পত্র পাঠ বিদায়

নীতা মণ্ডল


(১)
মাধ্যমিক পরীক্ষার পর লম্বা ছুটিতে মামার বাড়ি এসেছে বিদিশা। মামার বাড়িতে অন্যতম টান ওর পিঠোপিঠি দিদি নালন্দা। কিন্তু এবারে এসে যে এরকম ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে কে জানত! শেষপর্যন্ত নালন্দার সঙ্গে বিদিশারও বিচারসভা বসল। নালন্দা বিদিশার ছোটমামা অমরবাবুর মেয়ে। যে কোনও পারিবারিক সংকটে বিদিশার মামারা ওর বড়মামা অজয়বাবুর বৈঠকখানা ঘরে জমায়েত হয়। আজও তাই হয়েছে। নালন্দাকে লেখা শ্যামলের চিঠি এবং নালন্দার নিজের হাতে লেখা সেই চিঠির উত্তর দুটোই বেহাত হয়েছে। অমরবাবু চিঠির ভাঁজ খুলতে খুলতে বললেন, ‘বড়দা তুমি একবার পারমিশন দাও। আমি নালুর বিয়ের ব্যবস্থা করি, ওর আর লেখাপড়ার দরকার নেই।’
বিদিশা আর নালন্দা দেয়াল ঘেঁষে সিটিয়ে বসে আছে ঠিকই কিন্তু বিদিশার চোখের সামনে ভেসে উঠছে কাল রাতের দৃশ্য। ওই চিঠি নিয়েই দুজনের কত জল্পনা কল্পনা!
নালন্দা প্রেম করছে শুনেই খুব উৎফুল্ল হয়ে বিদিশা জানতে চেয়েছিল ‘তোরা চিঠি লিখিস না?’
‘না, না।’ নালন্দা লজ্জা লজ্জা মুখে বলেছিল।
‘বলনা, নালু। আমি কাউকে বলব না।’ নালন্দার মুখ দেখে ওর মনে হয়েছিল আরেকবার জিজ্ঞেস করলেই বলবে। তাই বিদিশাও চেষ্টার ত্রুটি করে নি। প্রেমপত্র নিয়ে বিদিশার অপার কৌতূহল। কখনও লেখার সুযোগ পায় নি, কিন্তু সুযোগ পেলে ফাটিয়ে দেবে, এ বিশ্বাস ওর আছে। বিদিশা উপন্যাসের পোকা। এখন তো শুধু সুনীল গাঙ্গুলি আর বুদ্ধদেব গুহতে মজে আছে। বুদ্ধদেব গুহ’র ‘সবিনয় নিবেদন’ পুরোটাই প্রেমপত্র। নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ প্রেমপত্র নাহলেও একটা শিহরণ জাগানো রোম্যান্টিক চিঠি। নারায়ণ সান্যালের ‘অন্তর্লীনা’তে অন্যের হয়ে চিঠি লিখতে গিয়ে একটা ছেলে আর মেয়ের কি রকম প্রেম হয়ে গিয়েছিল! এসব কাল রাত জেগে বিদিশা নালন্দাকে শুনিয়েছে। উদ্দেশ্য নালন্দার বিশ্বাস অর্জন করা যাতে ও শ্যামলের চিঠিগুলো সব দেখায়। যথারীতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে প্রেমপত্র সম্পর্কে বিদিশা যথেষ্ট বিজ্ঞ।
শেষে নালন্দা ওর গোপন কুঠুরি থেকে খামটা বের করেছিল। চিৎ হয়ে শুয়ে চিঠিটা কিছুক্ষণ বুকের উপর রেখেছিল। তারপর খুলে বুক ভরে বড় করে একটা শ্বাস নিয়েছিল। ততক্ষণ বিদিশা ধৈর্য ধরেছিল তারপর আর সহ্য হয় নি। কেড়ে নিয়েছিল চিঠিটা। সেই চিঠির উত্তর লিখেছে দুজনে মিলে। চিঠির উৎকর্ষ বাড়াতে কথার ফাঁকে ফাঁকে গানের লাইন, কবিতা এসব গুঁজে দেবার পরামর্শ দিয়েছিল বিদিশা। আর সেই চিঠি নালন্দার অসাবধানতা অথবা ছোটমামির গোয়েন্দাগিরির ফলে ধরা পড়েছে।
