পশ্চিমে হাওয়াবদল

সুস্মিতা মৈত্র



‘ইশ, কার না কার জুতো বলে লোকটা কেমন চেঁচিয়ে উঠেছিলো?’
‘উস্রি নদীর ঝর্না দেখতে যাব। দিনটা বড় বিশ্রী।’ বলতে বলতে অপু কেমন ধপাস করে পড়লো বল?’
‘আর তারপর জুতো হারিয়ে ওর কি কান্না, সেটা বল?’
‘আর অপুর পিঠে কেমন কিল পড়েছিল?’
কে কোন কথাটা বলছি, কে তার উত্তর দিচ্ছে সেসব না দেখেশুনেই আমরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ছি।
‘আর তোমার জন্য তো আমার ঘাড়ে আজও ব্যাথা করে।’ ঘনা সন্তুদাদার দিকে তাকিয়ে অভিযোগ জানায়।
‘তুই থাম, আমি তোর ঘাড়ে পড়লাম বলে একটা লাড্ডু খেতে পেলি, সেটা ভুলে গেলি?’ সন্তুদাদাই বা ছাড়বে কেন?
‘জয়াদির কথা ভাব। হারিয়ে গিয়ে কোনও চিন্তা নেই, দিব্যি দোকানে বসে মিষ্টি বানানো দেখছে!’ অপা বলল।
‘আমি তো্ তোর মত ‘ড্যানচিবাবু’ খেতে চাই নি। আমি মিষ্টি দেখছিলাম আর ভাবছিলাম কোনটা কেমন খেতে হবে। আহা, মিষ্টিগুলোর কি সুন্দর গন্ধ।’ জয়াদির চটপট এমন করে বলল যেন এখনও গন্ধ পাচ্ছে।
জয়াদি আমার দিদি। নিজের না। জেঠতুতো। আমার নিজের দিদি নেই। তবে মনে হয় আমার নিজের দিদি থাকলেও এর থেকে বেশি নিজের হতে পারত না। আমাদের তুতো ভাই বোনরা সবাই যেন নিজের ভাই বোন এমন ভাবেই বড় হয়েছি। জয়াদি, আমি রিন্টু, অপু, সন্তু, ঘনা, নিনা।
আমাদের ছোটবেলাটা এক অদ্ভুত নৈকট্যে কেটেছে। বড় হয়ে দেশে বিদেশে নানান জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম আমারা সবাই। কিন্তু আজ এই বুড়ো বয়সেও আমাদের ভাইবোনেদের পরস্পরের প্রতি টান বা ভালবাসার কোনও ঘাটতি নেই। তখন যেমন জ্যেঠা, জ্যেঠিমা, কাকা, কাকিমা, পিসি, পিসেমসাইদের নিজের বাবা মায়ের মত মান্য করতাম, এখন তেমনই ভাইবোনদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনিদেরও নিজের বলেই মনে করি।
আজ আমরা সব ভাইবোনরা জয়াদির বাড়িতে এসেছি বিজয়া করতে। নিনা অবশ্য আসতে পারে নি। আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে ওই এখন দেশের বাইরে। আসার পর যা হয়, প্রনাম ট্রনাম সেরে আড্ডায় জমে গিয়েছি। মিষ্টি, নোনতা আর চায়ের সঙ্গে সঙ্গে চলছে আমাদের একে অপরের পিছনে লাগা।
এই খবর দেওয়ানেওয়া করতে করতেই জানা গেল জয়াদির ছেলে রাহুলদের বেড়াতে যাওয়ার কথা। রাহুল, ওর বউ নয়না দুজনেই অফিসের ব্যাস্ততায় জেরবার। এর সঙ্গে আছে ছেলের স্কুলের চাপ। কালিপুজোর কদিন ছুটি পেয়ে ওরা তিনজনে একটু ঘুরে আসবে। গন্তব্য মালয়েশিয়া। প্যাকেজ ট্যুর। যাওয়া, আসা, থাকা, খাওয়া, ওখানে বেড়ানো সব কিছুই ট্র্যাভেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা। মাথা ঘামানোর কোনও দরকার নেই। শুধু দক্ষিণা ধরে দিলেই হবে।
