ধর্মতলা

সাম্যব্রত জোয়ারদার


ম্যাজ লেনের সামনে এসে দাঁড়াই। রাস্তাটা বেমালুম বদলে গিয়েছে। এই পথের নাড়ি নক্ষত্র এক সময় হাতের তালুর মত চিনতাম। আজ দু’দশক পর সন্ধ্যের আলোছায়ায় সব কেমন অপরিচিত, অজানা। হাতের তালুর রেখাও কিছু পালটে গিয়েছে বোধকরি।
ক্লাস ইলেভেন। স্কুলেই পড়ি। বন্ধুদের একটা গ্যাং তৈরি হল। একসঙ্গে কোচিং ক্লাসে যাওয়া। বাইক ভাড়া করে চালানো। বিকেলের দিকে নির্দিষ্ট ঠেকে জমায়েত। ফার্স্ট কাউন্টার। সেকেন্ড। থার্ড। প্র্যাট মেমোরিয়াল। অ্যাসেম্বলি অব গড চার্চ। এম বি বিড়লা। ওয়েল্যান্ড গোল্ড স্মিথ। এই সব চলছে তখন। আর চলছে নিয়ম করে ক্লাস বাঙ্ক। নুন শোয়ের ধর্মতলা।
বাবা দু’টো ছবি দেখিয়েছিলেন। এক্টার নাম ‘গোল’। উচ্চারণে ‘গো-ও-লে।’ আরেকটা ‘জাঙ্গল বুক।’ গোল ছবিতেই আমি প্রথম মারাদোনাকে দেখি। তার আগে আর্জেন্তিনার অধিনায়ক ড্যানিয়েল পাসারেলার নাম শুনেছি আনন্দমেলা পড়ে। আকাশ থেকে ‘স্কাইল্যাব’ ভেঙ্গে পড়বে বলেও শুনেছি। ‘জাঙ্গল বুক’ ওয়াল্ট ডিজনি প্রোডাকশনের। আমার দেখা প্রথম ইংরেজি সিনেমা। অ্যানিমেশন মুভিও।
সরু গলির মত একটা ভেতরে ঢোকার জায়গা। আলো-আঁধারি পেরিয়ে একটা ছোট টার্ন। তারপর আর একটা দরজা পেরিয়ে ‘এন্ট্রি।’ যার উলটো দিকে একই রকম ভাবে লাল লাইটে লেখা থাকবে ‘একজিট।’ সিনেমা হলটা একটু লম্বাটে টাইপ। অনেকটা বেলেঘাটা বি-সরকার বাজারের ‘সন্তোষ’-এর মতন। সন্তোষ গুমোট। আলুর গুদামে তৈরি। নড়বড়ে চেয়ার। মাঝে মধ্যে রিল আটকে বিরাট হল্লা হয়। দর্শকরা সবাই চেয়ার খুলতে আর বন্ধ করতে থাকেন। এটা তা নয়। এসি আছে। একটা খুশবুও। বাবা বলতেন, এই সিনেমা হলটারর নাম ‘টাইগার।’
‘জাঙ্গল বুক’ ছিল আমাদের পারিবারিক সিনেমা দেখার প্রথম অভিজ্ঞতা। বাবা, মা, ভাই, বোন। বাবার বন্ধু বিভূতিকাকু। হলের ভেতর মায়াবী আলো-আবছায়া। গম্বুজের মাথায় টিমটিমে তারা জ্বলছে। ফিল্ম শুরুর আগে সব ধীরে ধীরে নিভে গেল। ম্যাজিকের মতন লাগছিল। সাপটা সম্মোহন শেখাচ্ছিল – ‘লুক অ্যাট মাই আইজ।’ লিন্ডসে ষ্ট্রীটের ওই রাস্তায় এরপর বহুবার হেঁটেছি। সিনেমা দেখেছি ‘গ্লোবে।’
ম্যাজ লেনের সামনে দাঁড়িয়ে এ’সবই আকাশপাতাল ভাবছিলাম। ভাবছিলাম হাতের তালুর রেখা পালটে গিয়েছে বোধকরি।
এস এন ব্যানার্জি রোডের দু’টো পিন কোড আছে। ঠিক মনে নেই – একটা বোধহয় ওয়েলিংটনের আগে। পেরিয়ে গিয়ে আরেকটা। এই রাস্তাটা ছিল আমাদের ধর্মতলা যাওয়ার গেটওয়ে। ক্যালকাটা বয়েজকে বাঁ-হাতে রেখে তালতলা পেরিয়ে ওয়েলিংটন। পেরিয়ে জানবাজার। পেরিয়ে কর্পোরেশন।
