সেইসব সোনার দিনগুলি হারায়ে গিয়াছে

তুষ্টি ভট্টাচার্য্য


ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল খটাস্‌ খটাস্‌ শব্দ শুনে । চোখ খুলে দেখি জানলার কাচ দিয়ে সবে অন্ধকার কেটে আলো ঢুকছে । কাকেদের ডাকাডাকি এখনও শুরু হয় নি । ওহ্ ! দাদু উঠে পড়েছে সেই সাতসকালে , তিনতলার ঠাকুরঘরে যাচ্ছে খড়ম পরে । ওপাশ ফিরে শুতে গিয়ে চমকে ধড়মড় করে উঠে পড়লাম । বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা লাফালাফি শুরু করল । গলা শুকিয়ে কাঠ একেবারে ! আবার কান পেতে রইলাম কিছুক্ষণ – নাঃ কোনো খড়মের শব্দ শুনতে পাচ্ছি না তো এখন । আর কি করেই বা শুনবো ! দাদু মারা গেছেন একমাস হয়ে গেল যে !
উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে । জল খেয়ে ঠাকুরঘর পেরিয়ে ছাদে গিয়ে পায়চারী করতে করতে এই পুরনো বাড়িটার মতই বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম । ‘দাদু’ মানে আমার শ্বশুরমশাইয়ের বাবা । সিদ্ধেশ্বর শাস্ত্রী মহাশয় । আমি যবে থেকে দেখছি , যেন তারও বহুযুগ আগে থেকে কিম্বা যুগযুগান্তর ধরে তিনি বোধহয় বৃদ্ধই ছিলেন ! নুয়ে পড়া কোমর নিয়ে তরতর করে এগিয়ে যাওয়া এখনকার এই মানুষটি সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত ও পেশায় রাজপুরোহিত ছিলেন । এখানকার নিস্তারিণী কালীবাড়ির প্রধান পুরোহিতও বটে । খুব ভোরে উঠে বাড়ির ঠাকুরঘরে গিয়ে পুজোপাঠ সেরে তাঁর পুঁথি খুলে বসতেন রোজ নিয়ম করে । ঠাকুরঘরে যাওয়ার সময়ে তাঁর খড়মের শব্দে সকলের ঘুম ভাঙত । ওনার ঘরটাই আমার কাছে যাদুঘরের মত মনে হত । খুব একটা যেতাম না ও ঘরে , শুধু আড়াল থেকে দেখতাম ঘরের যাবতীয় গৃহস্থালী ! কখনও এদিক থেকে , কখনও ওদিক থেকে ।
ঘরটার কাছে গেলেই একটা সোঁদা সোঁদা পুরনো পুরনো গন্ধ আসত । এ বাড়িতে ওপরে ওঠার দুটো সিঁড়ি আছে । একটা সিঁড়ি বাড়ির ভেতর দিয়ে ওঠা পুরনো দিনের তৈরী , উঁচু ধাপওলা , খুব চাপা সরু , তিন বাঁকের । আর একটা বাড়ির সামনে দিয়ে ওঠা এখনকার নিয়মের সিঁড়ি । ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলে লক্ষ্য পড়ে ঘরের ভেতরে দুটো কালো পালিশ করা মেহগিনি কাঠের ঢাউস আলমারীর , যার একটার পাল্লায় বেলজিয়াম গ্লাসের আয়না লাগানো । সামনের সিঁড়ি দিয়ে উঠলে দেখা যায় , টানা বারান্দায় লম্বা পেন্ডুলামওলা একটা ঢাউশ গ্র্যান্ডফাদার ক্লক আর ঘরের মধ্যে একটা টেবিলক্লক , যেটা কিনা পিয়ানোর সুর তুলে দুলে দুলে সময়মত বাজে । দেওয়ালের ওপর দিকে বাঙ্কে লাল শালু মোড়া পুঁটুলিতে ঠাসা । সেরকমই দুএকটি পুঁটলি মাটিতে নামানো আর এক ছত্রী দেওয়া পালঙ্কের প্রায় অর্ধেকটা নানারকম বই আর পুঁথিতে ভর্তি । সেই শালু মোড়ানো পুঁটলির মধ্যে শুধু পুঁথি আর পুঁথি । ওই খাটে বই আর পুঁথির মাঝে একজন হাড়সর্বস্ব বৃদ্ধ আতস কাচ দিয়ে কিছু না কিছু পড়ে চলেছেন । সংস্কৃত কলেজে এখনও ওঁর লেখা বই পড়ানো হয় বলে শুনেছি । ‘গুরুদেব’এর কাছে সকাল থেকেই শিষ্য সমাগম হয় , প্রণাম ও প্রণামী নেওয়ার মধ্যেই তাঁর পড়া চলতে থাকে । কালীবাড়ির পুজো সেরে প্রায়দিনই কোনো না কোনো নামীদামী শিষ্যের ডাকে তাঁকে ছুটতে হয় । মোটামুটিভাবে এ হল তাঁর রোজনামচা ।