‘তোরাই বল, এটা কেমন বেড়াতে যাওয়া? নিজের পছন্দে কিছুই হবে না।’ জয়াদি বলল।
‘কেন, ট্র্যাভেল প্যাকেজটাই তো নিজেদের পছন্দ করা।’
‘আরে, প্যাকেজের সব কিছু কি আর মনের মত হবে? হয়তো যাওয়া আসার ব্যবস্থা পছন্দ হবে, কিন্তু গিয়ে দেখবে হোটেলের ঘরটা ভালো না।’ জয়াদি খুঁতখুঁত করে।
‘আহা, বেড়াতে গিয়েছিলাম আমরা! পশ্চিমে গিয়ে আমাদের কেমন মজা হয়েছিল মনে আছে?’ সেই শুরু হল আমাদের নিজেদের পশ্চিমে হাওয়াবদল করতে যাওয়ার গল্প। কত কথা, কত মধুর স্মৃতি। দাদুর কথা, ঠাকুমার কথা। বেড়াতে গিয়ে নিনার প্রথম হাঁটা শেখার কথা। আমাদের সবার দুষ্টুমির কথা। সাঁওতাল পরগণার সৌন্দর্য আর সেখানকার মানুষদের মধুর ব্যবহারের কথা। স্মৃতির অ্যালবামটা খুলতেই ছোটবেলার ছোট ছোট স্মৃতিগুলো ভিড় করে এল।

‘নানান ছাপের জমলো শিশি/ নানান মাপের কৌটো হল জড়ো/ ব্যাধির চেয়ে আধি হল বড়/ ডাক্তারেরা বললে তখন হাওয়া বদল কর।’
তখন আমরা সবাই ছোট। শীত আসবো আসবো করছে। জয়াদির বাবা বুড়ো জ্যাঠার শরীরটা ভালো নেই। ওনার ক্রনিক পেটের অসুখ কিছুতেই সারছে না। তাই ডাক্তারবাবু পরামর্শ দিলেন কদিন হাওয়াবদল করে আসতে। পারিবারিক মিটিঙে ঠিক হল মধুপুর যাওয়া হবে। সে এক বিশাল তোড়জোড়। বাড়ির প্রায় সক্কলে যাবে। দাদু, ঠাকুমা, জ্যেঠু, কাকারা, পিসিরা, মা, কাকিমারা কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। শুধু হারুকাকা যাবেন না। উনি বাড়ি পাহারা দেবেন। যাওয়া অন্তত মাস খানেকের জন্য। কবে জ্যাঠার শরীর ঠিক হয়!
‘আমাদের মধুপুরের বাড়িটা তো তালাবন্ধ হয়েই থাকে। তোমরা গিয়ে বরং আমাদের বাড়িতেই ওঠো। আমি কালই তার করে দেবো। কেয়ারটেকার সব ঘরগুলো খুলে পরিস্কার করে রাখবে।’ আমাদের মধুপুর যাওয়ার কথা শুনে পাশের বাড়ির অবনীদাদু যেচে বললেন।
‘হ্যাঁ, অনেকগুলো ঘর আছে, তোমাদের কোনও অসুবিধা হবে না। বাসনকোসন, লেপতোশকের কথাও ভাবতে হবে না।’ পান চিবোতে চিবোতে বললেন গিরিঠাকুমা।
‘বাহ, তাহলে আর চিন্তা কিসের। পশ্চিমের জলহাওয়ায় বুড়োর শরীর নিশ্চয় খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে। বিশেষ করে মধুপুরের জল অমৃত। আমরা তাহলে আপনাদের বাড়িতেই উঠবো। সময় করে আশেপাশের জায়গাগুলোও ঘুরে দেখা যাবে।’ দাদুকে খুব নিশ্চিন্ত দেখাল।
কম করে একমাসের ধাক্কা। আমাদের জ্যেঠতুতো, খুড়তুতো, পিসতুতো ভাইবোনের দলে তখন একটাই আলোচনা। স্কুল নেই, পড়াশুনো নেই। শুধু ঘুরে বেড়াও আর যত খুশি খেলো। একটা পুঁচকেও থাকবে এই দলে। নিনা একদম কোলের শিশু। ওর কিছু মনে থাকবে না বলে জয়াদির সে কি আফসোস!
