হেমন্তের ফুটপ্রিন্ট ছায়াপথে সেদিনও তো ছিল!

কৌশিক দত্ত


পাথরেরা জলে নামবে কিনা বুঝতে না পেরে যেখানে থেমে গেছে , সেখান থেকে জলের বুকের তল অবধি বালি । বালিরা যেমন হয় — একান্তে শুকনো রুক্ষ, কিন্তু সমুদ্র ছুঁলেই ভেজা মন! এখানে ও তেমনি ওরা । ঈষৎ তফাৎ বর্ণে পুরী কোভালামে । পুরীর সমুদ্র কালো , বালি গেরুয়া তামাটে।এখানে বালিরা কালো, সমুদ্র সুনীল । পাথরের উৎরাই পেরিয়ে এ হেন বালির মধ্যে সদ্য পাদুকা মুক্ত পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছি সমুদ্রের মুখোমুখি । সমুদ্র দরাজ এখন ।ছল ছল ঢেউ ঢেলে পা ধুইয়ে দিচ্ছে অমায়িক।
আমার থেকে ঠিক এক আকাশ এক সমুদ্র দূরে শেষ নভেম্বরের সূর্য জলের দিকে নামতে নামতে এক জায়গায় থমকে আছে কয়েক মুহূর্ত । কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা এই বেলা ডুব দেবে কি দেবে না । সন্দিগ্ধ পাথরদের মতো । বালির মতো যারা নিশ্চিত নয় পিপাসা বা প্রেম বিষয়ে … একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়া শেখেনি বলে যাদের কোনোদিন ডোবার মতো করে ডোবা হল না ! আমার হাসি পাচ্ছে বুঝতে পেরেই বোধ হয় ঝুলতে থাকা পশ্চিম দেয়ালের সূর্য একবার পাথর আর একবার বালির দিকে তাকিয়ে সহসা চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল । এবার সে জলে নামছে দ্রুত… অতি দ্রুত । যেন তার ডোবার তাড়া । যেন তাকে যেতে হবে আজই ।
এই অত্যুৎসাহী আত্মহত্যার দৃশ্যে নাড়া খেয়েই হোক , অথবা হাওয়া – জল –বিকেল রোদের প্রবহমানতার টানে ... পায়েরা আর স্থির থাকতে পারল না। একবার পাথরের মজলিসের দিকে কয়েক পা হেঁটে আবার ফিরে এলাম যেখানে ছিলাম সেখানে নিজের পায়ের ছাপ খুঁজতে খুঁজতে। আর এসেই সেই কথাটা বুঝতে পারলাম, যেটা অনেক মূল্য দিয়েও বুঝিনি এতদিন। যেখানে এইমাত্র ছেড়ে গেছিলাম পদচিহ্ন, সেখানে... ঠিক সেইখানে শুয়ে আছে “৯”।
এই পাঠটুকু হৃদয়ে নেবার ফাঁকে সূর্য আত্মঘাতী হল। জলে হিংস্র দাগ কেটে ছুটে যাওয়া স্পিড বোটের স্পর্ধার প্রেক্ষাপটে বেহিসেবি ক্রিমসন ছড়িয়ে সে লয় বেছে নিল। বোট দেখল না ঘাড় বেঁকিয়ে তার চিরে দেওয়া দগদগে রেখা কতক্ষণ বুকে করে বসে থাকে সমুদ্র। স্পষ্ট বোঝা যায় স্পিড বোট আর এই জলরাশি একসাথে থেকেছে শুধু; সহবাস করেনি। ঘোমটা সরেনি কোনোদিন। নইলে জানতে চাইত নির্ঘাৎ এরাও, এখনো পারি কি আমি... এখনো তোমার বুকে স্থায়ী দাগা দিতে? সমুদ্র রাখেনি তার রেখা। বোকা বোট খবরই রাখে না।
