জলছবি

পায়েল নন্দী


ঝরঝরে পলেস্তারাহীন একটা বাড়ি, ছাদের ঘরটাকেসম্মান দিলে গোটা পাঁচেক স্যাঁতস্যাঁতে ঘর। ছোটতেই খাওয়া নিয়ে বায়নাক্কার কারণে মায়ের শিখিয়ে দেওয়া, ‘জানিস তো ঠাণ্ডা ঘর কিন্তু সাপের বাস’। অতএব টোকা মারলে মেঝের তলায় এখনো দেখতে পারি প্রাচীন লতা লতা লতা। হ্যাঁ তিনবার বলে নিতে হয় কিনা। রাতে বলতে হয় শুনেছিলাম আমি দিনেও বলে নি। বাড়তি সুরক্ষা কি শুধু ব্যাঙ্ক গুলোই দিতে পারে নাকি, নিজেও নিজেকে দিতে পারি হে।এই লতা কনসেপ্ট আমার সাথে আদান-প্রদান করেছিলো যারা তারা আসলে কোথা থেকে এসেছে সে ব্যাপারে কনফিউশান কাটিয়ে উঠতে গেলে খেলার সময় কিছুটা কমে যেত বলে সেদিকে আর গুরুত্ব দি নি। ওদের ভাষা টা একটু আলাদা ছিল। বাঙাল ছিল ওরা। ওরা মানে আমাদের ভাড়াটিয়া। ছোটবেলায় যাদের আমি বলতাম তোরা তো আমাদের টিয়া, তাদের প্রিয় উৎসবের তালিকায় দুর্গাপুজো-টুজো ছাড়াও এনে ফেলেছিল আরও কিছু বিশেষ দিন। যেদিন ওদের ‘দেশ’ থেকে লোক আসতো বাড়িতে।
সোশ্যাল নেটওয়ারকিং সাইটে সবুজ আল জ্বেলে রেখে মহিলাদের বিরক্তির শেষ থাকে না। সকাল বিকেল অচেনা, অজানা মানুষ “হাই, হ্যালো, বন্ধু হতে চাই” বলে একেবারে ক্লান্তিহীন হয়ে লেগে থাকে একটু কথা বলার আশায়। অচেনা মানুষ যেমন বন্ধু হতে চান তেমনই বন্ধুর তালিকা হাজার পেরিয়েছে যারা সত্যি খুব চেনা নয়। এই প্রোফাইল পিকচার লাইক করা, ভালো লেখা, ভালো কবিতা শেয়ার করলে পছন্দ জানানো দিয়ে শুরু তারপর গুরুত্বপূর্ণ আলচনায় তেড়েফুঁড়ে নিজের মত জানানো এবং ইনবক্সে কথা চালাচালি। বেশ কয়েকদিন ধরে অচেনা ব্যাক্তি মেসেজ করে যাচ্ছে ইনবক্সে। প্রথমটায় পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি নি। ক’দিন পরে জিজ্ঞেস করতে তিনি বলেন, “আমি শিনু দা। চিনতে পারছিস?” “শিনু দা!”। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথা গুলো। সেই অঙ্ক করাতে আসতো যে দাদা। পাশের বাড়ির পান দিদার ছয় ছেলের সবচেয়ে ছোটোজন। “কতদিন পর বল। তোকে খুঁজে পেয়েই কথা বলতে চলে এলাম। আমি তো আর এসব চালাতে পারি না, এসব তো তদের জন্যেই। তুই খুব বিরক্ত হয়েছিস না রে? কাকু, কাকিম, দাদাভাই সবাই কেমন আছে?” একনাগারে বলে গেল শিনু দা। মনে পরে যাচ্ছে ফর্সা লম্বা ছেলেটার কথা, লাজুক স্বভাবের এতই যে চোখ তুলে তাকাতো না বেশি। শিনু দা আরও বলল, “ তোর সেই ভাইবোনেরা কেমন আছে? সেই ভাড়াটিয়া আছে তো এখনো? এখনো তারা উৎসব করে?” এক এক করে উত্তর দিতে গিয়ে দেখি শিনু দা’র প্রশ্নের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একটু বিরক্ত হয়েই উত্তর দিচ্ছিলাম। পাশের চ্যাট বক্সে বন্ধু এসে গেছে দরকারি কথা বলবে বলে। দরকারি মানে, হয় তা প্রেমঘটিত অথবা পরীক্ষা সংক্রান্ত। কিন্তু আমার তাতেই বেশি আগ্রহ। শেষ প্রশ্নের উত্তর গুলো দেওয়া হল না শিনু দা’কে। “উৎসব” শব্দটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকলাম।
