এটা টাইপরাইটারের অবিচুয়ারি নয়

শুভদীপ মৈত্র


এই যে খটাখট আওয়াজ হচ্ছে, আমি কয়েরটি কি বোর্ড-এ লিখে চলেছি, তাকে কী বলব? নিশ্চয়ই কলম পেশা নয়। টাইপিং। অর্থাৎ যন্ত্রের সাহায্যে লেখা। অথচ যা টাইপ করছি, শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, সেটা সেই টাইপরাইটার যন্ত্রের সোয়ান সং। লজিক বলছে যে ক্রিয়া পদ যে বস্তু থেকে উদ্ভূত সেই বস্তুই নেই এমন হতে পারে না । কিন্তু সত্যিই তাই তো ঘটছে দেখছি। যা ঘটে তাহা সত্যি, যদিও ছোটবেলায় বুড়বক বনতে হত কেউ যদি বলত টাইপরাইটার যন্ত্র আর কেউ কোনোদিন ব্যবহার করবে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এত কেন আমি হেদিয়ে গিয়ে টাইপরাইটারের অবলুপ্তি নিয়ে লিখছি, সে তো আর কোনো প্রাণী নয় যা লোপ পেলে ইকোলজিকাল ব্যালেন্সের সর্বনাশ হয়ে যাবে। বা উনিশ শতকের এমন একটি আদর্শ (যাহা সত্য কারণ নাকি বিজ্ঞান), যার অবলোপ কফি হাউজ থেকে চায়ের দোকানের গজল্লাবাজদের টেবল বাজানোর উপাদান নষ্ট করে দেবে। সে সব ছেড়ে পেটি বিষয় নিয়ে লিখছি কেন? তার একটা সুগভীর কারণ রয়েছে। ওই যন্ত্রটি-র প্রতি আমার মারাত্মক আকর্ষণ ছিল ছোটবেলা থেকে – লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট, পহেলি নজর মে মুহাব্বত।


সে প্রথম প্রেম

আট বছরের ক্ষুদে আমি, পুজোর ছুটিতে মামার বাড়িতে। এক্‌জটিক লোকেশন নয়, হাজরা মোড়ের উপর একটা ম্যানশনের চারতলার ফ্ল্যাটে। গত শতকের আশির দশক। অর্থাৎ মহা গোলমেলে সময় কারণ গোলমাল কিস্যু নেই। শুধু একটা অপেক্ষা, যেন একটা বিরাট বদলের আগে ছিলা টানটান। ঘুম থেকে উঠে, সেটা যত দেরীতে হয় মঙ্গল কারণ স্কুলে যাওয়া নেই, পড়াশোনা নেই, মামাদের কেউ দেখতাম নিয়ে এসেছে শ্রীহরির ডাল আর কচুরি, গরম, ধোঁয়া ওঠা, মাটির ভাঁড় আর ব্রাউন পেপারের ঠোঙা। ট্যাঙস ট্যাঙস করে ঘণ্টি মেরে গোঁত্তা মারছে ট্রাম, রাসবিহারীর দিক থেকে এসে আলিপুরের দিকে যাচ্ছে। আমি আর আমার ভাই ভাবছি এবার একটা এলিয়েনদের স্পেস শাটল থেকে ফ্ল্যাশ গর্ডন কীভাবে ডক্টর জারকোভকে উদ্ধার করবে।
এমন সময় তার মধুর ধ্বনি, নানা আসলে ক্যাকোফনিই হবে হয়তো, কানে ঢোকে। হয়তো আসত অনেকদিনই কিন্তু খেয়াল করিনি। কিভাবে যে নজর কারল। হাল্কা সবুজ রঙের একটা পোর্টেবল টাইপরাইটার। ছোটখাটো স্লিক ডিজাইন এখনকার ভাষায়। সেই হালকা সবুজ শরীরের উপর কালো ঝকঝকে চাবিগুলো, স্টিলের লিভারটা যেন ক্লিওপেট্রার উদ্ধত নাক। এবং শাদা কাগজের উপর হরফগুলোর কালো মুচমুচে শরীর।
বড়দাদু নিপুণ হাতে টাইপ করে চলেছে। খাদির ফতুয়া পড়া শাদা লম্বা চুলের বৃদ্ধ লোকটি অত্যন্ত সামাজিক। তার ছিল নানা সমাজসেবী সংগঠনের দায়িত্ব, এবং সেই দায়িত্ব নিতেন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেই, অর্থাৎ এনজিও নামকের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তখনও তৈরি হয়নি, এবং তা যে কর্পোরেটাইজড মুনাফা-সন্ধানের অংশ হতে পারে এ বোধহয় খুব কম লোকই ভেবেছিল।
