সেই সব তেঁনারা

অনরন্য


এক
নীল মেঘের থেকেও অপরূপ,গ্রীস্মের দুপুরের সরবৎ - এর থেকে তৃপ্তিদায়ক ছিলো সে সকাল।
তখন সকাল। সেই সকালে অনেক ধূলোমাখা মিষ্টি আলো ছিলো।বেলা গড়াতে গড়াতে যা ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর।কুয়াশা মাখা সেই সব সকালের এক নিজস্ব ভূগোল ছিলো,যা আমাদের শরীরে লেগে থাকতো আলতো ইতিহাসের ব্যঞ্জনা নিয়ে।বাবা অফিস যেতো রোজ,আমি আর দিদি ইস্কুল। সেদিন কেন যেন ওরা কেউ কোথাও গেলো না। সবার খুব ব্যস্ততা। কেন কে জানে? আমি যে একটা মানুষ বাড়ীতে বাস করি সে কথা যেন কারো মনেই নেই। একটু পর যখন সকাল ১০টা হবে,আমি তো তখনো গড়ি দেখতে শিখিনি, বারান্দার দরজায় তালা দিয়ে সকলে চলে গেলো। যাওয়ার আগে আমাকে একটা দুধ আর মুড়ি দিয়ে চলে গেলো। সবার মুখ এত থমথমে যে আমি আর কিছু জিজ্ঞেস ও করিনি,সেই প্রথম বার বাড়ীতে একা থাকা,যদিও সকাল,তবু তো একাই থাকা। ভয় লাগছে খুব।মা অবশ্য যাওয়ার আগে বলে গেছে – ‘তুমি তো আমার সাহসী ছেলে,দেখি তো কত বড় হয়েছো,একা থাকতে পারো কি’না দেখি বাড়ীতে’। প্রথমটা তো খুব খুশীই হয়েছি।এত স্বাধীনতা...কিন্তু একটু পর থেকেই কেমন জানি ভয় লাগছে। দোতলা পুরোনো বাড়ী আমাদের। কার যেন একটা পায়ের শব্দ শুনলাম। ভাবলাম মা বোধহয়। চীৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম – মা – আ – আ - আ ? কোনো উত্তর নেই।আবার জিজ্ঞেস করলাম।আবার ও তাই।তাহলে আসেনি।তাহলে কে? মন দিয়ে খেলতে শুরু করলাম। এদিকে আমার যে খুব লজেন্স তেষ্টা পেয়েছে ,অবশ্য মা থাকলেই কেবল পড়তে বলে।আজ তো খেলবো অনেক।কিন্তু একা খেলতে ভালো লাগে নাকি ! দেওয়ালটাকে বন্ধু ভেবে বল ছুঁড়তে লাগি,দেওয়ালটাও বন্ধু -র মত বল ছুঁড়ে দেয়। খেলা চলছে। আবার আওয়াজ কার যেন পায়ের। এবার আর ডেকে জিজ্ঞেস করলাম না।বন্ধ দরজার গায়ের ফুটোটায় চোখ রেখে বসে থাকলাম,কই কেউ তো নেই।যেই না আবার খেলায় ফিরছি,আবার...এবার কিন্তু ভয় লাগছে বেশ।কি করি? শীত করছে। ভয়ে পেচ্ছাব ও পেয়ে গেছে। কিন্তু বাথরুম তো নীচে। একবার ভাবলাম বারান্দা দিয়ে যন্ত্রটা বার করে,হি –ই – ই - স বলে করে ফেলি ।কিন্তু পাশের বাড়ীতে তো আমার বয়সী একজন আছে যদি দেখে ফেলে।তাই করলাম না। আওয়াজটা বাড়ছে।আর পাল্লা দিয়ে তলপেটে চাপ।কি করি,কি করি ভাবতে ভাবতেই দেখি টস টস করে সে বেরোতে শুরু করেছে।অগত্যা তো এবার করতেই হয়,তাই বারান্দায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।আর শুয়ে শুয়েই করে দিলাম,বারান্দার নর্দমার দিকে তাক করে।শোয়ার কারণ বারান্দা ছিলো রেলিং দেওয়া,মানে বাইরে থেকে সব দেখা যায় । অগত্যা ... যাক একটা কাজ তো হল, এবার আমার খুব বিস্কিট খেতে ইচ্ছে করছে,ক্যাডবেরী ও।কিন্তু বেশ জোরে পায়ের আওয়াজ,খুব ভয় লাগছে,কি করি ভাবছি,দেখি বন্ধ দরজার ভেতরে একটা মানুষ।কোথা থেকে এলো কে জানে! – ‘এ নাও। বিস্কুট আর লজেন্স। আর কিছু খাবে?’ অচেনা লোক,কিন্তু বেশ সুন্দর দেখতে। আমি চুপ। - ‘ খিদে পেয়েছে তো’। মাথা নাড়লাম না’তো। -