পরে যৌবনের কলকাতায় এই ওয়েলিংটনে সান্ধ্যকালীন শনিবার, বৃষ্টিবার, মেঘলাবার, রোদ্দুরবার, বারবার- বার আর স্বেচ্ছাচার কাটিয়েছি। খালাসিটোলায়। সে ছিল কেরোসিন কাঠের টেবিলে আমাদের তুমুল হই-হল্লার দিন। অনির্বাণ বলতে পারবে চাট বিক্রেতার নাম। সুলেমান সম্ভবত। যাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছিল অনির্বাণ। আমার মনে থাকবে ট্রাম লাইনে ‘মৃত্যু মৃত্যু’ খেলা।
আমরা মানে গ্যাঙেরা নামতাম ‘এলিট’-এর সামনে। বাঁ-দিকে আমিনিয়া। বাইরে থেকেই বিরিয়ানির আতরমাখা সুবাস। একটু এগোলেই সামনা পড়ত ‘মিনার্ভা।’ পরে নাম বদলে হল ‘চ্যাপলিন।’ তার আগে ‘সভেরা’ হোটেলের পাশ দিয়ে রাস্তা গিয়েছে মশলাপট্টির দিকে। ডানদিকের দেওয়ালে পড়ত ‘সোসাইটি’। অপরিচ্ছন্ন। ভেতরটা প্রস্রাব আর ছারপোকার কূট গন্ধ মাখামাখি। ছায়াছন্ন পরিবেশ। বেশিরভাগই ‘এ-মার্কা’ ছবি চলত। ‘বেডরুম আইস’, ‘টমবয়’ জাতীয়। ‘সোসাইটি’র আগে ডানহাতে ‘নিজাম।’ কম পয়েসার বিফ রোলের লা-জবাব জয়েন্ট। যদিও ‘জয়েন্ট’ শব্দটাকে আমরা তখন অন্য ভাবে চিনতাম। সোসাইটির আগে দমচারা একটা গলি। সরু। সেলাই মেশিনের আওয়াজ ভেদ করে, হগ মার্কেটকে পিছন দিকে কাটিয়ে, এসে পড়তাম মসজিদের দিকটায়। এই গলি যেখানে ধাক্কা খেত সেটা একটা বহু পুরনো ভাতের হোটেল টাইপ। একজন মুসলিম চালাতেন। দুপুরবেলা খিদের পেটে ডাল গোস্ত আর গরম ভাত ছিল উত্তম এবং লোভনীয়। এক সন্ধেয় জলপাইগুড়ির ছেলে কিরিটির সঙ্গে এই রাস্তায় হেঁটেছিলাম। মনে পড়ে।
তখন একটা ব্যপার থাকত। ফিল্মের বিশেষ বিশেষ সিন, চাম্পু ছবি – টিকিট কাউন্টারের বাইরে টাঙানো থাকতো। সেগুলো দেখে রসিক জন গোটা ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে একটা ফয়সালা করতেন। আমরাও তাই করতাম। পছন্দ না হলে, ‘সোসাইটি’ ছেড়ে ‘লাইটহাউজ।’ নয়তো ‘নিউ এম্পায়ার।’ ‘গ্লোব।’ ‘টাইগার।’ ‘যমুনা।’ ‘রিগ্যাল।’ রিগ্যালের দেওয়াল বিখ্যাত ছিল ‘পানু’ সাহিত্য পত্র পত্রিকার জন্য। দেওয়ালে ভর করে মহিলারাও দাঁড়াতেন। অজানা উৎকণ্ঠায় গা-ছমছম করত। ছোট ছোট বইয়ের পাতা পর পর উলটে দেখাতেন বিক্রেতারা। তাস শাফল করার মত স্পিডে। কারা আঁকতেন সেই সমস্ত ছবি?
ম্যাজ লেনের দিকে আমার পিঠ। সামনে সদর স্ট্রীট। এই রাস্তার বারান্দা নিয়ে আস্ত একটা কবিতের বই আছে প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর। বাড়িটা আমি বহুবার আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করেছি, পাইনি। রবীন্দ্রনাথ ওই বাড়িতে বসেই নাকি ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’ লিখেছিলেন। একদিন নিশ্চয়ই বাড়িটার ছাদে গিয়ে দাঁড়াব। দেখব ফেয়ারলন হোটেলের লনে নীল চোখের মেয়েটিকে। হোটেল আর কস্টিং বিল্ডিংকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগোব। ফুটপাথের চিনা খাবার চেখে দেখব। পুরনো ‘লং প্লে’ বিক্রির দোকানগুলো হাতছানি দেবে। ফ্রি স্কুল ষ্ট্রীটের রিকশা টুংটাং সাংকেতিক ধ্বনি বাজতে থাকবে।