তার-বেতার

মালিনী ভট্টাচার্য.



১৯৮৯

কালো বোর্ডটার গায়ে আঙুল-মাপের অসঙ্খ্য পায়রার খোপ। নীচে আলো জ্বলছে। কখনো লাল কখনো সবুজ। তার-বেতার পায়রা এখানে খবর নিয়ে আসে। তার গুঁজে গুঁজে লাইনের সংযোগ ঘটায় ধীরাজ, দপ্তর থেকে দপ্তরে পৌঁছে যায় খবর। ধীরাজ এই মস্ত অফিসের টেলিফোন অপারেটর।

আজ রবিবার। ছুটির দিন। তার ছুটি নেই। কিছু দপ্তর খোলা। বাইরে থেকে আসতে পারে দরকারী কল। রাতের শিফটে অজয় আসবে, ততক্ষণ ছুটি নেই। পুরনো অফিসের উঁচু ছাদওয়ালা ঘরটায় বসে থাকতে থাকতে মন খারাপ করে ওঠে ধীরাজের। মিনিটার জন্য, সে সবে কে. জি ওয়ান এ উঠেছে। ভীষণ বাবা-ভক্ত। এই যে ধীরাজ বাড়ি নেই সারা দুপুর অনুভাকে জ্বালাতন করবে সে- বাবা কখন আসবে, কোথায় গেল, কেন গেল...প্রশ্নের শেষ নেই দস্যিটার। অনুভা গল্প বলে ভুলিয়ে রাখে, কখনো বা ধৈর্য হারিয়ে দু এক ঘা কষিয়ে দেয়। সত্যিই অনুভাকে দোষ দেওয়া যায়না। সারাদিন যা পরিশ্রম করে অনুভা! কিই বা দিতে পেরেছে সে?! যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে একদিন ঝোঁকের মাথায় অনুভাকে বার করে এনেছিল ধীরাজ তার একটাও রাখতে পারেনি সে। অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে পড়ে। খেয়াল পড়ে ফোন আসছে । বাতি জ্বলছে। বাইরের কল। লাইন কনেক্ট করে রিসিভার তোলে ধীরাজ।

পরের রবিবার। বাবার সঙ্গে লাফাতে লাফাতে বাবার অফিস যাচ্ছে মিনি। গত রবিবার জেঠু ফোন করেছিলো। অনেক অনেক দিন পর। মিনি এখনও বছরের হিসেবে সড়গড় নয়, তাই সে জানেনা তার জেঠু ফোন করেছিলো পাক্কা বাইশ বছর পর। ধীরাজও চমকে উঠেছিলো অতবছর পর সুপ্রকাশের গলা পেয়ে। প্রবাসী সুপ্রকাশ একদিন শ্বেতাঙ্গী মার্গারিতার হাত ধরে বিমানবন্দরে ছাড়তে আসা ধীরাজকে বলেছিলেন, “এরা থাকলো, এদের দেখিস।” দেখেছে ধীরাজ, সব ভাই বোনেদের পড়িয়েছে, বিয়ে দিয়েছে, বাবা মায়ের চিকিৎসা করিয়েছে সাধ্যমতো। অনুভার সঙ্গে এই নিয়ে অশান্তির শেষ নেই। চিঠি লেখা ছাড়া সংসারের সঙ্গে কোন সংযোগ নেই সুপ্রকাশের- অনুভা বিরক্ত, অনুভা ক্ষুব্ধ এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের ওপর। ধীরাজ বোঝানোর চেষ্টা করে যে
স্ত্রী-পরিত্যক্ত, জড়ভরত সন্তানের দায়িত্বে থাকা সুপ্রকাশের পক্ষে সম্ভব নয় এসব। অনুভা মত বদলায় না। মিনি বোঝেনা এসব। সে জানে তার এক জেঠু থাকে
রূপকথার মতো সুন্দর এক দেশে। সেই জেঠু মিনির সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে- সে বেজায় খুশি। সেদিন বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি যে বলো জেঠু সমুদ্রের ওপারে থাকে তাহলে তারের মধ্যে এল কি করে?” অনুভা তাকে বলতে থাকে টেলিফোনের গল্প – রবার্ট হুকের স্ট্রিং টেলিফোন, ইন্নসেনজো মাঞ্জেত্তির ‘স্পিকিং টেলিগ্রাফ’ হয়ে নিউ ইয়র্ক এ বসা অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সঙ্গে সান ফ্রান্সিস্কোয় বসা তার সহকারী অগাস্টাস ওয়াটসনের প্রথম টেলিফোনে কথা হওয়া অব্দি। মিনি মুগ্ধ হয়ে শোনে। শেষে বলে, “যেমন তুমি আর আমি কথা বলি, তাই না মা?” দুটো নারকেল তেলের টিনের কৌটোয় প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে সংযোগ ঘটিয়েছে অনুভা, মা- মেয়ে অবিশ্রান্ত কথা বলে সেই টেলিফোনে। তাদের গল্প শুনে হেসে ওঠে ধীরাজ। ঠিক করে এবারের এরিয়ারটা পেলেই বাড়িতে একটা টেলিফোন নিয়ে আসবে। অনুভাকে বাপের বাড়িতে কথা বলার জন্য পোস্ট-অফিস যেতে হয়, তাছাড়া দাদাও বলছিলেন...।