চোখ কচলাতে কচলাতে সিঁড়ি দিয়ে নামছি এক উৎসবের সকালে। দেখি দরজার শেষ গ্রিলের কাছে গড়িয়ে গেছে বৃত্তাকার একটা কিছু। গোল জিনিস ভেবে কাছে চলে যেতেই দেখি তার ডানদিক আর বামদিক দিয়ে আরও দুটো আরও দুটো গোল জিনিস গড়িয়ে যাচ্ছে তার পাশে। খুব কাছে যেতে দেখি ‘ ওমা এতো আলু!’। আহা রাখতে গিয়ে গড়িয়ে গেছে বুঝি ভেবে দুটো আলু চোখের সামনে থেকে তুলে বাঁদিকের টা তুলতে গিয়ে অবাক হয়ে যাই। টেবিলের তলায় জমা করা প্রচুর আলু। মা’র থেকে জানতে পারি দেশ থেকে আলু এসেছে। আজ আমাদের ভাড়াটিয়াদের উৎসব। দেশের আলুর আগমন জানান দিয়েছে দেশ থেকে কিছু লোকজন আসবে। সেদিন আর নিচে নামবো না ঠিক করেছিলাম। দেশ বলতে ঠিক কোন জায়গা, কোন দেশ বোঝায় তখন বুঝতাম না। শুধু বুঝতাম কিছু লোক আসবে সেই জায়গা থেকে যে জায়গা থেকে ওদের দুরত্ব অনেক আর আত্মীয়তা অনেক বেশি। আমি এখন সত্যি আত্মীয়তা দেখি না। ওরা চলে গেছে নিজেদের বানানো বাড়িতে। সেখানেও কি ওদের দেশ লোক আসে এখনো? ওরা কি সেখানেও টেবিলের তলায় আলু রেখে ঝুরি করে নিয়ে যায় মাংস রাঁধবে বলে? বড় হাঁড়িতে দুধ চাল মেশাতে দেখেছি পাশে থেকে বহুদিন। তা যখন পায়েস হয়ে যায় বাটি করে মা’কে দিয়ে গেছে, বলেছে,‘আজ লোক এসছে দেশ থেকে। চলো না গল্প করবে।‘ দেশের ওই লোকজনের প্রতি আতিথেয়তা আমার এখনো দেখতে ইচ্ছে করে। কে এই দেশের লোক? দেশ বলতে আমি ইন্ডিয়া বুঝি। যার মধ্যে এক জায়গার আমার বাসস্থান অতএব এই জায়গা এই দেশ আমার নিজের এবং প্রতিবেশীদের। ওদের কাছেও ওদের দেশ মানে যেখানে জন্ম, বড় হওয়া, যেখানে প্রতিবেশিরা হয়ে যেত রক্তের সম্পর্কের চেয়ে মেজদাদা, ফুলদিদি, কাকাবাবু, বুড়ি পিশিমা, রাগী জ্যাঠামশাই। যেখানে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না ‘ নিজের কাকা? নিজের দাদা?’ বাবা, মা, মাঠাক্‌রুণ সেখানে মিলে মিশে সবাই এক। দেশ থেকে সেই লোক জ্বর জ্বালা আনন্দ উৎসবে এখনো নিয়ম করে জুড়ে থাকে সবাই সবার সাথে যেগুলো হারিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, যেগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি। দেশ থেকে লোক আসলে আমি জেনে নিতাম আসল দাদা, আসল মামা কোনটা। তারপর সারাদিন প্রত্যেকের প্রতি সমান আতিথেয়তা, সমান আহ্লাদ, একই নস্টালজিয়ায় বারে বারে ভুলে যেতাম কে আসল আর কে নয়। কারণ আত্মীয় মানেই ওদের ফোলা গাল ও ঝলমলে দাঁত নিয়ে সদা হাস্যময় মুখগুলো ঘোরাফেরা করতো। খোঁজখবর নিয়ে নিচ্ছে দূর মাঠের ধারে থাকা জেঠুর মেয়ের বিয়ে হয়েছে কিনা, পাত্র দেখাতে কলকাতাতেই যেন আসা হয় বলে দিচ্ছে পই পই করে। দেশের ঘর নিকিয়ে দেওয়ার পদ্মদি’র ছেলে বড় হয়ে এখানে এসে এখন ওদের ব্যাবসাতেই ঢুকেছে। সিঁড়ির তলায় সিলিন্ডার রাখতে রাখতে শুনে নিচ্ছে সেও গ্রামের হাল হকিকত। খর শুনতে শুনতে পেছনে মুখ ফিরিয়ে কাকিমা বলে দিলেন এক ফাঁকে,‘সিলিন্ডার রেখে দুপুরের খাবার নিয়ে যাবি সবার জন্য, কৌটো করে দিয়ে দেবো।‘
