বন্ধুত্ব এক উদ্বৃত্ত মরসুম

দোলনচাঁপা চক্রবর্তী


বন্ধু নামে পৃথিবীর সমস্ত গানে ঘোর লাগে। এক সুরের মরসুম। আমার কানের সেই প্রিয় দুলটার মতো। চুড়ির গোছার মতো। দূর্গাপূজার আগে কেনা রঙমিলান্তি চুড়ির গোছা যেমন ঈদের সালোয়ার দোপাট্টার সঙ্গে মিশ খেয়ে যায়। আমার পাঞ্জাবী বান্ধবীর বিয়ের সঙ্গীত-মেহেন্দির সময়ে বানানো জরির পাতিয়ালা স্যুটের মধ্যেও কিসের মরসুম ছিলো যেন। আমরা বুঝিনি। কেন ও বিয়ের তিন মাসের মধ্যে হারিয়ে গেছে। জরির সেই পাতিয়ালা স্যুটটা রেখে দিয়েছে ওর বোন। নিজের সন্তান হলে তাকে পরাবে। মাসির কোলের স্নেহকোমল ঘ্রাণ। আশীর্বাদ। একসাথে বয়স বাড়ার এক বন্ধুত্ব – আর যা যা কিছু দেয়া হলো না, পাওয়া হলো না। দিদি ডাকটা, পিছনে থাকা অমৃতের এক কন্যার জবানিতে রয়ে গেলো। আসলে আলমারির ওই কোণটায়, জরির পোষাকের চেনা ঘামের গন্ধটায় সব আঁধার ছাপিয়ে সর্ষেফুলের গাঢ় হলুদ তর্জমায় ভেসে যায় স্মৃতি, সুনিবিড়।
মিলান কুন্দেরা বলেছিলেন,ক্ষমতার বিরূদ্ধে মানুষের লড়াই হলো, ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম। আহ, এই সংগ্রাম প্রত্যহের। বারো বছর বয়সের আগে পর্যন্ত যে রিকশাঅলা আমাকে স্কুলে নিয়ে যেত, তার একটা পা পোলিওতে বেঁকে গিয়েছিল। সে ক্লাস ফোর অবধি পড়ে পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। কাগজ আর তার দিয়ে জীবন্ত এক গোলাপ গাছ তৈরি করে দিয়েছিলো। ‘ভাইফোঁটাতে তোমাকে কি আর দেব। এইসবই ছাইপাশ বানাতে পারি’। বিশাল একটা গাছ। তার ডালে ডালে গোলাপ। কাগজ – নিজের নিয়মেই কয়েক মাস পরে নষ্ট হয়ে যায়। এখন আর তার কোনও খবর জানি না। খবর রাখতে পারিনি।
আমার কোনও দাদা বা ভাই নেই নিজের। তারও যতদূর মনে পড়ে, কোনও বোন ছিলো না। পরে কত সময় ভাই পাতিয়েছি, সে সব সম্পর্ক সাধারণত টেঁকেনি। আজও একজন বললো, ‘আমি সার্বজনীন ভাই বা দাদা নই’। আমায় কষ্ট দেয়ার জন্য বলেনি। আমিও কষ্ট পাইনি। কিন্তু ওই মেশিন মেমারির মতো একটা থেকে আরেকটাতে অনায়াসে মন চলে যায়। এই গোলাপ গাছ – গরীব রিকশাঅলা দাদার দেয়া স্নেহের উপহার – না চাইতেই এই প্রাপ্তি মনে পড়ে। মামারবাড়ির একটা ঘরের দেয়াল ভর্তি ছিলো হলুদ ফোঁটায়। দিদিমা থেকে তাঁর বৌমা হয়ে সেই বৌমার কন্যা... কারা যেন কাদের জন্য আঙুলের ছাপে মন রেখে গিয়েছে সেখানে।
বাড়ি ভেঙে পড়ছে এখন। একের পর এক বাতিল হয়ে চলেছে একেকটা অংশ। প্রথমে খিড়কির দরজার বাইরের বেলগাছ। তারপরে খিড়কির দরজা। দরজার পাশে পুরনো রান্নাঘর। মাটির উনুন। রান্নাঘরের পিছনের জানলা, জানলার বাইরের জমিতে ফলানো এক চিলতে সবজি ক্ষেত। ক্ষেতের সীমানায় দেশি খেজুর গাছ। সব উপুড় হয়ে নিভে গেছে একেকটি চিতার সাথে। বাকি ওই নোনা ধরা বাতিল ইট, হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে যে কোনও বর্ষায়। অত প্যাথোজ সহ্য হয় না। অতিনাটকীয় লাগে। ভাইফোঁটাতে দেয়ালে হলুদের ফোঁটা দিই না। এক টুকরো প্রার্থনা ভাসিয়ে দিই। ভাগ্যিস প্রার্থনার কোনও রাষ্ট্র, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ নেই। ডোঙা ভেসে যায় বাংলাদেশ ও আরও দূর প্রবাসে। যার কাছে গেল, সে জানতে পারে না। আমি জানি। দেয়াল জানে না।
