একটি জানাশোনা বিষ বিষয়ে...

নীলাদ্রি বাগচী


চোখে চোখ স্বস্তি দেয় না। চোখ না জানি কি বলে ফেলবে। সিগারেট ধরাতে গিয়ে নিকোটিন হলুদ নখ। অস্বস্তি। কেননা এ নখ বড় প্রিয়। কারন সে গোপন। হাত নামিয়ে নেওয়া চট করে। পায়ের চটির মাথার দিকটা একটু ছিঁড়ে এসেছে। আগে খেয়াল পরে নি তো। দু বার পা টা রাস্তায় ঘষে নেওয়া। একবার সামনে খেয়াল করা। সামনে এ কে।

না মানে এ সেইই। ওই চোখ বনানী বিতান আজও। কিন্তু এই দাঁড়ানো সেই দাঁড়ানো নয়। এই ভঙ্গী সেই ভঙ্গী নয়। এই মুখে সেই লালিত্য যেন নেই। সময়ের অদৃশ্য রেখা যেন দু একটা আঁচড় কেটেছে। প্রসাধন বেড়েছে অনেক। চুলের বাহারও বেড়েছে। সেই পাহাড়ি শীর্ণা নদী বয়সের পলি পেয়ে এখন অনেক পুষ্ট। বিভঙ্গ এসেছে তাই শরীরে। আত্মপ্রত্যয় আছে প্রতিটি সঞ্চালনে। বুকের কাছে উপনিষদের সঙ্কলন ধরে সেই চোখ সার্চলাইট হয়ে একবার দেখে নিল আপাদমস্তক।

কিন্তু... তোমার আরও ভালো থাকার কথা ছিল...

এর আগে পরে সমস্ত বাক্যবিনিময় অবান্তর। অবান্তর কারন সময়ের সৌজন্যবোধ প্রতিটি শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করে গেছে। যা বলতে চাওয়া এবং যা বলা হয়ে উঠল তার ফারাক হয়ে গেছে বিস্তর। দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা চিন্তার বাঁধ আবেগকে সরিয়ে দিয়েছে শব্দ থেকে বহু দূরে। অতএব, ‘ভালো থাকো, আসছি’।

কিন্তু তোমার আরও ভালো থাকার কথা ছিল। রাতে কুয়াশা জড়ানোর আগে অজস্র তারা। তারোঁ কি যব বারাত চলি তুম ইয়াদ আয়ে... আর আমার কতটা ভালো থাকার কথা ছিল? আমি কি আদপে ভালো আছি যে আরও ভালো থাকার কথা ছিল। শুধু ভালো থাকার কথা ছিল কি যথেষ্ট নয় এইখানে? নাকি আমার আচরণে কোনও ভাবে মনে হচ্ছে ভালো আছি। তাহলে আমিও ভালো আছি!

প্রেম কাহানী মে এক লড়কা হোতা হ্যায়- এক লেড়কী হোতি হ্যায়। এই সার্বজনীন ফরমুলা মানলে হারানো প্রেমের বিষয়ে মনোজ্ঞ আলোচনার পরিসর এইভাবেই শুরু হয়। এ ওকে বলে, তোমার আরও ভালো থাকার কথা ছিল। অনুক্ত থাকে, আমার সাথে থাকলে। শহরে, গ্রামে, পথে, প্রান্তরে, দীর্ঘ অন্ধকারে বা হ্যালোজেন আলোয় লম্বা হয়ে ওঠা ছায়ায় যেখানেই তুমি হারিয়ে ফেলে থাকো না কেন সেই প্রেম, সে আজও তোমার সাথে থাকলে তোমার আরও ভালো থাকার কথা ছিল।

কিন্তু এই প্রেম কি সত্যি হারিয়ে গিয়েছে? হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশে তাকে নিয়ে বিজ্ঞাপন দেবার কোনও প্রয়োজন আছে কি? এক বয়সে আহার নিদ্রা ত্যাগ করে- তুমি ওগো তুমি মোরে বেঁধেছ যে মায়াডোরে যার জন্য জপ করা লাগাতর, আজ তাকে দেখে সেই মায়ার কিছু কি খুঁজে পাওয়া যায়? ফেসবুকে তার ছবি দেখলে প্রথমেই কি মনে হয় না ইস্ কিরকম দেখতে হয়ে গেছে!? নিজের যে ইন্দ্রলুপ্ত, নিজের যে চারখানা দাঁত নেই- সেই কথা মনেই আসে না। বয়স আমায় চুরমার করে দিক তাকে তো ছোঁয়ার কথা নয়। সে তো সেই শান্ত ট্রাম লাইন, নিচু ঘাসের ঠাণ্ডা মাঠ, ক্যানেল পারের সন্ধে আর আঠারো বছরের দখিনায় আছে। তার তো বদল হতে পারে না। উপনিষদ নয় তার তো হাতে থাকার কথা শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তুমি থামো, এক পা তুলে রাখো আমার হাতের উপর/ রেখার উপর, তালুর উপর, রাখো তোমার উদ্যত পা... তোমার বয়স তো বাড়ার কথা নয়।

অনিশ্চিত জ্ঞানের নাম সংশয়। তাই এইখানে একটু খোলসা করা যাক। প্রেম হারায় না। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি সবসময়েই বলবো প্রেম হারায় না। তবে হ্যাঁ, হারায় না ততদিন অবধি যতদিন সেই প্রেমাস্পদের সাথে আবার যোগাযোগ না হচ্ছে। যোগাযোগ হল কি প্রেম হারাল। নিশ্চিত হারাল। কারন তখন জীবন ব্যাল্যান্স শিট হয়ে দাঁড়াবে। কি পাইনি তার হিসাব মিলাতে মিলাতে দেড় হাত জিভ বের হয়ে যাবে। রবি ঠাকুর মাত্থায় উঠবেন। রাতের ঘুম বরবাদ হয়ে যাবে- তখন রিক্সা চড়ার পয়সাও ছিল না এখন আই টেন চড়ছে, এই ভাবতে ভাবতে। জানালার যে পাল্লাটা একটু ঢিলে সারারাত তার ওপর বাতাসের অত্যাচার শুনে শুনে পরেরদিন সেই প্রেম আর এই শব্দ সমার্থক হয়ে উঠবে আপনার কাছে। কাঠ মিস্ত্রি আসবে। শব্দ বন্ধ হবে। রাতে কানে স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের সেই প্রেম ভাব আর ফিরবে না। সেই একজনারে মন সঁপেছি এই কথা মনে হলেই অবধারিতে মনে হবে আই টেন, উপনিষদ আর দূর শালা, ও যদি আমাকে ছাড়া এতটাই ভালো থাকে আমি ফালতু ভেবে মরছি কেন?

আর এইখানে এসে আবেগ আর যুক্তির মধ্যে একটা ক্যাট ফাইট শুরু হয়ে যাবে মাথার ভেতরে। আমি কি খারাপ আছি নাকি? সংসারএর কোন প্রয়োজনটায় আমার দরকার পড়ছে না? আর আমি কিই বা করছি না? বছর দেড়েকের মধ্যে কার লোন নেওয়াটা কোন সমস্যা নাকি? ওর আই টেন তো কি হয়েছে আমি আই টোয়েন্টি নেব একবারে। প্রেম হারাতে থাকবে। পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে বর্তমান।

বেশ ক দিন পরে রাতের দিকে ঘরে ফরফর আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে যাবে। ভয় নেই পাল্লাটা আবার ঢিল খায় নি। আরশোলার ওড়ার শখ হয়েছে তাও নয়। আপনার প্রেম আসলে আপনাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বায়বীয় জিনিস তাই এই ফরফর শব্দ। ফেরানোর চেষ্টা করবেন না। ও হারাবেই। শান্ত ট্রাম লাইন, নিচু ঘাসের ঠাণ্ডা মাঠ, ক্যানেল পারের সন্ধে আর আঠারো বছরের দখিনায় ও ফিরে যাচ্ছে। ও ফিরে যাচ্ছে শহরে, গ্রামে, পথে, প্রান্তরে, দীর্ঘ অন্ধকারে বা হ্যালোজেন আলোয় লম্বা হয়ে ওঠা ছায়ায় সেইখানে যেখানে আসলে আপনি ওকে রেখে এসেছেন। যে ভ্রান্তি এতদিন আপনার সাথে ছিল আজ তার থেকে আপনি আজাদ হয়ে যাচ্ছেন। নিশ্চিন্ত মনে ঘুলঘুলির আচমকা আলোয় দেড় হাত দূরের মানুষটির গভীর ঘুম লক্ষ করুন। দেখবেন আপনারও ঘুম পাচ্ছে। কারন, আপনার কাজ কেবল তাঁর সাথে এক হয়ে থাকা, তাঁর ঘড়ির কাঁটা হওয়া আর কি।অতএব, যা হারিয়েছে তা এই অন্ধকার রাতে তার নিজস্ব গন্তব্য খুঁজে নিচ্ছে তো নিক। এইটুকু ভেবেই কিন্তু আপনি ভালো থাকতে পারেন।

নইলে, প্রেম মনসিজ, প্রেম তরল আবেগ, এক বয়সের পর প্রেম ফ্রেম নিয়ে মাথা ঘামায় বেকার লোক। আহার- নিদ্রা- মৈথুন এসবই প্রেম রহিত। জীবনের চাহিদার ফ্রেমে প্রেম বস্তুটি ঠিক কোনখানে ফিট করে না। যৌনতা করে। কিন্তু প্রেম তো ২ আনা যৌনতা হলে ১৪ আনা নিকষিত হেম। এই ভাবেও ভেবে নিতে পারেন। অসুবিধা হবে না কোনও, দেখবেন।

সাংখ্য বলে, বাস্তবে কোন পুরুষ সংসারী নয়। পুরুষ যে সত্যি সত্যি বাঁধা পরে আছে তাও নয় আবার সত্যি সত্যি যে বন্ধনমুক্ত তাও নয়। সংসার- বন্ধন- মোক্ষ এ সবই প্রকৃতির জিনিস। পুরুষের কেবল সে বিষয়ে ভ্রান্তি আছে, আর কিছু নেই। এইটে জোরালো যুক্তি। ব্যবহার করে দেখুন।

আপনি একবিংশ শতাব্দীতে বেঁচে আছেন, এই হল আমার শেষ কথা, যুক্তির চরম, আপনার হারানো প্রেম নিয়ে।

আমি বরং এইবার আমার ধারনার কাছে ফিরি- প্রেম হারায় না। সন্ধের ঘোর যখন নেমে আসে আমার মফস্বলে, এক আধ দিন অলস হাঁটায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমি দেখি আলো অন্ধকার নির্জনে, কোলাহল থেকে ঈষৎ দূরে সাইকেল কিশোরীর সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটছে সদ্য গোঁফ গজানো তরুণ। অনায়াস নিজেকে ভেবে নিতে পারি আমি অইখানে। ওই দীর্ঘ হাঁটার সমস্ত গল্প আমি বুঝতে পারি। শব্দে নৈশব্দে স্পর্শে পৌঁছে যেতে পারি আমি। বেসিনের জল চোখেমুখে ছিটিয়ে, তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে ভাবতে পারি এতক্ষণ তার সাথেই ছিলাম। তার কথা মনে এলেই মফস্বলের আবহাওয়া সেইসব দিনে ফিরে যায় যখন বছরের পাঁচ মাস দখল করে থাকতো বৃষ্টি। আকাশে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। পুব হাওয়া দোলা দেয়। বারান্দায় তারে মেলা জামা কাপড় কেঁপে ওঠে। কাপড় জামা তুলতে তুলতে অবিরত মনে হয় আর মনে হওয়ার হাত ধরে আরও মনে হয়। মনে হওয়ারাই সন্ধেকে টেনে রাতে নিয়ে চলে যায়। দু এক খানা ডিগবাজি খেয়ে স্মৃতি সেইসব ঝলমলে দিন ফিরিয়ে আনে। সেই প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণের দিন। হন্যে হয়ে ক্লাস পালিয়ে রাস্তায় ঘোরার দিন। এবং অবধারিতে ঘুচে যাবার যন্ত্রণা। হেরে যাবার কষ্ট। আর আমি আবারও বুঝতে পারি, প্রেম আজও রয়ে গেছে।

সময় হারিয়ে যাচ্ছে। স্মৃতির বেলা পড়ে আসছে। অন্যমনস্কতা বাড়ছে। আজকাল বহু কিছু খেয়াল থাকে না। অফিস ফেরতা করলার পাড়ের মনোরম বাগান চোখে পড়লে একটা সংশয় জাগে ভেতরে ভেতরে। এটা কি সেই একই বাঁধ? সেই বকুল গাছ এই উদ্যানে কোথায় হারিয়ে গেছে। রূপশ্রী সিনেমা হল কবে বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে এখন বহুতল বিপণি। সিনেমা হলের সাথে সাথে আমার সেইসব ব্যালকনি দুপুরগুলোও হারিয়ে গেছে। হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে ঝরা ফুল কুড়োতে কুড়োতে একা আমি নিঝুম দুপুরে মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা, সত্যি এমন হবে না তো যে আমার প্রেমটাও আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে সময়ের ফেরে, আমি ভুলে যাব সেইসব দিন? শুধু আমার কেন এই ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড জীবনে প্রেম নামক বায়বীয় মনসিজ হারিয়ে যাবে না তো বাংলা স্বরবর্ণের সেই অক্ষরের মতো? কেবল ছাপার অক্ষরে আর পাঠ্যে অপাঠ্যে সে একটা শব্দ হয়ে থেকে যাবে না তো? একদিন এই ৯কার সংখ্যার মতো প্রেম সংখ্যাও বেড়িয়ে যাবে না তো? যেখানে সম্পাদকীয় শুরু হবে- বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত প্রেম, এই মানসিক অসুখের বাড়বাড়ন্ত ছিল দেখবার মতো। সুখের কথা, এই শতাব্দীর মানুষ ধীরে ধীরে এই অসুখের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলেছেন। অবসাদের তুল্যমূল্য একটি নিঃশব্দ ঘাতক এই অসুখের জয়গান করা হতো একসময় চিত্রে, সাহিত্যে, গানে, চলচ্চিত্রে। আজ বিশ্ব প্রেম মুক্ত দিবসের তৃতীয় বার্ষিকী উদযাপনের দিনে আমাদের এই বিশেষ সংখ্যা গত শতাব্দীর সেই মারণ মানসিক অসুখ নিয়ে যেখানে আমরা ফিরে দেখবো... ও ইত্যাদি, ইত্যাদি।
সাংখ্যবাদের জয় হোক। কিন্তু সে দিন যেন আমাকে না দেখতে হয়। আমি তার আগেই যেন হারিয়ে যেতে পারি গত শতাব্দীর শেষ দশকের সেই মায়াবী মানসিক অসুখে ভুগে......