আমার প্রথম প্রথম খুব রাগ হত, অবাক ও লাগতো। গাদা গাদা লোক আসে, পেট পুরে খায়, সারাদিন কত আওয়াজ, কথা, হাসি। সবাই তো নিজের লোক ও তো নয়। খুব টাকা পয়সা না থাকলে বছরে কয়েকবার করে এসব আয়জন করা সম্ভব ই না। তার ওপর নিজের থেকে বেশি পাড়ার লোক। এত আত্মীয় এদের, এত ঝামেলা করে কি পায় এরা? যা পায় তা বোঝার কথা নয় আমার তখন। আমাদের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। বাবা, মা, দাদাকে নিয়ে ফ্যামিলি বলতে এই নিজের একেবারে রক্তের সম্পর্ককে বুঝতাম। ভাড়াটেরা আমাদের কেউ ছিল না। তবু ভাড়াটে দুটো ছেলেমেয়ে বাদে আমার আর বন্ধু ছিল না। রাস্তার মোড়ে কোণার বাড়ি থেকে আসতো আরও একটি মেয়ে। তারা ছিল এদের ব্যাবসার বন্ধু, কাছাকাছি দেশের লোক অতএব পরম আত্মীয় এবং অদ্ভুতভাবে আমার সাথেও বহু দুরের হলেও খুব কাছের সম্পর্কের মানুষ, আমার বন্ধু। আমি একদিন এক লাফে বড় হয়ে গিয়ে বুঝেছি আত্মীয় কাকে বলে। আলুভাজা খেতে খুব ভালবাসি বরাবর। যাদের নিচের তলার লোক ডাকতাম তাঁরাও দেখেছে বহুদিনমা আলুভাজা করে দেয় রোজ। একদিন স্কুল থেকে ফিরে শুনি দিদা অসুস্থ। নিচের লোকেদের মধ্যে এই দিদা ছিলেন আমাদের সবার দিদা।মায়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প না করলে তার সন্ধ্যের খাবার খাওয়ার মত পেটে জায়গা তৈরি হত না। দিদা অসুস্থ শরীরে দেখি রান্নাঘরে বাটিতে আলুভাজা করে রেখেছেন আমার জন্য। কাছে যেতে বললেন,’ আমাগো আলুভাজা ক্যামন খাউ না। খেয়ে বলো।‘ পুরো বাটি শেষ করে দৌড়ে ওপরে গিয়ে ঠাকুরকে বলেছিলাম দিদাকে ভালো করে দাও। শিনু দা’র থেকে জানলাম দিদা মারা গেছেন বছর খানেক হোল। দিদার ওই আলুভাজার স্বাদ আমি ভুলিনি। দুপুরে সেদিন দোকানের চাবি নিতে এসেছিলো এক ছেলে তাকে মা জল ও যাবতীয় জিনিস আর চাবি দিলো, নিচে সবাই দিদাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে।
মা কেও ওই সময় বিচলিত হতে দেখি নি। বারবার ফোন আসছে, শান্ত গলায় আত্মীয়দের খবর দিচ্ছেন দিদা ক্যামন আছেন। দোকানের ছেলেটাকে রাত্রে আমাদের কাছে খেতে বললেন। মা কিকরে এতসব সামলালেন জানতে ইচ্ছে করল। মা গল্প শোনালেন। মা থাকতো গ্রামে যেখানে পুরো গ্রামটাই একটা পাড়া, পাড়াতুতো আত্মীয় ঠাসা গ্রামটা আমিও দেখেছি পরে। মামার ছেলে হয়ার পর সেবার ছুটতে ছুটতে এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়ি বালিশ নিয়ে যাচ্ছি আর অপরিচিত আত্মীয় এক হাসিমুখে একটা বালিশ কেড়ে নিয়ে আমার সাথেই দৌড় লাগিয়ে আমাকে সাহায্য করলো।
