সেই সন্ধের সাইকেল

বিশ্বজিৎ রায়


কোথাও একটা বাগান আছে । বাড়ির পিছনে । পশ্চিমের বাগান । বিকেল ছাড়া সেখানে রোদ্দুর থাকে না । তারপর বিকেল সন্ধেবেলা সেখানে মনকেমন ছায়া ক্রমশ ঘন হয়ে অন্ধকার হয়ে যায় । সেখানে পাশের বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া পাঁচিলের আধভাঙা জায়গা দিয়ে দুটো কুকুর ঢোকে, একটা ছেলে একটা মেয়ে । একটা বাঘা, একটা নেড়ি । একটা পেয়ারা গাছ আছে । অযত্নে বড়ো হয়ে উঠেছে । ফল হয় । তবে সেই পেয়ারার গা মসৃণ নয় , পুরুষের ভাঙা গালের মতো । সেই বাগানে এখনও আছে তারা । পড়ে আছে,কিন্তু আছে । আমি জানি, ঠিক জানি ।
বাবার সঙ্গে সাইকেলে করে ইস্কুল যাওয়ার পথে একটা দৃশ্য দেখেছিলাম একদিন । একটা একতলা বাড়ি । সামনে তার হাইড্রেন । তারপরেই বড়ো রাস্তা । সে রাস্তায় একটা-দুটো বাস যায় , লরি যায়, রিকশা ভ্যান । সেই রাস্তার ওপর এদিক ওদিক ছিটিয়ে ছিল একটা ট্রাঙ্ক, দুটো তোশক, দুটো বালিশ, একটা সিঙ্গল চৌকি, দুটো বালতি, একটা প্লাস্টিকের মগ । বাবা বলেছিল, ‘বাড়িওয়ালা ভাড়াটে তোলার জন্য পাড়ার ছেলেদের টাকা দিয়ে রাস্তায় বের করে দিয়েছে সব।’ ভাড়াটে তখন ছিল না । কোথাও গিয়েছিল । ফিরে এসে দেখবে তার ঘর হারিয়ে গেছে, বেদখল । জিনিস রাস্তায় । জিনিসগুলো পড়ে । ঘরের মধ্যে থাকলে একরকম, রাস্তায় তাদের আবর্জনার মতো লাগে , বাতিল । তারা অনেকদিন রাস্তায় পড়েছিল । ইস্কুল যাওয়ার পথে তাদের দেখা যেত ।
বাড়িওয়ালা কখন তুলে দেয় ভাড়াটেকে ? যখন ভাড়াটে গরীব হয়ে যায় , বেশি ভাড়া দেওয়ার টাকা থাকে না তখন । গরীব ভাড়াটে সেই ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো একদিন সন্ধের পর অন্ধকারে এসে চুপি চুপি ঠেলাগাড়ি করে নিয়ে চলে গিয়েছিল । সেই চলে যাওয়াটা আমি দেখিনি, বাবার মুখে শুনেছিলাম । তখন আমরা ভাড়া-বাড়িতেই থাকতাম । আমাদের ভাড়াবাড়ির পেছনে একটা ওইরকম বাগান ছিল । আমার খালি মনে হত কোনো একদিন আমাদের জিনিস যদি ওই বাগানে ফেলে দেয়, বাবা যদি ভাড়া না দিতে পারে ।
ফেলে অবশ্য দিতে পারেনি । কী করে দেবে ! বাবার হিসেবের খাতায় যে প্রতিমাসে বাড়িভাড়ার পাশে দেওয়া হয়ে গেছে বলে একটা টিক , লাল পেনের । বাবা রিটায়ারমেন্টের পর একটা বাড়ি করেছিল । সেই বাড়ির পাশে পুকুর, নিজেদের নয় । পেছনে বাগান নেই তবে লাল মেঝের সিঁড়ি, সামনে একতলার বারান্দার মুখে । সেই সিঁড়িতে বসে বাবা দাড়ি কামাত । বাবার নীল মগে জল, অসমান সাদা ফটকিরি । বাবার দাড়ি কামানোর ব্লেডে তারিখ । বাবার নখ কাটার নরুন,কাগজে ঢাকা । বাবা যদ্দিন না বিছানায় অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল তদ্দিন বাবা লুঙ্গি পরত । চানের সময় পৈতে কাচত । রেডিওতে খবর শোনা , সাতসকালে রেডিও শুনে ঘড়ি মিলিয়ে দম দেওয়ার অভ্যেসটা অবশ্য হারিয়ে গিয়েছিল । বাবার বিয়ের ঘড়ি খারাপ হয়ে যাওয়ার পরে বাবা একটা দম-দেওয়া এইচ এম টি কিনেছিল । সেটা যখন খারাপ হল তখন বাবাকে দাদা দমহারা অটোমেটিক টাইটান কিনে দেয় । নীল মগ, ফটকিরি বাবা কিন্তু বদল করেনি ।
বাবার রেশান কার্ড জমা দিতে হল, ডেথ সার্টিফিকেট নেওয়ার সময় । রেশন অবশ্য অনেকদিনই নেওয়া বন্ধ হয়েছিল । শুধু আমাদের চেয়ে যারা গরীব তারা আমাদের রেশান কার্ড নিয়ে কেরোশিন নিয়ে আসত । নীল মগ, নরুন, ফটকিরি,লুঙ্গি এখনও আছে । পড়ে আছে । বাড়িতেই । অব্যবহৃত । বাড়ির সিঁড়িতে রোদ। বাবার জিনিসগুলো আমি জানি ঠিক একদিন আমাদের চোখের সামনে থেকে একদিন হারিয়ে যাবে ।
কোথায় যাবে ? যাবে সেই বাগানে । পিছনের বাগানে । সেখানে বিকেল ছাড়া রোদ আসে না ।কোনও এক বিকেলে আমিও সেখানে যাব ।বাবা হাসতে হাসতে আমাকে সাইকেলে তুলে নেবে । ইস্কুলে যাব আবার, সন্ধেবেলার ইস্কুল । সেই ছোটোবেলার অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেশ,এনে দেবে বাবা । বাগানের পথে এগোতেই দেখতে পাব তাদের । তারা বাইরে আসবে বাবার হিসেবের খাতা থেকে । লাল ক্ষয়হীন লাইফবয়, গরমকালের কুঁজো, জনতা স্টোভ, ডালডার কৌটো , রাসমেলায় কেনা খুন্তি, মায়ের নতুন কেনা সিনথেটিক শাড়ি । সন্ধে হব হব বাগানের শেষ আলোয় তারা পড়ে থাকবে নরম ফুলের মতো । তাদের পাশে এসে বসবে নরুন, ফটকিরি, নীলমগ । বাবার সাইকেলে একটু একটু করে আমি আর বাবা হারিয়ে যাব অন্ধকারের দিকে ।