‘ আমি জানি পেয়েছে। এই নাও’। ওমা দেখি ক্যাডবেরি দিচ্ছে। না,নেবো না মনে মনে বললাম। মা বলেছে লোভ করতে নেই।ঈশ্বর যাকে যা দেওয়ার ঠিকই দেন। মাথা নীচু করে – ‘না’ বললাম।লোভ করবো না। লোকটা কাঁধে এসে হাত রাখলো। ‘আমি তোমার কাকুর বন্ধু,তোমারও’। - ধুর আমার কোনো কাকুই নেই। লোকটা হাসছে। - ‘আছে আছে খোঁজ নিয়ে দেখো। তুমি অনি আর আমি রনি। এসো আমরা বন্ধু।তোমার কি আমাকে দেখে ভয় লাগছে?’ - কই না’তো। -‘তাহলে খাবে না কেনো?’ এবার তো আর ভয় পেয়েছি দেখালে চলবে না। অগত্যা নিলাম।খেলাম।তারপর কত গল্প।উনি যেখানে থাকেন সেখানে কত কি মজার ঘটনা ঘটে শুনতে শুনতে আমি তো হেসেই মরি। হাসতে হাসতে পেট ব্যথা। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে খেয়াল নেই,দেখি বাইরের দরজা খোলার শব্দ। মা ঢুকলো,সাথে দিদি।মুখ থমথমে। পিসেমশায় মারা গেছিলেন সকালে। তাই আমাকে না বলে চলে গেছে।ইতিমধ্যে কেটে গেছে অনেকক্ষন।আমার হুঁশই নেই।আমি তো রনির সাথে বসে গল্প করেছি,খেয়েছি,ঘুমিয়েওছ কি’না কে জানে। মা বলছে কার সাথে কথা বলছিলে তুমি? আমি উল্টোদিকে ঘুরে রনি কাকুকে দেখাতে গিয়ে দেখি,নেই! কি আশ্চর্য্য। সব কথা শুনে মা’র তো চক্ষু চড়ক গাছ। ভয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরেছে। বলছে তোমার তো কাকু ছিলো,তুমি জন্মানর আগেই তিনি মারা যান।সে কথা
তোমাকে বলা হয়নি।আর সত্যি সত্যি রনি বলে তার এক বন্ধু ছিলো। সেও মারা যায় একই সাথে গাড়ী দুর্ঘটনায়। তাহলে??? এতক্ষণ আমি??? হুম সেই ছ’বছর বয়সে প্রথমবার তেঁনাদের সাথে আলাপ শুরু।

দুই
জীবন এক বড় জার্নি।সে সেই ছোট্টোবেলাতেই শিখে গেছিলাম। সকাল পেরিয়ে যখন দুপুরের প্রথম রোদে পা রাখছি,গালে হাল্কা হাল্কা কিশলয় দাড়ির ছোঁয়া,মেয়েরা তাকালে মাথা নীচু না করে হাঁ করে তাকিয়ে দেখি,সেই সময়,যখন অনেক খিদে পায়,কিন্তু খেতে ইচ্ছে করে না,কি যেন নেই,কে যেন নেই,সেই সময়ে...একদিন চিঠি এলো। মানে তখনো তো জল কে জল,পানি কে পানি বলতে শিখিনি। কেবল সকাল হলেই মনে হয় সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি,আর টই -টই।সকাল আটটা,চোখে সানগ্লাস,গায়ে লাল জামা।খুব রোগা তো মেয়েরা স্বাস্থ্যবানদের দিকে তাকায়,আমার দিকে কেন তাকাবে? আমি তো রোগা।বিশাল কপাল,কেবল আছে বলতে বাপ,মায়ের থেকে পাওয়া গায়ের গৌরবর্ণ।সেটা নাকি আবার মেয়েদের কাছে মাইনাস পয়েন্ট। তাই রোদে পুড়তে শুরু করলাম। মায় ডন-বৈঠক ও। না খুব একটা লাভ হলো না।