জ্যোৎস্না হত ইতি উঠোন

কিশোর ঘোষ


আকাশে চাঁদ আছে কিন্তু মাটিতে জ্যোৎস্না নেই। খুব স্বাভাবিক। এটা হারানোর সময়। এ হল নদী আছে অথচ জল নেই টাইপের সময়। জঙ্গল আছে, এমনকী তার গাল ভরা রিজার্ভ ফরেস্ট জাতিয় নামও আছে কিন্তু গাছ বাড়ন্ত। নারী আছে, স্তন যোনি আছে---বেশ সুন্দরীও... অথচ ভিতরে একটুও প্রেমিকা নেই, নদী নেই! পুরুষের ক্ষেত্রেও ব্যাপার এক। আমার এক বন্ধুর ঝুরি ঝুরি রক্তের সম্পর্ক আছে অথচ আত্মীয় নেই। একজনও নেই! বড়, বউ, বাচ্চা আছে। দাম্পত্যকলহ, ব্যংক ব্যালান্স, স্বচ্ছলতা---সব আছে অথচ সংসার নেই। কিংবা মন্দির আছে কিন্তু পুজোটাই হাওয়া। স্কুল আছে, সেই স্কুলে আছে টিচার কিন্তু শিক্ষক কোথায়! শিক্ষা দেওয়ার মতো কেউ!
ইয়ারকি না, সত্যি। জ্যোৎস্নার ব্যাপারটাও ওই। কিন্তু জ্যোৎস্না না থাকলে চাঁদেরও কোনো মানে হয় না। কারণ চাঁদ তো বিধেয়। চাঁদ হল জ্যোৎস্না-ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরি আছে অথচ প্রোডাকশান নেই---এ আবার হয় নাকী! কালে কালে কারখানাটি বন্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।
অবশ্য এত ভাবার বা মাথা তুলে তাকানোর সময়ও কম। তবুও। ওয়াটসঅ্যাপ থেকে হঠাৎ হঠাৎ চলন্ত ট্রেন-বাসের জানলা থেকে যখন চোখে পড়ে। দেখি অল্প খাওয়া, আধাখাওয়া বা গোল চাঁদ চলেছে, আমাদের সঙ্গে চলেছে---ভাসতে ভাসতে, হাসতে হাসতে কোথায় চলেছে যেন! তুরন্ত মুখ নামিয়ে নিই আমরা। সেই ভালো। অফিস ফাইলে দ্রুত সুইচ ওভার করাই বেটার। কারণ চাঁদ দেখা ভালো না। একদম না। ওতে ঝামেলা আছে। মানিব্যাগের সঙ্গে চাঁদের ঝামেলা সেই দুর্বাসা এজ থেকে। কিন্তু মনে মনে খুচরো আশ্চর্যও হইনা কি? এই ভেবে যে, আকাশে আস্তো চাঁদ অথচ শহরে এক ফোটা জ্যোৎস্না নেই! ব্যাপারটা কী? চাঁদের সঙ্গে কী আর ফ্রি জ্যোৎস্না দিচ্ছেন না ভগবান! নাকী জ্যোস্না ফুরিয়ে গেল অতিব্যবহারে বা অব্যাবহারে!
আমরা জ্ঞানপাপি। জানি, লোভের ভুলে অনেক হারিয়েছি। বহু ভালোকে খারাপ করে ছেঁড়ে দিয়েছি প্রতিভায়। আমাদের বহু স্বাভাবিক সম্পদ আজ আমাদেরই অতি চালাকিতে জাস্ট ভ্যানিসড। বা ভ্যানিসপ্রায়। জবরদস্তি বাঁধে নদীর জল শুকিয়ে যাওয়ার পাকাপাকি ব্যবস্থা করেছি আমরা, ছ্যাবলামি করে পাহাড়ের যত্রতত্র এমন বাড়ি-দোকানপাট বানিয়েছি যে, তা ভবিষ্যত-মৃত্যুর সলিড কারণ হবেই হবে। কিন্তু জ্যোৎস্না হজম করলাম কবে! কী করে? কার ভুল?
