হারিয়ে যাওয়া চিঠিপত্র

শুভশ্রী ভট্টাচার্য


অনেকদিন কারো কাছ থেকে চিঠি পাইনি।অবশ্য লিখিওনি কাউকে। তাই আজ পড়তি বেলায় শান্তিনিকেতন ডাকঘরে গিয়েছিলাম পোস্টকার্ড বা ইনল্যাণ্ড লেটারের খোঁজে।ঢুকতে গিয়ে দেখি দরজার কাছে একটা কুকুর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। তাকে ডিঙিয়ে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছি কিজানি হয়তো বন্ধ । তারপর দেখি না খোলাই ।দু-তিনজন টিমটিম করে বসে গল্প করছে।আমি তাদের কাছে পোস্টকার্ড বা ইনল্যাণ্ড লেটারের খোঁজ করতে ভারি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।বলল, ‘নেই’।আমি জানতে চাইলাম, ওগুলো এখনো পাওয়া যায়, নাকি একেবারে উঠে গেছে ।তাতে বলল , ওঠেনি, তবে সাপ্লাই নেই ।কেউ কেনেনা বলে আমরাও আনাইনা’। তাতে আমার হতাশ মুখ দেখে বোধহয় দয়া হল, বলল, ‘পাঁচটাকার স্ট্যাম্প আছে, নিতে পারেন।খামে পুরে চিঠি দিতে পারেন’।আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম , ‘তাহলে দশটা খাম ও দিন’।লোকটা বলল, ‘খাম তো নেই । সে আপনি পানের দোকানে টোকানে গেলেই পেয়ে যাবেন ’।
ছোটবেলায় পিওন দাদার সাইকেলের ঘণ্টিটা বাজলে বাড়ি থেকে আমিই দৌড়ে বেরিয়ে আসতাম । কারণ ঠিক ঐ সময়টায় বড়রা খেতে বসত । উনি একটা পা মাটিতে রেখে আরেক পা প্যাডেলে রেখে কাঁধের ঝোলা থেকে বেছে বেছে চিঠিবার করে আমার হাতে দিতেন ।একমাত্র রেজিস্ট্রি চিঠি এলে গুব্বা (ঠাকুর্দা) কে দিয়ে সই করানোর ব্যাপার থাকত বলে নামতেই হত । চিঠি নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই আম্মা (ঠাকুমা) জিগ্যেস করত , ‘নারুর চিঠি আইসেনাকি’? কিম্বা সজনে ডাঁটা চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞাসু চোখ তুলে তাকাত ।আমি হাতের লেখা চিনতাম সবার । পড়তে ভাল করে পারতাম না । নারু, মানে আম্মার বড়ভাই থাকতেন বম্বেতে । পোস্টকার্ডে চিঠি লিখতেন । তাঁর হাতের লেখা গুঁড়িগুঁড়ি পিঁপড়ের সারির মত , ডটপেনে লেখা ।বড়গুব্বা, মানে গুব্বার দাদার হাতের লেখা ছিল ছাপার অক্ষরের মত, কালির কলমে লেখা ।ইনল্যাণ্ড লেটারে লিখতেন ।বাবুন, মানে আমার ছোটপিসির চিঠির প্রথম দিকটায় গোটা গোটা ভাল আর পরের দিকটায় ছোট ছোট বাজে হাতের লেখা । গুব্বার চিঠির ব্যাপারে কোনদিন কোন আগ্রহ থাকতে দেখিনি। আমি আম্মার ঘরেই ওগুলোকে নিয়ে যেতাম।
