আড্ডা পাঁচা৯

মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায়



মা এখন আর গল্প বলে না। আমার আর মায়ের আড্ডাগুলো ঘুমপাড়ানোর সাথে সাথেই হারিয়ে গেছে। অথচ ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে। তখন কলেজস্ট্রীট। জানি না আজকের বইপাড়ার সাথে তার গড়মিল। মা ছোট। একান্নবর্তী পরিবার। দিম্মা, মায়ের কাকিমা, জ্যাঠিমা। একসাথে রান্না একসাথে খাওয়া। আধো ঘুম ঘুম আমি দেখতাম দিম্মা, সোনা মা, কাকিমা – আমার তিন দিদা। রেডিও খর খর আওয়াজের সাথে তাদের ভাঙ্গা ভাঙ্গা গল্প। তখন উলটোরথ সিনেমা জগত জলসা। উত্তম। সাদা কালো কাঁপতে থাকে ছবিটা। কোন সিনেমা কবে আসছে দল বেঁধে যাওয়া – কথায় কথায়। টিভির ভলিউমটা আসতে হয়ে আসে। ছাদে উঠলে পাশের বাড়ির মিনতি কাকিমা। তার তিন মেয়ে, মায়ের বন্ধু। কাপড় তুলতে সন্ধ্যে-বিকেল তখন তাদের ছোট্ট আড্ডা ছাদের পাঁচিলে ভর দিয়ে। মাঝে এক সরুগলি। ওপরে তাকিয়ে থাকে। দিম্মাদের আড্ডাটা বাড়ির বাইরে বেরতো না। বড়জোড় ঐ ছাদটুকু। আড্ডার পরিসরও ছিল বাঁধা। সংসারের দু চার কথা। বড়জোড় বিনোদনের সিনেমা। খুব কম এবাড়ির মহিলা ও বাড়ি যেতেন। দাদুদের আড্ডাটা অফিসে সামান্য ছিল। কাজের ফাঁকে দু চার কথা। আর বাড়িতে রাতে খাওয়ার সময় ভাইয়েদের মধ্যে। হতে পারে দেশ ছেড়ে আসা মানুষগুলো এ দেশটাকে তখনও রপ্ত করতে পারেন নি। তাই একটু গুটিয়ে থাকতেন। এই ঘরের ভেতরের আড্ডাটা চলে যায় বেহালায় এসে। সংসার অনুযায়ী বাড়ি ভাগ হয়। বাড়ির মাঝে দেয়াল বসে। আর কাকা কেনে পাশের বাড়িটা। তখন সেই ছাদের আড্ডা যেটুকু পেত। মায়ের কাকিমা তখন পাশের বাড়ির কাকিমা।

বাবা বড় হয়েছে রবীন্দ্রপল্লী। খড়দা। গোবিন্দদার বাড়ির সামনে ইট বাঁধানো। বারান্দাই। বিকেল বেলা। পাড়ার মা কাকিমারা আসতেন। খড়দা শহরতলি। এর ঘর পৌঁছে যেত আর এক ঘরে। আর এক ঘরের কথা শুনতো বারান্দাটা। কার মে’র বিয়ের দেখা, কার ছেলে চাকরি পেল, কার বর শহর যাবে। জামাইয়ের উঁচু ঘর আর বৌয়ের মুখোরা স্বভাব। পাড়াটাই এক সংসার। বাবা জেঠু বয়স মেনে যে যার দলের আড্ডা। বড় মাঠ এক কোণে গোল। জেঠু নাকে নস্যি টিপে। রাজনীতি কোন দিকে যায়। কোন দল, ফুটবল টিম। আর কেউ দোষ করলে ডেকে এনে কড়া শাসন, আড্ডার মধ্যেই।