শোনা যায় , যখন উনি যুবক ছিলেন , এ বাড়িতে ওঁর নিজের ও খুড়তুতো , জ্যাঠতুতো ভাই-বোন ও তাদের সংসার মিলে এক বিরাট একান্নবর্তী সংসার ছিল । মোটামুটিভাবে ৭০-৮০ জনের পাত পড়ত রোজ আর বাইরের অভ্যাগত মিলে প্রায় একশোর কাছাকাছি হয়ে যেত সংখ্যাটা ! ঠাকুর , চাকর নিয়ে বিশাল রসুইঘরে সকাল থেকে এক বিরাট আয়োজন চলত । বাড়ির বড়বৌ-এর দায়িত্ব থাকত মেনু ঠিক করা ও বাজার সরকারের থেকে হিসেব নেওয়া । এবাড়ির বম্মা সেকাজ হাসতে হাসতে , ঘামতে ঘামতে সেরে ফেলতেন দিব্বি । এছাড়াও কোন্‌ ঝিয়ের বাচ্চা হবে বলে তাকে একটু বেশি খেতে দিতে হবে , কি কারুর হাত পুড়েছে বলে তার কদিন বাসনমাজা বন্ধ থাকবে , কাকে ডাক্তারের কাছে পাঠাতে হবে , এসবের দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন । অন্য বৌরা কুটনো-বাটনায় বসে যেত , তাদের মুখও চলত আর হাতও । যাদের কচি বাচ্চা , তাদের মাই দেওয়ার জন্য একটু ছাড় দেওয়া হত নিয়ম করে । এবাড়ির একটু বড় হয়েছে এমন বাচ্চাদের রোজ বিকেলে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বে থাকত ‘ভগবান’ । ভগবানের মাথায় ইয়া পাগড়ি , পাকানো গোঁফ , হাতে লাঠি , ফাঁক পেলেই একটু খৈনী ডলে নিত সে । কিভাবে সেই মুঙ্গের থেকে এবাড়িতে সে কবে এসেছিল , সে নিজেই জানে না । এবাড়ির সিংহদরজা পাহাড়ার দায়িত্বে থাকত সে । আর কচিকাচাদের নিপুণভাবে সামলাতো , ওদের কাছেও ভগবান যেন সত্যিকারের ঈশ্বরের রূপে ধরা দিত । জ্ঞান হওয়া থেকে এখানে থাকলেও তার বাংলায় যথেষ্ট হিন্দি টান রয়ে গেছিল । সেটা কি তার ইচ্ছাকৃত , নাকি তার মাতৃভাষার কাছে ঋণ স্বীকার অথবা নিজের শেকড় ধরে রাখার চেষ্টা , কেউ কখনো জানতে চায় নি । ভগবানের দু-তিনজন সাকরেদও ছিল । এদের হেফাজতে গোটা দুয়েক দোনলা বন্দুকও থাকত ।
একবার বাড়িতে ডাকাত পড়ল । তেল চুকচুকে ইয়া চেহারার মালকোচা মারা ধুতি পরা মুখে কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা এক দল ডাকাত মুখে আআআআআআ করে বিচিত্র শব্দ করে বাড়ির দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল । মেয়ে-বৌদের গা থেকে সোনাগয়না কেড়ে নিল , ওবাড়িতে তখন কাঁসার বাসন ঢুকত না , যত রূপোর বাসনকোসন ছিল বস্তায় ভরতে লাগল । ওরা বোধহয় এবাড়ির বন্দুকের খবর রাখত না । ততক্ষণে কেউ একজন গুলি ছঁড়েছে । গুলির শব্দে ডাকাতদল সব জিনিস নিয়ে পাশের পুকুরে ডুব দিল । পুকুরের জল তাক করে গুলি চলতে লাগল । কিন্তু এ কি কান্ড ! কার্তুজগুলো ঠংঠং করে জলের ওপর থেকে ফিরে আসছে যে ! পরে বোঝা গেছিল ওরা মাথায় হেলমেটের মত করে হাঁড়ি পরে নিয়েছে !
