সে-তারেতে বাঁধিলাম তার

মনীষা মুখোপাধ্যায়


অক্সিজেন নলটা খুলে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ডাক্তারবাবু । (শরৎ পণ্ডিত যদিও ভেঙে ডাক-তার লিখতেই পছন্দ করতেন।) ১৬৩ বছরটাকে কি বৃদ্ধই বলা যায় শুধু ? ১৪ জুলাই রাত এগারোটা তিন।
কলকাতার অলিতে গলিতে ছোট ছোট করে রাত নামছে।
কানেক্টর ব্রিজগুলো চাঁদের আলোয় পাশ ফিরে শুয়ে পড়ার মত জায়গা করে বাকি জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে টুক-টাক বাস ট্যাক্সির জন্য।
খবর কাগজের লোকজনের তীক্ষ্ণ চোখ ফার্স্ট এডিশনের শেষ মুহূর্তে ।
লম্ফটা উস্কে দিয়ে মাছ ধরার জালটা ছইয়ের মধ্যে গুটিয়ে রাখছে বাবুঘাট। অন্ধকার গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে খিদিরপুর ডকের সেকেন্ড সিগন্যালের গা ঘেঁসে।
নির্জন রাস্তা পেরিয়ে খালাসিটোলা্র টেবিল হাল্কা হচ্ছে ক্রমশ ।
সেখান থেকে কিছু ভিড় পায়ে পায়ে হারকাটার দিকে। সেখানে চোখ-গাল-ঠোঁট রাত্রিকালিন চোখা।

নির্জনতার সামনে ঝিমোতে থাকা শহরে ভিড় শুধু মৃতদেহের সামনে। ভদ্রলক উইল করে যাননি, এই বয়সেও। বেয়াক্কেলেই বটে। আত্মীয়স্বজন বলতে সবাই বড়লোক আধুনিক। জাতে সাহেব হলেও গরিব থুত্থুরে কোনোদিনই সেখানে খুব একটা খাপ খুলতে পারেন নি। যদিও বুড়োর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছেছে তাদের কানেও। লম্বা লম্বা ফোনে আঙ্গুল চলছে দেদার। নিষিদ্ধ ইস্তেহারের মত আত্মীয়দের দেওয়ালে খোদাই হছে শোকপ্রস্তাব। কি যেন বলে…ও হ্যাঁ আরআইপি।

বুড়োর পুরনো জামাকাপড়, কানের শব্দমেশিন, বাইফোকাল চশমা একে একে জড়ো হছে টেবিলে। ট্রাঙ্কটা খুলতেই একরাশ ধুলো আর ভ্যাপশা গন্ধ একসঙ্গে । ছেলেটা অবশ্য আরআইপি-র মানে জানে না। ওকে বলেও দেয়নি কেউ। প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের পাঠশালায় এসব আব্রিভিয়েশন পড়ানো হত না। বুড়োর স্মৃতিচারণা করতে গিয়েই ট্রাঙ্ক থেকে হলদে হয়ে যাওয়া চিঠিটা মেলে।তারিখ বোঝা যায় না। সাল ১৯২৯।

- কম কথার মানুষটা কেমন দুম করে চলে গেল না!

- যাই বলুন , বড়ো চুপচাপ ছিলেন, প্রয়োজনের বাইরে একটা শব্দ উচ্চারণ করতেও যেন কষ্ট হত ওনার। সাহেব বাচ্চা তো !

- হ্যাঁ, শেষ ক’বছর আর কথাই বলতেন না শুনলাম। ১৬৩! ভাবা যায়? আমরা শুধু ৬৩ অবধি গড়াব কি না কে জানে?

এসব টুকরো টুকরো কাথাবার্তার ফাঁক গলেই চিঠিটা হাতে এল। কোনও সম্বোধন নেই। যেন দুজনের ডাকটা দুজনেই জানে। লিখবার প্রয়োজন নেই।
‘‘অনেকদিন খোঁজখবর পাই না, আছ কেমন ? ডালহৌসির বাড়িতেই আছ , নাকি ফের বাসাবদল হল? দ্যাখো দিকি একে তুমি বেশি কথা বল না, তায় আমি পরপর কত্ত প্রশ্ন করে ফেললাম। ওই স্টেশনমাস্টার মারা গ্যাছেন। আরে ওই স্টেশনমাস্টার গো... যার ঘরে তোমার-আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। ওই খড়মের বউলের মত জিনিসটা নাকি তোমার জিনিস? বাবা বলেছিল।অমন একখানা কল আমায় করে দেবে গো? কী সুন্দর খট খট আওয়াজ হয়। পটুটা বেশি পাকা। ভারি আমায় জ্ঞান দিতে এয়েচে। বলে, ওকে নাকি টরেটক্কা বলে, আমি যেন জানি না। যত্তসব। আমি তো জানি, পরে তোমার নাম বদলে গেল। ফ কেটে ম হল। নাম বদলের পর আরও কত জোরে তার ছুঁয়ে দৌড়তে তুমি! পটু কি আমার মত এত জানে বল?

আচ্ছা তোমার সঙ্গে উইলিয়ম ব্রুসের আর দেখা হয়েছিল? ওই যে

উইলিয়ম গো, সেই যে যার সঙ্গে ১৯৫০-এ কলকাতা থেকে ডায়মন্ডহারবার বেড়াতে গেলে। তুমিই তো বলেছিলে, তুমি নাকি তখন কুট্টি।এইটুকু। ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আর?