তিনদিন ধরে গোছগাছের ধুম পড়ল। বড় বড় ট্রাঙ্কে জামাকাপড়, শীতের পোশাক গোছানো হল। বড় বড় ঝুড়িতে মুড়ি, মুড়কি, চিড়ে, গুড়, নাড়ু ছাড়াও অন্যান্য খাবারদাবার। কুঁজো ভর্তি খাবার জল। যাবার আগের দিন সুবলকাকা এক ঝুড়ি ফল দিয়ে গেলেন। ট্রেনে লাগবে। সে এক এলাহি কাণ্ড। তারপর সবাই মিলে ট্রেনে চড়ে বসলাম। সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট কাটা হয়েছিল।
দাদু হলেন আমাদের গল্পদাদু। প্রশ্ন করলেই উনি গল্পের মত সব জায়গার ইতিহাস শোনান। আমাদের জ্যাঠা-কাকারা বলেন এ বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জানেন এই মানুষটা। কত মোটা মোটা বই দাদুর ঘরের আলমারিতে। ট্রেনে সব ভাইবোনরা দাদুর কাছাকাছি বসেছি। ঠাকুমা, মা, কাকিমা, পিসিমারা একদিকে। অন্য দিকে বাবা, কাকা, জ্যাঠা, পিসেমশায়ের দল। হরিদা, শিবুদা আপাতত দরজার কাছে উবু হয়ে বসে গল্প করছে।
‘জয়াদি সেদিন বলছিল আমরা পশ্চিমে যাব। পশ্চিম মানে কি দাদু?’ ট্রেন ছাড়তেই আমার প্রশ্ন।
দাদু বললেন ‘বাংলার পশ্চিমদিকের রাজ্য হল বিহার। মূলত সেই জন্যেই লোকে বলে পশ্চিম। দাঁড়াও, বাড়ি ফিরে তোমাদের ম্যাপ দেখা শিখিয়ে দেব।’
‘পশ্চিম মানে তো বুঝলাম, কিন্তু শরীর খারাপ করলে পশ্চিমে কেন যেতে হয়?’ এবার জয়াদির প্রশ্নবাণ।
দাদুর মুখের হাসি অমলিন। বললেন, ‘বিহারের বিভিন্ন জায়গার জলহাওয়া খুব ভাল। বিশেষ করে পেটের অসুখের জন্য। এই যেমন ধর মধুপুর, গিরিডি, গয়া, জসিডি, শিমুলতলা, দেওঘর, দুমকা, মুঙ্গের, ভাগলপুর, ঘাটশিলা। এখানকার জলে যেমন হজম ভালো হয়, তেমন খিদে হয়। তাই বাঙালিবাবুরা সুযোগ পেলেই বিহারের বিভিন্ন জায়গায় শরীর সারাতে আর বেড়াতে যান। এইসব জায়গাতে সুন্দর সুন্দর সব বাংলো ধরনের বাড়ি বানিয়ে রেখেছেন অনেক বাঙ্গালিবাবু। এই যেমন পাশের বাড়ির অবনীবাবুর বাড়ি আছে মধুপুরে।’
সন্তু নাকি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। তাই বোধ হয় ও একটা কঠিন প্রশ্ন করলো, ‘আচ্ছা দাদু, শরীর খারাপ হলে পশ্চিমে যাওয়ার এই চল কবে থেকে?’
