উড়ন্ত ডানার লিরিক

মেঘ অদিতি


রোদের ঢঙ পালটেছে । আদুরে ভঙ্গিতে সে এখন ঘাসের শরীর জড়িয়ে আছে । মনোলোকেও যেন উজ্জ্বল রঙ এসে পড়েছে তার।বুঝি হেমন্ত এল! এবার জলপাই বনে বনে অজস্র স্ফটিক হবে সোনারোদ। আকাশ প্রদীপ হবে, অনন্ত ঢেউ হবে নক্ষত্র সব।
সিদ্ধাই আর আমি অনেকক্ষণ চেয়ে আছি চেনা রোদে আধেক ছায়ার ওই দূর মায়াশৈশবের দিকে যা আমাদের ভাসিয়ে নিচ্ছে হাওয়ার তোড়ে ভালবাসায় জড়ানো সম্পর্কগুলোর কাছে। অতীতের এ্যালবাম ছেড়ে কে কোথায় কবে হারিয়েছে ডানার উত্তাপ, কতদূর চলে গেছে জীবনের রেখা, তবু, জীবন থেকে বহুদূরে সরু হতে হতে মিলিয়ে যেতে চাওয়া অমল দিনের রামধনু রঙ আর তার রেখাগুলো আমাদের দু’জনকেই বিবশ করছে। সেইসব স্মৃতি আমাদের নিয়ে চলেছে দিগন্ত ছাড়িয়ে মহাকালে রেখে দেওয়া সেই মুহূর্তগুলোর কাছে।আমাদের রেখেছিল যারা বিনি সুতার বাঁধনে, ডানা মেলা রোদ্দুরে ফলসার ঝোপ ছাড়িয়ে নাও ভাঙা চরে, নীলাকাশ ছাড়িয়ে কাশবনের হাওয়ায় অথবা বকুলের মালায়, সেসব দিনের কথা, তাদের কথা মনে পড়ছে।
আহ..দুরন্ত বেলা! আনন্দ ছিল উদ্দাম, ছিল স্বপ্ন মাখামাখি অকপট দিন, আর তার সাথে কিছু ছিল অনাকাঙ্খিত ঘটনা যার রেশ কোথা থেকে এসে যেন মনে বাজে সকরুণ আজও।
এই দেশ ওই মহাদেশে হয়তো আমরা অনেকে আছি ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখন। হয়তো কেউ কেউ হারিয়ে গেছি অনন্তে । অনেকের সাথে এক হয়ে থাকার সেইসব দিনে, নিখিলের ঘাসে ঘাসে, উড়ন্ত ডানার লিরিক হয়ে আমাদের বেড়ে ওঠার দিনে হঠাৎ নিজে নিভে গিয়ে আমাদের সব্বাইকে পিছনে ফেলে সেবার প্রথম হয়েছিল শিল্পী। এক বিকেলের বাতাসে উড়ে আসা চুপচুপ কথায় বড়দের প্রসারিত চোখের কৌণিক শ্লেষে ও প্রথমবারের মতো হারিয়ে গেছিল। ব্যথার চাঁদোয়ায় মুখ ঢেকেছিল শিল্পীর আত্মজনেরা।ওর নাকফুলে লেগে থাকা মিহিদানা রোদ্দুর মুছে শিল্পী হারিয়ে গেল এক সাঁঝের আঁধারে।
একটা ঘটনা, ততোধিক রটনার চাপ কত যে ভয়াবহ, তার ভারে একদিন আমরাও চিনতে শিখে যাই পাপ পূণ্যের হিসেব। তবু ও ফিরতে চেয়েছিল চেনা ভুবনে কিছু না হারিয়ে তার সাথে জুড়ে দিতে ওর নতুন জীবন, ও চেয়েছিল কিন্তু ঈশানের কোণে কোণে তখনই খুব মেঘ জমল আর কোথাও যেন সুর কাটল। শিল্পী তার গান ভুলে অমনি ফের হারিয়ে গেল রাশি রাশি চা পাতা আর সাদা কাফনের আড়ালে।
- কিছুই কি হারায়? যাকে তুই হারিয়ে ফেলছিস বলে ভাবছিস সে তোর মনের সঙ্গী হয়ে কত বছর ধরে তোর সঙ্গেই আছে, একবার ভাব!
