হারানো পালক

পঙ্কজ বিশ্বাস


এই সেদিনও মোমবাতির মত এক ভদ্র হিম আলোয় জেগে ছিল আমাদের ছেলেবেলা । পেন্ডুলামের মত চিলতে মগজে অহরহ দুলতে থাকতো পাঁচমিশেলি খেয়াল । ধুলো-ধানের ভুবনডাঙা পেরিয়ে বুকের মধ্যে ঠেসে নিতাম আকাশগঙ্গা উৎসব । দাদাই, কাকাই আর পাশের বাড়ির থুত্থুরে নবীনদাদুদের হাত ধরে শিখে নেওয়া ছিল ভাবি জীবনের গোল্লাছুট । সবটাই খেলার ছলে । ... “ যদি ভাঙে আমার খেতের বেড়া / কোলের পরে নিই তাহারে তুলে । ” – আবহমান বাংলার এই শৈশব হঠাৎই যেন তার পলেস্তারা খসিয়ে অন্য এক প্রতিজ্ঞা নিল । বিজ্ঞাপনে ভরা রং - বেরঙের ব্যানার টাঙিয়ে ঠাট - ঠমকে ঠায় বসে রইল । কিংবা দৌড়তে লাগল দিশাহীন অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতায় । ফসিল হয়ে যাওয়া সেই সব রূপ - রস - গন্ধ হয়ত এর পর ঠাঁই নেবে জাদুঘরে...

বাঁশবাগানের মাথার ওপর
বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ তখন বিছিয়ে দিচ্ছে তার দুধেল আঁচল । কানের ভিতর দিয়ে মরমে এসে ঠেকছে ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম গুলতানি । ওপারের হাঁটুভাঙা কচুরিপানার এবড়ো - খেবড়ো বিল থেকে বয়ে আসছে শাপলা - শালুকের সবুজ ঘ্রাণ । দেখতে দেখতে সুমুখের পরগণা যেন রূপকথার রাজকন্যে । ঠাম্মার দোক্তার গন্ধে ভরা শরীর থেকে নেমে আসছে কিনারাহীন রহস্য । তাঁর নাটুকে গলা থেকে নেমে আসা মেঠো বাংলা ভাষায় ভরে উঠছে আমাদের চৈতন্যের আগাপাশতলা । সেই সোনার কাঠি রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় কালপুরুষের চেহারা উঁকি দিত মনের উঠোনে । ‘তারপর’ ‘তারপর’ ‘তারপর’... একসময় মিইয়ে আসত আধো স্বরের মিনতি । আর সেই অমরাবতীর কোলে যে কাজল চোখে নিয়ে ঘুম - কন্যে চোখে এসে বসে, সে অবশ্যই নিশ্চিন্দিপুরের কেউ ।

কুমীর তোর জলকে নেমেছি
এক শরীর আলসেমি নিয়ে পরের দিন চোখ মেলা । ততক্ষণে সূর্য্যি মামা আদিগন্তে সবুজে সোনায় গালিচা পেতে দিয়েছেন । রোদের দিকে পিঠ করে মা আমাদের স্লেট - পেন্সিল হাতে বসিয়ে দিতেন পুবের বারান্দায় । ঠাণ্ডামধুর খেজুর রসের সাথে জামবাটি ভর্তি মচমচে লালচে মুড়ির ফলারে নিমেষেই পার হয়ে যেতাম ‘হাসিখুশি’র পানসি নৌকো । মাঝখানে মন্দ - মধুর গরুর গাড়ির পিছনে অল্পখানি ঝুলে আসা । এ বাড়ির চাল তো ও-বাড়ির ডাল আর তার বাড়ির তেল আর মাঠের আলু - শিম - শুটি, আমাদের রোজকারের এই বৈকালিক চড়ুইভাতি । ছিল এবাড়ি ওপাড়ার ঋতুফল পেড়ে ভাগ -বাটোয়ারার মত সম্মিলিত ব্যপার । কিংবা হুল্লোড় করে ফি - বছর বুড়িমার চুল পোড়ানো, নষ্টচন্দ্র রাতে জেগে থাকা, গাজনের সন্ন্যাসী বনে যাওয়া । কাদা - ধুলোর পোশাকই ছিল আমাদের শৈশবের খালাসীটোলার সাবেকি ফ্যাশন ।