একটা হাতের লম্বা লম্বা তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা কি বোর্ডর উপর, শিল্পীদের মতো বড় আঙুলগুলো। আমি কখনো তাকে দুহাতে টাইপ করতে দেখিনি। লিভার সরানো বা কাগজ রোল করা ছাড়া। শিফট কি টিপতেন না কখনো? কে জানে তখন এত খেয়ালও করিনি। বাঁহাত কখনো চায়ের কাপে, বা কখনো অলস পড়ে থাকত কোলের উপর। খাটে বসে, সামনে একটু উঁচু চেয়ারে সেই টাইপরাইটার।
এই যে কাজ চলছে ঘরে বসে, কারণ তিনি তখন চারতলার থেকে নিচে নামতে পারেন না। তাঁর শরীর খারাপের পর নামার ব্যাপারটা মুশকিল, আর এই ম্যানশন পাঁচতলা হলেও যেহেতু আদ্যিকালের সেহেতু লিফট নেই। ফলে তাঁর বেরনো বন্ধ। কিন্তু তাতে কাজ কি আটকায়? টাইপরাইটারে সারাদিন, সমস্ত অফিশিয়াল কাজ, চিঠি, অ্যাপ্লিকেশন সব চলছে। হরেক সংগঠন যেন চলছেই হাজরা মোড়ের সেই ঘরটা থেকে।
তার মধ্যেই নাতিদের কখনও ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করে খাওয়ার নির্দেশ। কখনো কালো বড় ফোনটা কানে ধরে কাজের কথা। হাতে তিনি কি কিছু লিখতেন? পোস্টকার্ড-এ বিজয়ার আশীর্বাদ জানানো ছাড়া বা কুশল মঙ্গল জানিয়ে ক্বচিৎ কখনো ছাড়া আর কিচ্ছু না। সেই হাতের লেখা ছিল রাবীন্দ্রিক ছাঁদের মকশো, সেটাই স্বাভাবিক যে যার সময়ের আইকন বেছে নেয়।
আমার হাতের লেখা খুব খারাপ, ইললেজিবল নয়, কিন্তু দর্শনীয় নয় একেবারেই, টাইপিং আমাকে আড়াল দিয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু তাঁর তো তেমন নয়। তবে কেন তিনি মোটামুটি কলমের ব্যবহার ছেড়ে একবারে টাইপরাইটার-এ চলে গেলেন। এ তো বাঙালির অভ্যাস নয়। তবে কি তিনিও আমার মতো, প্রেমেই পড়েছিলেন?

কমোডিটি ফেটিশও বটে

এটাকে কি কমোডিটি ফেটিশ, পণ্য লালসা বলে মনে হচ্ছে? হে পাঠক আপনি আমার ইনটেনশন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন এতক্ষণে হয়তো। একটা টাইপরাইটার নিয়ে এত কথা আমার মানায় কি না, সেটাও আপনাকে ভাবতে হচ্ছে। আপনি যদি আমাকে বাঙালি লেখক হিসবে ভাবেন তো বটেই। কারণ বাঙালি লেখক কোনোদিনই টাইপরাইটার প্রেমী নয়। ভাবুন আপনি, একটা ভাল পার্কার পেন নিয়ে যত আদিখ্যেতা বাংলা সাহিত্যে হয়েছে, তেমন টাইপরাইটার নিয়ে হয়নি। শুধু পার্কার নয়, যে কোনো পেন হলেই হল, উদাহরণ সন্দীপন চট্টো, সস্তার পেন কিনে কীভাবে এক লেখকের উপন্যাস শুরু হয় ও তার কালি শেষে শেষ – তার বিবরণ পেয় যাবেন ‘রুবি কখন আসবে’তে। ধুতি, খদ্দরের কলারঅলা কামিজ, শান্তিনিকেতনি ঝোলা ও বুক পকেটে পেন এই ক্লাসিক বাঙালি লেখকের অবলুপ্তি ঘটে না গেলেও, তাহারাও হারিয়ে যাবেন এক দু’দশকে, তবুও আমাদের যৌথ স্মৃতিতে ওই চেহারাই থাকবে। ফলে আমার লেখকত্ব নিয়ে আপনাদের সন্দেহ অমূলক নয়।
তা যদি কমোডিটি ফেটিশও মনে করেন, সেই কমোডিটির ইতিহাস, ভূগোল যানতে চান? গুগল ইট। আমি খামোখা এখানে স্পেস নষ্ট করব না, কন্ট্রোল টি টিপে আরেকটা ট্যাব খুলে উইকি থেকে শুরু করে যাতে মন চায় – বারবার দেখো হাজারবার দেখো, ইয়ে দেখনেকে চিজ হ্যায় হামারা দিলরুবা।