‘তাতো নিশ্চিত করে বলতে পারবো না দাদু। তবে শুনেছি ১৮৭১ সালে মধুপুর থেকে গিরিডি রেল লাইনের কাজে মধুপুরে এসে বিজয়নারায়ণ কুণ্ডু নামক এক ভদ্রলোক সেখানকার জলহাওয়ার গুণ টের পান। পরে সেখানে তিনি একটি বাড়িও বানান। কালেকালে এখানকার জলবায়ুর গুণের খবর জানতে পারে বাঙালিরা। শুরু হয় তাদের স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য পশ্চিমে যাত্রা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসেও পশ্চিম যাত্রার কথা আছে।’
পেটুক বলে আমার একটু বদনাম আছে। আমি প্রশ্ন করলাম ‘ওরা কি খেতো? হাওয়া বদল করতে এসে শুধু হাওয়া খেয়ে থাকত না তো?’
আমার প্রশ্ন শুনে দাদু হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘তবে শোন। এই যে বিলাসী বাঙ্গালিরা এখানে বেড়াতে আসতেন তাঁদের বলা হত চেঞ্জার। কেন না তারা চেঞ্জে এসেছেন। এখানে খাবারদাবার খুবই সস্তা এবং কলকাতার চেয়ে টাটকা। বাজারে জিনিসের দাম শুনে এই চেঞ্জারবাবুরা বলতেন, ‘ড্যাম চিপ’। তাই শুনে এখানকার নিরক্ষর খেটে খাওয়া মানুষগুলো এই চেঞ্জারবাবুদের নামই দিয়ে দিল ‘ড্যানচিবাবু’।’
‘ড্যানচিবাবু, ড্যানচিবাবু, ড্যানচিবাবু, আমি ড্যানচিবাবু খাবো।’ হঠাৎ ঝিমুনি থেকে উঠে অপু আব্দার জুড়লো।
‘অপু দাঁড়া, মধুপুর গিয়ে ড্যানচিবাবু খাবি।’ গম্ভীর হয়ে অপুকে থামিয়ে দাদুকে আবার প্রশ্ন করলো জয়াদি, ‘চেঞ্জাররা কি শুধু খেতো আর ঘুমোতো?’
‘তা কেন? এখানকার জল পেটে পড়তে যেই তারা একটু চাঙ্গা হত অমনি আশেপাশে বেড়াতে চলে যেতো। এখানে দেখার কত জায়গা আছে জানো? পরেশনাথ পাহাড়, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ, উষ্ণ প্রস্রবন, কত পুরনো মন্দির, নানান ঐতিহাসিক জায়গা। আর আছে নদী, ঝর্না এইসব। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির বাড়ি আছে, সেগুলোও এখন দ্রষ্টব্য।’
এত কিছু দেখার আছে শুনে আমরা সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। এমন সময় মায়েদের ডাক এল রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। লুচি, শুকনো আলুর দম পাতে এল। খেতে খেতে জয়াদি হঠাৎ বলে উঠলো, ‘মা, আমি গন্ধ পাচ্ছি, কই, গাজরের হালুয়া দেবে না?’ ‘নাঃ, এই মেয়ে ঠিক টের পেয়েই যাবে।’ সবার পাতে পাতে গাজরের হালুয়া দিতে দিতে বললেন জ্যেঠিমা। খাওয়া শেষ হলে আমরা সবাই শুয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙ্গল একবারে মধুপুর ষ্টেশনে ঢোকার আগে। ষ্টেশন থেকেই দেখা যাচ্ছে শাল, সেগুন, মহুয়া, পলাশের বন। সব্বাই দারুন খুশি। টাঙ্গা ভাড়া করা হল। স্টেশন থেকে বেড়িয়ে আমরা পৌঁছলাম শেখপুরা। অবনীদাদুর বাড়িটা ওখানেই। কেয়ারটেকার সেদিনের মত রান্না করেই রেখেছিল। দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম। বিকেল থেকেই শুরু হল আমাদের ভ্রমণ। তিনশো বছরের পুরনো দেবী কালীর মন্দির পাতরোল দেখা হল সেদিন। আর দেখা হল বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি ‘গঙ্গাপ্রসাদ ভবন’।