অগত্যা খুব হতাশ।কিছু একটা হয় না,কেন যে হয় না,তাও বুঝি না,কে আর নিজেকে অযোগ্য ভাবে বলুন। যখন হতাশ হয়ে কবিতা পড়তে শুরু করেছি,দু - একখান লিখতেও,পড়ে ফেলছি সুনীলের সুদূর ঝর্ণার জলে,আর বিমল করের খড়কুটো,মনের ভেতর কে যেন মোচড় মারে খুব,কাঁদতে ইচ্ছে হয়,কিন্তু পুরুষ মানুষ আবার কাঁদবো কি ! দুপুরগুলো কাটতেই চায় না,হঠাৎ যেন আকাশ থেকে এসে পড়লো একটা চিঠি।প্রেরকের নাম নেই। শুধু লেখা – ‘ভালবাসি,ভালবেসো’। উফ্ পাগল হয়ে যাবো।এতো আলো কোথায় ছিল কে জানে। আমি পাগল হয়ে যাবো প্রায়,হাসছি। নিজস্ব টিলার ওপর তখন তেজিয়াল রোদ্দুর,আর পুড়ছি,হঠাৎ কে দিলো এলো এ সুজাতাসম। যখন তখন যাকে তাকে দেখে হাসছি,বাইরে তো তখনো অনেক নুন।লবণাক্ত সে এক সময়,মার এক মামা ছিলেন,গণৎকার। মা বললো – ‘চল,তোকে দেখিয়ে আনি’। আমি কি বিরক্ত। তখনতো যুক্তিবাদের মন্ত্র ঢুকছে মাথায়। ফুৎকারে উড়িয়ে দিলাম।না যাইনি। কেন যাবো? মা কি জানে নাকি আমার কাছে কি আছে? তিন প্রহরের বিল। যেখানে পদ্ম ফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে সেই বিরল ও অফুরান ঐশ্বর্যের মালিক হতে চলেছি আমি। কিন্তু চিঠিটা দিলো কে? না,খুঁজতে যাইনি। আমারো তো আছে অভিমানী পঙ্খীরাজ,তাকে নিয়ে ঘোঁড়া ছোটাবো, কেন যাবো? কি দরকার,যে দিয়েছে সেই প্রকাশ্যে আসবে।বুদ্ধিটা দিয়েছিলো যে সে আমাদের দাদা। মানে পাড়াতুতো।শুনলাম,বুঝল ম,কিন্তু মনতো মানে না । কিন্তু সপ্তাহ ঘুরে গেলো কেউ সামনে আসছে না,বাধ্য হয়ে খুঁজতে বেরোলাম। সকাল থেকেই খুঁজি।দুপুরে ফেরিওয়ালা গেলেও উঁকি দি।যদি...সে যে কোনো ফেরিওয়ালা নয়,তা আমি জানি,তবু খুঁজি।সন্ধ্যে গড়ালে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসি।মৃদূ – মন্দ বাতাস বয়। সে উড়িয়ে নিয়ে যায় না আমায়,গন্ধ রেখে যায় মৃদূ বিষন্নতার, সে বাতাসে সে মিশে আছে কি’না কে বলতে পারে। তেলেভাজার দোকানে তেলেভাজা কিনতে গিয়েও তাকে খুঁজি,পাই কই।তারপর? তারপর যেদিন,জল চিক চিক দুপুর,সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার,আর অবিরাম অথচ শান্ত বৃষ্টি, সে এসে হাজির হল আমার ঘরে। আর কি অদ্ভূত আমার সাথে যা ঘটে তার সবটা জুড়েই আছে কিছু অদ্ভূত হতভাগ্য অথচ মন কেমনের দুপুর।সে এলো। যেমন করে দূরদর্শনের পর্দায় ফুটে ওঠে সুন্দরী,সেভাবেই এলো।অনেকটা আকস্মিক। আমি চমকে উঠেছি তার ডাকে। বললো- ‘মা কই?’ আমি থতমত খেয়ে বললাম - ডেকে দেবো?,সে হাসলো।
- না,আমি তোমার কাছেই এসেছি। বসতে বলবে না? আমি তো ভ্যাবচ্যাক।
- হ্যাঁ,বসুন।
- দরজাটা ভেজিয়ে দাও।দুপুরবেলা কে হুট করে ঢুকে পড়বে।
আমি উঠে দরজা ভেজিয়ে এলাম মন্ত্রমুগ্ধের মত।
-উত্তর করলে না’তো?