গ্রেট ব্রিটেন ছেড়ে সেই যে এলে, আর ফিরলে না!ওটা বোধহয় ১৮৪১ সাল, না গো? আমেরিকাতেও যে কেনণো মন বসল না তোমার!অবিশ্যি তাতে ভালই হয়েছে। নইলে কি আর আমার সঙ্গে তোমার আলাপ হতো বলো? তারের ওপর পা দিয়ে কী করে যে তুমি অত জোরে হাঁটতে কি জানি!আমায় তাও শিখিয়ে দিলে না!বললে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গল্প শোনাবে—এতো বয়সে তা কি আর পারবে? তখন নাকি ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানীকে তুমি খূব সাহায্য করেছিলে, আমায় বাবা বলেছে।

সামুয়েল মোর্সেকে মনে পড়ে তোমার? সেই যে তোমার প্রথম বন্ধু... যার হয়ে তুমি ওয়াশিংটন থেকে বারমিনহামে তার কোন এক বন্ধুর বাড়িতে খবর পৌঁছোতে গীয়েছীলে... মনে পড়ে তোমার! আচ্ছা পাগল লোক ছিল বল? বন্ধূকে বলে কিনা SAY WHAT HATH GOD WROTE? হা হা, গড যেন ওর মাইনে করা খাজাঞ্চী— সব খাতায় টূকে রাখবে!তবে সামুয়েলকে ভুললেও রবি ঠাকুরকে তুমি ভুলতেই পারো না। আমায় বলেছিলে রবিবাবুর কত গানের লাইন, কবিতা তোমার মুখস্থ ছিল। সেই একবার প্রমথকে লিখলেন তিনি COME SHARP. WAITING. প্রমথও ফোক্কোড়। লিখল WAIT SHARP. COMING. দুবারই তুমি গেলে এ-ওর কাছে। তোমার সে কি হাসি প্রমথনাথ বিশীর এমন উত্তর দেখে!
১৯১৩-র দিনটা মনে পড়ে? বাপরে! রবি ঠাকুরের নোবেল জয়ের খবর নিয়ে সকাল থেকেই এদিক ওদিক দৌড়চ্ছ তুমি! একফোঁটা জুড়োবার জো নেই!
তবে আমি জানি, তোমারও মন খারাপ হত… খারাপ খবরগুলো যখন পেতে তখন তুমি আরও চুপচাপ হয়ে যেতে। গম্ভীর। কেমন যেন পুরনো বটগাছের মত। চোয়াল ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে। লোকে ভাবতো তুমি উদাসীন... ভাল-মন্দ সবেতেই নির্মোহ।(এই নির্মোহ শব্দটা গল্পগুচ্ছ থেকে শিখেছি সদ্য।)সমান গম্ভীর।মাপা কথা। গোনাগুনতি শব্দ। কিন্তু এই উদাসীনতার মধ্যেও তুমি যে কত গভীর তা আমি জানি। আসলে তুমি তো উইটি ব্রিটিশ।আর তাই বোধহয় এতো গম্ভীর। সেদিন শুনছিলাম ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন নাকি ২০০৬-এর পর তোমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্কই রাখেনি... তুমি নাকি ওদের এমন ব্যবহারে খুব অপমানিতও বোধ করেছিলে। তার পর নাকি পরের ছ’মাস ডালহৌসির বাড়িটা থেকে বেড়োতেই না। লোকে বলতো যান্ত্রিক গোলোযোগ। তার পর দিল্লির এক ভদ্রলোক হঠাৎ তোমায় আপ্যায়ন করলে মান ভাঙে তমার। দেখেছো আমি কত খবর রাখি তোমার... অথচ তুমি? আমার ভারি অভিমান হয়েছে।
আচ্ছা তোমার জন্য নাকি ১০০ কোটি টাকা খরচ প্রতি মাষে। কেন গো? তোমার কি খুব কঠিন অসুখ? কেউ নাকি এতো খরচ টানতেই পাড়ছে না! আমি যদি বড় হয়ে যেতুম তোমার সব খরচ আমি দিতুম। একশো কোটি মানে
অনে-ক না গো? তবু আমি পারতুম।
কতো দিন তোমার সঙ্গে দেখাই হয় না। আমার বুঝি মন খারাপ করে না! পরে শুনেছি সেই কবে অজয় করের ছবিতে কৃষ্ণেন্দুর মায়ের মারা যাওয়ার খবর নাকি তুমিই দিয়েছিলে।যদিও সিনেমার গল্প সত্যি হয় না। তবু আমার কষ্টই হয়েছিল। মিছিমিছি করে মা মরে গেলেও কান্না পায়, জানো। থাক। আজ আর বেশি লিখব না। বরং তোমায় দেখতে যাব একবার। এত তাড়াতাড়ি তোমায় আমি মরতে দিচ্ছি নে, হ্যাঁ। যতই অসুখ হোক।
--তোমার অপু।
হলদে চিঠি ফড়ফড় করে উড়ছে কলকাতার রাস্তায়। অন্ধকারেরও একটা কালো রঙের আলো আছে।
বিষণ্ণ আলাপবিমুখ কেজো একটা বুড়োর মৃত্যু স্তব্ধ করে দিচ্ছে শহুরে রাজপথ।

মনে মনে খট খট আওয়াজ। খোদাই হচ্ছে TELEGRAM E X P I R E D