১৯৯৯

চাকরী বদলেছে ধীরাজ, অবস্থাও। তবে অনুভার বক্তব্য তার চাকরীটা এখনও টেলিফোন কানে বসে থাকার। মন্দ বলেনি অনুভা- সারাদিনে অসংখ্য ফোন আসে ধীরাজ স্যারের। অফিসের টেবিলে খান পাঁচেক, বাড়িতে খান দুই- একটা কর্ডলেস। স্নান-ঘরেও বিরাম নেই। কথা বলার সময় নেই মিনি- অনুভার সঙ্গে। যে রবিবার বাড়িতে থাকে খাওয়া-দাওয়ার পর একটা আই. এস. ডি কলের অপেক্ষা করে সুপ্রকাশের থেকে। দু’জনে পুরনো কথা বলে আর স্মৃতির জাবর কাটে। অসহ্য মনে হয় অনুভার। ছটফট করে মিনিও। এতক্ষণ ধরে বাবা ফোন এনগেজড রাখে! কে জানে দীপ্তটা পাবলিক বুথে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে রাগ করে চলে গেল কিনা। তাহলে আবার রাগ ভাঙাতে হবে কাল টিউশনে। উফফ! এই একটা দিনও তো বাবা অফিসেই থাকলে পারে...।
ধীরাজ জানেনা সোম থেকে শনি রোজ পড়ন্ত বিকেলে ‘রং নাম্বার’ এর সঙ্গে কথা বলে মিনি। ‘রং নাম্বার’ টিউশন থেকে বাইকে তুলে নিয়ে বাইপাসে দুরন্ত গতিতে ওড়ায়
মিনিকে। তার-বেতারের প্রেম পেঁচিয়ে ওঠে মিনির শরীরে, সেতার বাজে।