- আমাকে বলছেন?
-তা নয়তো কাকে?
- কি হয়েছে তোমার,অনি ?
আমি চুপ। যেন কথা বলতে পারিনা।শুনতে পাইনা।

এসব সময়ে আমরা উত্তর কোলকাতার বাংলা স্কুলে পড়া পাবলিকরা যেমন করে তেমনই করলাম। ও এগিয়ে এসে আমার হাত ধরলো।আর তখনই দেওয়ালে টিকটিকি ডাকলো।টিকটিকি ডাকলে কি করা উচিত যেন? মনে পড়ছে না।হাতের তালু ঘামছে।মাটি তো নেই তবু নখ ঘষছি মেঝেতে। ও আমি যে কি করি। ধুস! হঠাৎ বলে বসলাম - টয়লেট করে আসি। সে বললো – ‘চলো আমিও যাচ্ছি’।আমি লাজুক হেসে বললাম – তা হয় নাকি। দাঁড়ান এক মিনিট,আমি আসছি। দৌড়ে গেলাম। বুক ধড়ফড় করছে। ঈশ্বরহীন এসব দুপুরে এমনটাই হয়, হয়তো বা। ওমা ফিরে এসে দেখি সে নেই।আমার তো জিজ্ঞেস করা হয়নি কোথায় থাকেন আপনি,কি করেন,আবার কবে দেখা হবে। এসব মূহুর্তেই পৃথিবীতে নাকি সন্ধ্যে নামে,নাহলে মুখ লুকোবো কোথায়। মা ঢুকলো – ‘কার সাথে বকবক করছিলি?’ হঠাৎ মার ওপর খুব রাগ হয়ে গেলো। বললাম - দুপুরবেলা
যে সে ঢুকে পড়ে,দরজা বন্ধ করে রাখতে পারো না? – ‘কই? দরজা তো সেই দুপুর একটা থেকেই বন্ধ। কেউ তো খোলেনি’। আমি থ’! কি বলবো বুঝে উঠতে পারছি না।বিন বিন করে ঘাম দিচ্ছে। চুপ করে গেলাম।বিছানায় সোজা হয়ে বসলাম।কে যেন বলেছিলো এক মিনিট স্থির হয়ে বসা।এক ইঞ্চি বুদ্ধ হয়ে ওঠা। ডুকরে কেঁদে উঠিনি,বরং শান্ত হলাম,সমাহিত,কারণ কেউ গেলো আর কেউ এলো,তেঁনার প্রবেশ। Rather অনুপ্রবেশ বলাই ভালো।মাথায়,কপালে হাত বুলোলেন,পরম বন্ধুর মতই বললো চলো তোমায় জর্জ বিশ্বাসের গান শোনাই। - আছে দুঃখ আছে মৃত্যু...

