার দেয় তো সাপটাও চিৎসাঁতার দেয় । সীতা যদি ডুবসাঁতার দেয় তো , সাপটাও ডুবসাঁতারে জলের জগৎ পার হচ্ছে । আমি ঘাটে স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি জলের জগৎ কত বিশাল , কত মায়াময় । আমিও ঝাঁপ মারি জলের জগৎ পার হব বলে ।
ওদিকে বাবা রেডিও থাবড়ে থাবড়ে অনুরোধের আসর শুনছেন আর ভেসে থাকা ফাতনার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে জগতের ভেসে থাকা দেখছেন । মাঝেমাঝে বাবা চিৎকার করে আদ্যাস্তোত্র পাঠ করছেন । যেন আদ্যামা ওই ফাতনাটি-ই । ঐ ফাতনাটি-ই বাবার আরাধ্যা দেবী । বাবার চিৎকৃত আদ্যাস্তোত্র পাঠে ঐ সাদা ফাতনা মাঝেমধ্যে সাড়া দিচ্ছে । সাড়া দিচ্ছে মানে নড়ছে-চড়ছে । সাদা ফাতনা বাবার পরিষ্কার উচ্চারণের আদ্যাস্তোত্র পাঠে মুগ্ধ হয়ে মাথা নাড়ছে মৃদুমৃদু । বাবার নাকে নস্যি , মুখে একশো বিশ জর্দা পান , পাশে ঘাসের ওপরে আলতো করে রাখা পানামা সিগারেটের প্যাকেট । তার পাশে নিরীহ ১৬নম্বর দেশলাই । বাবা আদ্যামাকে ডাকছেন পুকুরের দিকে তাকিয়ে ।
হঠাৎ ফাতনা বাবার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে , জলের অন্দরে হু হু করে , কান্নার মত ডুবতে থাকল । ঘাসের ওপরে রেডিওতে তখন ইডেন গার্ডেন্সে ফুটবল খেলার রিলে চলছিল । রিলে করছিলেন অজয় বসু , পুষ্পেন সরকার । খেলা হচ্ছিল ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে মোহনবাগানের । আইএফএ শিল্ডের ফাইনাল । তার আগে টালিগঞ্জ অগ্রগামী , ভাতৃসংঘ , সালকিয়া ফ্রেন্ডস , খিদিরপুর ক্লাব কোয়ার্টার ফাইনাল , সেমিফাইনালেই ফুটে গেছে । বাবা ফরিদপুরের লোক , ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার । বাবা সারাজীবন-ই হেরেছেন । তাই ইস্টবেঙ্গল জিতলে বাবা নিজেই যেন জিতলেন , এমনটা করেন তিনি । অজয় বসুর কমেন্ট্রি যেন সাহিত্যের বিবরণ । অজয় বসুর ভাষায় স্বয়ং বিভূতিভূষণ মানিক জীবনানন্দ এঁরা যেন হাঁটছেন । তেমন সুন্দর কমেন্ট্রি করছেন পুষ্পেন সরকার । হঠাতই ফ্রিকিক থেকে সমরেশ চৌধুরী মানে পিন্টু চৌধুরী গোল করলেন । বাবাই যেন ফ্রিকিক থেকে গোল করলেন এমন আনন্দে আত্মহারা তিনি । সাক্‌সেশ সকলেই চায় । বাবাও ফ্রিকিক থেকে গোল পেয়ে যেন বিরাট সাক্‌সেশ পেলেন – বাবা চিৎকার করছেন আনন্দে ! তিনি যে পুকুর ধারে বসে মাছ ধরছেন তা খেয়াল নেই তাঁর । হঠাতই খেয়াল করলেন তার সাদা ফাতনা হুরহুর করে জলে ডুবছে ! বাবা ছিপ টানলেন সজোরে । কিছুতেই হারবেন না তিনি । কিন্তু ছিপ টানার পর বঁড়শিতে যা উঠে এলো , তা দেখে তিনি অবাক ! বঁড়শিতে জল থেকে আমাদের সীতা উঠে এলো সঙ্গে জলঢোঁড়া সাপ !
রেডিওতে তখন খেলা শেষ । রেডিওতে তখন অজয় বসু , পুষ্পেন সরকারও শেষ । রেডিওতে তখন অনুরোধের আসর , যুবভারতী , বেলা দে , বোরোলীনের সংসার শেষ । রেডিওতে তখন শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায় , জগন্নাথ বসুর নাটক শেষ ।
পুকুরপারের ঘাসের ওপর তখন রেডিওর বদলে নতুন শাটার খোলা আপট্রন টিভি । সেই সাদাকালো টিভিতে ছন্দা সেন , তরুণ চক্রবর্তী খবর পড়ছেন । বিশেষ বিশেষ খবরের মধ্যে বলল ইস্টবেঙ্গল জিতেছে আর একটি পুকুরের মাছ ধরা ছিপে , মাছের বদলে আদ্যামায়ের মূর্তি উঠেছে জল থেকে । বাবা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখেন – সত্যি সীতা নয় , জলঢোঁড়া সাপ নয় , বাবার বঁড়শিতে সদ্যস্নাত আদ্যামা ঝুলে আছে , ছিপের ডগায় ! আমার বাবা ছিপে মাছ ধরার পরিবর্তে আদ্যামা ধরে বিখ্যাত হয়ে গেলেন ।
বাবা বিখ্যাত হয়ে গেলেন আর আমাদের সেই পুকুরে প্রোমোটার দাসবাবু দুনিয়ার মাটি , রাবিশ ইত্যাদি ফেলে ফেলে পুকুর বোজাতে লাগলেন ।
পুকুর বুজে গেল । পুকুর মুছে গেল । আমাদের ধুতি-লুঙ্গি পরা বাবাও হঠাৎ সেরিব্রাল স্ট্রোকে গত হলেন । বাবা গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবলে রোভার্স কাপ , বরদলুই ট্রফি , ডিসিএম কাপ , এইসব টুর্নামেন্ট এবং জেসিটি , মাহীন্দ্রা মাহীন্দ্রা , মফতলাল স্পোর্টস , ভাস্কো-র মত ফুটবল ক্লাবগুলোও চিরতরে উঠে গেল ।
এখন সেই মাটি দিয়ে বোজানো পুকুরের ওপরে জ্বলজ্বল করছে “সিন্ধুসারস” অ্যাপার্টমেন্ট ।
ঐ সিন্ধুসারস - অ্যাপার্টমেন্টের নীচে আমার শ্যাওলা সরানো সাঁতারের ছোটোবেলা , সীতার চিৎসাঁতার , জলঢোঁড়া সাপের সহজতা , বাবার মাছধরা – এইসব কিছু এখন চাপা পড়ে আছে । আমার এখনো মনে হয় ঐ বিশাল আলোকোজ্জ্বল , সফল , অ্যাপার্টমেন্টের নীচের পুকুরে মা আমাকে জীবন উতরোনোর সাঁতার শেখাচ্ছেন । চিৎসাঁতার , ডুবসাঁতার , বুকসাঁতার । আমি এখনো যেন ঐ অত ইঁট সিমেন্ট রড গ্রীলের নীচে সাঁতার কাটছি । পুকুরের এপার ওপার করছি বাজি ধরে । দশবার , কুড়িবার , তিরিশবার । পারাপার করছি , হাঁফাচ্ছি , সাঁতার কাটছি যেন এখনো ঐ “সিন্ধুসারসের” নীচে !