এইসব পৌরাণিক দেয়ালের ইতিহাস ছিল। মূর্তির ইতিহাস। মূর্তির সামনে বসে সমস্ত মৃত্যু, অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনা সহ্য করার ইতিহাস। বাতাসা আর নকুলদানায়, পদ্মকুঁড়ি আর চাঁপার সৌরভে, ধুপধুনোচন্দন আর ব্রতকথার পাঠে গোটা একটা পরিবারের অন্ধকার, অবিশ্বাস, ব্যর্থতা ও কান্না ঢেকে রাখার ইতিহাস। ফলে মূর্তির প্রতি আমার কোনও স্নেহ রইলো না। সুন্দর ওই নারী ও পুরুষ মূর্তির অবয়ব, গঠন, তাদের কেন্দ্র করে যা কিছু নিয়মনীতি, এত খুঁতহীনতা আমায় প্রায়শই শ্বাসরোধ করে দ্যায়। ভাবি, যা কিছুতে ভোরের আলো, সেখানেই সে থাকে। অথচ ভোরের ওই সূর্যপ্রণাম আমাকে ঈশ্বর নামক সেই আটপৌরে দ্বিধাদ্বন্দে ভরা খেটো ধুতি পরা বিতর্কিত লোকটির ধারেকাছেও নিয়ে যায় না। সূর্যপ্রণামের মন্ত্রটা শুধু সুন্দর কেননা তার অর্থের ভিতরে কোথাও ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। বিশ্বাসের ইতিহাস। মূর্তির সামনে যে বিশ্বাস আমার ওই পরিবারকে ঢেকে রেখেছিল, তার আজানুলম্বিত প্রচ্ছায়া। গল্পের, উপন্যাসের এক বিস্তার।
আরও পরে জেনেছি, বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে অন্যান্য কিছু রীতিরেওয়াজের মতো সূর্যপ্রণামেরও। বিজ্ঞান বাদ দিয়ে ওই আটপৌরে, খোঁচা খোঁচা দাড়িঅলা লোকটাকে নিয়ে ভাবতে গেলে দেখি, শেষ বয়সের বাবা ঝিলের ধার দিয়ে হেঁটে আসছেন। দাড়ি কামাতে হাত কাঁপে, স্বীকার করেন না। আয়নায় ভালো দেখেন না, নাপিতের কাছে যেতে ইচ্ছা করে না। আরও দেখি, আলোর ইতিহাস বিস্তৃত হচ্ছে জমি খেয়ে নেয়া নদীর চরের মতো। আমার জীবনের গ্রীষ্মদিনে বাবা নামের সেই চরটিতে আমি আশ্রয় নিই।
ফোনে বাবা মুম্বাই শহরে বাসরত তাঁর এক ছাত্র-দম্পতির কথা বলেন। তারা নাটকের দল করে প্রতি বছর পূজার সময়ে নাটক করে। নাম জিজ্ঞাসা করলে আর মনে করতে পারেন না কিছুতেই। স্মৃতি লোপাট হয়ে গেছে। আমারও মনে পড়ে বাল্যবান্ধবীর মুখ। তার কন্ঠস্বর মনে পড়ে না। তার সাথে শেষ কথা বলার দিনটা মনে পড়ে। শহর ছেড়ে ওদের চলে যাওয়ার সেই সন্ধ্যায় কলকাতা শহর অন্ধকারে ডুবে ছিল। এজন্য আমি লোডশেডিঙের কাছে ঋণী। আর, বাবার শৈশবে আলোয় কোনও শব্দ ছিল না। ফলে অদৃশ্য সুতোর উপন্যাস বাবার পাশে পাশে হেঁটে আসে, আমাকে গ্রাস করে নেয়। প্রজন্ম ছাপিয়ে এক হাহাকার বেজে ওঠে ফরিদা খানুমের কন্ঠে – আজ যানে কি জিদ্‌ না করো-!