তিন
এরপর থেকেই জানেন আমার জীবনটা বদলে গেলো। যেখানেই যাই তেঁনারা সাথে থাকেন।মনে হয় কে যেন আমার সাথেই চলছে,ফিরছে।আর পেছন ফিরলেই নেই।এ এক ভারী মজার খেলা।অনেকটা পুরোনো ঘা এর মত। অস্বস্তিও আছে,আবার মাঝে মাঝে যেঁ হাত বুলোতেও ইচ্ছে করে।আমিও লুকোচুরী খেলি তার সাথে।সে বলে – টুকি।আমিও বলি – টুকি।
চাকরী পেলাম। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরী পেয়ে লোকের মন ভালো হয়। আমার হল মনটা খারাপ হয়ে। সুনীল এর প্রতিদ্বন্দীর সিদ্ধার্থ কেও এই একই চাকরী নিয়ে চলে যেতে হয়েছিলো ওড়িষ্যাতে।আর তার কি মন
খারাপ ! আর বলি তোমার নিস্তার নেই,নেই অনি,রক্তাত হও,আর নেশার মত,কবিতার মত একটা জীবনে প্রবেশ করো,যেখানে বুকজলে ডুবে বলবে,চলো আরো আরো জলের গভীরে,মাছেদের সঙ্গে থাকো,জলজ হও,শ্যাওলা হও,আর বেঁচে থাকো।উড়ন্ত ডানার মত,শঙ্খচিলের মত কবিতায় আত্মস্থ হও। আর আমাকে তো সারা দেশ ঘুরে বেড়াতে হয়। সে যাই হোক,এমনই একদিন ফিরছি রাতের ট্রেনে। খুব লেট। দমদম স্টেশনে নেমেছি যখন রাত দুটো। কেউ নেই সাথে। সাথে মাথার ওপর মেঘ ডাকছে।বৃষ্টি হব হব।ও’মা দেখি কত গুলো কুকুর পিছু নিয়েছে।আমি ও চলছি,তারাও চলছে।আমি থামলেই তারাও থেমে যাচ্ছে। আর সাথে ঘেউ ঘেউ।রাত দুপুরে পায়ে ঘ্যাঁক করে দিলেই হলো ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছি,দেখি তিঁনি এলেন,অন্ধকার রাস্তা,তেমন দেখা যাচ্ছে না,বললেন – ‘চলো হে বন্ধু আমার সাথে’। ব্যস।কুকুরগুলো ওমনি চুপ। পাশে পাশেই যাচ্ছে তিঁনি।কিন্তু কেমন জানি ছায়ার মত। যেভাবে মেঘ ছায়া ফেলে উপত্যকায়,সেভাবেই।তার র আমায় সাথে করে নিয়ে সিঁথির মোড় পৌঁছলেন,যেই না ওপারের দিকে এগিয়েছি দেখি তিঁনি নেই।

চার
তেঁনাদের আমি অনুভব করতে পারি।ঈশ্বর কে ততটা নয়,স্মৃতি বা শিশিরকেও নয় যতটা তেঁনাদের। সেই যেবার আমাদের গাড়িতে সামনা সামনি ধাক্কা মারলো উল্টোদিক থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্স,আমি ঠিক বুঝিনি,কি করে বুঝবোই বা,আমারতো কোনো অলৌকিক অতিন্দ্রীয় ক্ষমতা নেই। কিন্তু কে যেন আমার কানে কানে সাবধান করছিলো... প্রাণপনে চীৎকার করে বলছিলাম ড্রাইভারটাকে।ভাগ্যিস ও শুনেছিলো।নইলে তো ‘৯’হয়ে যেতাম। আর কি। মুক্তি কাকে বলে আমি জানিনা। অলৌকিক ও আমি জানিনা।কেবল দেখি আমি ক্লান্ত হলে কে যেন এগিয়ে দেয় সহানুভূতির হাত,কে? আমি টুকরো টুকরো হলে কে যেন আমাকে কুড়িয়ে এনে দেয় আমার সমস্ত খন্ডাংশ। উদাহরণ লম্বা হলে পাঠক বিরক্ত হয় সে কথা আমি ও জানি।কিন্তু কি করবো,আমার তো তেঁনাদের কাছে ঋণ অপরিসীম। সে কথা মুক্ত কন্ঠে স্বীকার না করলে যে বড় পাপ হয়ে যাবে। বড় অন্যায়।উড়ন্ত মোটরগাড়ীর মত,যৌন নিশ্বাসের মত পাপচিন্হে ধূলি ধূসরিত হয়ে আর কতদিন,ঋণ স্বীকার করবো না,যেমনটা করেনি বলে আজ ও দগ্ধিত হই আমার নিভে যাওয়া পিতার কাছে।
মা যেদিন চলে গেলেন, তার ঠিক একটু আগেই তেঁনারা এসে আমায় বলে দিয়েছিলো – ‘তৈরী হও।মন শক্ত কর’। দিদি কে বলতে হেসেছিলো।আমি হাসিনি।কারণ আমি তাকে মানি। শান্ত আবেদনের মত,আপেলদানার মত,লবণাক্ত চুম্বনের মত,ছবিঘরের অন্ধকারের মত তাকে মানি। ঘর অন্ধকার না হলে অলৌকিক কিভাবে ঘটে? অন্ধ বিশ্বাস না থাকলে কিভাবে সেমান্যতা দেবে আমাকে? মান্যতাই তো সম্পর্কের ভিত।এই যখন লিখতে বসি,মাথায় কিছুই আসে না,অথচ আমাকে লেখা দিতেই হবে আর দুদিনের মধ্যে,সে ঠিক আমায় লেখা যোগান দেয়।যারা ঈশ্বর কে মানে,তারা মানুক।আমি তেঁনার ডাই হার্ড ফ্যান। আর মা চলে গেলো তেঁনারা বলার ঠিক ছেচল্লিশ মিনিট পর। আর আমি ভেঙ্গে খান খান।হাত ধরে সে প্রবল সমুদ্র গর্জন তো সামলেছিল তেঁনারাই।বৌ তো তখন নিজের অফিসের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত।বাকী আত্মীয়রাও তথৈবচ। কি জানি কাকে আত্মীয় বলে !