আম্মা খেয়ে আসার মধ্যে আম্মার শোয়ার যায়গাটা পরিষ্কার করে, চাদর টানটান করে, ধারে আম্মার জন্য দুটো বালিশ, আর ভেতর দিকে আমার একটা ছোট বালিশ পাততাম। তারপর গুব্বার ঘর থেকে সেদিনকার খবরের কাগজটা গুছিয়ে সংগ্রহ করে আনতাম। সকাল থেকে রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত থাকায় খেয়ে উঠে ওই সময়টাতেই আম্মা কাগজ পড়ার সময় পেত। কাচের আলমারীর ওপরের তাক থেকে ডিঙি মেরে ভাঙা কাচের মধ্যে দিয়ে হাত গলিয়ে চশমার খাপটা বের করে আনতাম। চিঠি আর কাগজ চশমা দিয়ে চাপা দিয়ে একটা ছোটখাটো বই নিয়ে আমিও শুয়ে শুয়ে আম্মার আসার জন্য অপেক্ষা করতাম। সবাইকে খাইয়ে দাইয়ে এসে যখন আম্মা দেখত আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি, শুলেই হয়, তখন কী যে খুশি হত।
শুয়ে প্রথমে চিঠিগুলো পড়ত। আমার নামে চিঠি থাকলে আমাকে দিত। আমার পিঠোপিঠি পিসতুতো বোন ছবি এঁকে পাঠাত। বাবুন মানে আমার ছোটপিসির চিঠি এলে আমার খুবই আগ্রহ থাকত। কারণ বাবুন বিয়ে হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমার ছোটবেলার একমাত্র খেলার সঙ্গী ছিল। পুতুল বিয়ের লুচি ভেজে দেওয়া, কাপড়ের পুতুল, মাটির পুতুল বানিয়ে দেওয়া, পুতুলকে শাড়ি পরানো, গল্পের বই পড়ে পড়ে শোনানো, বিকেলে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, মা পড়তে বসে মারলে বাঁচানো—এইসব কাজ বাবুনই করত। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাবুনের বহুদূর আসামে বিয়ে হয়ে গেল। বেশির ভাগদিন বাবুনের চিঠিতে আমাকে লেখার আর জায়গা থাকত না। সব্বাইকে সব কিছু লিখে যখন ইনল্যাণ্ড লেটারে জায়গা ফুরিয়ে যেত, তখন পাতার মার্জিনে ছোট্ট ছোট্ট করে আমার জন্য দুলাইন লিখত। ‘আদরের গাল্লুসোনা, তোমাকে এই চিঠিতে বড় করে লিখতে পারলাম না বলে কিছু মনে কোর না। পরের বার নিশ্চয়ই অনেক কিছু লিখব। ভাল থেক। ইতি, বাবুন’।
প্রত্যেক চিঠিতেই একই ব্যাপার হত বলে আমার খুব অভিমান হত। ঠোঁট ফুলিয়ে মনকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম, যে এই দেখ না, আমি যে একটা মানুষ, যে নাকি আলাদা করে বড় চিঠি না লিখলে মন খারাপও করতে পারি, সেটা যে অন্তত বাবুনের মনে হয়েছে এই না কত। গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করত। শেষে হঠাৎ একদিন দেখতাম, বাবুন ইনল্যাণ্ড লেটারের গোড়াতেই আমায় লিখেছে। গোটা একটা পাতা আমার জন্য। তখন সব অভিমান ধুয়ে মুছে যেত। মনের আনন্দে উত্তর লিখতে বসে যেতাম।
একবার আম্মা-গুব্বা টানা মাস কয়েকের জন্য দিল্লিতে জেঠুর বাড়িতে চলে গিয়েছিল। ওদের ছেড়ে এতদিন কখনো থাকিনি। সেই সময় আম্মা -গুব্বা আলাদা করে আমাদের চিঠি দিত। গুব্বা যে গুব্বা কোনদিন কাউকে চিঠি টিঠি দিত না, বিজয়ার সময়ও আম্মা জোর করে লেখাত, তাই নিজের দাদাকে ঠিক দুলাইন লিখে বিজয়া সারত। সেই গুব্বা পর্যন্ত আমায় একটা কবিতা লিখে পাঠিয়েছিল। ছোট্ট কবিতা, কিন্তু মনে আছে। ‘গাল্লু হা, আপ্পু গা, রেবতী রে, তোদের জন্য আমার যে মন কেমন করে’।