পায়ে পায়ে পাশের টিলায় উঠে নির্জন পাথরে বসে আরেকবার খোঁজার চেষ্টা করি জলের পাকদন্ডী পথে নৌকার ফুটপ্রিন্ট। চলে যাওয়া সূর্যের ফেলে যাওয়া সিঁদুর কৌটো জলে গুলে, আকাশের গায়ে মাখামাখি হয়ে আছে। আর কোনো স্মৃতি নেই কারো। এমনকি সিঁদুরটুকু মুছে যাচ্ছে। এইবার কালো। এইবার স্মৃতিগ্রাসী আরব সাগর সব শব্দ মুছে গেলে একাকী গর্জাবে সারা রাত।
কালও ফের সূর্য উঠবে, একইরকম। কিন্তু আজ সন্ধেবেলা যে থরথর সূর্যকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখলুম, সে আর আসবে না। পয়লা ডিসেম্বর অন্য এক দিন। অন্য সূর্য তার। যে গেল, সে গেল।
* * * * * * * * * * * * *

ডায়মন্ড প্লাজার সামনে কাতার দিয়েছে সুখী মানুষ। এদিক-সেদিক থেকে এসেছে সুখ কিনতে যশোহর রোডকে গাড়ি চাপা দিয়ে। রিক্সা, চপ-ফুলুরিওয়ালা আর আধখোলা নর্দমাকে নজর-আন্দাজ করে স্নান করছে বিজ্ঞাপনের সান্ধ্য উজ্জ্বলতায়। এই বাড়িটার মধ্যে এখন সংসার পেতেছে খুশি আর আনন্দ। ওদেরকে নতুন করে সাজিয়েছে বাজার। ওরা রোজ বিক্রী হয়। রোজ কিছু হিসসা নিয়ে যায় দমদম, লেক টাউন, বাঙুরের দাবিদারেরা। আবার নিজেদের শানিয়ে তোলে ওরা। আবার সেজে গুজে বসে প্যান্টালুনস, বিগ বাজার আলো করে। আবার লাইন পড়ে ওদের কেনার জন্যে। পুজো আসছে। দীর্ঘ হচ্ছে লাইন। পুজো আসছে, শরৎ আসছে না।
অথচ শরৎ ছিল। এখানেই ছিল। খুশি জানে, পূজা জানে, লাইন জানে না। ডায়মন্ড প্লাজা আর ডায়মন্ড সিটি নর্থ এইসব এ শহরে ধ্রুব মনে হয়। শরতের মতো তারা ঋতুমাত্র নয়। এরা আসে সুখ নিয়ে, বাতিল শরৎ ব্যর্থ প্রেমিকের মতো শহরের বাইরে চলে যায়। অথচ এখানে বছর দশেক আগে কাশফুল ছিল। শহর নিশ্চিত জানে, লাইন জানে না। শহরেরা চাপা দেয় হেরে যাওয়া শব, লাইনেরা খবর রাখে না।
যশোহর রোডের উল্টোদিকে এক পাঁচতলা হাসপাতাল। সে যখন সাদা ছিল, তখন এখানে ছিল কাশক্ষেত, ভাঙা রডকল। পাঁচতলার ছাদে উঠে মাঝে মাঝে দেখতাম — খানিক অবাক — কেমন অদ্ভুতভাবে কংক্রিটের বনে একখন্ড নির্লিপ্তি বেঁচে বর্ত্তে আছে! পাঁচিল ঘেরা জমি বিঘে কয়েক। মাঝবরাবর একটা পুরানো দালান। তিনতলা। একতলা বসে গেছে মাটির ভেতরে অনেকটাই। একাকী যখের মতো দিনরাত পাহারায় থাকে। এই ভূমিখন্ড শুধু তার। শরৎ এলে তার বাগানে এসে নামে পরিযায়ী কাশের দল। কোথা থেকে আসে? কেন আসে? দিনে দিনে সাহস বাড়ে কাশের। বড় হয়। মাথা নাড়ে বাতাসে পাগল! খুশি আর আনন্দ — যাদের বাজার দর হয়নি তখনো — ছুটে বেড়ায় মাঠ জুড়ে কাশফুল ছুঁয়ে। এইভাবে পুজো আসে। কাশের সংসারে কোনো বিক্রী-বাটা নেই। শুধু দোল খাওয়া। এভাবে শরৎ যায়। ধীরে ধীরে তাঁবু গোটায় কাশ। ফিরে যায়। আবার আসবে।