পাঁচ
সোমনাথ যখন খুব অসুস্থ,প্রচূর টাকা লাগবে,কি করবো বুঝে উঠতে পারছিনা,দেখি সেই আমায় উপায় বলে দিলো।আর বিশ্বাস করুন আমি সারা শহর ঘুরে ঘুরে প্রচূর টাকা তুলেও ফেললাম।না,সোমনাথ কে বাঁচাতে পারিনি।সোমনাথ আমার বন্ধু। জানিয়েছিলো সেবারও তেঁনারা আমাকে। ‘পারবে না’। আমি হতাশ হয়ে পরেছিলাম শুনে, তেঁনারাই বলেছিলো – কর্ম করে যাও,ফলের আশা করো না।হ্যাঁ,বলতে দ্বিধা নেই সব জেনেও তবু আশা করেছিলাম। যে জাহাজ ডুবে যায় তার ক্যাপ্টেন কি হাল ছাড়ে? আমিও ছাড়িনি।ছাড়তে নেই যে। স্নেহ,বাৎসল্য বড় বিষম বস্তু।আমার সমস্ত টুকরো আমি কে ডাকটিকিটের মতো তুলে এনে দিতো তেঁনারাই,আমি আমাকে আবার গুছিয়ে নিতাম প্রতিটি অকালবর্ষণের পর।এই যে তেঁনাদের সাথে আমার এইরকম একটা সম্পর্ক,তা বলে ভাববেন না তা্দের আমি মিস ইউজ করি।কক্ষনো না,কেন করবো। বাবা বেঁচে থাকতে বলতেন – পরের স্ত্রী কে মা মনে করবে,আর রাস্তায় যদি পরের কোনো জিনিস পরে তাকে,তাকে ইঁট মনে করো।ভগবান বুদ্ধের উপদেশ,সমাজ যাতে খারাপ না হয়ে যায়,এই উপদেশ তিনি দিয়েছিলেন।আমি তাই কখনো তেঁনাকে বলিনি তাজমহল বা ভিক্টোরিয়া দেখিয়ে ওটা আমার চাই।কেন বলবোই বা। শুকনো,অতৃপ্ত কূয়োর মত আমি ও তো পরে থাকি নিজের আলো – আঁধারির বারান্দায়, বৌ এর ব্যস্ততা বেড়েছে আরো। মেয়েটা বড় হচ্ছে,বুঝতে পারছি নিজের বয়স বাড়ছে। তবু,আমি এ আকাশগঙ্গায় আমি এক সিন্ধুনাবিক।

ছয়
তবে জানেন এটা জানতাম আজও জানি যে তেঁনারা আমার চিরকালীন বন্ধু।আমায় পথ দেখান। অলীক নির্জন বাতিঘরের মত তারা আছে।ছোটো বেলায় লাঠি লজেন্স দিতো।এখন দেয় উপদেশ।টুকলু আমার ফোন ধরে না,কেন কে জানে।পুপাই,বাবু,মিতুল, অরি ওরা কেউ আমায় ফোন করে না।কিছু মিসড কল পড়ে থাকে। বড় হওয়া খুব ক্লান্তিকর,তাই না? কেবল কাজ করে যাও।কর্তব্য করে যাও।কেউ তোমার নয়,তুমিও কারো নও। বৌ আমার সাথে আর বেশী কথা বলে না।কথারাও তো ফুরিয়ে আসে।মেয়ে বড় হয়ে গেছে,সে আর আমার গালে এসে গাল ঘষে না। ও আমি এখন আমার চেয়ারে বসে পাখীর উড়ে যাওয়া দেখি,পিঁপড়েদের হেঁটে যাওয়া দেখি,দেশটা ক্রমশ বাজার হয়ে গেলো কি করে দেখি,আর কথা বলি তেঁনাদের সাথে। কেউ তা নিয়ে ব্যঙ্গ করতেই পারে,সে তার ধর্ম,আমার নয়।