এখন শ্যামল আর নালন্দা দুজনের লেখা দুটো চিঠিই হাট করে খোলা একঘর লোকের মাঝখানে। ভয়েভয়ে ওদিকে তাকাতেই বিদিশা দেখল, নালন্দার লেখা চিঠির শুরুতেই ওর বলে দেওয়া গানের লাইন জ্বলজ্বল করছে, ‘প্রিয়তম, কি লিখি তোমায়?’ চিঠির নিচে বাম দিক ঘেঁষে, লাল টকটকে ঠোঁটের ছাপ। এটা অবশ্য বিদিশার অগোচরে হয়েছে। তার মানে নালন্দা সুযোগ বুঝে লিপস্টিক লাগিয়ে নিজের ঠোঁটের ছাপটা দিয়েই দিয়েছে। শ্যামল যে লিখেছিল ‘জন্মদিনে যে লিপস্টিকটা দিয়েছি ওটা লাগিয়ে একটা ঠোঁটের ছাপ দিও তোমার চিঠিতে।’
চায়ে চুমুক দেওয়া শেষ করে অজয়বাবু নালন্দার লেখা চিঠিটা তুলে নিলেন। নাকের ডগায় চশমা এঁটে এক ঝলক চিঠির দিকে তাকানোর পর গম্ভীর অজয়বাবু ততোধিক গম্ভীর গলায় বললেন, ‘মাধ্যমিকে বাংলায় যেন কত পেয়েছিলে নালু?’
নালন্দা তোতলাতে শুরু করল, ‘চু...চু...চু...’
চুয়াল্লিশ, না চুয়ান্ন নাকি চুয়াত্তর তা আর নালন্দা বলে উঠতে পারল না। অমরবাবু রাগে গরগর করতে করতে বললেন, ‘সে আর শুনতে হবে না। জান না এ বাড়ির মেয়েরা সব বাংলা বানানে পণ্ডিত? পরীক্ষার হলে চেনা বিষয় না থাকলে একটা রচনা লেখার ক্ষমতা নেই। অথচ প্রেমপত্র লিখতে বল, দেখ ভাষার বাঁধুনিতে, বর্ণনার ছটায় সব ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়কেও হার মানিয়ে দেবে।’
নালন্দার মুখটা অপমানে কালো হয়ে উঠল। চোখ দুটো ছলছল করছে ওর লেখা চিঠিকে ওই ভাবে সকলের সামনে নগ্ন হয়ে যেতে দেখে। ঠোঁট ফুলে উঠছে অভিমানে। মুখ দেখে বিদিশাও বুঝতে পারল না এরপর কি হতে চলেছে। নালন্দা ওর শান্ত তুলতুলে ইমেজ ছেড়ে হঠাৎ দুঃসাহসী হয়ে উঠল। বাবা ও জেঠুর হাত থেকে চিঠি দুটো ছোঁ মেরে নিয়ে ওখানেই ছিঁড়তে শুরু করে দিল। তখন ওর যত রাগ ওই চিঠি দুটোর উপর। নালন্দার ফোঁপানির শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল বিদিশা, দেখতে পেল নালন্দার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা। চারিদিক থেকে ওদের দুজনের উপর তখন হরেক উপমা ও অসংখ্য নীতিবাক্য ছিটকে এসে পড়ছে। বিদিশার মা বলছেন, ‘সব এক গোয়ালের গরু।’ অমরবাবু বলছেন, ‘মিথ্যা কথার ডিপো এক একটা। একটা কথাও বিশ্বাস কর না। খলের কখনও ছলের অভাব হয় না।’ এমন দিশেহারা অবস্থায় আগে পড়ে নি বিদিশা। ওর মনে হল ঘরের মেঝেটা যদি ফেটে যেত তাহলে ও তক্ষুনি নালন্দাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করত।
এমন সময় বিদিশার দিদিমা হঠাৎ উল্টো সুর গেয়ে উঠলেন, ‘অমরা, খুব যে বড় বড় কথা বলছিস তখন থেকে। লজ্জা করে না তোদের একটা বাচ্চা মেয়ের চিঠি নিয়ে চেঁচিয়ে পড়ার মতলব করছিস দুই ভাইয়ে। নিজেদের কীর্তিকলাপ বুঝি সব ভুলে গেলি?’