মায়ের বড় বেলা বেহালা। বেহালার নীচের ঘর ভাড়া দেওয়া। সে ঘরে যে কাকু থাকে তার বন্ধুরা আসে মাঝে মাঝে। তখন সি পি এম। মা যেটুকু বুঝতে পারে। রাজনীতি কড়া হতে থাকে। মতভেদ। আসতে আসতে আড্ডার কথা বদলাতে থাকে। উঠে আসে আর একটা নাম – নকশাল। আড্ডা নাম নেয় মিটিং। মায়েদের বাড়ির একতলা। ঘন ঘন সিগারেটের ঘন ধোঁয়া। পুলিশ আসা শুরু হয়। আড্ডার ভাষা হয় ফিসফাস। প্ল্যানিং। মায়ের বাবা কাকা জ্যাঠা দের ঘন ঘন বৈঠক। থানা থেকে ডাক এলো পুলিশ এলো - গুলি চলল। পাড়া অন্ধকার। দাদুদের কথা বার্তা। মেয়েদের স্কুল পাঠানো হবে কাল থেকে? নীচের ঘর নকশাল ভাড়াটিয়া। উঠে যেতে বলবে? আড্ডার হালকা হাওয়াটা হঠাৎ গরম হয়ে যায়। দিম্মাদের মাঝে তখন একই বাড়ির মধ্যে ভাগ। সোনা মার জানলায় হাত, হাত রাখে দিম্মা। নীচের তলার ভাড়াটিয়া বৌয়ের পাঁচ ছেলে। দাঁড় করিয়ে পুলিশ গুলি মারে চোখে। পরের দিন লাশ আসে। কাঁপা হাত সোনা মার, শক্ত করে ধরে আছে দিম্মা। টিভিটা ঝির ঝির করতে থাকে।

বাবা বড় হলে আড্ডা দিত শান্তি কাকুর বাড়িতে। ক্যারাম বোর্ড তাস। ইস্টবেঙ্গল – মোহনবাগান। খেলার মাঠের আড্ডা। সূর্যসেনের বিশাল মাঠে কে কটা গোল। কারটা ভুল পাস। খেলা পেরিয়ে এই দু চার কথা লেগে থাকত। রেডিও রিলে। একটা রেডিও ঘিরে সবাই। ক্রিকেট তখন টেস্ট। রামাকান্ত দেশাই ফাস্ট বোলার। স্পিনার বাবু নাথ কারনি। আড্ডা ঘিরে থাকত। “নাথ কারনির বল কেউ মারতে পারত না তিরিশ ওভার বল তো তিরিশ ওভার মেডেন।” বাবার মুখে ফিরে আসে আড্ডার কথা। “আড্ডায় শুধু খেলাধূলো? রাজনীতি প্রেম ছিল না” বাবাকে জিজ্ঞেস করি। “প্রেম শরৎ চন্দ্রের সময়ও ছিল আমাদের সময়ও ছিল। তবে এখনকার মতো ছিল না।” “না মানে পাড়ার সুন্দরী মেয়েটির কথা কেউ বলত না? প্রেমে পড়া বন্ধুর পেছনে কেউ লাগত না?” বাবা গলা ঝেড়ে বুঝিয়ে দেয় আড্ডাটা সেন্সর পাশ করবে না। শুধু একপাড়ায় আড্ডা হত তা নয়। পাশের পাড়া থেকেও আসত ছেলেরা। মাঠে গোল হয়ে বসে। সূর্যসেনের বড় মাঠ। আশে পাশে আর ছিল না। আশে পাশের পাড়ার ছেলেরা আসত খেলতে। খেলার আগে পরে আড্ডা হত। তারপর যে যার পাড়ায় ফিরে যেত।

বাবা প্রথমে শহরে গিয়ে, ছিল একটা মেসে। পাশাপাশি ঘর ভাড়া। একঘরে দু তিন খাট। বেচেলার ছেলেরা। কেউ অফিস কেউ কলেজ। কেউ বা বিবাহিত। সপ্তাহে বাড়ি যায়। সন্ধ্যে করে সবাই ঘরে ফিরে চা চিৎকার। নন্দ দা। এক থালা চা নিয়ে উঠে আসত সিঁড়ি বেয়ে। এক ঘরে সবার জমায়েত। বাবা তখন সদ্য শহুরে হাওয়া। আড্ডা হাওয়া কিছুটা শহরের। সিনেমার নতুন নায়িকা। কেউ উত্তমের মতো করে সিগারেট ধরানো। কারো ভালো লাগা কলেজের যুবতির চিঠি ভাঁজ। অল্প অল্প লেনিন মার্ক্স। আড্ডায় হই হই সবই আসে সবই যায়। তবে হ্যাঁ ঐ মেসে কোন সুচিত্রাসেন এসে ওঠে নি।

নকশাল। বাবা তখন খড়গপুর। চাকরি পেয়ে গেছে তখন। খবর যায় মাঝে মাঝে, পাড়া ভাগ হচ্ছে। বোম পড়ছে। এ পাড়া ও পাড়া যাওয়া আসা নেই। গুলি চলছে মরে যাচ্ছে। এ পাড়া ও পাড়া বন্দুকের নল। পাড়ার মধ্যে বন্দুকের নল। আড্ডার চেহারাটা বদলে যায়। কথা গুলো গুলির শব্দ হয়ে যায়। আগে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ছিল এখন শ্রেণীশত্রু। রেডিওটা তখন কলকাতার গুলির শব্দ নিয়ে আসে। পাড়ার বয়স্ক মানুষগুলো চুপ করে যায়। পাড়া অন্ধকার। গোবিন্দের বারান্দায় বোমার শব্দ। শান্তিকাকুদের ঘরে আলো জ্বলে না। আড্ডাটা চুপচাপ মাঠের এক কোণ থেকে দেখতে থাকে গোটা পাড়াটাকে-বোবা।