পরদিন আমাদের গন্তব্য গিরিডি। সেদিনটা খুব সুন্দর ছিল। উস্রি ফলস দেখে আমরা সবাই খুব ছুটোছুটি শুরু করলাম। পাথরের উপর দিয়ে লঘু ছন্দে উস্রি নদীর ঝর্না বয়ে চলেছে। ঝকঝকে, ঠাণ্ডা জল। সহজপাঠে পড়েছি, ‘আজ উস্রি নদীর ঝর্না দেখতে যাব, দিনটা বড় বিশ্রী।’ হয়ত সেই কারনেই আমাদের এত উত্তেজনা। বইয়ে পড়া একটা জিনিস একদম চোখের সামনে! তিন্নি পিসি গান ধরল, ‘আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও’। সহজপাঠ আউড়াতে আউড়াতে আমরা সবাই লাফাচ্ছি, কিন্তু আছাড় খেলো অপু। পা পিছলে পড়ে জামাকাপড় ভিজলো আর সঙ্গেসঙ্গে পিঠে দুটো কিল। এমন সময় দেখা গেলো অপুর এক পাটি জুতো জলের তোড়ে নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। ‘আমার জুতো ...’, বলে নাকিকান্না জুড়লো অপু।
সন্তু তিন লাফে পৌঁছে গেল জলটা যেখানে কিছুটা নিচে পড়ছে। অনেকেই স্নান করছে সেখানে। ‘আরে, এটা কার জুতো? ইশ, কার না কার জুতো, আমার গায়ের উপর পড়লো’, যারা স্নান করছিলেন তাদের একজন হঠাৎ জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন। অপুর জুতো উদ্ধার করা হল। তবে সেই জুতোর অবস্থা দেখে অপুর নাকিকান্না আরও বেড়ে গেল। জলের তোড়ে জুতো ছিঁড়ে গিয়েছে। খালি পায়ে, ভিজে গায়ে হি হি করে কাঁপছে অপু। এভাবে ঘুরলে অপুর ঠাণ্ডা লেগে যাবে ভয়ে শেষ পর্যন্ত তাড়াতাড়ি ফিরতে হল আমাদের। আমরা সারাদিন অপুকে দুষলাম তাড়াতাড়ি ফিরতে হল বলে আর অপু কাঁদল ওর কষ্ট কেউ বুঝল না বলে।
পরের দিন গেলাম জৈনতীর্থ পরেশনাথ পাহাড় দেখতে। দাদু বললেন ২৩তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ স্বামী এখানে এসে দেহ রেখেছিলেন। তাই তার নামে ১৩৬৬ মিটার উঁচু এই পাহাড়ের নামকরণ হয়েছে। পাহাড়ে তাঁর মন্দির আর মূর্তিও আছে। আড়াই ঘন্টার পাহাড়ী পথ চলা সহজ কথা নয়। ধীরেসুস্থে, একটু হেঁটে আবার একটু জিরিয়ে আমরা উঠছিলাম। কি করে কে জানে সন্তু গড়িয়ে পড়ে গেলো। আর পড়বি তো পর একদম ঘনার উপর। ও ঠিক সন্তুর পেছনেই ছিল। সন্তুর তেমন লাগল না, কিন্তু ব্যাথায় বেচারা ঘনা কান্না জুড়লো। আর সেই কান্না শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সন্তুও কান্না শুরু করল। ছোট পিসির ব্যাগ থেকে বিশাল সাইজের মিহিদানার লাড্ডু বেরোচ্ছে দেখে তবেই ওদের কান্না থামল।
তোঁপচাচি লেক গেলাম তারপরের দিন। ঝড়িয়াকে জল দেওয়ার প্রয়োজনে ১৯১৫ সালে পরেশনাথ পাহাড়ের কোলে তৈরি এই কৃত্রিম লেক অপূর্ব সুন্দর। সঙ্গে করে খাবার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরোটা, শুকনো তরকারি আর প্যাড়া। সেখানেই দুপুরে খেলাম আমরা। আমরা ছোটাছুটি করলাম, খেললাম আর বড়রা বসে গল্প করলেন। তিন্নিপিসির কোল ছেড়ে উঠে নিনা সেদিনই প্রথম হাঁটতে শুরু করল। বেশ একটা পিকনিকের মত কেটে গেল দিনটা।
হুড়মুড় করে দিলগুলো কেটে যাচ্ছে। এরমধ্যেই একদিন গেলাম শিমূলতলা। সারাটাদিন টাঙায় করে আর হেঁটে হেঁটে শহর দেখে, লাট্টুপাহাড় ঘুরেই কেটে গেল। দেখলাম হলদি, লীলাবরণ আরও কত ছোট ছোট নাম না জানা ঝর্না। সন্ধ্যেয় যখন বাড়ি ফিরলাম কারোর পা চলছে না আর। হরিদা সর্ষের তেল গরম করে আমাদের পায়ে মালিশ করে দিলো। তারপর কয়েকদিন আমাদের সবার ঘুম কে দেখে!