মা বলে চলে।‘ জানিস আমাকে পাড়ায় সব বয়স্করা ‘মা’ বলতেন। একা’র বাবা বলতেন ‘কহমা’, আনির বাবা বলতেন ‘দুম্মা’, রাধারানীর বাবা ‘ন্যাড়া মা’ যেহেতু আমার কখনই চুল থাকতো না মাথায় আর নব’র বাবা ‘মা’ বলে।‘ মা অনর্গল গল্প বলতে থাকে। চোখ ছোট হয়ে আসে, এতো আলো ঝলমল করে মুখে। মায়ের থেকেই জানা পাড়ায় এই ‘আনি’ হল সেই মেয়ে তোতলার কারণে যে নিজের ‘রাণী’ নামকে ভেঙ্গে ফেলে সবার কাছে ‘আনি’ হয়েছে। ‘একা’ হল সে, যার বাবার দোকানই পাড়ায় তখন একমাত্র দোকান। রাধারানী ও মাধবী মায়ের তখনকার বেস্ট ফ্রেন্ড বলা যায়। ওদের বাড়িটা এখনো চেনা যায় আম ভর্তি গাছ দেখে। এক ফাঁকে মা বলে, ‘ওই আম গাছেই থাকার হুকুম ছিল। যদি বা এক আধটা ঢিল ছোঁরা হত ওমনি জেঠুমা চ্যালা কাঠ নিয়ে ধেয়ে আসতো। এই সব আত্মীয় মা আর পায় না। প্রায়ই বলে হারিয়ে গেছে। তাই অভ্যেসবশত মা এই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে আর সবার সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে। মা কে জিজ্ঞেস করলে পাড়ার জ্যাঠা, দাদু, দাদাদের খবর পাওয়া যাবে যাদের আমি কখনই পাড়াতুতো বলে চিনি নি। মা আর দেখেই নি কাউকে ছোটবেলায় যেমন দেখেছি কেউ কারুর ঘামাচি মেরে পাঁচ পয়সা পাচ্ছে। যদিও বিয়ের পর এখানেও মা নাকি দেখেছে পাড়াতুতো সম্পর্কে ঠাসা জমজমাট এলাকা। রাত ১২ টা অবধি যেখানে অনায়াসে গল্প করে কাটায় এ তার সাথে। ছেলেমেয়েরা চুপচাপ ঢুকে পরতো না যে যার বাড়িতে। ঢুকতে গেলে বাবা সমান পাড়ার জেঠুকে দু’বার প্রশ্নের উত্তর দিতেই হত, ‘এত দেরি হল কেন?’ অথবা ‘একটা অঙ্ক দিচ্ছি কর তো’। মা এখনো গল্প শোনায়, ‘ পম্পির মা সাড়ে সাত’শ ডালে মাস চালাত। খুব ফুটিয়ে অনেকটা জল ঢেলে ডাল বানাত। পম্পির এখন বিদেশে ভালো বিয়ে হয়েছে। ভগবান মুখ তুলে তাকিয়েছে রে।‘
এই পম্পির মা এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে মেয়ের বিয়ের পর। আমাকে বললেন, ‘তুমি চিনবেনা আমায়’। আমি বলিনি, খুব চিনেছি। সবার চরিত্র আমি এঁকে ফেলেছি কল্পনায়। কল্পনা করতে পারি সেই টুকা দা’র বউ মায়ের কাছে ছেলেকে রেখে অফিস যেতেন ‘টাটা বাইবাই বাটার জুতো চাইচাই’ করতে করতে বি. টি. রোডচলে যেতেন হেঁটে। বি. টি.রোড অবধি হেঁটে যাওয়া পুরনো পায়ের ছাপ, পুরনো গন্ধেরা আজ নেই। আজ কেউ সারাদিন ছেলেকে সারাদিন রেখে যায় না অন্যের কাছে, পাড়ার দাদা অঙ্ক করাতে আর আসে না সন্ধেবেলা অথচ পাড়ায় ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাথমেটিশিয়ান আছে, বকে ধমকে কান ধরে টেনে পড়তে বসানোর দাদা নেই। কত কিছু হারিয়ে গেছে। এখন আমাদের আছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট। অনুষ্ঠান, জন্ম মৃত্যুর খবর, কে