আমি বরং ভাবছি কী ভাবে আমার সেই প্রেম বা ফেটিশ যাই-হোক-না-কেন, জন্মাল? প্রথমত ওই যে বললাম বাঙালি টাইপরাইটারকে ঘরে তোলেনি কোনোদিন। সে জানে তা আপিসে থাকে। কেরানির চাকরি জোটাতে গেলেও টাইপ জানা দরকার, আর তাই পাড়ার টাইপরাইটার শেখার দোকানে বেজার মুখে লাইন দিতে হত যৌবনে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ, দিলখুশার চপ এবং আরো কত কী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছেড়ে! কাজেই টাইপরাইটার তার আতঙ্ক, তার ঘেন্না। আমাদের কলেজ জীবনেও অর্থাৎ একুশ শতকের একদম গোড়ার দু-এক বছরেও কেউ কেউ সে পথে, অর্থাৎ সেই বিরস জ্ঞানার্জনের পথে যেতেন, পাড়ার গুরুকুলে। এখন যদিও সে গুরুকুল কোথায় যে লোপাট হয়েছে, বোধহয়, সাইবার ক্যাফেতে পরিণত।
আমার আসলে বারবার ছোটি সি মুলাকাত ঘটে গেছে। সতের বছর বয়স, হলিউডে মজে রয়েছি, কখনো স্কুল কেটে আমি আর আমার বন্ধু শমিক দাশগুপ্ত গ্লোব-লাইটহাউজ-নিউ এম্পায়রে, কখনো কিছু বেশি টাকা জমলে এক দু পেগ হুইস্কির উইশ কি ও ছিল। সেই সময় বোধহয় দূরদর্শনেই, রাতের বেলা, অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন। রবার্ট রেডফোর্ড আর ডাস্টিন হফম্যান। ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল কি জানতামই না, কিন্তু ওই যে সিগারেট ধোঁয়াভরা নিউজরুম খবরের জন্য রুদ্ধশ্বাস আর সঙ্গে টাইপরাইটারের খটরখটর। ব্যাপারটা মাথায় গেঁথে গেল। পরবর্তীতে তাই কী মনে হয়েছিল, সাংবাদিকতাটাই পেশা হওয়া উচিত? আসলে সাংবাদিকতা করতে শুরুর পিছনে ওই টাইপরাইটার। বোকার মতো ভেবেছিল সেই যুবক। কারণ সে যখন শুরু করল সাংবাদিকতা, নিউজরুম থেকে টাইপরাইটার বিদায় নিয়েছে, আর নো স্মোকিং জোন-এ পরিনত সবকটা বড় কাগজ বা টিভি-র অফিস। অর্থাৎ প্রেমিকা বিদায় নিয়েছেন তখন।
তবু ওই সিনেমা আমাকে আবার ফেলেছিল প্রেমে সন্দেহ নেই। বাংলা সিনেমায় টাইপরাইটার খুব গোলমেলে ভাবে থাকে। পাঠক মনে করুন সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় ‘মহানগর’-এর টাইপিস্ট মেয়েটি এ্যাংলো ইন্ডিয়ান, অর্থাৎ সে আলাদা, সে যেন ওই পার্ক স্ট্রীটে একদিন ট্রিংকাস-এ যাওয়ার মতো বিস্ময়কর অপর। অথচ টাইপরাইটার যন্ত্রটি মেয়েদের স্বাধীনতার একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছেলের গেল যুদ্ধে ফলে ইউরোপেই মেয়েরা চাকরিতে তাদের শূন্যস্থান ভরাতে এগিয়ে গেলেন, এবং তাদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল ওই যন্ত্রটি। যুদ্ধ শেষ হল। পুরুষরা কিন্তু ফিরে এসে তাদের আর হটিয়ে দিতে পারল না। মেয়েরাও সোচ্চার হলেন তাদের স্বাধীনতার আর অধিকারের দাবিতে।
দেশভাগের পর যে সব মেয়েরা টিঁকে থাকতে নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য চাকরির খোঁজে বেরলেন তাদেরও তো সেইরকমই হয়েছিল। এদেশি মেয়েরা চাকরিটাকরি করতেন না খুব, কিন্তু ভিটে মাটি ছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা কোনো রকমে যে আশ্রয় পেলেন একটা, সংসার বাঁচাতে তাদের জীবন সংগ্রামে পা বাড়াতে হল। সেলাই মেশিন বা টাইপরাইটার দেখেছে তাদের সেই অসামান্য স্ট্রাগল। উফফ, সেই সব মেয়েদের কথা ভাবুন, নিতা বা মহানগরের সেই বউটি, হয়তো তারা সোচ্চার হননি, তাদের নিয়ে মহাকাব্য নাই বা থাকল, তারা যে এভাবে টিঁকে থাকার লড়াইটা চালিয়েছিলেন, তা কি ভিয়েতনামের প্রতিরোধের থেকে কম কিছু ছিল?