আম্মা এমনিতে আমাদের তুই করে বলত, তবে চিঠিতে কেন জানি না তুমি বলত। কল্যানীয়াসু স্নেহের গাল্লু দিয়ে সুরু করত। ওপরে আবার ওঁ লিখত। গুব্বার ওসবের বালাই ছিল না।
বাবা কাজের জন্য বাইরে কোথাও গেলে কেন মা-কে চিঠি লেখে না, মায়ের সেটা খুব দুঃখ ছিল। বাবার বোধহয় মাকে লিখতে লজ্জা করত, তাই আম্মাকে লিখত আর আমাকে লিখত। অথচ আমি তখনো পড়তেই শিখিনি। গম্ভীর ভাবে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর আমাকে লেখার পর শেষ লাইনে লিখত, কথাগুলো তোমার মাকে বলে দেবে। আম্মা ঐ পাতাটা আমার হাতে দিয়ে মাকে দিতে বলত। আম্মার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি থাকত, কিন্তু মায়ের মুখ ভার হয়ে যেত।
চিঠিগুলো কিছুদিন কাচের আলমারীর মাথায় খবরের কাগজের তলায় চাপা থাকত। তারপর আম্মা ওগুলোকে খাটের তলার মস্ত লোহার ট্রাঙ্কে পুরে ফেলত। সেই ট্রাঙ্কে আরো অনেক পুরোনো চিঠির রাশির সঙ্গে থেকে যেত এই চিঠিগুলো। শুধু কি চিঠি? কত পুরোনো ছবি, আরো নানা রকম আকর্ষণীয় জিনিস চোখে পড়ে যেত ট্রাঙ্কটা খুললেই। হাঁসের পেটে পানের বাটা, কাঠের তৈরী পুতুল পরিবার—বাবার পেটে মা, তার পেটে বড় ছানা, তার পেটে মেজো, তার পেটে ছোট, তার পেটে পুঁচকি পুতুল, উল কাঁটা, সেলাইয়ের ডিজাইনের ছেঁড়াখোড়া বই, পুরনো ভাঙা ডল পুতুল, আরো কত কী। আর সেই সঙ্গে ন্যাপথলিনের কড়া গন্ধ। আমি অমনি মুণ্ডুটা গলিয়ে দিতাম কী কী আছে দেখার জন্য, আর বকা খেতাম। সত্যি, ঐ ভারী লোহার ডালা একবার মাথায় পড়লে আর দেখতে হবে না। প্রতি বার বন্যার সময় বাবা সবচেয়ে আগে ওটাকে আলমারীর মাথায় তুলত, যাতে চিঠিগুলো জলে ভিজে না নষ্ট হয়ে যায়। ওগুলো খুলে মাঝে মাঝে ছাদে ঢিল চাপা দিয়ে দিয়ে রোদে দেওয়া হত। ধুলো ঝেড়ে ঝেড়ে পড়া হত আবার।
বাবার এক মারা যাওয়া বন্ধুর চিঠি বার বার বাবাকে পড়তে দেখেছি। চিঠিটা তার মৃত্যুর পরে আমাদের বাড়িতে এসে পৌঁছেছিল। কেহ বা কাহারা তাকে ঠকিয়েছিল বলে তার বাচার ইচ্ছে আর নেই বলে সে জানিয়েছিল। চিঠিটা পেয়ে বাবার ভয়ানক আফসোস হয়েছিল—যদি আর কিছুদিন আগে চিঠিটা এসে পৌঁছত, তাহলে নাকি তাকে যাহোক করে বাঁচাতে পারত। কিন্তু সেই বন্ধু সময়ের হিসেব নিকেশ করেই চিঠি লিখেছিল, ‘হয়তো যখন চিঠিটা তোর হাতে পৌঁছবে ততদিনে আমি হারিয়ে যাব এই পৃথিবী থেকে। তাও আমার শ্রাদ্ধের নেমন্তন্নটা করে রাখলাম। আসিস’।
ঐ চিঠিটা বাবা আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছে। বাকি সব চিঠি কালের নিয়মে কোথায় গিয়ে জমেছে কে জানে?