যেন জোঁকের মুখে নুন পড়ল। অজয়বাবু ও অমরবাবু দুজনেই চুপ করে গেলেন। এত জমজমাট নাটকের ওখানেই সমাপ্তি হল। নালন্দা আর বিদিশা দুজনের জ্যান্ত সমাধি হল না তবে নালন্দার ওপর কড়া পাহারা বসল। এবং নালন্দার সেই প্রেমও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হল।
(২)
অমরবাবুর অপমানের জবাব দিতেই বোধ করি নালন্দা ও বিদিশা দুজনেই বাংলা নিয়ে পড়াশুনো করেছিল পরবর্তীকালে। দুজনেই স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে বাংলার দিদিমনি হয়েছিল। নালন্দার আর চাকরি করা হয় নি। অমরবাবু ইঞ্জিনিয়ার পাত্র দেখেই রেখেছিলেন। বিয়ের পর ও চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে বরের সঙ্গে লন্ডনে চলে গিয়েছে। আর বিদিশা অনেক বছর ধরে পড়াচ্ছে স্কুলে।
ওদের স্কুলে একটা বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়। ওরা বলে ‘শিক্ষা সপ্তাহ’। বৃক্ষরোপণ হয়, ক্যুইজ হয়, নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় এবং সব শেষে হয় পুরস্কার বিতরণ। এ বছর ওদের প্রধান শিক্ষিকা একটা নতুন চমক রাখলেন। তা হল কিছু লুপ্তপ্রায় এবং কিছু বিলুপ্ত পরিষেবা বা বস্তু নিয়ে শিক্ষক ও দ্বাদশশ্রেণীর ছাত্রীদের একটা আলোচনা সভা। আলোচনা হল, রেকর্ড প্লেয়ার নিয়ে, ক্যাসেট নিয়ে, ল্যান্ড ফোন নিয়ে। আর সব শেষে এল চিঠি।
বিদিশার সেই যে প্রেমপত্র নিয়ে এক অপার কৌতূহল ছিল তা বুঝি আজও যায় নি। আলোচনা শুরু করেছিল বিদিশা। ওর বক্তৃতার সারমর্ম হল, মোবাইল ফোন আজ যাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তারা কি ভাবতে পারে প্রেমের সূচনায় নিজের হাতে লেখা একটা ছোট চিঠি হৃৎপিণ্ডের গতি কিরকম বাড়িয়ে দিতে পারত! এই চিঠির ওপর অনেক সময় প্রেমের পরিণতিও নির্ভর করতো। তারপর ছিল রাত জেগে, নিভৃতি খুঁজে, কাঁপাকাঁপা হাতে লেখা চিঠিটা কাঙ্ক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার রাস্তা খোঁজা। বইয়ের ভাঁজে অথবা টিফিন বক্সে চিঠি লুকিয়ে রেখে ঠিক জায়গায় চিঠিটা পৌঁছে দেবার জন্যে কতজনের কাছে গিয়ে কাকুতি মিনতি করা! শেষে ভাইবোনদের মধ্যে কাউকে অথবা পাড়ার এঁচোড়ে পাকা ছেলেটিকে ঘুষ দিয়ে চিঠি পাঠানো! সেই ঘুষ ছিল ফুচকা, চুরমুর, আইসক্রিম বা চপ, যার খরচ এখনকার এস এম এসের খরচের চেয়ে অনেক বেশি। এরপরও কি টেনশন কম! চিঠি ঠিক মানুষের কাছে নির্বিঘ্নে পৌঁছালো, নাকি জাঁদরেল জেঠু অথবা বাবা, মা’র হাতে পড়ল তার কি নিশ্চয়তা!
আর যদি ঠিক হাতে পড়ে, তবে যার চিঠি তার অবস্থা তখন দেখার মত। সে হয়ত এক ভিতু কিশোরী। দুপুরে পাওয়া প্রেমপত্র পড়ার সুযোগ পেতেপেতে তার মাঝরাত। বাড়িতে মেয়ে বড় হয়েছে বলে চারিদিকে কয়েক জোড়া সন্ধানী চোখ। তাই চিঠি বাড়িতে কোথাও লুকিয়ে রাখা যাবে না। সেক্ষেত্রে বারকয়েক পড়ে, মুখস্ত করে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলা ছাড়া কি উপায়!