বেলা এগারোটা সাড়ে-এগারোটা বাজলে দাদু নেয়ে-খেয়ে রেডি থাকত । তাঁর প্রিন্স কোটের পকেট থেকে সোনার চেন ঝোলানো পকেট ঘড়িটা একটু পরে পরেই দেখতেন দেরী হয়ে গেলেই । যেই গাড়ির হর্ন শোনা যেত নীচে থেকে , তাঁর মোকাসিনো জুতোর মশমশ আওয়াজ তুলে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যেতেন উত্তরপাড়ার রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে । ওখানে ওঁকে ভগবানের মতই ভক্তি-শ্রদ্ধা করা হত । ওই রাজবাড়ির এক সহিসের কাছ থেকে ঘোড়ায় চড়া শিখে নিয়েছিলেন আর উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন একটি টাট্টু । এই টাট্টুতে চড়ে তিনি মাঝেমাঝে বৈকালিক ভ্রমণে বেরোতেন । টাট্টু দেখাশোনার জন্য ওঁর বাড়িতে একজন সহিস মোতায়েন করা হয়েছিল ।
দাদুর ছোট ভাইকে সবাই ফুলদাদু বলে ডাকত । এই ডাকের পিছনে রয়েছে তাঁর ফুল-বাবু টাইপের সাজগোজ । সবসময় গিলে করা পাঞ্জাবী আর হাতে কোঁচা ধরা ইঞ্চিপার ধুতি , মাথায় টেরি কাটা , গায়ে বিলিতি ফ্রাগরেন্স , পায়ে বাঁকানো চকচকে জুতো । বিলিতি ছবির ভক্ত হলেও কিকরে যেন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যান ! তাঁর একটি ল্যান্ডমাস্টার গাড়ি ছিল , সুচিত্রা সেনের বাড়ি গেলে সেই গাড়িতে চেপেই যেতেন । শোনা যায় , সে গাড়ি স্টার্ট নিতে এক গ্যালন পেট্রল খরচ হত । ‘বাবু’ কালচারের শেষ নিদর্শন হিসেবে তিনিও অকালে মারা যান ।
দাদু ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকের সমঝদার ছিলেন । প্রায়দিনই নিজে অরগ্যান বাজিয়ে গান গাইতেন । এছাড়া মাসে একবার এবাড়িতে সঙ্গীতানুষ্ঠান হত । অনুষ্ঠানের দুদিন আগে থেকে সবচেয়ে বড় ঝাড়বাতিটা নিয়ে ঘষামাজা শুরু হত । চাঁদোয়া খাটিয়ে তাকিয়া সহযোগে মেঝেতে গালিচা পেতে এই অনুষ্ঠান হত । আসতেন অনেক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতানুরাগী ও গায়ক । সবার জন্য রূপোর গড়গড়ায় পরিবেশিত হত অম্বুরি তামাক । দাদু নিজের ভাই ও বন্ধুদের নিয়ে একটা কয়্যার তৈরি করেছিল । এক ভাই খুব ভালো চেলো বাজাতে পারত , সে কন্ডাক্ট করত দলকে । এছাড়া ছিল ভায়োলিন নিয়ে কয়েকজন । দাদুর গান তো থাকতই । সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল , যে এই আসরে ঢোকার মুখেই সেই বিশাল গ্র্যান্ড মাস্টার ক্লক দাঁড়িয়ে থাকত ! বোধহয় সকলকে সময়ের হুঁশ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য । আর স্বাগত জানানোর জন্য দুদিকে দুটি ব্রোঞ্জের চকচকে হাতি , যাদের দাঁতগুলো আসল আইভরির ।