মধ্যবিত্তের গণ্ডি টপকে

সূর্য সেন স্ট্রিট, কলেজ স্রি েট ক্রসিং ছাড়িয়ে ওই রাস্তা ধরে এগোলে দেখা যাবে কয়েকটা ঝুপড়ি মতো দোকান। বুড়ো লোকটি ওখানেই এসে বসেন রোজ। ট্রেনে করে দক্ষিণের শহরতলী থেকে শেয়ালদা স্টেশন। সেখান থেকে হেঁটে ওই ঝুপড়ি দোকানে। কোঁচকানো চামড়ার বাঁকা আঙুলগুলো অপেক্ষা করে। কখনও কোনো লোকজন এসে চিঠি বা দরখাস্ত টাইপ করায়। বাকি সময়টা তিনি ওখানেই বসে কাটান, তার মতো এক দু’জন যিনি আছেন তাদের সঙ্গে আড্ডা দেন। বুড়ো লোকটি চল্লিশ বছর ধরে টাইপ করছেন ওখানে বসে। আগে রোজগার ভালই ছিল। যদিও একটু নজর করে দেখবেন, তার কোমর একটু বেঁকা, আসলে ওইভাবে বসে টাইপ করে করে সেটা যে কি ভীষণ বিগড়েছে তা উনিই জানেন।
উনি একজন টাইপিস্ট। কলকাতা শহরে একসময় বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যেত এদের। যেমন ধরুন ডালহৌসিতে, বা হাজরা পার্ক-এর গায়ে, বিজন সেতুর তলায়। এরা কোনো আপিসের মাইনে করা চাকুরীজীবী নন। এঁরা আমার আপনার মতো লোকেদের নানা টাইপ আউট-এর প্রয়োজন মেটাতেন। ধরুন চাকরির দরখাস্ত দরকার, বা ছুটির জন্য অ্যাপ্লিকেশন জানাবেন আপিসে, বা সরকারি কোনো দফতরে নালিশ জানাতে হবে। এঁরাই ছিলেন একমাত্র উপায়।
এই বুড়ো লোকটি এই কাজ করে সংসার চালিয়েছেন, দুটো মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেটা অটো চালায়। আর দশ বিশ বছরের এদিক ওদিক হলে কেলেঙ্কারি হত, কারণ এখন তার যা রোজগার তাতে সংসার চালানো অসম্ভব। ডিটিপি-র ঠেলায় তার কাজ গেছে, বয়স তাকে নতুন প্রযুক্তি শিখতে দিয়েছে জোর বাঁধা। প্রযুক্তি বা উন্নতির যে অন্ধকার দিক রয়েছে, ব্যাপক বেকারি বাড়ায় তা তিনি অন্তত বুঝতে পেরেছেন। তবে এটা মেনে নিতে কষ্টও তো হয়, তিনি একটা কাজ জানেন অথচ সেই কাজটার অস্তিত্ব চলে যাচ্ছে, ক্রমশ মানুষের মনের থেকে মুছেই যাচ্ছে।
সামান্য ঘটনা? এত কল কারখানা বন্ধ হল, এত চাষের জমি চলে গেল, এত আদিবাসী মূলবাসী মানুষ বেঘর হলেন, তার তুলনায় এ আর কি এমন। সত্যিই তাই। আর যেহেতু এ নেহাতি কিছু ব্যক্তির সমস্যা তাই ঝাণ্ডা বাগিয়ে আন্দোলন করার উপায় নেই, আমরা মিটিং মিছিল সেমিনার করব না, নিঃশব্দে দেখতে হবে, যে ভাবে আসন্ন মৃত্যুকে দেখি আমরা, দিন ফুরনোকে দেখি।
টাইপো বলে একটি শব্দ আছে, এমন ভুল যা ওই যন্ত্রের চাবি টিপতে টিপতে হবেই, এখনো পর্যন্ত এই ভুল কেউ করেননি এমন মানুষ পৃথিবীতে জন্মাননি। এই ঘটনাটাও কি টাইপো? এই যে ভদ্রলোকের দুঃখ এবং তার পেশার অস্তিত্বই চলে যাওয়া, এও কি এক অমোঘ এক টাইপো নয়?
এই যে বুড়ো লোকটির নাম আমি আপনাদের জানাইনি। কারণ এর অস্তিত্ব একজন টাইপিস্ট হিসেবেই রয়ে যাক আপনাদের কাছে আমি চাই। গল্পের মতো আমি এর নাম দিয়ে ইনি কি খান, কোথায় যান, কোন পার্টির মিছিল করেন বা করেন না, এসব জানাব না। এটা আমার এক ধরনের পার্ভারশন নয়, কারণ আসলে আপনারাও জানতে চান না। এই লোকটিকে আমি সেই ইউনিভার্সিটির সময় থেকে দেখছি। কখনও তো জানতে চাইনি, লেখার রসদ হিসবে এখনই বা কেন তা জেনে তুলে ধরব আপনাদের সামনে, প্রমাণ করব আমি আপনাদের থেকে বেশি অনুভূতিপ্রবণ?
তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে যে এই লোকটির টাইপিস্ট ছাড়া কোনো অস্তিত্ব নেই, যে অস্তিত্ব আবার আছে কিন্তু নেই। মধ্যবিত্তের ব্যক্তি পরিচয় থাকে, আপনার পাশের বাড়ির যে লোকটি সে কী চাকরি করে সেটা দিয়ে তার পরিচয় তৈরি হয় না। সে অমলবাবু বা রমেনবাবু যেই হোন না কেন, তাঁর একটা নাম আছে, তিনি যে সচ্ছল, তাঁর গলায় মাঝে মধ্যেই খেলে ওঠে ইমন রাগ, বা বিদেশি পত্রিকা বুক পোস্টে আসে। মাঝে মধ্যে ঝগড়া শোনা যায় বউ-এর সঙ্গে আবার তিনিই পাড়ার অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের তত্ত্বাবধান করে এই সব মিলিয়ে আপনার কাছে তিনি একটা গোটা মানুষ। সেক্ষেত্রে এটাও ভাবতে হবে কোনদিন এই টাইপিস্ট লোকটার অস্তিত্ব আপনার কাছে ছিল। শরদিন্দুর চমৎকার গল্প আছে, মাকড়সার রস। সেখানে পোস্টম্যানটি ঘরে আসে, অথচ তাকে কেউ হিসেবে ধরে না। সে শুধুমাত্র পোস্টম্যান।
কাজেই এভাবে তালিকাভুক্ত মানুষেরা চিরদিন এভাবেই হারিয়ে যান।
যন্ত্র ও যন্ত্রী দুই চলে গেলে তাহলে কী পড়ে থাকে, কিছুটা শূন্যস্থান, ও বিষাদ।

চালাও পানসি বেলঘরিয়া

যা গেছে তা তো গেছেই। এখনও কেউ কেউ নিশ্চয়ই ব্যবহার করে যাবেন টাইপরাইটার। যেমন এই বুড়ো লোকটি করে যাবেন। বা কেউ হয়তো বলবেন ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহারে যে বিদ্যুতের যে অপচয় তার থেকে টাইপরাইটার ভাল। যেমন উডি এ্যালেন নাকি এখনও স্ক্রিপ্ট লেখেন টাইপরাইটারে, ওয়ার্ড প্রসেসরে তিনি রপ্ত হননি। টাইপরাইটার, নানা সাইজের কাঁচি, বন্ড পেপার, ইরেজার, হোয়াইট ইন্‌ক তার লেখার সঙ্গী। এইসব উদাহরণ বাদ দিলে, বলা যায় একটা নতুন প্রযুক্তি কী আমাদের লেখাকেও বদলে দিচ্ছে না?