বিদিশার বক্তব্য শেষ হতেই অঙ্কের দিদিমনি অনুপমাদি বললেন, ‘চিঠি মানেই যে প্রেমপত্র ব্যপারটা কিন্তু তা নয়। তবে খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, যে ধরনের চিঠি নিয়ে সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা, গল্প, সাহিত্য, কবিতা বা গান সৃষ্টি হয়েছে তা মূলত প্রেমপত্র। একবার ভেবে দেখুন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্য। নায়ককে লেখা নায়িকার চিঠি মেস মালিকের পকেট থেকে তাঁর স্ত্রীর হাতে। অথবা সেই চিঠি মেসের আর সকলে মিলে পড়ার দৃশ্য। তাই ধরে নেওয়া যায় সবচেয়ে লিখিত ও পঠিত চিঠি প্রেমপত্রই হবে।
অবশ্য প্রেমপত্র বাদ দিলেও একটা সময় ছিল যখন পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান ও তুলনামূলক ভাবে সস্তা মাধ্যম ছিল চিঠি। সেসব ছিল পারিবারিক, ব্যক্তিগত, অফিশিয়াল বা নিতান্ত কেজো চিঠি। তবে সব চিঠির মূল অনুষঙ্গই ছিল অপেক্ষা। সন্তানের চিঠির জন্য বাবা-মা’র এক বুক স্নেহভরা অপেক্ষা, স্বামীর চিঠির জন্য স্ত্রীর ভালোবাসার কাঙাল অপেক্ষা, ভাইয়ের চিঠির জন্য বোনের অভিমানী অপেক্ষা, বন্ধুর চিঠির মিষ্টি অপেক্ষা, ইন্টারভিউ দিয়ে আসার পর চাকরির চিঠির জন্যে উদগ্রীব অপেক্ষা এবং পাত্রপাত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দেবার পর তার উত্তরে চিঠির অপেক্ষা। চিঠি যে সবসময় আনন্দের ছিল এমন না, তবুও চিঠির প্রতীক্ষা মানুষ যুগ যুগ ধরে করে এসেছে।’
ভূগোলের দিদিমনি বাসন্তীদি ছাত্রীদের মাঝে খুবই জনপ্রিয়। ওনার বলার ভঙ্গী জলের মতই সহজ সরল। অনুপমাদি যেখানে শেষ করলেন সেখান থেকেই বাসন্তীদি শুরু করলেন গল্প বলার ঢঙে, ‘চিঠির মধ্যে এই অপেক্ষাটাই ছিল আসল। তবে চিঠির অপেক্ষা অনেক সময়ই বদলে গিয়েছে ডাকপিয়নের অপেক্ষায়। তাই একটা সময় গ্রামেগঞ্জে পোষ্ট অফিস খোলার আগেই লাইন পড়ত। অফিস খুলে পিয়ন চিঠিগুলো দেখে প্রাপকের নাম ধরে ডাকতেন। সেখানে উপস্থিত লোকজন নিজের বা পাশের বাড়ির চিঠি নিজ হাতে নিয়ে যেতেন। বাড়ির সবাই তখন এক জায়গায় জড়ো হতেন। চিঠি খুলে একজন পড়তেন, বাকিরা শুনতেন। যে লেখাপড়া জানত না তাকে পাশের বাড়ির কোনো পড়াশুনো জানা ব্যক্তির কাছে গিয়ে চিঠি পড়িয়ে তার মর্ম উদ্ধার করতে হত। সমস্যা হত স্বামী স্ত্রীর পরস্পরকে লেখা চিঠি অন্যকে দিয়ে পড়াতে। তখন পাঠক বা লেখক খুঁজতে হত নিতান্ত বিশ্বস্তজনকে। কারণ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে মধুমাখা আবেগ বিনিময় হত তা জানাজানি হয়ে গেলে লজ্জার কথা।’
একটু থেমে বাসন্তীদি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমার দাদুর মুখে আমাদের পাড়ার ভালোদাদুর কথা শুনেছিলাম। গোটা গ্রামের লেখাপড়া নাজানা মানুষজন ভালোদাদুর কাছে আসতেন চিঠি লেখাতে ও পড়াতে। কানাই ঘোষ নামের এক ভদ্রলোক এসেছিলেন চিঠি লেখাতে। কানাই ঘোষের স্ত্রী মাস তিনেক বাপের বাড়িতে, পরের মাসে বাচ্চা হবে। ভালোদাদু জানতেন যে কানাই ঘোষ স্ত্রীকে ‘তপনের মা’ বলে ডাকে। পুরো চিঠি শেষ করে ভালোদাদু বললেন, ‘শেষে দুলাইন নিজের হাতে লেখ, তোর বৌ খুব খুশি হবে। চিঠি কি শুধু চিঠি রে, তোর হাতের ছোঁয়াটুকু পাবে তোর বৌ।’ কথাটা কানাই ঘোষের মনে ধরেছিল। ভালোদাদুর কথা মত উনি শেষে ট্যারাব্যাকা অক্ষরে লিখেছিলেন ‘তপনের মা তোমাকে শত কোটি প্রণাম দিয়ে শেষ করলাম।’ সেকথা কি করে কে জানে গোটা গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল। ‘কানাই ঘোষ’ পরবর্তীকালে হয়ে গিয়েছিলেন ‘শত কোটি প্রণাম কানাই’।