এমনি করে একবার হেমন্তের সন্ধেবেলা বানজারা কাশেরা উধাও। বুড়ো বাড়িটা যেন একটু বেশি বিমর্ষ। এসেছে নোটিস বুঝি পাতা খসানোর। পরের বছর কাশেরা উড়ে তো এল কলকাতা শহরে দিকশূন্যপুর শালুকপুকুর তালুক থেকে, কিন্তু একি! ঘরদোর কই? সিমেন্ট বালির স্তুপে কোথাও পেল না খুঁজে শরতের নিকোনো উঠোন। শরৎ চলে গেছে “৯”-এর বাড়িতে। এখানে মানুষের বাসা হবে। বড়মানুষের বাসা। মানুষের স্বপ্ন শুরু, শরতের শেষ।
* * * * * * * * * * * * *

“মানুষের স্বপ্ন শুরু, শরতের শেষ” কথাটা আংশিক সত্য। লিরিকাল গদ্যের উপযোগী সত্যের অংশটুকু। অন্য ভাষায় অন্য ভাবে অন্য বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে বাক্যটা হয়ত এমন হতে পারত, “ মানুষের স্বপ্ন শুরু, মানুষের শেষ”। দুটো মানুষের দলকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্যে হয়ত দুবারই মানুষ শব্দটার আগে লিখতাম “কিছু”। ব্যাস! মানুষ ভেঙে যেত, যেমনটি রোজই তারা ভাঙে। সেই লেখার চাল হত অন্য, হৃদয় রাজনৈতিক। অকর্কশ কণ্ঠে কোনো স্লোগান দেয়নি যেন কেউ! শরতের সত্যি আর মানুষের সত্যি যেন এক হতে পারে না কখনো।
মানুষের সত্যিরাও ডায়মন্ড প্লাজার নীচে শুয়ে আছে বিস্মৃত কবরে। কাশগুচ্ছেরআগেএখানেমা নুষছিল, আরমানুষেরআগেহয়তকাশ।এ ই অঞ্চলে একসময় অনেক ছোট ছোট কারখানা ছিল। রড, রাবার, ছাতার কল... আরো নানারকম। অর্ডিনান্স ফ্যাক্টরি, গান-শেল আর জেসপের মতো বড়দের পাশাপাশি যৌবন গৌরব ছিল এদেরও শরীরে। কেষ্টনগর, মালিপাঁচঘরা, চুঁচড়ো, বসিরহাট থেকে কাজে আসত লেবার, মিস্ত্রি, ছোটবাবু, মেজবাবু... হরেক মানুষ। সারা দেশ জুড়ে তাদের হরেক কিসিমের সংসার। কারো মেয়ে ইস্কুলে এইবার দ্বিতীয় হয়েছে, কারো ছেলে তবলায় তুখোড়। শ্যামবাজার মোড় থেকে কোনো বাপ নিয়ে যাচ্ছে সন্তানের প্রথম ফুটবল। সে এক অন্য যুগ, অন্যতর স্বপ্নের প্রহর।
কাঠের বর্গা দেওয়া পাবলিক বাস, সবুজ রঙের ট্রেন বনগাঁ লোকাল। প্রাইভেট গাড়ির গল্প গোনাগুনতি, একজন দুজন। অ্যামবাসাডর আর প্রিমিয়ার পদ্মিনী। নেহাৎ পয়সা উড়লে কন্টেসা ক্লাসিক। হিরুবাবুদের ছিল পুরোনো ফিয়াট; দরজাগুলো সামনেদিকে খোলে।টেলিভিশনের সেট মহল্লায় একটা কি দুটো — শহর মফস্বলে — গাঁ-পাড়ায় একান্ত রেডিয়ো। রেডিয়োর মত সাথী কখনো পায়নি মানুষ। চায়ের দোকানে বাজে, সান্ধ্য আড্ডায়... অন্ধকারে চুপি চুপি লেপ মুড়ি দিয়ে তাকে নিয়ে শুয়ে থাকলে কলকাতা “ক” নরম গভীর কণ্ঠে কথা বলে বৈঠকি চালে। শুক্রবার সন্ধেবেলা রেডিয়ো-নাটক, বুধবার যাত্রাপালা, স্থানীয় সংবাদ, হারানো দিনের গান, অনুরোধের আসর... সে এক অন্য সুখ, অন্য কোনো দ্বীপের বোধহয়! সে দ্বীপ চেনে না এই ঠিকানা হারিয়ে ফেলা একুশ শতক।