অসুস্থ ঝাঁপিয়ে পরে সাহায্য করা, রাজ্যের, দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে আলচনার ঝড় তোলা এসমস্তই হয় এই সাইট এ। সবাই সবাইকে দেখতে পাই, জানতে পারে, মুখ বন্ধ করে কথা বলতে পারি, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে ভার্চুয়াল ভালবাসা আদান প্রদান করতে পারি প্রজুক্তির অভাবনিয় উন্নতির ফলে। মুশকিল হোল, ছুঁতে পারি না। পান দিদির হাত থেকে পান খাওয়া, রাগী জেঠুর চোখ রাঙ্গানি, শিনু দা’র সলজ্জ ভাষায় কথা বলা এগুলো কিছুই খুব কাছ থেকে দেখতে পারছিনা। খুব ইচ্ছে করছে একবার ছুঁয়ে দেখি বন্ধু, বন্ধুস্থানিয় মানুষদের হাত।পারছিনা। এখানে আমরা সবাই বোবা বন্ধু। এই পারাতুতো সম্পর্ক এখন রুপ নিয়েছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট গুলোয়। ভালো প্রয়াস। সত্যি বিপদে দুঃখে আনন্দে হাততালি দিয়ে, কেঁদেকেটে অথবা গভীর শোকে মর্মাহত হই, একত্রিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পরি কখনো রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে কখনো বা প্রাণ বাঁচাতে, বন্ধুর আঘাতে সহমর্মী হতে পারি। কিন্তু এই হাজার পেরিয়ে যাওয়া বন্ধুর মধ্যে আমার বন্ধু কয়জন। আর প্রয়োজনে যে অচেনা মুখগুলো ভিড় করে পাশে দাঁড়ায় তারাও কি আমার প্রকৃত বন্ধু? সবাই বন্ধু আমরা, অদ্ভুত এই সম্পর্কের বৃত্ত গড়ে তুলে হয়েছি এক ফ্যামিলির লোক সবাই যা ছিল একসময় পাড়াতুতো ফ্যামিলি।তবে যেগুলো পাচ্ছিনা তা হোল মুখমুখি হওয়া। দেখেতে পাওয়া এই সম্পর্কগুলোর সময়ে অসময়ে, চিন্তার, আনন্দের মুখগুলো। সেই দেশ থেকে চিকিৎসার জন্য আসাআত্মিয়দের দেখে ওই ছলছলে চোখ, থমথমে মুখ আর নেই, দূরসম্পর্কের মামারা আসতেন পড়াশোনা করতে, কলকাতায় অল্প চেনা হলেই আত্মীয় বলে বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করা এখন আর নেই। এখন আর ছেলেমেয়েদের কেউ পড়াশোনার জন্য অন্যের বাড়ি পাঠান না। সবাই খুব একলা হওয়া বেছে নিয়েছি। পলিউশান, ঘিঞ্জি শহরের এত আওয়াজ, ঝামেলা পেরিয়ে নিশ্চিন্ত দিনরাত্রি কাটাব বলে কাসিন এর সাথে এক বিছানায় সারারাত গল্প করা হয় না আর। দুপুরে সিঁড়ির তলায় খেলেতে যাই না আর। এই নিশ্চিন্তের জীবনের দিকে তাকাতে গিয়ে দু’ধার রাস্তায় ফেলে দিচ্ছি পাড়াতুতো সম্পর্ক, আত্মিয়ের স্নেহ যেগুলো অনেক কষ্টে উপার্জন করতে হয়। পুজোর সময় আপনজনদের জামাকাপড় দেওয়া ছাড়াও আমাদের অনেক দায়িত্ব আছে দুপুরের আগন্তুকদের প্রতি। একই ফ্ল্যাটে সোজা নিচে নেমে গেলে যেন কেউ প্রস্ন করুক দরজা খুলে, ‘কোথায় চললি’, এটা চাইছি প্রবল। এসব হারিয়ে ফেলা পাপ। আঁকড়ে ধরে জাপটে ধরে রাখতে হয়। স্নেহ কুড়িয়ে রাখতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একাকিত্ব বড় পাপ হে।