ফিকশন-মেকিং বা পোয়েট্রি মেকিং শব্দগুলো আসছে। এ যেন সিনেমার পরিভাষায় যাকে বলে নন লিনিয়ার এডিটিং। আমরা একটা লেখা যেখান থেকে ইচ্ছে লিখতে শুরু করতে পারি, হয়তো কেউ একটা গল্প লিখছে, তার শেষ প্যারাগ্রাফটা সে আগে লিখল। এবং সেটা লিখে রেখে টাইপ করতে শুরু করল তার উপরে কারসারটা উঠিয়ে নিয়ে। কত সহজে একটা শব্দকে আরেকটা শব্দের সঙ্গে জায়গা বদলে বদলে দেখা যায়। ফলে কবিতা বা গল্প লেখার ক্ষেত্রে লেখকের মনের ভিতর একটা বদল আসছে। তার শব্দ ব্যবহার বা নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন ধরন তৈরি হচ্ছে।
টাইপরাইটার যেমন সাহিত্যকে বেশ বদলে দিয়েছিল, তেমনি টাইপরাইটার চলে গিয়ে ওয়ার্ড প্রসেসর লেখার আরো রদবদল ঘটাচ্ছে। আমি চাইলেই যে কোনো লেখর থেকে ফাইন্ড-এ গিয়ে, আমার ফাইলটায় একটা শব্দ খুঁজে বের করে তাকে রিপ্লেস করতে পারি আরেকটা শব্দ দিয়ে। এবং তার অভিঘাত মারাত্মক। ফাইন্ড-রিপ্লেস বা কাট-কপি-পেস্ট, আমাদের লেখার নির্মাণে বিশাল একটা পরিবর্তন এনে দিয়েছে। কবিতা বা গল্পের ন্যারেটিভ-এ এর নিশ্চিত একটা প্রভাব পড়ছে।
বাংলা সাহিত্যে এই রদবদল ঘটছে, একুশ শতকের পর যারা লিখছেন, অনেকের লেখা পড়লেই বোঝা যায় তারা জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে বদলে গেছে তাদের নির্মাণ। এবং এই বদলে যাওয়া নানা নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে পোয়ট্রি মেকিং বা ফিকশন মেকিং ব্যাপারটা গুরুত্ব পাবে। ব্যক্তি লেখকের ভাবনার যে কেন্দ্রীয় অবস্থান সেটা টেক্সট-এর মধ্যে থেকে সরে যাচ্ছে, ফলে স্পেস টাইম যে সম্পর্ক বা গ্রামারের মধ্যের লজিকালিটি, তা ভেঙে সহজে একটা নতুন ভাষা তৈরি সম্ভব হচ্ছে ।
কাজেই কেউ চান বা না চান পানসি অন দ্য রোল।
আমার এই লেখাটার মধ্যেও নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তব্য নেই। অবলুপ্তি ব্যাপরটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যাথা যে আছে তাও না, কারণ লিখতে গিয়ে দেখতেই পেলাম দুটো মানুষের কাছে একই জিনিসের বিলোপ সম্পূর্ণ আলাদা মানে তৈরি করে। কাজেই সে নিয়ে কোনো সার্টেনটি বা নিশ্চয়তাবাচক ভাবনা তৈরি হয় না। বিশেষ করে গত শতাব্দীর শেষ দু দশক থেকে এখনও পর্যন্ত এত কিছু বদলে গেছে আমার চারপাশে, যে কোনটা আমার এপিসোডিক মেমারি আর কোনটা সেমান্টিক, সেটাই তো গুলিয়ে যাচ্ছে, এখানে বিলুপ্তি তাই বিশেষ কোনো ছাপ ফেলে কি না, ব্যক্তির মানসিক গঠনে তাও তো বুঝতে পারছি না।
ফলে টাইপরাইটার বা গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিলুপ্তি যাই হোক না কেন, কোনো বিশেষ একটা অনুভূতিকে কেন্দ্রে রেখে তার সম্পর্কে একটা লেখাকে কনক্লুড করা যায় না। তাই ট্রুমান কাপোতে ‘অন দ্য রোড’ পড়ে বিরক্ত হয়ে যেমন বলেছিলেন, ইট ইস নট রাইটিং ইট ইজ টাইপিং; আমার এই লেখাটা পড়ে কারো যদি তাই মনে হয়, আপত্তি নেই। আমি নাচার।