ওই যে যেখানে ছায়ার জড়ো হচ্ছে,দল বাঁধছে,আর আমার থেকেই রক্ত আর অস্থি - মজ্জা নিয়ে যেঁ তেঁনারা আমার,তারাই তো আমাকে লাঠি লজেন্স এনে দিতেন বাবা,মা না থাকলে বাড়ীতে। হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে গেলে এসে আমার হাত ধরতো, কৈশোরে যখন প্রায়ই ঢুকে পড়তাম কানা গলিতে, আমায় বার করে আনতো বড় রাস্তায়,যৌবনে বলেছিল – ‘অনি উচ্ছন্নে তুমি যেতেই পারো,কিন্তু ভালো ও তো তুমিই হতেই পারো’। অন্ধ রাতে বসে গানের সঙ্গ দিতো, আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলতো – ‘কি’হে চলো ঘুরে আসি কোথাও’। তেঁনারাও নিশ্চিত আমার সাথেই বুড়ো হয়েছে।ঈশ্বর আমার কাছে চিরতরের এক ভার্চুয়াল দ্বীপ,কিন্তু সেই তিনি,তেঁনারা আমার।আমারই। বলতে বলতেই আমি উঠে বসেছিলাম আমার বিছানায়,কতদিন পর এই অবেলায়। যেখানে গত কয়েকদিন যাবৎ,আমি শুয়ে।আমার ওঠার ক্ষমতা নেই।হাত নড়ে না,পা নড়ে না,মুখ দিয়ে কোনো বাক্যই সরে না,কি যেন আমার হয়েছে,যারা আসে আমার চোখের পাতাটা বন্ধ হলে শান্তি পাবে ভেবে সে আমার পরম আত্মীয়রা,তাদের কেউ জানলোই না,এই একটু পরে,আর একটু পরে...আমি বেরিয়ে পড়বো তেঁনাদের সাথে ,একটা খোলা মাঠের নীচে গিয়ে আমরা বসবো,আর তারপর অনেক কথা বলতে বলতে আমরা এগিয়ে যাবো,ওই যেখানে মাঠ মিশেছে কুয়াশায়,’৯’ এর দেশে। আমার হাত টা কিন্তু তেঁনারা ধরেই রাখবে,রাখবেই। আমার তিনি,তেঁনারা।
পুনশ্চঃ- ভালো সমস্ত তেঁনারা হারিয়ে যায়,যাচ্ছে। এ পচা,ভেপসে ওঠা দেশ জুড়ে রয়ে গেলো কেবল সবুজ,কমলা,আর লাল জামা পরা খারাপ তেঁনারা।
স্বার্থ - সিদ্ধিময় মারামারি,কাটাকাটি করা প্রভূত রক্তপাতময় এ অঞ্চল থেকে এ লেখা বহুযোজন দূরের এক গোলার্ধ,এক অন্য পৃথিবী। ভালো তেঁনাদের পৃথিবী।এই মাত্র,সকাল ঠিক ৪টা ২৯মিনিটে,যখন অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করছে,ভোরের প্রথম লোকাল ছেড়ে গেলো শিয়ালদহর প্ল্যাটফর্ম,আমি আর তেঁনারা পা দিলাম সেই পৃথিবীতে। বাড়ীর সামনে এখন একে একে লোক জড়ো হবে।এ সুযোগে আমি ঘুমোতে চললাম।হ্যাঁ,ঘুম লেগেছে হৃতকমলে।