চিঠিতে ঠিক মত আবেগ ফুটিয়ে তোলারও অনেক উপায় ছিল। চিঠির ভাঁজে ভালবাসার গোলাপ বা আশির্বাদী ফুল, প্রেমের সুগন্ধি ছাড়াও মনের ভাব বোঝাতে নানান রঙের কালির ব্যবহার করা হত। আমার এক ঠাকুমা ছিলেন, লেখাপড়া জানতেন না কিন্তু সম্পর্ক বুঝে মুখে মুখে ছড়া সাপ্লাই দিতে পারতেন। আর্মিতে কাজ করা বিকাশকাকুর স্ত্রীকে ঠাকুমা লিখতে বলতেন, ‘শিশিরে কি ফোটে ফুল বিনা বরিষণে, চিঠিতে কি ভরে মন বিনা দরশনে!’ এছাড়াও চিঠি লেখার বই বিক্রি হত বাজারে এবং রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে। ব্যাকরণ বইয়ে চিঠি লেখার অনুশীলনী থাকত।’
ইতিহাসের দিদিমনি মালবিকাদি এগিয়ে এলেন হাতে একগোছা কাগজ নিয়ে। প্রস্তুতি ছাড়া উনি কোনও বক্তৃতা দেন না। উনি বলতে শুরু করলেন, ‘কান টানলে যেমন মাথা আসে সেরকম চিঠির কথা উঠলে ডাকব্যবস্থার কথাও চলে আসে। অতএব সন্ধান করা যাক চিঠি লেখার প্রচলন কবে থেকে এবং মূলত কি কারনে শুরু হয়েছিল আর কালে কালে তা কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে।’ বলে উনি চিঠির সুদীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করলেন।
লিখিত চিঠির ইতিহাস সভ্যতার প্রারম্ভের দিকের হলেও পাথরে ছবি এঁকে কিংবা প্রতীকী চিহ্ন দিয়ে খবরাখবর আদান-প্রদান সেই গুহাবাসী মানুষ থেকেই শুরু হয়েছিল। তাই ধারণা করা হয় পৃথিবীতে প্রথম লিখিত রূপটি ছিল বার্তা বা চিঠি। তাহলে বলা যায়, চিঠির বয়স মানবসভ্যতার সমান সমান। অথর্ববেদে বার্তাবহ বা বার্তা আদানপ্রদানের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া চাণক্যের শ্লোক থেকে পাওয়া যায় কিভাবে চিঠির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে কর সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হত।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবন, প্রকৃতি, রাজনীতি, সমাজনীতিসহ সব কিছুতেই যোগাযোগের একমাত্র উপায়ই ছিল চিঠি। বিভিন্ন দেশের মনীষী ও রাজনীতিবিদদের কাছে লেখা চিঠি দিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ তৈরি হয়েছে। সেসব চিঠির গ্রন্থে উঠে এসেছে তৎকালীন মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃত ইতিহাস।
প্রাচীনকালে রাজা, শাসক এবং জমিদারেরা তাঁদের রাজ্য রক্ষা করতে যেমন সামরিক বাহিনী রাখতেন তেমনই রাখতেন চর বাহিনী। এই বাহিনীর প্রধান কাজ ছিল বার্তাবহ অথবা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত পায়রার মাধ্যমে গোপন খবর আদানপ্রদান করা। পরবর্তীদিনে আধুনিক ডাক ব্যাবস্থার প্রচলনের আগে মানুষ অন্যের হাত দিয়ে লিখিত চিঠির মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সংবাদ আদানপ্রদান করেছে।
