চিঠিপত্র

অগ্নি রায়


‘গ্রীষ্মের ছুটির মত দীর্ঘশ্বাস তুমি আঠালো মার্জিনেই রয়ে গিয়েছো । তা সে যত নীলই হোক , দেখেছি তার পথশ্রমের সিলমোহর । মধ্যরাতে বইয়ের ভাঁজে একগাল মুখরতা আর বনেদি কপচানিতে অন্য সময়ের বাতাস লেপটে রয়েছে । ডাকপিওনের নিরপেক্ষতার কাছে ঠিকানার উত্তাপ গলে যায়। ভারী চশমার কাঁচে তোমার প্রতিবিম্ব তামাদি হয়ে যাচ্ছে।‘

কামনার রঙ লাল । রক্ত আর ডিউস বলও লাল । যথেষ্ট রাঙা শীতকালীন টমেটো আর রেভলনের কিছু লিপস্টিক-এর শেড ।
তালিকা দীর্ঘায়িত করে লাভ নেই । শুধু এটুকুই উল্লেখ থাক যে , উল্লিখিত বিষয়গুলির সেনসেক্স অদ্যপি উঁচিয়ে রেখেছেন যথাক্রমে যৌনভিক্ষু , খুনি , উদীয়মান সিম বোলার , কৃষক ও তেলপাবদা , ওয়েটিং কলে অপেক্ষারত ওষ্ঠপ্রান্ত ।
সুধীজন , এই ফাঁকে মনে করে নিন সেইসব কাঠচাঁপা মোড় অথবা অন্ধ গলিপথগুলির কথা যেখানে ছায়া ও রোদ মেখে আজও দন্ডায়মান যে সব ডাকবাক্সগুলি তাদের রঙও কিন্তু বেচারি লাল ! বেচারি কারণ , সেই টকটকে লাল , গোধুলি ছড়াতে ছড়াতে দিগন্তের ফাঁকে টুপ করে কখন যে খসে গিয়েছে ।
টেলিগ্রামের দাহকার্য শেষ হয়ে গিয়েছে তা বছর ঘুরতে চলল । ডিজিটাল বিভুতি যেভাবে দেশের প্রতি কোনায় তার প্রসাদ পৌঁছে দেবে বলে কোমর বেঁধেছে , তাতে আজ না হোক কাল , ডাক চিঠির পূর্নাঙ্গ অশৌচকার্যের জন্য তৈরি হতে হবে এই গ্রহকে । অথচ ওই লাল খাম্বা থেকে বেরিয়ে আসা কালো হ্যাটের খোঁদলে কতই না উদ্বেগ , আশা , উষ্ণতা এমনকি প্রত্যাখানও ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের ঘিলু , মগজ , কলজে , পাঁজরের সিম্ফনি-সহ । এই তো সেদিনও আর পাঁচটা নিত্যপ্রবাস পদ্ধতির মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হত ‘পৌঁছসংবাদ’ নামের এক আশ্চর্য প্রদীপ-কথা । যে আলোময় করে দিত প্রোষিতভর্তৃকার স্কাইলাইন । দুশ্চিন্তামুক্ত করত মায়ের মুখ । জন্ডিস-হলুদ সেই পোস্টকার্ডটি বাক্স প্যাঁটরার পাশাপাশি সঙ্গে নিয়েই দূর পথে পা বাড়িয়েছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম । গন্তব্যে পৌঁছে গতে বাঁধা দুলাইন লিখে নিকটবর্তী বাক্সে ফেলে দিয়েছেন ।
মেট্রো শহরের দিন রাত না হয় বেশ কিছুদিন হল সাইবার-জলের ভিতর নুনের পুঁটুলির মত গলে রয়েছে । অন্তত হাত চিঠি পাওয়ার লোভেও আমরা না ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি , না আসছি কাছে । হেমন্তের অরণ্যের সেই বিখ্যাত পোস্টম্যানের পায়ের শব্দ পাতাঝরার সঙ্গে দীর্ঘদিন পাল্লা টেনে টেনে ক্লান্ত ও বেপথু । শীত-গাছের মত সর্বস্বান্তও কিছুটা ।
যে সব গভীর মফস্বলগুলি একসময় তার ধোঁওয়া ওঠা ভাঁড়ের অন্তরঙ্গতা , সাইকেল-প্রেম , হাঁস মুরগির গন্ধ মাখা ভোরের সঙ্গতে প্রতিদিনই অবিস্মরণীয় দৃশ্যের জন্ম দিত , তার আর কিছু থাক বা না থাক , একটি আঁতুর ঘর থাকত । যার নাম পোস্ট অফিস ( বিগত উপনিবেশের স্মৃতিময় , বিরাট কমপাউন্ড আর লাল পাঁচিল ঘেরা সেই সর্বমান্য ঠিকানা ) । আজও তা রয়েছে ঠিকই , কিন্তু মফস্বল , আধা-শহরে তার দাপট আর নেই । আগে এই পোস্টঅফিসগুলির সর্বময় কর্তা পোস্টমাস্টার ছিলেন একজন সামাজিক কেষ্টবিষ্টুও বটে । প্রায় আইকন । অভিজ্ঞতা থেকে জানি , এক একটি মফস্বল শহরে কোনও কোনও পোস্টমাস্টারের পরিচিতি এতটাই ছিল যে বিয়েবাড়ি থেকে তমুকবাবুর আড্ডা – তাঁর জন্য বরাদ্দ থাকত একটি বিশেষ আসন । মাছের বাজারে সবচেয়ে সরেশ পেটিটি সরিয়ে রাখা হত পোস্টমাস্টারবাবুর জন্য । দিনের শেষে তাঁর কাছেই কিনা যেতে হবে সঞ্চয়ের খাতায় গোলমাল হলে !