দেখা

তখন সকাল স্কুল। দুপুরে ঘুম পাড়াতো মা। শীত শীত। সবে। কুলের আচার রোদ। আর উঠোন কাম্মার। জেম্মা, মাসি, পিসি। উলের কাঁটার খুট্‌। সূচের ভেতর সু্তো। একটা নকসীকাঁথার গল্প শুরু হচ্ছে। মা তখন রোদ পোহাচ্ছে। গল্পও। ঘুম ঘুম চোখ লেগে আমি শুনতে পাই কথা। উঁচু ঘাস বন পেরিয়ে আসে। মাঠের ধারের বুড়ির কথা। কাম্মার গলায়। আর ধূ ধূ মাঠে কাঠ বুড়ি। জানে না কোথার থেকে আসে। ছোট খড়ের ছাউনি। বেড়ার ঘর। সারাদিন কাঠ কোড়ায়। আর চাল ডাল ঝোলার ভেতর। কোথা থেকে আসে তো জানি না। মাঠের দূর দেখা যায়। আশে পাশে কেউ নেই। গল্প হয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসেছে পাড়ার মা মাসি পিসি কাম্মা কেম্মা। আর মাঝে মাঝে সেই সাদা কাপড়ের পা ঝোলানো বেল গাছ থেকে। পিনুদির মা বলে। পিনুদি কোলে। হেঁটে ফিরছে হেঁটে ফিরছে। মাঠের মধ্যে সরু পথ। মাথা তুলে দেখে বেল গাছে সাদা কাপড় সরু পা লিক লিক করছে। পা ঝুলিয়ে। “রাত্রে মা গো পিনুর ধুম জ্বর। তারপর জলপোড়া। ঝাড়ালাম।” তখন সেই মণ্ডলের বাড়ির পাশে কে যেন এক ঝাড় ফুঁক করে। মা শোনে হা করে। বি এস সি পাশ মা। কলকাতার কলেজে পড়া। মা শোনে হা করে। আর আমার ঘুম পাড়ানি গল্পগুলোয় আসে এক ডাইনি বুড়ি ক্ষিণ ক্ষিণে গলা। জলার ধারে পেতনি। শুকতারার লেখক কি জানে কখন ছেলের ঘুম আসে। মায়েরাও সাহিত্যিক হন। শুধু ছেলেকে ঘুম পাড়াবে বলে। ওটাই সাহিত্যসম্মান। কাম্মাদের গোল উঠনে এক ফেরিওয়ালা আসে মাঝে মাঝে। তার কাঁচের বাক্স। গোল হয়ে উঁকি মারে পাড়ার মায়েরা। হরেক মাল ছ’টাকা। দূর থেকে তার ডাক এলেই মনে হত পাড়ায় আত্মীয় আসছে। যেমন বাড়িতে মামা এলে মা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাড়ার সব মায়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত। নতুন কি হরেকমাল এলো। মাঝে মাঝে আসত এক সাঁপুড়ে। তখন সবাই একটাকা করে দিলেই ভিড় করতে পারে। সাপের ফোঁস করে ওঠা আর মাথা নাড়ানো। মানুষগুলো কত কাছের সবার। আমার একটু ভয় ভয়। আমি মায়ের পেছনে উঁকি দিতাম। বা কাম্মার। বা জেম্মার। কাম্মার সেই গোল উঠোনটা এখন আর নেই। তাতে জঙ্গল হল প্রথমে। তারপর তো বাড়ির নতুন ঘর।