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে
সাতসকালে শিউলি ফুল এসেই একদিন মোদ্দা সংবাদটি দিয়ে যেত । স্কুল শেষে বনবাদাড়ে হাসতে থাকা ধবল কাশের গুচ্ছের সাথে মাখামাখিতেই ছিল আমাদের
শৈশব - বাল্যের পুজোর ছুটির ভিত উদযাপন । মেঘের গায়ে মেঘ, সব কটা একেকটা আস্ত তুলোর বস্তা । চিকণ নদীর ওপারে উড়িয়ে দিতাম আমাদের ব্যক্তিগত ঘুড়িদের । ততদিনে রাঙামাসি, তমুক পিসেবাড়ি থেকে আসতে শুরু করেছে ‘মিঠুন চেক’ জামা, ব্লু কালারের বেঢপ জিন্সের মত হালফিলের পোশাক (সবই টলিউড নাহলে বলিউড ঘেঁষা অন্তত ) । প্যান্টের সাথে মাগনা প্লাস্টিকের বেল্ট নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতার অন্ত ছিল না । বছরভর এই অপেক্ষার প্রাপ্তিতে মনের ভেতর দুমদাম ঢাকের কাঠি বেজে যেত । ছকে নিতাম তিরিশ পৃষ্ঠা বাংলা তিরিশ পৃষ্ঠা ইংরেজি হাতের লেখা আর একশোটা অঙ্কের সময়সীমা । এরই মাঝে মুখ উঁচিয়ে তাঁবুর ফাঁক দিয়ে কশ্চিৎ দেখে আসা গোকুলে বাড়তে থাকা দুগ্‌গা ঠাকুর আর তার ছেলেপিলেদের । মহালয়ার পর এক ভোরে ঠোঙা মুখে এহাত - ওহাত ঝাঁ চকচকে অস্ত্র দেখে যত না অবাক অসুরের গজ্জন তেল দেওয়া বডি আর হারু ডাকাতের মত গোঁফ দেখে আমরা তো থ...। এ বিস্ময়ে কোনওবারই খামতি পড়ে নি !

চোখ বুজলে আজও বুকের ভেতর ভুরভুরিয়ে ওঠে তেপান্তরের ঘ্রাণ, সন্ধ্যাপ্রদীপের ধূপধুনো, কোজাগরীর আল্পনা । যেন ভোর বেলাকার স্বপ্ন, উঁচিয়েই আছে । তার ঘাসে ঘাসে পা ফেলে ঘোর আজও কাটল না । পুরোটাই গল্পদাদুর ঝুলি । নতুন শতাব্দীর জাতকদের আলো - বাতাস - মাটির এরকম কোনও গল্প তৈরি হওয়ার অবকাশ কই ! সবুজের কোল ছেড়ে তারা যেন উঠে গেছে ইট - পাথরের কোন দৈত্যপুরীতে । অঢেল পাওনা - গণ্ডায় হেলাফেলাই তাদের স্বভাবজ । গ্রহণ লাগা এই শৈশব থেকে ‘রহস্য’ শব্দটাই বেমালুম ভ্যানিশ । দক্ষিণারঞ্জন, উপেন্দ্রকিশোর, অবন ঠাকুরের বদলে আলোকবৃত্তের এক বেপথু ঠমকে তারা আঠার মত আটকে । বেমক্কা অস্তিত্ব নিয়ে ক্রমশ ঢুকে পড়ছে এক ঠাণ্ডা ভুলভুলাইয়ায়, যার শিকড়-সন্ধিতে পতন লেখা ।