মা’কে বড়ো একা লাগে। তুমুল জ্যোৎস্নার অগোচরে উপন্যাস সকলকেই একে একে জ্যোৎস্নার শরীরের গভীরে লুকিয়ে রেখে আসে। নতুন এক গর্ভসম্ভাবনায়। কেউ জানতে পারে না। মাও জানে না। আমি পুরনো সেই মায়ের গলায় ফিরে যাওয়ার আর্তি শুনতে পাই, নির্বিচার বসন্ত তাকে করুণ করে। পৃথিবীর সব নদীই পাতাঝরার মরসুমে এসে শেষবার খোঁজ করে ব্যক্তিগত জানলার, যেখানে সে বাঁক নেবে, হয়ে উঠবে নিপাট পরিবারের ফ্রেমে আটকে থাকা নারী।
খুব প্রিয় এক বন্ধুর বাড়িতে দেখেছিলাম তার মায়ের আলমারি সাজানো রয়েছে যেমনটি সেই মেয়ে রেখে গিয়েছিল। তার আয়না, আলনা, তার পালঙ্কে সূর্যাস্ত এখনও তেমন। বন্ধুত্ব ভাবলেই কেন আমার এই উষ্ণতাগুলো মনে পড়ে? কেবলি মনে হয়, ভালো বন্ধুরা মরচে ধরা তোরঙ্গটার মতো। যার মধ্যে রয়ে গিয়েছে ছোটোবেলাকার মার্বেল, পুঁতির মালা, সমুদ্রতীর থেকে সেই কবে ফ্রক পরা দিনদুপুরে কুড়িয়ে আনা একরাশ তাজা ঝিনুক - বালির স্পর্শমাখা নুন। আর কিছু পুরানো শাড়ি, ধুতি, জামা। রঙ চটা, রুক্ষ হয়ে আসা জীর্ণ সুতোয় লেগে থাকা একটা সুঘ্রাণ। বড়ি দেয়া হাতের গন্ধ, রাতে আঁচলে শুয়ে রূপকথা শোনার গন্ধ, একঘুমে ভোর হওয়ার পরে শিউলি কুড়ানো সেইসব গন্ধ মনে পড়ে ওইসব শাড়ি, পুঁতি, ঝিনুক আর তোরঙ্গের কাছে গেলে। ডায়েরির ভাঁজে শুকনো ফুলের কাছে গেলে। তোরঙ্গের মতো সমস্ত স্মৃতি ধরে রাখা প্রিয় কোনও মানুষের কাছে এলে, তাদের সাথে কথা হলে। এমনকি না হলেও। তারা এক পরিচিত রাস্তা ধরে হেঁটে আসে। আমার ভবিষ্যতের দিকে।
এইসব কোমলতা শিশিরে দাফন হয়ে ওঁর কপাল আর নিমীলিত চোখ ছুঁয়ে গেলে, ফিরোজা বেগম গেয়ে ওঠেন, মুসাফির মোছ রে আঁখিজল...। এ কান্নায়, আহ্বানে হংসধ্বনির কোনও জটিল আদর নেই। শীতের সময়ে আমার দেশে তবু বিদেশি পাখির ভিড়। হাঁসের দল দোলায় পাখা আর সমুদ্রের ওইপাশে, প্রবল শীতার্ত যুবক মোমবাতির আলোয় বাঁশির সঙ্গতে গেয়ে ওঠে, লাগি লগন পতি সখী সঙ্গ্‌, পরম সুখ অতি আনন্দম্‌। বাঁশি যেখানে আমায় ভরসা দিয়েছিলো, বন্ধুত্ব সেই উদ্বৃত্ত মরসুম। রাধা নয়, এর সবটাই আমি! জলে যে নেমেছিল অবেলায়, ইতিহাসে, মিথে – কল্পযাপনে। রাধেশ্যাম!