আর ছিল রবিবারের সিনেমা ডি ডি বাংলা। মায়ের পেছন পেছন আমি যেতাম অনিতা দি দের বাড়ি। টুকাই আসত ওর মায়ের সাথে। কাম্মা জেম্মা পাড়ার আরো সবাই পাঁচটা না চারটের ঠিক আগে। তখন সাদা কালো টিভি। টিভির সামনে একটা নীল কাঁচ। কি সিনেমা কি সিনেমা সেদিন দেবে কেউ জানে না। এটাই একটা আগ্রহ। নাম দেখাতো যেই টি ভি তে অমনি সবার কলরব ছিল। উত্তম হলে কথাই নেই। তখন প্রসেনজিত বাচ্চা। আর সিনেমায় একসাথে হাসা। একসাথে চোখে জল। তখন তো সবার বাড়ি টিভি নেই। পরে এক এক করে আসতে থাকলো। ভাঙলো পাড়ার একান্নবর্তী। কাম্মার বাড়িতে নতুন রান্না হলে আমার বাড়িতে আসত আগে। আমি ছুটে নিয়ে আসতাম বাটি করে। সেই বাটি ফেরত যেত মায়ের তৈরী খেজুর চাটনি। জেম্মার সেই শাক ভাজাটাও একবারেই অন্যরকম। আচার হত কুলের। বা আলুকাবলি সবাই মিলে মাখতে বসত উঠোন নিয়ে। জানি না ঠিক কবের মধ্যে সংসারটা ছোট্ট হল। এখন সবার ঘরেই টিভি। সবাই দেখে রোজ সিরিয়াল। আমার বাড়িও কাম্মারা নেই। আমার মা-ও শেষ যে কবে গিয়েছিল অনিতাদি দের সাদা কালোর উত্তম বা প্রসেনজিতও। তারপর তো রঙ্গিন টি ভি। সামনে শুধু আমার মা। আমারও আর মনে পড়ে না কাম্মার সব রান্নাগুলো- কুলের আচার- জেম্মার শাক। যে বাটিটা বাড়ি ঘুরতো সেটাও একটা কোণায় পড়ে। ঝুল ভেতরে। মাকড়সাও।

বাবাদের ছিল চক্রবর্তী কাকুর বাড়ি। খেলা হলে। না হলেও। পাড়ার সব কাকু জেঠু। আমিও যেতাম মাঝে মাঝে। তাদের গল্প বুঝতাম না। বুঝতাম ঐ একটু আধটু মাঝে মাঝে খেলার কিছু বিষয় নিয়ে গল্প উঠলে। ঘর পেড়িয়ে বারান্দাতে অদৃশ্য এক ব্যাট তুলতেই ভেতরে শচিন ছয় মারল। বাবারা সব কি টেনশান। জিতবে ভারত ? থমথমে মুখ। সব কাকুরই। একটা ভারত চক্রবর্তী কাকুর ঘরে। একটা ভারত টুকাই দের বাড়ি। সেটা দাদাদের। তারা ছয় মারলেই চিৎকার চাই। আউট হলেই সব চুপচাপ। যখন অনেক উঁচুতে বল উঠত। ছয় হবে না ক্যাচ হবে ঠিক। আমরাও দাঁড়িয়ে উঠি। সবাই। দাদা আমি ঘরেই এখন। বা কখনো দেখা হয় না। টুকাই আমার পাশের বাড়িই আমাদেরও কোন দেখা নেই।

ক্লাবটা তখন বেড়ার ছিল সবাই মিলে চাঁদা তুলে। কেউ দশ দিক। কেউ পঞ্চাশ। সবাই একটা ক্যারাম বোর্ডই। সবাই একটা ব্যাট কিনতে। সেও সবার চাঁদায় কেনা। পরে তো সবার বাবার মায়না বাড়িয়ে দিতে যে যার ব্যাটে। আমার ব্যাটে বুবাই কেন? আমিই বা কেন ওরটা নেব? ও- ও দেয়না। স্ট্রোক যাবে ওর অন্য খেললে। আমি বুবাই টুকাই মিঠুন এখন সবাই অন্য অন্য। ক্লাব ঘরে টাকা দেয় সরকার। ক্লাব ঘরে থাকে পতাকা রাখা। ক্লাবঘর বলে কি কথা বলব। কি কথা বলবে দাদা বা বাবা। ওদের কথা বোঝার মতন বয়স আমার। তবুও দেখি, ঘরের মধ্যে যে কথা বলে, ক্লাবে আলাদা। বা কেউ চুপ। কেউ আসে না। বন্ধ করেছে। অন্য পার্টি। টুকাই দেখি ভোটের দিনে, বেঞ্চে বসে। কতদিন পর দেখা হচ্ছে। কি খবর তোর কেউ বলে না। ইশারায় বলে আসল জায়গা ভোটটা যেন ভুল না পড়ে। আমিও হাসি মনে মনে রাজনীতিটা আমিও বুঝি। আমাদের দেখি ক্লাব ঘরটা পাকা হয়েছে পতাকা নিয়ে। আমাদের দুটো বন্ধুত্ব মুখমুখি হেসে একটাই রঙ। ভেতরে আমরা আলাদা পার্টি। বন্ধুত্ব জানতে পারে না।