দিল্লীর সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবক তাঁর শাসনকালে (১২০৬-১২১০) মেসেঞ্জার পোষ্ট সিস্টেম চালু করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১২৯৬ সালে আলাউদ্দিন খিলজির দ্বারা তা আরও বর্ধিত ও উন্নত হয়। তিনি ডাকচৌকির প্রচলন করেন। এই কাজের জন্য তিনি ঘোড়া অথবা পদাতিক রানারের ব্যবহার শুরু করেন। আরও পরে শের শাহ (১৫৪১-১৫৪৫) সংবাদ আদানপ্রদানকে দ্রুত করার উদ্দেশ্যে পদাতিক রানারদের বদলে শুধুই ঘোড়ার ব্যবহার প্রচলন করেন। সুদীর্ঘ উত্তরপথ (বাংলা থেকে সিন্ধু) ধরে এক বৃহৎ অঞ্চল জুরে ব্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক সংবাদ আদানপ্রদান করা হত তাঁর আমলে। শের শাহ. প্রায় ১৭০০ সরাইখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাদশাহি সড়ক জুরে। প্রতিটি সরাইখানায় সবসময় দুটো করে ঘোড়া মজুত থাকত। এখানেই বিভিন্ন রাজনৈতিক চিঠি হাতবদল হত। পরে আকবর ঘোড়া ছাড়াও উটের ব্যবহার প্রচলন করেছিলেন চিঠি বহনের জন্যে। দক্ষিণ ভারতে ১৬৭২ সালে মহীশুরের তৎকালীন রাজা একটি দক্ষ ডাক বিভাগ চালু করেছিলেন যা পরবর্তীকালে হায়দর আলি আরও উন্নত করেছিলেন।
১৫১৬ সালে ‘রয়্যাল মেইল’ নামে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ডাক বা পোস্টাল সার্ভিস চালু হয়। অষ্টম হেনরি প্রবর্তিত এই ডাকপ্রথা ১৬৬০ সালে দ্বিতীয় চার্লস সাধারণ ডাক বা জেনারেল পোস্ট অফিস রূপে প্রবর্তন করেন। ১৮৩৫ সালে রোল্যান্ড হিল আধুনিক পোস্ট অফিসের ধারণা দিয়ে ‘পোস্ট অফিস রিফর্ম’ প্রকাশ করেন। সেখানে বলা ছিল দূরত্ব যা-ই হোক, যে কোনো চিঠি পাঠানোর জন্য প্রেরককে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ দিতে হবে, যা পরিশোধ্য হবে ডাকটিকিটের মাধ্যমে। আগে দূরত্ব অনুসারে ডাকচার্জ নির্ধারিত হতো। ব্রিটেনেই বিশ্বে প্রথম ডাকটিকিট প্রথা চালু হয়, যার নাম ছিল ‘পেনি ব্ল্যাক’। পরে ১৮৫০ সালে নাম হয় ডাকবক্স প্রথা। সহজে চিঠি লেখার জন্য পোস্টকার্ডের প্রচলন হয় ১৮৬৯ সালে। ১৯১১ সালে এয়ার মেইলের মাধ্যমে বিদেশে সহজে চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে চিঠির প্রচলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল ডাক বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছয় ১৭৭৪ সালে, লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে। ওই বছর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম পোষ্টঅফিস প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতায়। ক্রমে ১৭৭৮ ও ১৭৯২ সালে মাদ্রাজ ও বোম্বাই শহরে পোষ্ট অফিস ব্যবস্থা চালু হয়। সর্বভারতীয় ডাকটিকিট চালু হয়েছিল ১৮৫৪ সালে। রেলওয়ে ডাক চালু হয় ১৮৫৩ সালে এবং পোস্টাল অর্ডার সার্ভিস চালু ১৮৮১ সালে।
মালবিকাদির সুদীর্ঘ ভাষণের ফলে সবার হাই উঠতে শুরু করেছিল। এমন সময় গুপী গায়েনের ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’ এর ঢঙে তার সুরেলা কন্ঠে বক্তৃতা শুরু করে শেফালিদি সবাইকে ঝিমন্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করলেন। বললেন, ‘চিঠি বা ডাক ব্যবস্থার একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে আমরা এতক্ষণের আলোচনায় বুঝতে পারলাম। সম্ভবত তা শুধুই ইতিহাসে পরিণত হবে অদূর ভবিষ্যতে। এই বিলুপ্তির পেছনে হাহুতাশ করার মত কিছু নেই কারন অনেক দ্রুত পরিষেবা তার বিনিময়ে এসেছে। ডিজিটাল যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে ইন্টারনেট, ই-মেইল, ভয়েস মেইল, চ্যাটিং, ফোন ও মোবাইলের জয়-জয়কারে দেশ-বিদেশের বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে চিঠি মারফত যোগাযোগ প্রয়োজনহীন। যুগে যুগে সব বদলায়। বদলায় প্রয়োজনেই। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বদলেছে।’
শেফালিদি যে খুব আশাবাদী মানুষ তা বিদিশারা সবাই জানে কিন্তু শেফালিদির পরের কথায় বিদিশা চমকিত হল। ‘তবে ‘রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম’, ‘আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম’, ‘বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই, কথা আর সুরে সুরে’ অথবা গত দশকের দুই বাংলার জনপ্রিয় গান, ‘ভাল আছি, ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ কিম্বা মন উদাস করা সেই গান ‘মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা’ আর লেখা হবে না। সৃষ্টি হবে না ‘মেঘদূত’ এর মত কাব্য অথবা ‘ডাকঘর’ এর মত কোনও গল্প। তৈরি হবে না চিঠির অপেক্ষাকে বিষয়বস্তু করে কোনও ছবি। সামাজিক দলিল হিসেবে হয়ত চিঠির অস্তিত্বই থাকবে না।’
(৩)
স্কুল থেকে ফেরার সময় সারা রাস্তা ওই আলোচনার কথাই ভাবছিল বিদিশা। বর্তমান প্রজন্ম অবশ্য এখনও বইয়ে পড়ে, ‘পোষ্ট অফিস কি?’ অথবা ‘পোষ্টম্যান আমাদের কিভাবে সাহায্য করে?’ ইত্যাদি। কে জানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এসব পড়ার দরকার হবে কিনা! যারা জানলই না চিঠি কি, চিঠি লেখার মধ্যে কতটা ভালবাসা থাকতে পারে, কতটা আদর বা অনুভূতি মিশে থাকতে পারে তারা এসব হারানোর বেদনাও পাবে না। স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা এখন কি প্যাড না দেখেই মোবাইলে মেসেজ টাইপ করে। এদের কাছে চিঠির মূল্য কোথায়? চিঠির জন্য মন কেমন করবে তাদের, যারা এখনও পুরনো চিঠিগুলো জমিয়ে রেখেছে।
বিদিশারও তো সব চিঠি জমানো আছে। প্রতিবার রেজাল্ট বের হবার পর বাবার লেখা চিঠিগুলো আশীর্বাদ বয়ে আনত। বিজয়ার পর বিদিশা প্রতি বছর নিয়ম করে মামামামিদের ও দিদাকে চিঠি লিখত। সেই চিঠির উত্তর আসত তাতে সবার লেখা থাকত দুলাইন করে। দিদার লেখাটুকু পড়তে পড়তে বিদিশা দিদার চুল থেকে আসা কেওকারপিন তেলের গন্ধ পেত। বন্ধুদের লেখা চিঠিগুলোও থেকে গিয়েছে আর আছে ওর চাকরির এপোয়েন্টমেন্ট লেটার। এখন তো এপোয়েন্টমেন্ট লেটারও ইমেইলে আসে।
বাড়ি ফিরে বিদিশা জামাকাপড়ও বদলাল না। সোজা পৌঁছল ওর প্রিয় বইয়ের আলমারির কাছে। সেখানেই আছে চিঠিগুলো। অনেকদিন খুলে দেখে নি। আজ যার কথা সব চেয়ে বেশি মনে পড়েছে, যার ছায়া বারে বারে এসেছে ওর বক্তৃতায়, সেই নালন্দার লেখা চিঠিই উঠে এল হাতে।
সব ভুলে গিয়ে আলমারির সামনে মেঝেয় বসে চিঠিটা পড়তে শুরু করে দিল বিদিশা। ছবির মত সেসব দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠল ওর। মুখের রেখায় কখনও হাসি খেলে গেল, কখনও চোখ ভরে এল জলে। এমন সময় বিদিশার ছেলে গুড্ডু ঘরে ঢুকল। ও এখন ক্লাস সেভেন। মাকে ওই অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল মা?’
বিদিশা হাত এগিয়ে দেখাল। বলল, ‘চিঠি। নালন্দা মাসির লেখা। এই দেখো সেবার আমার পরীক্ষা চলছিল বলে ওদের সঙ্গে বেড়াতে যেতে পারি নি। মামারা সবাই মানালি গিয়েছিল, রোটাংপাসে বরফ দেখে এসেই এই চিঠিটা নালন্দামাসি আমাকে লিখেছিল। আমরা দুজন তো খুব বন্ধু ছিলাম। এই দেখো, এটা ছিল আমার হোস্টেলের ঠিকানা।’ বিদিশা ভুলেই গেল যে ওর ছেলে বাংলা পড়তেই জানে না। জীবনে কখনও চিঠি লেখে নি। পুরো চিঠিটা খুলল বিদিশা, ‘দেখেছ মাসির লেখাটা কি সুন্দর, মুক্তোর মত ঝকঝকে। বানান ভুল হত বলে ছোটমামা কত বকতেন, কিন্তু হাতের লেখাটা যে সুন্দর সেটা কখনও বলতেন না।’
গুড্ডু শুধল, ‘মাসিমনিকে একটা ফোন করলেই তো পার। মাসিমনির ইমেইল আই ডি নেই?’
বিদিশা বলল, ‘ফোন করে তো মাঝেমাঝে। কালই ওর ইমেইল পেয়েছি।’
গুড্ডু বলে, ‘তাহলে চিঠি পড়ে তুমি ওরকম করে বসে আছ কেন?’
বিদিশা বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘আসলে, চিঠি মানে ঠিক চিঠি নয় রে বাবা। চিঠি একটা মানুষের মতই। একটা সময় ... একটা ছবি ... একটা চরিত্র, ধর... ধর...’
গুড্ডু ছটফট করছে। ওর কি এত সময় আছে! মা হাত পা নেড়ে তখন থেকে কি সব বলছে! বিদিশার কথাগুলো ওর কাছে দুর্বোধ্য।
বিদিশাও যেন কোনও ভাবেই বুঝিয়ে উঠতে পারছে না। সেদিন বড়মামার বৈঠকখানা ঘরে যেমন অসহায় লেগেছিল নিজেকে আজও ওর অবস্থা অনেকটা সেরকমই। বোঝাতে না পেরে বিদিশার চোখ ফেটে জলে এল। হতাশার শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমি বোধ হয় তোকে বোঝাতে পারব না রে গুড্ডু।’
গুড্ডু কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্মার্ট ভঙ্গীতে বলল, ‘ও ক্কে। বুঝতে না পারলেও কোনও ক্ষতি নেই। তোমাকে কাঁদতে হবে না।’
বিদিশা ভাবল চিঠির মধ্যে ঠিক কি ছিল, যা ইমেইল বা ফোনে নেই তা কি সত্যি বোঝানো যায়! চিঠিটা ভাঁজ করে রং চটা খামে পুরে ফেলল বিদিশা। তারপর আলমারি বন্ধ করতে করতে ঠিক করল যে কটা চিঠি এখনও আছে সেগুলো যত্ন করে রেখে দেবে। হতেই পারে একদিন কেউ ওকে জিজ্ঞেস করবে, ‘চিঠি মানে কি ঠাকুমা?’ তখন উদাহরণসহ বুঝিয়ে দিতে পারবে।