সেটা উঠোন আমল। যখন বাড়িতে বাড়িতে অ্যাকোয়াগার্ড না থাকলেও পাড়ায় পাড়ায় একটা করে মাঠ থাকত। বড় ফাঁকা মাঠ। সবুজে ভরে থাকত সেই মাঠ। ভোরে সেই ঘাসে হিরে কুচির মতো শিশির গড়াত, রোদ একটু চড়লে দড়িবাঁধা, দড়িছেড়া গরু ঘাস খেতো চলে আসত এদিক ওদিক। বিকেলে ক্রিকেট ফুটবল আর জীবন থেকে অবসর নেবো নেবোদের গুছিয়ে আড্ডা মারার জায়গা ছিল সে। আর সন্ধে থেকে শুরু হত আসল কেতা। তখন শুধু জোনাকি আর জ্যোৎস্নার মাঠ। অসীম আর অনন্ত নামের দুই আদি বন্ধুর আড্ডার ঠেক ছিল এই চরাচর। একটু বড় বয়সে গরমকালের সন্ধেবেলা সেই মাঠ ছিল আমাদের গানমঞ্চ। ডেকচি তবলা আর বেসুরো আনন্দগায়নে না ফার্স্ট বেঞ্চ, লাস্ট বেঞ্চ সব গুলিয়ে যেতো একেবারে।
মাঠ থেকে ফিরেও জ্যোৎস্না ফুরোতো না। ফুরোবে কী করে! আমাদের তো উঠোনও ছিল। লোডশেডিং হলেই যেখানে সুন্দরী জ্যোৎস্নার হাসি বাঁধ ভেঙেছে কত কতবার। সাদা আর নীল মেশানো গাছ, বাড়ি, মাটি... জোনাকির মিউট উড়ান, ঝি-ঝি-র কোরাস... ঈশ্বরের বিনাপয়সার গিফট।
যা লুটে নে! যাকে বলে সার্থক জনম আমার জন্মেছি জ্যোৎস্নামুগ্ধ গ্রহে...।
বড় বাড়ি ছিল আমাদের। বড় বাড়ি মানে ছড়ানো উঠোন। লোডশেডিং হলে মন ভালো আর মন খারাপ একসঙ্গে ঝাপাত। ঘরে ফ্যান টিভি অফ হল মানে বাইরে জ্যোৎস্না অন। কিন্তু দিন বদলালো। এদিকে শেয়ারমার্কেটে জ্যোৎস্না, জোনাকিদের দাম কমল আর ওদিকে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার আর ভ্যালেন্টাইন ডের হাইফাই উপহারের দাম বাড়ল। একেবারে হু হু করে।
কারন্ট অফ হয় না আর। এতে করে পিসি, ল্যাপটপ অন থাকে। কাজ পণ্ড হয় না। জ্যোৎস্নাও এসে খোচায় না। হ্যালোজেনের আলোয় সব সাদা। ঝকঝকে পরিস্কার। কলাপাতাকে কলাপাতাই লাগে, ভূত মনে হয় না। সেই সূত্র ধরে বাংলা কবিতা থেকে, গান থেকে ছবি থেকে জ্যোৎস্না লোপাট হতে বসল। শুরু হল ভ্যাপারের আলোর মতো প্রেমিকার মুখ। কবিতায় কিলবিল করতে শুরু করল ওভার ব্রিজ, রেলিং, লিফট, হাই রাইজ, মেট্রো, টিভি, ফ্রিজ, ফ্রিজের ভিতর রাখা আইসক্রিমর গুষ্টি। আরও আরও অনেক অনেক সমসময়ের আসবাবরা। আর এই তো স্বাভাবিক। কবিতা তো জীবন মিলিয়েই বলবে তার জীবন। জীবন যদি ছোট হয় তবে কবিতাই কোথা থেকে পাবে বড়, মহত, মহান? মোদ্দা কথা আমরা এখন জাল গোটাচ্ছি মনে হয়। ভাবনার জাল, চিন্তার চেতনার জাল। মহান জ্যোৎস্না থেকে ভাগ্য বিরম্বনায় ও আত্মহত্যার আপন ইচ্ছেতে আমরা আজ সঙ্কীর্ণ টেবিল ল্যাম্প জীবনে থিতু হচ্ছি দাঁতকেলিয়ে। জ্যোৎস্নার ছড়িয়ে পড়া থেকে সরে যাচ্ছি আমরা। দ্রুত। কনকর্ড গতিতে।
সম্ভবত আমারা আর কোনওদিন চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে লিখতে পারব না, সম্ভবত আমরা আর কোনওদিন আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে লিখতে পারব না। আর কোনও দিন লিখতে পারব না---মহিনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার মাঠে।
কেননা হারিয়ে গেছে ওসব। কিংবা হেরে গেছি আমরা আমাদের লোভের কাছে, মুনাফার কাছে।
অতএব আজ জ্যোৎস্না হত ইতি উঠোন।