ধীরাজ জানেনা সোম থেকে শনি মাঝদুপুরে নির্জন বাড়িতে ঝনঝন করে ওঠে টেলিফোন। ব্যস্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে অনুভা কোনরকমে গ্যাসটা নিভিয়ে। ইলা ফোন করে। ধীরাজ ও অনুভার কলেজের সহপাঠী ইলা বসু এখন নামজাদা কবি। একসময় কত লিখেছে একত্রে কত ম্যাগাজিনে। সংসার কবিতা কেড়ে নিয়েছে অনুভার থেকে। অথচ সে ইলার থেকে কোনো অংশে খারাপ লিখত না। ধীরাজের অফিসের কালচারাল প্রোগ্রামে মুখ্য অতিথি হিসেবে আসা ইলাকে দেখে সে কথাই ভাবে অনুভা। অনুভার সবচেয়ে কাছের ছিল ইলা যতদিন না নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পরে। ধীরাজ সন্তর্পণে সরিয়ে নিয়েছিলো অনুভাকে। ধীরাজের মতে ওই পথ নাকি সর্বনাশের পথ! হুঃ! কি সর্বনাশ হতে বাকি আছে তার! ওই সর্বনাশী মেয়েমানুষকেই তো সংবর্ধনা দিচ্ছ! আর তিলে তিলে তোমাদের স্বার্থে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দেওয়া অনুভাকে একটু সময়ও দিতে পারো না। তাই ধীরাজের মানা সত্ত্বেও ডায়েরী ঘেঁটে প্রথমদিন কাঁপা হাতে ফোন করেছিলো অনুভা। ইলার সাফল্যকে সে হিংসে করেনা, হিংসে করে হয়তো তার জীবনকে। পুলিশের লাঠিও মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারেনি ইলার। ইলার মধ্যে না-হওয়া নিজেকে খুঁজে পায় সে। এক থালায় মাখা ভাত খাওয়ার মতো চেটেপুটে খায় ইলার দুঃসহ অভিজ্ঞতা। মাঝদুপুরে টেলিফোনের তারে আঙুল জড়িয়ে জড়িয়ে স্বপ্ন বোনে অনুভা, হলুদ মাখা আঁচল বনির্ল হয় জেহাদী কবিতার রামধনুতে।


২০০৯

রবিবার। ঝড়ের তাণ্ডব চলছে। ইলেকট্রিক নেই। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা তিনজন। দুপুরে টেলিফোন বাজে না আর- এক বছর, ছ’ মাস, এক সপ্তাহ- তিনজনের হিসেবে তিন রকম। সুপ্রকাশ এসেছিলেন গত বছর। জমিজায়গা সংক্রান্ত ভাইয়ের করা বন্দোবস্তে খুশী হতে পারেননি তিনি। ওঁদের বোন রেখার প্ররোচনায় বিবাদ বহুদূর গড়িয়েছে। কার্যরত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মাসছয়েক আগে কাগজে বেশ বড় করে ছাপা হয়েছিলো কবি ইলার মৃত্যুসংবাদ, কোনো এক রবিবার একটা আলাদা ক্রোড়পত্রও বেরিয়েছিল। দশ বছরের সম্পর্কে ছেদ টেনে দীপ্ত আমেরিকা চলে গেছে গত সপ্তাহে।
হঠাৎ তীব্র একটা বাজ পড়লো কাছেই কোথাও- টেলিফোনটা কঁকিয়ে কেঁদে উঠলো একবার। মিনি ছুটে গিয়ে তুলে বলল, ‘ডেড’। ধীরাজ জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “আবর্জনা বাড়ল...।”

২০১৪

আজ রবিবার। একটু আগে স্কাইপে কথা হয়েছে মিনির সঙ্গে। সে এখন মিডল ইস্ট এ, ঘোর সংসারী। অনুভাই কথা বলেন, ধীরাজ এসবে স্বচ্ছন্দ নন। অনুভার স্মার্ট ফোনের পাশাপাশি ধীরাজের ‘আনস্মার্ট’ কালো-সাদা ফোনটা পড়ে থাকে। অবসর পরবর্তী জীবনে ফোন খুব একটা আসেনা তাঁর। লোক ডেকে বাড়ির আবর্জনা সাফ করাচ্ছেন অনুভা। একটা পুরনো বিগশপারে ভরা দুটো জিনিস আলাদা করিয়ে সরিয়ে রাখলেন- দুটো নারকেল তেলের টিনের মরচে পরা কৌটো, একটা বাজ পড়ে অকেজো হওয়া টেলিফোন হ্যান্ডসেট। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ঘসা খাচ্ছে দুটো ভিন্নধর্মী জিনিস...তালে তালে বুকে বাজছে “ সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা...।” আজ ইলার জন্মদিন।