দেওঘর ঘোরার অভিজ্ঞতাও এক কথায় অসাধারণ। সাঁওতাল পরগনার এই অঞ্চল নাকি দেবতার ঘর। তাই এর নাম দেওঘর। লর্ড শিবের মন্দির, ক্লক টাওয়ার, সেই টাওয়ার ঘিরে গড়ে ওঠা বাজার, ন’লাখ টাকায় তৈরি হওয়া নওলাখি মন্দির সব ঘুরে দেখলাম। কখনও টাঙায় চেপে, কখনও বা হেঁটে। এখানে বাজারে আমাদের জয়াদি হারিয়ে গেল। হঠাৎ হেমেনকাকার খেয়াল হল, জয়া নেই। খোঁজ খোঁজ। শেষে একটা মিষ্টির দোকানে পাওয়া গেল জয়াদিকে। দলছুট হয়েও জয়াদির কোনও চিন্তা ছিল না, ও জানতোই বড়রা ওকে নিশ্চয় খুঁজবে। তাই ও একমনে মিষ্টি বানানো দেখে যাচ্ছিল।
মুঙ্গের যেতে বেশ অনেকটা সময় লাগবে। তাই সেখানে গিয়ে তিনদিন থাকা হবে ঠিক হল। ঠিক হল সেখান থেকেই ভাগলপুরেও ঘুরে আসবো। মুঙ্গেরে গিয়ে সীতাকুণ্ড দেখে তো আমরা হাঁ। ওখানে আমরা সবাই স্নান করলাম। হেমেনকাকা আমাদের ভাইবোনদের কোলে করে কুণ্ডের জলে ছেড়ে দিচ্ছিলেন। জল এত গরম যে গায়ে ছ্যাঁকা লাগছে, কিন্তু পুড়ে যাচ্ছে না। আমরা সবাই তারস্বরে চেঁচাতে লাগলাম। স্নান সেরে দেখি একটা না, এরকম আরও কত কুণ্ড। রামকুণ্ড, ভরতকুণ্ড, ঋষিকুণ্ড। দাদু জানালেন সবাই বলে, ‘সীতার অগ্নিপরীক্ষার সময় থেকেই এখানে জল ফুটে চলেছে বিরামহীন।’
পরেরদিন ভাগলপুর। শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়, বনফুলের মত বিশিষ্ট সাহিত্যিকের স্মৃতি বিজড়িত শহর। দাদুর কথা শুনে মনে একরাশ ভক্তি নিয়ে সারাদিন ঘুরেঘুরে দেখলাম। দুধেশ্বর মহাদেবের মন্দির, জৈন মন্দির, কুপ্পা ঘাট আশ্রম এসবই ছিল আমাদের সেদিনকার দ্রষ্টব্য।
তারপর গেলাম হাজারীবাগ। সব থেকে বড় আকর্ষণ ছিল কানারী পাহাড়। শ’পাঁচেক সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে হবে। সে কি কম কথা? ওঠার সময় এত কষ্ট হল। কিন্তু উপরে উঠে শহরের দৃশ্য দেখে এত ভালো লাগলো যে ওঠার কষ্ট ভুলে গেলাম আমরা। মনে হচ্ছিল কেউ যেন ঝুলন সাজিয়ে রেখেছে। সারাদিন ঘুরে সেদিন আমরা সেখানেই থেকে গেলাম।
পরের দিন সেখান থেকেই গেলাম রাঁচি আর দশম ফলস। রাঁচি লেক আর লেকের মাঝে দ্বীপগুলো যেন ছবির মতই সুন্দর। রাঁচির উত্তরের মোরাবাদি পাহাড় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ির কারণে টেগোর হিল নামে পরিচিত। এখান থেকেই আমরা দেখতে গেলাম কাঞ্চি নদীর দশম ফলস। ১৪৪ ফুট উঁচু ঝর্না এসে পরছে সুবর্ণরেখা নদীতে। অত উঁচু থেকে পরার জন্য জল গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। আর সেই গুঁড়ো গুঁড়ো জল ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। ‘ওটা কি দাদু?’ হঠাৎ ঘনা চিৎকার করে উঠলো। রামধনু উঠেছে ফলসের উপর। গুঁড়ো গুঁড়ো জলের মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পরা নানান রঙের সেই আলো কি যে সুন্দর। না দেখলে জানতেই পারতাম না।
পালামৌ, ঘাটশিলা, নালন্দা এরকম আরও কত জায়গা বাকি থেকে গেলো। একমাস সময় কি করে পেরিয়ে গেল আমরা টেরও পেলাম না। ইতিমধ্যে বুড়ো জ্যাঠার পেটের অসুখ ভালো হয়ে গিয়েছে। চমৎকার জলহাওয়ায় আমাদের সবারই দারুন খিদে বেড়েছে। সবারই নাকি স্বাস্থ্য গোলগাল হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে এখানে, এই পশ্চিমেই থেকে গেলে বেশ হয়। এমন সময় একদিন সন্ধ্যেবেলায় দাদু বাবাকে ডেকে বললেন, ‘এবার তো বাড়ি ফিরতে হয়। অনেকদিন হল সবাই বাড়ির বাইরে। তোমাদেরকে অফিস কাছারিতে যেতে হবে। বাচ্চাদেরও স্কুল আছে।’ আবার সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে বেশ মন খারাপ নিয়েই আমরা ফেরার ট্রেনে চাপলাম।

পশ্চিমের দিনগুলো যেন আমাদের সবাইকে আবার সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। স্মৃতিচারণ আর হাসাহাসির মধ্যেই ঘরে ঢুকল রাহুল। হাতের ট্রেতে ওর নিজের হাতে বানানো ফিশচপ। সঙ্গে কাসুন্দি আর স্যালাড। ঘরটা ‘ম ম’ করে উঠল সুখাদ্যের সুগন্ধে। পিছনে কোল্ডড্রিঙ্কের বোতল আর কাচের গ্লাস নিয়ে নয়না।
‘খুব তো পশ্চিমে বেড়াতে যাওয়ার গল্প হচ্ছে। রান্নাঘর থেকে আমি সব শুনতে পেয়েছি। কিন্তু এখন কার এত সময় আছে যে একমাস ধরে কোথাও গিয়ে বসে থাকবে?’ সেন্টার টেবিলে চপের ট্রে নামাতে নামাতে বলল রাহুল।
‘সেটা অবশ্য ঠিক।’ ফিসচপের দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে বলল অপু।
‘ছেলের স্কুলের কথাও তো ভাবতে হবে। একদিনও কি কামাই করার উপায় আছে? রোজই তো কিছু না কিছু প্রোজেক্ট জমা দিতে হয়।’ রাহুল আরও বলল।
‘তা তুই ঠিকই বলেছিস রে রাহুল। দেখ না, আমার নাতি দুটোরও একই অবস্থা। রোজই হয় প্রোজেক্ট নাহয় পরীক্ষা। কোথাও যাওয়ার উপায় নেই।’ ফিসচপে কামড় বসিয়ে আমি বললাম।
‘শুধু কি তাই? অফিস থেকে ফিরে বাড়িতে তো নানান কাজ আছেই। বেড়াতে গিয়েও রান্না করলে মজা করবো কবে?’ নয়নার প্রশ্ন।