একটি হাইপাওয়ারের চশমা সর্বস্ব অকিঞ্চিৎকর কিশোরের কথা বলি । যে কিনা এক বড় শহর ছেড়ে , বন্ধুবান্ধব , বাবা মাকে ছেড়ে কিছুদিনের জন্য মফস্বলবাসী হয়েছিল । শহরের জটিল কংক্রিট থেকে মুখ সরিয়ে , সে তখন ডুবে যাচ্ছিল ধানখেত , সবুজ দিগন্তে । কিন্তু দুপুর গড়ালেই মন আনচান , সে ছুটত পোস্টঅফিসের একটি নির্দিষ্ট টেবিলে । বাড়িতে পিওন আসা পর্যন্ত ধৈর্য সে ধরতে পারত না , প্রায় প্রত্যেকদিন ডাক আসার সময় হিসাব করে পৌঁছে যেত বিরাট কম্পাউন্ডওয়ালা ( যেখানে স্বচ্ছন্দে ক্রিকেট ফুটবল খেলা চলে ) পোস্টঅফিসের সেই চিঠি বিলি হওয়ার লগবগে কাঠের টেবিলটির সামনে । মুখ চেনা হয়েই গেছিল , তাই চিঠি-বাছাই বাবুটি ওর নামে আসা নীল শাদা ঘিয়ে রঙের স্বর্ণকুচিই যেন তুলে দিতেন বাড়ানো হাতে । মাতৃস্নেহের মত বিস্তৃত সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে চলত সেই চিঠি পাঠের সেই একক উৎসব । কিছু লাইন নষ্ট হয়ে যেতে পারে এই ঝুঁকি নিয়েও সে কম্পিত হাতে আঠার তোয়াক্কা না করেই ছিঁড়ে ফেলত খাম , ইনল্যান্ড লেটার । ফেলে আসা বন্ধুদের সেই সব গোটা গোটা , তেরছা , ভালো এবং মন্দ হস্তাক্ষরের যাপনপত্র অনেকদিন সে রেখে দিয়েছিল দেরাজে । পরে যথারীতি অন্যসময়ের বাতাস এসে উড়িয়ে দিয়েছে সেই সব কথাজীবনকে । যেমনটা হয়েই থাকে ।
ওই কিশোরটি ষাট , সত্তর অথবা আশির দশকের আর্কেটাইপ । কত না গান , উপন্যাস , ছোটগল্প , সিনেমায় এক অনিবার্য সূত্রধর হিসেবে হাজির থেকেছে মেঘরঙা সেই সব চিঠির দল , তার হিসেব কষতে বসলে বেলা গড়িয়ে যাবে । চিঠি না-পাওয়ার অভিমান , সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর চাকুরীপ্রার্থীর হাতে নিয়োগপত্র পৌঁছনোর নিষ্ঠুর তামাসা , হঠাৎ দুপুরে আসা শাদা খামে কোনাকুনি ‘গঙ্গা’ লেখা মৃত্যু সংবাদ , একান্নবর্তী পরিবার থেকে সদ্যবিবাহিত প্রবাসীর নববধূকে পাঠানো চিঠিতে সেলোটেপ বা আঠার বাড়তি সতর্কতা ( তবুও সেগুলি লুকিয়ে পড়ে ফেলার দমবন্ধ উত্তেজনা যে না-পুইয়েছে , বয়োঃসন্ধি বিফলেই গিয়েছে সেই সব কিশোর কিশোরীর !) , এমনকি পাশের পাড়ার প্রেমিক বা প্রেমিকার ভাই বা বন্ধুর মারফৎ দীর্ঘ অদর্শনজনিত দুঃখ (হয়ত সেই দৈর্ঘ দুদিনের , কিন্তু তাতেই দুশো শব্দ ! ) বোঝাতে পাঠানো হাতচিঠি – এ সবই মনে হয় , এই তো যেন সেদিনের কথা ! এই তো সেদিন পর্যন্ত মাউস বলতে ইঁদুরই তো বুঝতাম আমরা !
ডাকটিকিট বন্দী , শিলমোহর খচিত সেই সব শ্বাসধ্বনি , নির্দিষ্ট স্পেস হয়ে যাওয়ার পরেও মার্জিনে ঠেসে দেওয়া কথকতার গ্রাফিতি – আজ বড়ই ফিকে । শুধু প্রবীণ ও হেরে যাওয়া সম্রাটের মত কালো ক্যাপ ঝুঁকিয়ে নতজানু দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই সব পোস্টবাক্সগুলি ।