ধীরে ধীরে অন্য অঙ্ক অন্য লোভ এসে গোঁজামিল দিয়ে গেছে হিসেব খাতায়। দমদম, টিটাগড়, ফুলেশ্বর, নৈহাটি... স্বপ্নেরা হেরে গেছে সময়ের কাছে। পলিমার ধেয়ে এসে ভেঙে দিল পাটের কুটির। পুরোনোটেকনোলজি হেরে গেল নতুনের কাছে, যেভাবে সন্ন্যাস নেয় পরাজিত বুড়ো সিংহ প্রিয়তমা সিংহীদের ছেড়ে। চটকল, ডানলপ, সুলেখা বা ঊষা... একে একে চলে গেল বর্ণহারা “৯”-এর কোটরে। সাথে নিয়ে গেল এক প্রজন্ম চেতনা। স্থিতিবাদী, অল্পে খুশ, ছোট স্বপ্ন, ছোটখাটো কথা। তালা এল। লে আউট, লক আউট। অনশন, প্রতিবাদ, মৃত্যু আর গণসঙ্গীত। সব এল যেমনটি আসার। সফল রাজনীতি এল যক্ষাগ্রস্ত শ্রমিকের বস্তি দাপিয়ে। বিকল কলেরা তবু কলরবে মুখর হল না। কি আশ্চর্য হেরে যাওয়া পাটের কারখানার দখল নিল না পলিমার! নতুন বিজ্ঞান এসে নিল না বেঙ্গল কেমিক্যাল। ঊষার উঠোনে এল মাথাউঁচু সাউথ সিটি, রডকলে হীরক নগরী। ফুলেশ্বর মনোরম পিকনিক স্পট। নদীও বেড়াতে পারো, নৌকারা তো আছে। এই মাঝি একদিন ঐখানে কাজ করতে যেত। ঐ যে দেখছো ঐ নোনা ধরা ইটের পাঁচিল! জুটমিল। বন্ধু গিটার আছে? গান জানো? সুমনের গান? গাইলেই প্রতিদ্ধনি আসে। পুরোনো পাটের গন্ধ অথবা ব্যর্থ ঘাম গান শুনে মুখ টিপে হাসে!
বরং সিগারেট খাও। চারমিনার আছে? বিপ্লবের সিগারেট ফিল্টারবিহীন। হারানো বিশ্বাসের পাশে ছেঁড়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঐ দেখ সেও শুয়ে আছে।
* * * * * * * * * * * *

এই বিছানাটায় আমার বাবা শুতেন। এই গেঞ্জিগুলো তাঁর। তিনটে রুমাল, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি পাজামা। এই যে সাতটা খাতা... তিনটেতে লেখা হয়নি কিছু। এসব বাবার। বাবা একটা উপন্যাস লিখছিলেন। উপন্যাসও বলতে পারো, জীবনের সংক্ষিপ্তসারও। অনেক বছর ধরে চলছিল লেখা। অগোছালো জীবনটা গোছাতে সময় তো লাগেই। আমাদের অনেকের মতই আমার বাবাও ছিলেন অসফল সাধারণ মানুষ। রোদ্দুর হবার কথা ভেবে শেষে কেরানি জীবন।গাছেরও খাওয়া হয়নি তলারও কুড়ানো হয়নি সে জীবনে । এই সব মানুষের কথা বাকি থেকে যায়।সেটাই নিয়ম । ব্যর্থ বাবাদের কথা সন্তানেরা শোনেনা বিশেষ । আমি ও শুনিনি । সমস্ত জীবন বাবা কিছু বলতে গেলে আমার কাজের চাপ সেই মুহূর্তে সব চাইতে বেশী । শ্রোতার অভাবে শেষে কাগজের কাছে বলা । সে কথাও বাকি রয়ে গেল । ইলেকট্রিক চুল্লির পাশে অন্ধকার গঙ্গা তীরে বসে প্রথমবার মনে হল কত কথা শোনাই হল না ! হঠাৎ নিজেকে এক কনসার্টের দুয়ারে দাঁড়ানো টিকিট না পাওয়া শ্রোতা মনে হল ।আমি জানি … আজ জানি… কিছু কথা চলে গেল নিরুদ্দেশ নগরে, যাদের চিনলে ভালো হত।