‘এছাড়াও এখন স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে পশ্চিমে গেলে সেখানে ভালো ডাক্তার, হসপিটাল বা থাকার জায়গাও তো নেই!’ জয়াদি নিজেই বলে উঠল।
‘আসলে কি বলতো, এখন কোথাও বেড়াতে গেলে কিভাবে যাওয়া যায়, কোথায় থাকা যায়, আশেপাশের কোথায় কি দেখার আছে, সেটা ট্র্যাভেল এজেন্সীগুলোই ভালো জানে। টাকা হয়তো নেবে, কিন্তু ব্যবস্থা করে দেবে সব। তাই ওদের উপর দায়িত্ব দিয়ে দিলেই তো ভালো, তাই না?’ কোল্ডড্রিঙ্কে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল রাহুল।
‘নাঃ, মানতেই হবে, যারা ট্র্যাভেল এজেন্ট, তাদের হাতে ছেড়ে দিলে বেড়ানোর অনেক কিছুই অনেক কম সময়ে, সহজে হয়ে যায়।’
‘সত্যি, আমাদের দিন কি আর আছে? কত কিছুই তো বদলে গেল। এখন ট্রেনের টিকিট কাটাই তো কত সহজ হয়ে গিয়েছে। লাইনে দাঁড়ানোরও দরকার নেই। ঘরে বসে ট্র্যাভেল এজেন্টকে একটা ফোন করে দাও। কিম্বা কম্পিউটারে বসে ইন্টারনেটে নিজেই টিকিট কেটে নাও।’ কাসুন্দিটা আঙ্গুল থেকে চেটে নিয়ে বলল ঘনা।
‘এখন কি কেউ বিশাল পরিবার নিয়ে, ঠাকুর চাকর, রান্নার বাসন কিম্বা ট্রাঙ্ক ভর্তি শীতের লেপকম্বল নিয়ে বেড়াতে যায় নাকি? এখন এই জেট গতির যুগে কারোর সময় নেই অনেকদিন সময় নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার।’ রাহুল ঘনামামার সুরে সুর মিলিয়ে বলল।
‘সবথেকে বড় কথা এখন পশ্চিমের সেই রমরমাও আর নেই। কটা লোকই বা সেখানে বেড়াতে যায়। আর স্বাস্থ্যউদ্ধার করতে তো কেউই যায় না। এখন ছোট-বড় ছুটি পেলে বাঙালি বাবুরা-বিবিরা যান সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, মেক্সিকো। প্যাকেজ ট্যুর। কখনও তিন দিনের, কখনও ষোল দিনের। টাকা দাও, ঝাড়া হাতপায়ে ঘুরে এসো। যুগটাই পাল্টে গিয়েছে।’ জয়াদির গলায় যেন একটু মন খারাপের সুর।
সেদিন আড্ডা শেষে বাড়ি ফিরছি। মনে হলো ‘যদি আবার একবার সবাই মিলে পশ্চিমে যেতে পারতাম। যদি আরেকবার হেঁটে হেঁটে উস্রি নদীর ঝর্না দেখতে পারতাম! যদি আরেকবার শাল, সেগুনের বনে লুকোচুরি খেলতে পারতাম! যদি আরেকবার আমাদের সবার গান, গল্প আর খিলখিল হাসিতে ভরে উঠত পশ্চিমের আকাশ বাতাস! যদি, যদি...’
একা একা গাড়িতে বসে অনেকগুলো ‘যদি’ আমার মনের মধ্যে ভিড় করে এলো।
-----


রেফারেন্সঃ
ভ্রমণসঙ্গী। ১৯৮৯ সাল। এশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি।