সেই সব ৯কারেরা

বিশ্বদীপ দে


মরণ রে…
নাউ আই হ্যাভ বিকেম ডেথ, দ্য ডেসট্রয়ার অব ওয়ার্ল্ডস।
কথাগুলো কখন বলেছিলেন বিজ্ঞানী জে রবার্ট ওপেনহাইমার, তা ইতিহাস সচেতন মানুষের অজানা নয়। এ সেই মুহূর্ত যখন উজ্জ্বল আলোয় ধাঁধিয়ে যাচ্ছে চারপাশ। ভোর সাড়ে পাঁচটার সেই বিস্ফোরণ গলিয়ে দিয়েছিল একশো ফুট দীর্ঘ টাওয়ার। দূর দূরান্তের বাসিন্দারা চোখ কচলে দেখেছিল, আজ দুবার সূর্য উঠল কিনা! আসলে তা ছিল পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ।
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি। সামান্য কদিন পরেই হিরোসিমা-নাগাসাকি বিস্ফোরণ। তার আগেই হয়েছিল এই পরীক্ষা। প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূর থেকে সেই কমলা রঙের কুণ্ডলী পাকানো বিষ-মেঘের দিকে তাকিয়ে গীতার শ্লোক উচ্চারণ করে বসেছিলেন ম্যানহাটন প্রোজেক্টের সর্বময় কর্তা ওপেনহাইমার!
এ লেখার বিষয় ওপেনহাইমার নয়। এমনকী পরমাণু বোমাও নয়। আমরা কেবল তাকিয়ে থাকব সেই উজ্জ্বল মেঘের দিকে। আর ভাবব ওপেনহাইমারের কথাগুলি। নাউ আই হ্যাভ বিকেম ডেথ, দ্য ডেসট্রয়ার অব ওয়ার্ল্ডস।নিজেকে স্বয়ং মৃত্যু বলে ঘোষণা করেছিলেন ওপেনহাইমার।তাঁর চোখের সামনে যখন ভেসে উঠছিল মৃত্যুর উজ্জ্বল কমলা আলো। তিনি প্রমাদ গুনেছিলেন সেদিন সেই আশ্চর্য আলোটি দেখে। ভুল তো কিছু ভাবেননি। আজও সেই আলো মানবসভ্যতার আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। আর সেই আলোর জ্যোতি কেমন? তাও বলেছিলেন তিনি। সেও গীতা থেকেই। 'দিবি সূর্যসহস্রা ভবেদ যুগপত্থিতা...।' হাজার সূর্যের মতোই সেই আলোর দীপ্তি। এই কথার সূত্র ধরে এবার আসল লেখায় ঢোকা যাক।
তাহলে উজ্জ্বলতর কর দীপ
আপাতত যতটা লেখা হল, সবই আসল লেখার ধানাই পানাই। আমাদের আসল উদ্দেশ্য ওই উজ্জ্বল আলো ও মানবসভ্যতাকে স্পর্শ করে আরও সুদূরে যাওয়া। অনেক অনেক সুদূর। মানুষ তার নিজের সৃষ্টি করা আলো দেখে ভেবেছিল হাজারটা সূর্যের কথা। আমরা বলব এমন আলোর কথা যার তীব্রতা দশ মিলিয়ন বিলিয়ন সূর্যের সমান! সেই আলোও এক বিস্ফোরণের আলো। মানুষের সমস্ত অহংকারের উত্তর হয়ে সেই আলো আজও পৃথিবীর আকাশে ফুটে আছে। সূর্যের থেকে পঞ্চাশ গুণ বড় আর দশহাজার গুণ উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল সেই আলোর। সেই দৈত্যাকার নক্ষত্রের অকালমৃত্যুও হয়েছিল তার ওই উজ্জ্বল শরীরের জন্যই। সেই বিস্ফোরণের ‘আফটারগ্লো’ আমাদের আকাশে ফুটে আছে একটি ছোট্ট লাল বিন্দু হিসেবে!
অথচ ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে তেরো বিলিয়ন বছর আগে। বিগ ব্যাঙের মাত্র ছশো মিলিয়ন বছর বাদেই। আজও সেই আলো মহাকাশের বুকে তার সফর অব্যাহত রেখেছে। ওপেনহাইমারের সেই কথাকে (যা আসলে শ্রীমদ্ভাগবত গীতার কথা)এই বিস্ফোরণের প্রেক্ষিতে দেখলে আরও বিরাট একটা ক্যানভাস আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। সেটাও আসলে মৃত্যুর ছবি। এক দীর্ঘকালীন পথ পেরিয়ে সেই সুদূর সময়ের আলো মানুষের চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলতে থাকে মৃত্যুর ধারাবাহিক, অনিবার্য, শীতল এক পরিক্রমাকে। বলতে গেলে ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাসের অন্যতম আদিম এক নক্ষত্র সে। অথচ বিজ্ঞানের নিয়মে আজও ভেসে চলেছে তার উজ্জ্বল শরীর নিয়ে।
তবে… আসলে তো সে নেই। কবেই এক বৃহৎ ‘৯-কার’ হয়ে গেছে। মহাকালের হৃদয়ে কেবল জলছাপটুকু রয়ে গেছে তার।
ক্রমে আলো আসিতেছে
আকাশে যে নক্ষত্র দেখি তাদের মধ্যে এমন আরও আছে। যারা আছে। অথচ নেই-ও। আসলে নেই-ই। কেবল মহাজাগতিক সেই সব ‘৯-কার’-এর আলো জেগে রয়েছে আমাদের চেতনায়।
শহরের আকাশে খুব বেশি তারা দেখা যায় না। ধূসর তার শরীরময় কেবলই মানুষের তৈরি করা কৃত্রিম ধোঁয়া ধোঁয়া রং। কখনও দূষন। কখনও বা শহরের নিজস্ব আলোর বিরক্তিকর বিচ্ছুরণ। সব মিলিয়ে কেমন ঝাপসা ঝাপসা। কিন্তু শহর থেকে একটু দূরে গেলে, আকাশ যখন পরিষ্কার… তখন ওপরে তাকালে কেমন ঘোর লেগে যায়। জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত লাগিতেছে আমার শরীরে…।’ একজন কবি তো শেষ পর্যন্ত দ্রষ্টা। তিনি চোখ মেলে তাকালে তাঁর চোখ সময় বা দূরত্বের ধারণাকে নস্যাৎ করে বহু দূর অবধি দেখে নিতে পারে নিমেষে। জীবনানন্দের মতো কবিরা এ ভাবে আলোকবর্ষের সীমা ভেঙে আরও বহুদূর দেখে নিতে পারেন। ‘নক্ষত্র’ শব্দটি তাঁর কলমে কতবার যে জ্বলজ্বল করে উঠে এমন সব দ্যুতিময় অপার্থিব পংক্তির জন্ম দিয়েছে।
তবে এ লেখা যেহেতু জীবনানন্দকে নিয়ে নয়, তাই আমরা তাঁর কবিতা থেকে চোখ সরিয়ে আবার তাকাব অন্যত্র।
আমাদের উঠানের কাছে...
মহাকাশে যা দেখি সেসব বহুদূরের ঘটনা মাত্র। তার সঙ্গে আমাদের জীবনের কী যোগ? এমনটাই ভেবে থাকি আমরা। এমনটাই ভাবা বোধহয় স্বাভাবিকও। প্রাত্যহিক পিএফ, প্রিমিয়াম, ইএমআই, মেগা সিরিয়াল, জিমিস কিচেন, আইপিএল, শাহরুখ খান, ওয়াই ফাই, হোয়াটস অ্যাপ, বন্ধুর বিয়ে, ভাগ্নির মাধ্যমিক, বাবার সুগার--- এসবের সঙ্গে সেই অর্থে সরাসরি কোনও যোগাযোগই নেই যার তাকে নিয়ে ভাবার দরকারটাই বা কী?
অথচ অনন্ত কুয়োর জলে পড়ে থাকে চাঁদ। সেই কুয়ো রয়েছে জ্যোৎস্নায় ভিজে থাকা আমাদেরই উঠোনে। আমরা যার মধ্যে রয়েছি, সারাক্ষণ তীব্রগতিতে যার ভেতর দিয়ে ভেসে যাচ্ছি... সেই মহাশূন্যের জগৎ আমাদের অস্তিত্বের মধ্যে গুঁড়ো হয়ে মিশে আছে। তারার ধুলো থেকেই আমাদের জন্ম, আবার তারার ধুলোর মধ্যেই একদিন সব মিশে যাবে---এমন একটা নৈরাশ্যের কথা আমরা ভাবি বা না ভাবি, তা তো সত্যিই। কবেকার এক লাল আলোর বিন্দু যেন সেই কথাটাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
আসলে এই মহাবিশ্ব কী এক অমোঘ নিয়মে ক্রমশ অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বের দিকে, নির্মাণ থেকে বিনির্মাণের দিকে, সৃষ্টি থেকে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। এমনটাই নিয়ম। অর্থাৎ 'কাল ছিল ডাল খালি, আজ ফুলে যায় ভরে...' এর ঠিক উল্টোটা। শেষ পর্যন্ত সব কিছুই এক 'নেই'-এর দিকে, এক বৃহৎ '৯ কার'-এর দিকে যাবে।
সৃষ্টির আদিম যুগের সেই তারার ভাগ্যে যা ঘটেছিল, আমাদের সূর্যের ক্ষেত্রেও তার থেকে আলাদা কিছু হবে না।
একেবারে শেষে এসে সেও পরিণত হবে একটা লাল দৈত্যতে। মানে অতিকায় লাল তারাতে। এমনটাই তো নিয়তি সমস্ত নক্ষত্রের। সেই লাল তারা ক্রমশ ফুলতে ফুলতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পরিণত হবে এক প্রকাণ্ড নেবুলাতে। তারপর আসবে 'সাদা বামন' দশা। সূর্যের নিজের মধ্যে তখন অবশিষ্ট থাকবে কেবল সামান্য ফিকে আলো। বিজ্ঞানীদের মতে সেই আলো যেন জ্যোৎস্নার আলোর মতো!
আস্তে আস্তে সমস্ত নক্ষত্রের ভাগ্যেই এমনটা ঘটবে। আর সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে নেমে আসবে চিররাত্রির অন্ধকার। মৃত নক্ষত্র আর ব্ল্যাক হোলে ভরা আমাদের ব্রহ্মাণ্ড সামগ্রিক ভাবেই তখন এক '৯কার'। এক দীর্ঘ অনস্তিত্বের দেশ।
আজও তবু পৃথিবীই আমাদের চোখ জুড়ে আছে
আজ থেকে একশো ট্রিলিয়ন বছর পরে এমনই ঘটবে। বলছেন বিজ্ঞানীরা। ব্রহ্মাণ্ডের বুক থেকে মুছে যাবে তারাদের যুগ। মহাজাগতিক সব কিছুই এভাবে কথায় কথায় আমাদের কোটি কোটি বছরের এপার ওপার নিয়ে যায়। কিন্তু আমরা যারা এই পৃথিবীতে এসেছি খুব বেশি কয়েকটা দশক কাটাব বলে, তাদের কাছে এই খবরের আপাত কোনও গুরুত্ব থাকার তো কথা নয়। তা সত্বেও সেই সুদূর ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে থাকা দুঃস্বপ্ন আমাদের চেতনার মধ্যে এক হতাশার ঢেউ হয়ে দুলে যায়।
কিন্তু তবু...আমরা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর দিকেই ফিরে আসি। বকের বেশ ধরে এসে ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘জগতে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কি?’ যুধিষ্ঠির জবাবে বলেছিলেন, 'সব মানুষই মরবে। অথচ এ কথাটি সে ভুলে থাকে। এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের।' আসলে মৃত্যু যেমন এক অনিবার্য গন্তব্য, তেমনই এই ভুলে থাকাটাও আমাদের সেই পথের এক অবশ্যম্ভাবী মাইলফলক।
তাই, তারার আলোয় আমরা কেবল ধংসের কথা ভাবি না। মনে পড়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়। 'দেয়ালির আলো মেখে নক্ষত্র গিয়েছে পুড়ে কাল সারারাত। কাল সারারাত তার পাখা ঝরে পড়েছে বাতাসে। চরের বালিতে তাকে চিকিচিকি মাছের মতো মনে হয়।' এমন সব পংক্তি আর আমাদের এই সব অনিবার্য 'লিকার'-এর থেকে বহুদূরে নিয়ে যায়। যে তারা আছে অথবা যে তারা নেই, তাদের সবার শরীরে আমাদের মুগ্ধতার জলছাপ লেগে যায়। আমাদের মতো এই সব তারারাও একদিন মুছে যাবে আকাশের বুক থেকে। কিন্তু অমর কবিতার মতো, অবিনশ্বর শিল্পের মতো, 'চিকিচিকি মাছের মতো' তার রেশ থেকে যাবে কোথাও না কোথাও।
এই সব ভাবতে ভাবতে ও বিশ্বাস করতে করতে আমরা পুনর্বার জীবনে প্রবেশ করি। সেই সব সুদূর ‘৯’কারেরা আমাদের চেতনার গভীরে থেকে যায় যদিও।