শোনা যায় রাজনীতির ওপর মহলেও দাদুর নিত্য ওঠাবসা ছিল । এই বাড়িতেই নিস্তারিণী চতুষ্পাঠী নামে একটি টোল গড়ে উঠেছিল , যা ছিল হুগলী জেলার একমাত্র টোল । সরকারী বদান্যতাও পেতেন দাদু এই জন্য । সংস্কৃত কলেজের বই বাবদ রয়্যালটিও পেতেন । তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের দেশের বাড়ি ছিল আরামবাগে । সেখানে যাওয়ার সময়ে মাসান্তে তিনি এ বাড়িতে এসে জলযোগ সহকারে দাদুর সাথে আড্ডা দিয়ে যেতেন ।
দাদু মারা গেছেন এক মাস হয়ে গেল । মারা যাওয়ার অনেক অনেক বছর আগেই দাদুর সোনার দিনগুলো শেষ হয়ে গেছে । এখনও এই বাড়িতে সেই যুগের অর্গ্যানটির খাঁচা পড়ে আছে । আর রয়ে গেছে Seth Thomas কোম্পানির দুটি ঘড়ি । একটি চাবি দেওয়া গোল দেওয়াল ঘড়ি এখনও নির্ভুল সময় দিয়ে যাচ্ছে । আর সেই টেবিল ঘড়ি বছর কয়েক আগেও যে কিনা পিয়ানোর মত মিষ্টি সুরে ডেকে ডেকে সময় জানাতো , এখন সেও স্তব্ধ । এই তো কয়েকমাস আগেও এই ঘড়ি যখন জানান দিত সকাল ন’টা বাজে , কানে ভেসে আসত - “বৌমাআআ” ডাক । বৌমাও পড়িমরি করে একটি কাঁসার জামবাটি ভরা ঘন লালচে সর পরা দুধের মধ্যে দুটো ঘিয়ে ভাজা পরোটা ডুবিয়ে দাদুর সামনে হাজির হত । সেই দুধে কখনও থাকত কড়া পাকের সন্দেশ অথবা গোটা কয়েক জিলিপি ডোবানো ! মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এইটুকু লাক্সারি তিনি বহন করতে পেরেছিলেন এবং সহ্যও ।
একটি সূক্ষ কারুকাজের হাতির শুঁড়ের ডিজাইনের ছোটো টুল আর কয়েকটি শ্বেতপাথরের টেবিল , দু একটি ভাঙ্গাচোরা আলমারী এখানে সেখানে পড়ে আছে । সেই ঝাড়বাতিও নেই , সেই রূপোর বাসনের পাহাড়ও নেই , নেই সেই ব্রোঞ্জের হাতি , নেই সেই দিস্তে দিস্তে পুঁথি । এভাবেই সব পুরনো সোনার দিন শেষ হয়ে যায় বুঝি ! পিছনে রেখে যায় গল্পকথার মত কিছু স্মৃতি , যাকে ঝাড়াইবাছাই করতেও আর কেউ এগিয়ে আসে না । সামনের দিকে তাকিয়ে দিন চলে দিনের মত ।আজ দাদু নেই বলে বাড়িটা যেন বড় বেশি বিষণ্ণ , বড় বেশি অসহায় তার স্মৃতির ভারে । এ বাড়ির সদস্যরা যে যার সীমারেখা টেনে নিয়ে , নিজেদের বৃত্তেই ঘোরাফেরা করে । অতীত খুব স্বাভাবিকভাবেই আর ছাপ ফেলে না তাদের কাজে । এই বাড়িকেও ভেঙেচুড়ে যে যার আস্তানা নিজের মত করে বানিয়ে নিয়েছে । তবু কিছু পুরনো ইট জানে , কিছু কড়িবর্গা জানে , কিছু খড়খড়ি দেওয়া জানলা জানে ইতিহাস । তারাও যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েই আছে । আমার এখনও যেন মনে হয় , ওরা ঠিক দাদুর মতই বিড়বিড় করে পড়ে চলেছে সেই সব তালপাতার পুঁথি । আতস কাচ দিয়েও যার অক্ষর আজকাল আর দেখা যাচ্ছে না ।