অত শত বোঝে কি মন? তার হারাবার ব্যথা এতই প্রবল যে ভার বয়ে বেড়াবার শক্তি হারিয়ে সে কেবল বন্ধ ঘরের চার দেয়ালে মাথা কোটে।
- তবু গভীরে গিয়ে ভাব একবার, কিছুই কিন্তু হারায়নি। জীবনের সব হাসি - কান্নার আড়ালে রয়ে গেছে সব ছবি হয়ে। তাদের একে একে বের করে আন, দেখ, সবাইকে পেয়ে যাবি।
জানো সিদ্ধাই, সমুদ্রে সেবার আমার প্রথমবার। অত জল অত ঢেউ আগে তো দেখিনি, আমি কেমন দিশেহারা তাই। হাতে আমার রান ফোঁড়, চেইন ফোঁড়ে রুমালের গোলাপ, কখন টুপ করে পড়ে গেল জলে আর হারিয়ে গেল।
এইটুকু শুনে মৃদু হাসে সিদ্ধাই। তার কোঁকড়া চুলে রোদ লেগেছে ঝিকমিক। মুখে ডগমগ ফলসার বেগুনে আভা। সিদ্ধাই চোখ রাখে চোখে। গালে টোল ফেলে বলে, তারপর, দেখি তোর হারানোর লিস্টিখানা কত বড়।
পলকে আমার আমি থমকে যায়। বুকের ভেতর ছটফট করে পাখি। বল বল বল... উজাড় করে দে, দেখ কতটা ভার চলে যায় আজ।
ভার, আহা যেন জোয়াল চাপিয়েছি কাঁধে। সত্যি কি যায় না কি তার ভার! যা আমি নিজে ধারণ করেছি তাকে ফেলে দিই বা কেমন করে! আর সব হারানোর কথা সে যদি সিদ্ধাইও হয় তবু আমি নিজে থেকে কখনও বলতে পারব কি, কী করে একবুক শোক নিয়ে আমি হেঁটেছি দীর্ঘ পথ।
সিদ্ধাই চেয়ে আছে আমার দিকে। এখন হাসছে না আর সে। তার চোখ দুটোর তীক্ষ্ণতার কাছে চারপাশের সবকিছু ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রখর দৃষ্টির দিকে আমি তাকাতে না পেরে চোখ ফিরিয়ে নিই।
- জল কখন উপচে পড়ে জানিস?
- আকাশ ধরে রাখতে পারে না তার মেঘের ভার তাই বৃষ্টিরা নেমে আসে
সিদ্ধাই মৃদু হাসে। বাতাসে ওড়ে তার চুল।
- নদীও তার জল যখন আর ধরতে না পারে তখনই প্লাবণ আসে চারপাশ ভাসিয়ে। যে শোক যে তাপ তুই বয়েছিস অহর্নিশ তা উপচে পড়ে বলেই আজও চোখ ভাসে জলে।
যে যোগবলে সিদ্ধ তার কাছ নিজের ভাবনার টানাপোড়েন বোধহয় লুকানো যায় না তবু দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে যাই। মজার ঘটনা মনে পড়ছে, এমন ভঙ্গীতে বলি, জানো ফ্রকের ঝুল তখনও হাঁটু পেরোয়নি, নুড়ি থেকে ঝিনুক, ঝিনুক থেকে গোটা পৃথিবী নিজের কাছে তুলে আনার নেশায় আমি কী ভীষণ মশগুল থাকতাম।
- সে তুই একা না কি? আমি নিজেও কত কি জমাতাম, কখনও কোঁচর ভর্তি কষা পেয়ারা বা শিউলির মালা। পুতুলের শাড়ির জন্য মায়ের শাড়ির পাড় থেকে শুরু করে ঘুড়ির সুতো কী না জমাতাম।

সেবারে একদল আত্মীয়া এল বাড়ি। ব্যাপারটা ঠিক বেড়াতে আসার মতো নয়। বোধহয় তারা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল। গ্রাম থেকে শহরে যাবার পথে আমাদের মফস্বলের বাড়িটাতে একরাতের জন্য উঠেছিল তারা । মা যে ঘরটাতে ওদের থাকার ব্যবস্থা করেছিল, সে ঘরটা আমার পড়ার ঘর, আর আমার ট্রেজার আইল্যান্ড সেও সেই ঘর। তখন আমার ডাকটিকেট জমানোর নেশা। বাবা কিনে দিয়েছিল ডাকটিকেট জমিয়ে রাখার বই। কত দেশের ডাক টিকেট যে তাতে জমা পড়েছিল। তারপর আরব দেশ থেকে আমার জন্য এল কালো রাশভারী এক ডাকটিকেট জমানোর বই। কী যে তার গম্ভীর সৌন্দর্য! আমি তাতে যত্ন করে ডাকটিকেট সাজাতাম।
সেই রাতে, সেই অতিথির দলে ছিল ছোট্ট একটা ছেলে, বোধহয় আমারই বয়সী সে, বইখানা বুকে তুলে নিল। তারপর ঘুমানোর আগ অব্দি সেই বই বুকে করে সারা বাড়ি ঘুরল। অন্য কারও বুকে আমার প্রাণপাখি শোভা পাচ্ছে, আমার সহ্য হচ্ছে না আবার মা’র ভয়ে কিছু বলতে পারছি না। আর বলতে আমি শিখিওনি। শুধু ভীত হৃদয়ে প্রার্থনা করছি আমার প্রিয় জিনিস আমার কাছে ফিরে আসুক। কখন যেন ঘুমিয়েও গেছি। সকালে উঠে দেখি তারা চলে গেছে। দৌড়ে সেই ঘরে ঢুকে প্রথমেই খুঁজতে শুরু করেছি আমার সেই ঐশ্বর্যময়ীকে।
- পেলি?
- পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই ছেলেটা বইটাকে নিষ্ঠুরভাবে ঠুকরে ঠুকরে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল তার সমস্ত পাতা। ভেতরে প্রতিটি পাতায় সে এভাবেই রেখেছিল স্বাক্ষর।
- আর সেই ভেবে ভেবে কষ্ট পাস এখনও তুই।
- পাই একথা বলব না। এমনিতে রোজকার জীবনযুদ্ধে সেইসব স্মৃতি আর মনে পড়ে কই বলো তবে এই যে তোমার কাছে এতদিন বাদে মনের ঝাঁপি খুলে উপুড় করেছি সব অমনি আমার শোকও উথলে উঠছে সত্যি।
হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা পথ পেরিয়েছি আমি আর সিদ্ধাই। মনে পড়ে গেল, পাথরের নিচে চাপা দেওয়া জুতো হারিয়ে হাপুস নয়নে কেঁদে ভাসাবার কথা। কী সব ছেলেমানুষীর দিনই না ছিল সেসব, মনে আসতেই ফিক করে হেসে ফেললাম আমি।
বকুলের ডাল ছাড়িয়ে রোদের তেজ এখন গুটিগুটি ডাকঘর অবধি, হাসিটা সিদ্ধাইয়ের চোখ এড়াল না।কাঁধে স্পর্শ পেলাম ওর.. বলল, তোর জ্বলজ্বলে চোখ দু’টোর চাইতেও তোর হাসিটা বেশ। কেন হাসি পাচ্ছে?
- আর বোলো না। সেবারে আমরা চট্টগ্রাম গেছি, ছোটকাকুর বাড়ি। দিন সাতেক ছিলাম বোধহয়। ওই যেবার রুমালটা হারিয়ে গেল সমুদ্রে সেবার। কাকুর বাড়ি লাগোয়া দু’টো টিলা ছিল যেখানে আমি আর নীলা সারাটা দুপুর খেলতাম। আমাদের কাছে সে টিলা দুটোই মস্ত পাহাড়। বালুর পাহাড় আর কাঁটার পাহাড়। আমরা বালুর পাহাড়ে খেলা করতাম। এক দুপুরে অনেকটা সময় ধরে আমরা বালু নিয়ে খেলা করছিলাম আর আমাদের জুতোগুলো রেখেছিলাম একটা পাথরের তলে। হঠাৎ দেখি আকাশ কাঁপিয়ে মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে একটা হেলিকপ্টার, ইয়াব্বড়। হা করে সেই উড়ান, সেই হেলিকপ্টার দেখছি আর তার গতির সাথে তাল রেখে নিজেরাও সরে যাচ্ছি। কিন্তু সেটা চোখের আড়াল হয়ে যাবার পর দুজনেরই খেয়াল হলো, আমরা ঠিক জায়গাতে নেই, আর নেই আমাদের জুতোগুলো। তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছি, এই পাথর সেই পাথরের তলা, নাহ্ কোত্থাও নেই। বাড়ি যাব কী করে, ও নীলা, জুতো ফেলে বাড়ি গেলে আমাদের তো মা আজ মেরেই ফেলবে রে, আর কক্ষনও জুতো কিনে দেবে না.. বলেই আমি তো ভ্যাঁ।

সরু একটা পথ চলে গেছে বহুদূর। পথের দু পাশে জলাশয়। সরু পথটা ধরে আরও কিছুটা যেতে ইচ্ছে করছে আমার। কিন্তু সিদ্ধাই ফিরতে চাইল। ফিরতে ফিরতেবলল, যা গেছে তার জন্য শোক বা সমাধি কোনোটাই নয় বরং মনের আকাশে উড়িয়ে দে না লক্ষ মঙ্গল ফানুস। দেখবি মনে আর কোনো কষ্ট থাকবে না। এই যেমন এখন, কেমন মেলে দিলি প্রজাপতি ডানা, দিব্যি মনটা ভালো হয়ে গেল। জীবনের খাতায় হাসি আর কান্না দুইই থাকে। হাসিটাকে তুলে নিতে হয়, নিজের জন্য, চারপাশের সকলের জন্য।
তোর ওই হাসিটুকু থাক, বাকী সব মুছে যাক নীলিমার নীলে।
ফেরার পথটা সিদ্ধাই আমার হাত ধরে থাকল, আমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে এলাম মনের আকাশবাড়ি।