হয়ত এ জন্যেই আছে হারিয়ে যাবার প্রথা । প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে এক অবিরাম দর কষা কষি । চলে গেলে দাম বাড়ে । এইটুকু জেনে চোট খাওয়া তরুণ প্রেমিক আত্মহননের পথে যায়। স্পিডবোট নয়তো সে, ছোটডিঙি নৌকার মতন মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শেষবার চেয়ে দেখে খোঁজ পেয়ে কেউএল কিনা।নদীর বুকের মধ্যে আতিপাঁতি খোঁজে জলছাপ । নদী তার এঁকে দেওয়া সিঁথি মুছে ফেলে । দুজনে আঁধারে যায় সন্ধ্যা – সময়ের সাথে হাত ধরে প্রেম ও প্রেমিক ।
এভাবেই সব যায়।ভালোবাসা, ভালোবাসা, টেলিগ্রাফ, শকুন, ম্যামথ… মূল্যবোধ বদলে যায়, মূল্য বাড়ে… দু - আনা, চার-আনা বাতিল পয়সার দলে যোগ দেয় বছর বছর ।ছেলেবেলা ফেলে আসা সেই মুড়িওয়ালা , ঝাঁকামুটে, সেই ডাক “শিইইইলকোটাবে … বালির ঘড়ির থেকে সব বালি ঝরে যায় … রাত শেষ।চাঁদ ও থাকে না।
যাবার ও দরকার আছে । আমি না হারালে তুই আসবি কী করে ? কোথায় বসাবে তোকে সীমিত পৃথিবী? চাবি ঘড়ি গেল তাই টাইটান কোয়ার্তজ । টরেটক্কা পার হয়ে হাতে মুঠোফোন । রেমিংটন টাইপরাইটার গেছে ; তাই আজ দ্যাখ, আমার কোল আলো করে বাঙলা লেখা ল্যাপটপ । হ্রদ মুছে সল্টলেক সিটি । স্টিম ইঞ্জিন হারিয়ে না গেলে কোথায় পেতিস বল বৈদ্যুতিক রাজধানী এক্সপ্রেস? স্থিতি গেছে, তাই না এ গতি। চলে তো যেতেই হবে, ফুরোবার আগে ফুর্তিলা নাচের ছন্দে বেঁচে নিলে এমন কী ক্ষতি ?
মানুষের মগজে ও যেন যন্ত্র লাগানো আছে মুছে ফেলবার । নইলে সব স্মৃতি এক সাথে স্তুপ হলে বাঁচাই মুশকিল ।যে গেল, সে গেল।বেশ ।যে নেই , সেনেই।যার কোনো মূল্য নেই, সে দৃশ্য সে স্মৃতি মগজ ও মুছেই ফেলে । এগোবার তাড়া । যে রয় , সে রয় ।
* * * * * * * * * * *

এখন অনেক রাত । শোন একটা গল্প শোনাই ।এই তারা দের গল্প, অথবা আমার । ঐ যে তারাটা দ্যাখ, পশ্চিম আকাশে… ও হয়ত মারা গেছে কাল । অথবা পরশু রাতে , অথবা অনেক চাঁদ আগে । এই যাকে দেখছিস, সে আদৌ নেই ।একে একে সব তারা মরে গেলে তবু পৃথিবীর রাতে এসে জ্বলবে কি ভৌতিক আলো? তখন তারারা প্রত্যেকেই মৃত তবু জ্বলন্ত ফসিলের মতো চেয়ে আছে ইতিহাস থেকে ! সে রাত কি সত্যি রাত ? না কিসে ও মায়া ? শব্দ কোষে বর্ণ চোর লুপ্ত জীব ৯ – কারের মতো ! নিশ্চিত জানিস আজই সেই রাত নয় ? তারারা এখনো বেঁচে? তুই আর আমিও ? ছায়াপথে ওরা শুধু প্রাচীনের পদচিহ্ন নয়?
ওহো, তোকে বলতে ভুলে গেছি কী সত্য শিখিয়েছিল সমুদ্র আমায় । পদচিহ্ন নামে কিছু হয়না রে সাগরবেলায় । যেই আমি ফিরেছি পিছনে, অমনি তার পদসেবী ঢেউ পায়ের চিহ্ন টুকু নিয়ে গেছে অতীতের ঘরে।যেখানে ছিলাম আমি , সেইখানে রেখে গেছে “৯”।যত চিহ্ন ছেড়ে যাব বিজ্ঞান, পদ্য, পরিবার… একটি ঢেউয়ের গ্রাস ! বেলাভূমি , সমুদ্র, আকাশ… মানুষের কোনো স্মৃতি দুই দন্ড আগলে রাখে না।